বিলীন হচ্ছে ঢাকার ঐতিহ্
সাকিল আলম : সংরক্ষণ ও সংস্কারের অভাবে ধ্বংস হচ্ছে ঢাকার পুরাকীর্তি হিসাবে গুরুত্বপূর্ণ শতাধিক ঐতিহ্যবাহী ভবন। আইন করেও ঢাকার গর্ব হিসাবে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা এসব স্থাপনা রক্ষা করা যাচ্ছে না।
অবৈধ দখলদার ও ভূমিদস্যু চক্র নির্বিচারে একের পর এক ঐতিহ্য ধ্বংস করে চলেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ২০০৯ সালে ঐতিহ্য সংরক্ষণ আইন প্রণয়ন হয়েছে। কিন্তু আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর অবহেলাসহ নানা দুর্নীতির কারণে ঢাকার বুক থেকে একের পর এক ঐতিহ্য বিলুপ্ত হতে চলেছে।
ঢাকা সিটি করপোরেশন, রাজউক ও প্রত্নতত্ত্ব বিভাগসূত্রে জানা যায়, মহান স্বাধীনতার পর এ পর্যন্ত পুরনো ঢাকাসহ রাজধানীতে সহস্রাধিক কারুকাজ মন্ডিত প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা ধ্বংস করা হয়েছে। গত দশ বছরে বিনাশ করা হয়েছে আরো শতাধিক ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা। এরকম আরো শতাধিক ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা ভেঙ্গে ফেলার আশংকা করা হচ্ছে। ঐতিহ্য বিনাশ রোধে সরকার তেমন কোন কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারছে না।
অতিসম্প্রতি ঢাকা সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে সরকার একাধিক মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে ১২ সদস্যবিশিষ্ট একটি হেরিটেজ কমিটি গঠন করেছে। কমিটি পুরনো ঢাকাসহ রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে স্থাপিত প্রাচীন ভবনগুলোকে হেরিটেজ হিসাবে চিহ্নিত করে। এর মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, টিএসসির ভিতর শিব মন্দির, লালবাগ কেল্লা, জাতীয় তিন নেতার মাজার, ছোট কাটারা, বড় কাটারা, শাহবাজ খান মসজিদ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, রূপলাল হাউজ, ঢাকা ব্রাহ্ম সমাজ মন্দির, নবাব বাড়িসহ ৯৩টি ঐতিহ্যবাহী ভবনকে চূড়ান্তভাবে হেরিটেজ তালিকাভুক্ত করে গেজেট প্রকাশ করা হয়েছে। তালিকাভুক্ত স্থাপনাগুলো দ্রুত সংস্কার ও সংরক্ষণের জন্য সরকারের কাছে একটি পূর্ণাঙ্গ সুপারিশমালা পাঠানো হলেও সংস্কারের ব্যাপারে এখনো কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি।
অবশ্য ঢাকা সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আবুল কালাম আজাদ এ প্রসঙ্গে ইত্তেফাককে বলেন, ঢাকার ঐতিহ্য রক্ষায় ইতিমধ্যেই সরকারের উচ্চ মহল থেকে তাগিদ এসেছে। ঢাকার আদি ঐতিহ্য সংরক্ষণের জন্য ঢাকা সিটি করপোরেশন, রাজউক, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়কে কঠোর নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। সে অনুযায়ী ঐতিহ্য সংরক্ষণের কাজ চলছে। কিন্তু সরেজমিনে পরিদর্শনে এ বক্তব্যের সত্যতা পাওয়া যায়নি।
ঢাকার ঐতিহ্যবাহী স্থাপনার অন্যতম হচ্ছে রূপলাল হাউজ। সরকারিভাবে এই স্থাপনাটি প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের সম্পদ ঘোষণা করা সত্ত্বেও তা দীর্ঘকাল ধরে বেদখল হয়ে রয়েছে। রূপলাল হাউজকে ঘিরে শতাধিক ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। এসবের মধ্যে রয়েছে জামান হাউজ, জনতা কৃষি পণ্য বিপণন কেন্দ্র, বৈশাখী বাণিজ্যালয়, আরাফাত ট্রেডার্স, মেসার্স ঢাকা-বাংলা আড়ত্, রাশেদ বাণিজ্যালয়, ইউনাইটেড ট্রেডার্স প্রভৃতি। এছাড়া তিনতলা ভবনের একাংশে আর্মি স্টাফ কোয়ার্টার গড়ে তোলা হয়েছে।
ইতিমধ্যেই রূপলাল হাউজের সাইনবোর্ড পাল্টে জামান হাউজের সাইনবোর্ড স্থাপন করা হয়েছে। জাতীয় জাদুঘর স্থাপিত সাইনবোর্ডটি অপসারণ করা হয়েছে। রূপলাল হাউজের দখলদার জামান হাউজের বাসিন্দাদের সাথে যোগাযোগ করা হলে তারা এ ব্যাপারে কোন মন্তব্য করতে রাজি হননি।
এদিকে ঐতিহ্যবাহী ভবন সংরক্ষণের খবরে পুরনো ঢাকায় একাধিক প্রভাবশালী মহল আদি ঐতিহ্য বিনাশে মরিয়া হয়ে উঠেছে। তারা রাতারাতি একাধিক ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা ধ্বংস করে তাতে বহুতল ভবন গড়ে তুলছে। রাজউক চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. নূরুল হুদা বলেন, ঢাকার ঐতিহ্যবাহী বাড়ি ও স্থাপনা রক্ষার দায়িত্ব সরকারি সংস্থার পাশাপাশি সমাজ সচেতন মানুষের। তিনি বলেন, অতীতে নির্বিচারে বহু হেরিটেজ ধ্বংস করা হয়েছে। আগামীতে আর যাতে কোনো ঐতিহ্য ধ্বংস করার সাহস কেউ না পায় সেই উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। ঐতিহ্য বিনাশকারী ১৬ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে রাজউক মামলা করেছে। ঢাকার ঐতিহ্য বিনাশের ষড়যন্ত্রে লিপ্ত একাধিক ডেভেলপার কোম্পানির তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে। শীঘ্রই এদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে যাচ্ছে রাজউক। রাজউকের চেয়ারম্যান আরো বলেন, ঐতিহ্যবাহী স্থাপনাগুলোর রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের। নগরীর ঐতিহ্য রক্ষায় রাজউক অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছে।
স্থানীয়রা জানিয়েছেন, ঐতিহ্য বিনাশকারীরা কোনো দোহাই মানছে না। তারা ডিসিসি কিংবা রাজউকের দেয়া নোটিসকে মোটেও আমলে নিচ্ছে না। ইতিমধ্যেই শাঁখারী বাজারের হেরিটেজভুক্ত ১৪ নম্বর বাড়িটি ভেঙ্গে ফেলা হয়েছে। সুত্রাপুরের বড় বাড়িটির সিংহভাগই ধ্বংস করা হয়েছে। মোগল আমলের স্মৃতিবাহী বংশাল মুকিম বাজার জামে মসজিদ, সিদ্দিক বাজার জামে মসজিদ সংস্কারের নামে ধ্বংস করা হয়েছে। সিংটোলায় দুইশ বছরের পুরনো আরেকটি স্থাপনা বিনাশ হয়েছে। এছাড়া হেরিটেজভুক্ত তাঁতীবাজার জগন্নাথ মন্দির, ফরাশগঞ্জ বড় বাড়ি। কোতোয়ালির ২৭/২ নম্বর বাড়ি, সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজ হোস্টেল বিল্ডিং, গোয়াল নগরের ২টি বাড়ি, শাঁখারী বাজার ১১৮ নম্বর বাড়ি, রাধিকা মোহন বসাক লেনের ২১ নম্বর বাড়ি ইতিমধ্যেই ভেঙ্গে ফেলা হয়েছে। এসব স্থাপনা রক্ষায় সরকারের সুস্পষ্ট নির্দেশনা থাকলেও রাজউক ও ডিসিসির কর্মকর্তারা রহস্যজনক ভূমিকা পালন করেছে। অনেকক্ষেত্রে এদের নীরবতা ঐতিহ্য ধ্বংস সহায়ক শক্তি হিসাবে কাজ করছে।
তবে ঐতিহ্যবাহী এসব স্থাপনার মালিকও ভবনের বাসিন্দারা জানিয়েছেন ভিন্ন কথা। কোনো ধরনের অধিগ্রহণ ছাড়াই পুরনো ঢাকার শতাধিক বাড়িঘর, স্থাপনা হেরিটেজ হিসাবে ঘোষণা করা হয়েছে। নিজ ভূমে পরবাসের মতোই এখন আমাদের জীবন। বাড়ির চুনকাম করতেও সরকারের অনুমতি লাগে। রাধিকা মোহন বসাক লেনের বাসিন্দা বিশখা রানী সরকার বলেন, তাদের পৈতৃক ভিটামাটিতে সরকারের অনুকম্পা নিয়ে বসবাস করতে হচ্ছে। কথায় কথায় পুলিশ আসে। আসে রাজউক ও ডিসিসি’র কর্মকর্তারাও। এদের সবার দাবি হেরিটেজ ভবনগুলো বাজার দর মোতাবেক উপযুক্ত ক্ষতিপূরণসহ অধিগ্রহণ করা হোক। একইসঙ্গে তারা ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে পুনর্বাসনেরও দাবি জানিয়েছেন।
আরবান স্টাডি গ্রুপের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা স্থপতি তাইমুর ইসলাম বলেন, ঐতিহ্য সংরক্ষণ কার্যক্রমকে জোরদার ও গতিশীল করতে হবে। তিনি ইমারত নির্মাণ বিধিমালা আইন কার্যকর ও হেরিটেজ ভবনগুলো সংরক্ষণের দাবি জানান।
পুরনো ঢাকার ছোট কাটারা, বড় কাটারা, লালবাগ কেল্লা, রূপলাল হাউজসহ শতাধিক ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা পুরাকীর্তি হিসাবে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের সম্পদ হিসাবে নথিভুক্ত রয়েছে। এছাড়া গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের হেরিটেজ ভবনের দুইটি তালিকা রয়েছে। প্রথমটিতে ১১২ ও দ্বিতীয় তালিকায় ৩২টি ঐতিহ্যবাহী স্থাপনার নাম রয়েছে। তিনি বলেন, ইতিমধ্যেই প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের বেশকিছু ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা দখল করে মাদ্রাসা, আড়তসহ নানা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হয়েছে। এই অমূল্য সম্পদগুলো উদ্ধারের চেষ্টা চলছে। বাকি স্থাপনাগুলোর প্রতিও নজরদারি বাড়ানো হয়েছে বলে তিনি জানান।
লালবাগ কেল্লা ঢাকা
লালবাগ কেল্লার নির্মাণকাজ শুরু করেছিলেন মোগল সম্রাট আওরঙ্গজেবের তৃতীয় পুত্র মুহাম্মদ আজম শাহ। তিনি ১৬৭৮ সালের ২৯ জুলাই বাংলার সুবাদার হিসেবে ঢাকায় আসেন। মাত্র এক বছর তিনি সুবাদার ছিলেন। এর মধ্যেই তিনি বুড়িগঙ্গার তীরে এক প্রাসাদ দুর্গ নির্মাণের কাজে হাত দেন। পিতার নামানুসারে এর নাম রাখেন 'কিল্লা আওরঙ্গাবাদ'। পরবর্তী সময়ে নামকরণ হয় লালবাগ কেল্লা। হয়তো এ এলাকায় লাল গোলাপের বাগান ছিল, সেই থেকে এলাকার নাম এবং এলাকার নামে কেল্লার নাম।
মারাঠাদের সঙ্গে লড়াই করার জন্য আজম শাহকে চলে যেতে হয়। তিনি নতুন সুবাদার শায়েস্তা খাঁকে কেল্লাটির কাজ শেষ করার অনুরোধ করে যান। শায়েস্তা খাঁ কেল্লাটি সম্পূর্ণ করতে না পারলেও কন্যা পরীবিবির সমাধি ভালোভাবেই শেষ করেছিলেন। পরীবিবির মাজার ছাড়াও কেল্লার অভ্যন্তরে আছে একটি হাম্মামখানা (গোসলখানা), একটি মসজিদ ও একটি পুকুর। ১৮৫৭ সালে এ কেল্লায় সিপাহিদের সঙ্গে ব্রিটিশ নৌসেনাদের লড়াই হয়। বর্তমানে এটি বাংলাদেশের সংরক্ষিত প্রত্নসম্পদ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা থেকে কেল্লায় যেতে রিকশা ভাড়া ১৫ টাকা।
আহসান মঞ্জিল
নবাব বাড়ির নবাব কি সত্যি নবাব ছিলেন? এর উত্তরে হয়তো সবাই বলবেন, অবশ্যই খাজা আবদুল গনি। কিন্তু কোথায় পেলেন তিনি এই নবাব খেতাব আর এই বাড়িটি তিনি কেনেন কোথা থেকে_ এসব জানতে হলে আপনাকে যেতে হবে সুদূর অতীতে।
প্রাণেশ সমাদ্দারের কিশোর ইতিহাস 'সিপাহী বিদ্রোহে ঢাকা' বইটিতে আহসান মঞ্জিল তথা নবাব বাড়ির আদি কথা তুলে ধরা হয়েছে। ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের জুন মাস উত্তাল সারা ভারত। ইংরেজ বেনিয়া শাসককুল ঢাকায় বিদ্রোহ থামাতে অত্যন্ত সচেতন, কিন্তু ঢাকার সিপাহীদের থামাতে চাই ভিন্ন কৌশল। কারণ সিপাহীদের সদর কেন্দ্র জলপাইগুড়ি থেকে বিদ্রোহের খবর এসেছে। সদর কেন্দ্র বিদ্রোহী হলে ঢাকাকে রক্ষা করা যাবে না। তাই ইংরেজ জাত বাঁচানোর তাগিদে ৩০ জুলাই ঢাকা কলেজে এক সভা ডাকেন। (বাহাদুর শাহ পার্কের ঠিক পশ্চিমে যা বর্তমানে ঢাকা কলেজিয়েট স্কুলে পরিণত হয়েছে) সে সভায় সাদা জাতির তীক্ষ্ন বুদ্ধি থেকে বের হয় এক নতুন ষড়যন্ত্র। ঢাকার বিদ্রোহ দমাতে চাইলে, এদের শায়েস্তা করতে হলে একজন 'গাদ্দার' রেব করতে হবে। যাকে কেনা যাবে টাকা ও সম্পদের মোহ দিয়ে। অতি অল্প সময়ে পাওয়া গেল একজন সম্ভ্রান্ত নাগরিককে। সেই নাগরিক হলেন ঢাকার নবাব খাজা আবদুল গনি। এই সেই আবদুল গনি, ঢাকার উন্নয়নকল্পে তার অবদান অস্বীকার করা যায় না। তিনি মূলত ছিলেন চামড়া ব্যবসায়ী। ব্যবসায়িক কারণে ইংরেজদের সঙ্গে যোগযোগ প্রায়ই হতো। ফলে তাকে বাগে পেতে খুব একটা কষ্ট করতে হয়নি ইংরেজদের। দেশবাসীর প্রতি বিশ্বাসঘাতকতার জন্য কোম্পানি বাহাদুর এনাম হিসেবে দিলেন নবাব এবং পরবর্তী সময়ে স্যার (কেসিএসআই) উপাধি। বেইমানির পুরস্কার হিসেবে তিনি ঢাকায় এক বিরাট ভূখণ্ড চিরস্থায়ী লিজ পান। এ ভূখণ্ডটিতে কোম্পানি বাহাদুর নবাব আবদুল গনির পুত্র আহসানের নামে এই ঐতিহাসিক আহ্সান মঞ্জিলটি গড়ে দেন। মূলত এ মঞ্জিলটি তৈরি হয়েছিল ইংরেজদের দুর্গ হিসেবে, পরে তা নবাব আব্দুল গনিকে এনাম হিসেবে দেওয়া হয়।
ইংরেজ জাতির চামচা হওয়ার ফলে 'নবাব' উপাধিও হয়ে যায় বংশগত উপাধি। ফলে বংশানুক্রমে নবাব আহসানউল্লাহ, নবাব সালিমুল্লাহ, নবাব হাবিবউল্লাহ আরো অনেকে নবাব উপাধি বহন করে এসেছেন। ঢাকার প্রকৃত ও আদি নবাবের বাড়ি ছিল ঢাকার নিমতলীতে। তাই তারা আবদুল গনিকে কাগুজে নবাব বলতেন। (শতবর্ষের ঢাকা : আহমেদ মীর্জা খবীর), এদিকে খাজা আবদুল গনি প্রচার করতে থাকেন খাজা আলিমউল্লাহ ১৮৩৫ সালে ফরাসি কুঠিয়ালদের কাছ থেকে এ বাড়ি কিনেছিলেন। তারপর থেকে সবাই জানে আহসান মঞ্জিলের সব বংশধর নবাব ছিলেন। এখন কথা হচ্ছে, '৪০০ বছরের ঢাকার ইতিহাস' এবং 'সিপাহী বিদ্রোহে ঢাকা' এ দুটি বইতে আহসান মঞ্জিল সম্পর্কে যে তথ্য দেওয়া হয়েছে তা বিতর্কিত। কারণ, দুটি অতীত ইতিহাস ভিন্নরকম, প্রমাণ দেওয়া কঠিন আসল সত্য কোনটি। তবে মিথ্যা সত্যকে কখনোই পরাজিত করতে পারে না।
কালের স্মৃতিচিহ্ন | ঢাকা: হোসেইনী দালান
হুসেনী দালান বা হোসেইনী দালান (Hossaini Dalan) হচ্ছে শিয়া সম্প্রদায়ের মহররম উৎসবের কেন্দ্র ইমামবাড়া। আক্ষরিক অর্থে ইমামবাড়া বলতে ইমামের বাড়িকে বুঝায়। কিন্তু স্থাপত্যিক অর্থে ইমামবাড়া হলো একটি শিয়া মিলনায়তন যেখানে মহানবীর দৌহিত্র হযরত হোসাইনের মৃত্যু দিবস বা আশুরার উদযাপন পালিত হয়। মহরম মাসের ১০ তারিখে ইমাম হোসাইন শাহাদত বরণ করায় ঐ দিনটিকে শিয়া সম্প্রদায় সমগ্র বিশ্বে আশুরা বা শোকের দিবস হিসেবে পালন করে থাকে। এই দিনে ইমামবাড়ায় কোরান পাঠ, কারবালার শোক গাথার বর্ণনা, মাতম বা বুক চাপড়িয়ে শোক প্রকাশ এবং মিলনায়তন থেকে তাজিয়া আনা-নেয়া হয়।
বর্তমানে
পুরনো ঢাকায় অবস্থিত যে ইমারতটি হুসেনী দালান নামে পরিচিত, তা মোগল
সুবাদার শাহ সুজার আমলে নির্মিত হয়। সৈয়দ মুরাদ, নামান্তরে মীর মুরাদ,
নামে জনৈক ব্যক্তি এটি নির্মাণ করেছিলেন বলে জানা যায়। জনশ্রুতি আছে যে
সৈয়দ মুরাদ স্বপ্নে হযরত হোসাইনকে তাজিয়া নির্মাণ করতে দেখে এই তাজিয়াখানা
নির্মাণ করেছিলেন, এবং তাকে হোসাইনী দালান হিসেবে নিজেই নামকরণ করেন।
মূল ইমারতটি ডয়লী’র চিত্রে একটি চমৎকার মোগল স্থাপত্য হিসেবে দর্শিত হলেও
পরবর্তী সংস্করণে তাকে বর্তমান ঔপনিবেশিক নিদর্শনে রূপান্তরিত করা হয়।
ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ১৮০৭ ও ১৮১০ সালে ইমারতটিতে সংস্কারসাধন করলেও
বর্তমান দালানটি ১৮৯৭ সালের ভূমিকম্পের পরবর্তী নির্মাণেরই ফসল। ভূমিকম্পে
দালানটি ক্ষতিগ্রস্ত হলে নবাব আহসানউল্লাহ তা আবার সংস্কার করে
দিয়েছিলেন।
জানা
যায়, ঢাকার সবচেয়ে পুরনো হুসেনী দালান বা ইমামবাড়া ছিলো ফরাশগঞ্জে বিবি
কা রওজা মহল্লায়। ইসলাম খাঁর ঢাকায় পদার্পণের আগে জনৈক আমীর খান ১৬০০
সালে তার নির্মাণ করেছিলেন। ১৮৬১ সালে আর, এম, দোসানজী এটি আবার সংস্কার
করেছিলেন। তবে ইমামবাড়া হিসেবে বর্তমানে পুরনো ঢাকার এই হুসেনী দালানই
সমধিক পরিচিত স্থাপনা।

No comments:
Post a Comment