ইসলাম







































রসূল (স.)-এর মর্যাদা রক্ষা ও মুসলিম উম্মাহর করণীয়
লেখক: জাস্টিস আল্লামা তকী ওসমানী: মানুষ যখন যুক্তি-প্রমাণে হেরে যায় কিন্তু হঠকারিতা ও জেদ ছাড়তে পারে না— তখন সে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে ধৃষ্টতাপূর্ণ পথই বেছে নেয়। মহানবীর সমসমায়িক বিভিন্ন ধর্মানুসারী সমপ্রদায় যারা ইসলামকে দলিল-প্রমাণ বা জ্ঞানভিত্তিক বিতর্কে নাকচ করতে পারেনি, তারা পেশিশক্তি, কুরুচিপূর্ণ নিন্দাবাদ ও অযৌক্তিক পন্থায় আক্রমণ করতো। এটা তার অস্তিত্ব রক্ষার শেষ চেষ্টা। চোখের সামনে অনিবার্য পরাজয় দেখে স্রেফ মনের ঝাল মিটানোর মতো কাণ্ড। অসভ্য ও হঠকারী প্রতিপক্ষের কাছে যখন আপনার বিপক্ষে বলার মতো কিছু থাকে না তখন সে নানাভাবে আপনাকে গালমন্দ করতে শুরু করবে। বিশ্বনবী (স.) এর যুগ এবং পরবর্তীকালে মহান আল্ল­াহ ইসলামকে যে আদর্শিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন, তার মুখোমুখী হতে গিয়ে যেসব লোক পরাজিত হয়েছে যুক্তি-প্রমাণ ও সামাজিক-রাজনৈতিক শক্তি হিসেবেও তারা গায়ের জোরে ও গালমন্দের পথ ধরে এগুতে চায়।  আজ আধুনিক সভ্যতা ও উন্নত সংস্কৃতির দাবিদার সেজে যারা তাদের নিজের কৃষ্টি-কালচারের ডুগডুগি বাজায়, যারা মানবাধিকারের ধ্বজাদারী বলে ঢোল পিটায়, তাদের আর বর্বর-জাহেলী যুগের কূপমণ্ডুকদের মাঝে তেমন কোনো তফাত্ নেই। তত্কালীন সত্যবিমুখ, হঠকারী লোকদের মতো বর্তমানের ইসলামবিদ্বেষীদের কাছেও ইসলামের বিপক্ষে কোনো দলিল প্রমাণ নেই। যুক্তি-প্রমাণের ময়দানে তারা চূড়ান্তভাবে হেরে গেছে। আল্ল­াহর রহমতে ইসলাম আজ তার সত্যতা ও সহজাত মহিমায় গোটা দুনিয়াকে জয় করে নিয়েছে। ইসলামের এসব শত্রুদের কাছে চাঁদের দিকে থুথু ছিটানোর মতো মহানবীর চরিত্র হননের বিফল চেষ্টা ছাড়া কোনো পথ খোলা নেই। আজ ওরা সেই চেষ্টাই পুনর্বার শুরু করেছে। বস্তুত, এটা তাদের পতন, পরাজয় আর সর্বৈব ব্যর্থতার প্রমাণ। যুক্তি-প্রমাণে হেরে গিয়ে অনিঃশেষ অন্তর্জ্বালা মেটাতে তারা উম্মাদের মতো আচরণ করছে। এর বহিঃপ্রকাশ হিসেবে কখনও সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ এ মানুষটির চরিত্র হনন করে উদ্ভট ও নোংরা চলচ্চিত্র নির্মাণ করছে, কখনও কার্টুন ইত্যাদি প্রকাশ করছে।  জ্ঞানী, যুক্তিবাদী ও সুস্থ বিবেকসম্পন্ন মানুষ প্রমাণ দিয়ে প্রতিপক্ষের মোকাবিলা করে। যুক্তি দিয়ে খণ্ডন করে বিপক্ষের দাবি। যুক্তির জবাবে তুলে ধরে পাল্টা যুক্তি। বুদ্ধিবৃত্তিক যুদ্ধে ব্যবহার করে কেবল জ্ঞানের হাতিয়ার। এ পথে অগ্রসর না হয়ে পেশীশক্তি প্রদর্শন, গালমন্দ ইত্যাদির আশ্রয় নেয়া প্রকারান্তরে নিজের মতাদর্শের অসারতাই স্বীকার করে নেয়ার শামিল। তারা রাসূলের উপস্থাপিত প্রামাণ্য বক্তব্যের কোনো জবাব রাখে না; তাই ক্রোধের আগুন নিভাতে না পেরে অসভ্যতার পথ অবলম্বন করে। আর নাম দেয় মুক্তচিন্তা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা। পরোক্ষে এটা নিজেদের পরাজয়েরই স্বীকৃতি।
অন্যদিকে এর মাধ্যমে মুসলমানদের আত্মমর্যাদাকে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে। নবীর প্রেমিক হবার দাবিদাররা দেখি এই ধৃষ্টতার জবাবে কী ভূমিকা পালন করে। এটি একটি চ্যালেঞ্জ। আমি মনে করি, পুরো মুসলিম উম্মাহ্র উচিত এই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করা। তাদের দেখিয়ে দেয়া উচিত, মুহাম্মাদুর রাসূলুল­াহ (স.) এর ইজ্জত ও মর্যাদা রক্ষায় তারা জীবন পর্যন্ত উত্সর্গ করতে পারে। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্ল­াহু আলাইহি ওয়া সাল্ল­াম) দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষণা করেছেন— ‘সে পর্যন্ত তোমাদের কেউ মুমিন হতে পারে না যে পর্যন্ত আমি তার জীবন, পিতা, সন্তান-সন্ততি এবং গোটা পৃথিবীর চেয়ে তার কাছে অধিকতর প্রিয় বিবেচিত না হই।’ সাহাবায়ে কেরাম নিজেদের আমল বা কর্মের মাধ্যমে নবীপ্রেমের এমনসব দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন, পৃথিবীর কোনো জাতি নিজেদের নেতার, নবীর, পথপ্রদর্শকের বেলায় ভালোবাসার এরূপ নজীর দেখাতে পারেনি। হযরত আবু মাহযুরার (রা.) বাল্যকালে একবার তাঁর মাথায় রাসূল হাত রেখেছিলেন। তিনি আজীবন সেই স্পৃষ্ট জায়গার চুল অকর্তিত রেখে দিয়েছিলেন শুধু রাসূলের ভালোবাসায়। সাহাবায়ে কেরামের নবীপ্রেমের নমুনা এমনই।  আজ মুসলমানদের সামনে ছোট্ট একটি পরীক্ষা হাজির হয়েছে। যারা রবিউল আউয়ালে বিশাল জুলুস বের করে, রাসুলের প্রতি অপরিসীম ভালোবাসার দাবি করে থাকেন— আজ আপনাদের সামনে একটি পরীক্ষার ক্ষেত্র প্রস্তুত। তা হলো— রাসূলের শানে যারা বেয়াদবি করার ধৃষ্টতা দেখাচ্ছে— তাদের ব্যাপারে আপনি কী ভাবছেন? আপনার করণীয় কী নির্ধারণ করলেন? এখনও কি আমরা তাদের সঙ্গে বন্ধুত্বের সম্পর্ক বহাল রাখবো? তাদের জন্য সামাজিক-অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক-কূটনৈতিক সুবিধা দেয়ার চেষ্টা করে যাবো এতো কিছুর পরও? আমাদের কিংবা অন্য কারো পক্ষ থেকে স্তুতি, প্রশংসা, শ্রদ্ধা নিবেদনে মহানবীর (সা.) তেমন কিছুই যায় আসে না। মহান আল্ল­াহই তাঁর জন্য সর্বোচ্চ মর্যাদা নির্ধারণ করেছেন আর ঘোষণা করেছেন— ‘আর আমি আপনার স্মরণকে সমুন্নত করেছি (সূরা ইনশিরাহ, আয়াত-৪)।’ পৃথিবীতে এমন একটি মুহূর্তও অতিবাহিত হয় না যখন দুনিয়ার কোনো না কোনো জায়গায় আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রাসূলুল্ল­াহ ধ্বনিত হয় না। পবিত্র কুরআনে ঘোষণা করা হয়েছে আল্লাহ ও তাঁর ফেরেশতাগণ রাসূলের প্রতি দরুদ-সালাম প্রেরণ করেন। হে ঈমানদারগণ তোমরাও নবীর প্রতি দরুদ ও সালাম প্রেরণ কর। (সূরা আহযাব, আয়াত—৫৬) ।
++লেখক : সাবেক প্রধান বিচারপতি, পাকিস্তান সুপ্রিম কোর্ট
     অনুবাদ :খন্দকার মোহাম্মদ হামিদুল্লাহ

------------------------------------------------------------------------------------------------------ সতর্কতা ও সচেতনতা : শরিকে কোরবানি ও কোরবানির সঙ্গে আকিকা
মুহাম্মদ যাকারিয়া আবদুল্লাহ
কোরবানি একটি ইবাদত এবং তা ইসলামের অন্যতম শিআ’র ও নিদর্শন। ইসলামী আদর্শের ইবাদত অংশটিও অতি মহিমান্বিত এবং বিশিষ্টতাপূর্ণ। এর প্রধান দুটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে ‘তাওহিদ’ ও ‘সুন্নাহ’। ইসলামের ইবাদত ও উপাসনা একমাত্র আল্লাহর জন্যই, তিনি ছাড়া আর কেউ ইবাদতের উপযুক্ত নয়। তেমনি ইবাদতের নিয়ম-নীতিও সুন্নাহ কর্তৃক নির্ধারিত। সুন্নাহ পরিপন্থী কোনো ‘ইবাদত’ আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। কোরবানির প্রসঙ্গটি কোরআন মজীদের বিভিন্ন জায়গায় এসেছে। সুরাতুল বাকারা : ১৯৬; সুরাতুল মায়েদা : ২, ৯৫; সুরাতুল আনআম : ১৬২; সুরাতুল ফাহত : ২৫; সুরাতুল হজ : ২৭-৩৭ ও সুরাতুল কাউসারে কোরবানির কথা আছে। সুরাতুল আনআম ও সুরাতুল কাউসারে সাধারণ কোরবানি আর অন্যান্য সুরায় হজের কোরবানির কথা উল্লেখিত হয়েছে। কোরবানির নিয়মনীতি সংক্রান্ত বিস্তারিত বিবরণ আছে হাদিস শরীফে।
সামর্থ্যবান ব্যক্তির পক্ষে একা কোরবানি করা বিভিন্ন কারণে উত্তম। তবে শরিকে কোরবানির বিধান উম্মতকে দিয়েছে অবকাশ ও প্রশস্ততা। এই প্রশস্ততা আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাহয় স্পষ্টভাবে আছে। বিখ্যাত সাহাবী জাবির ইবনে আবদুুল্লাহ (রা.) বলেন, ‘আমরা হজের ইহরাম বেঁধে আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে বের হলাম। তিনি আমাদের আদেশ করলেন যেন প্রতিটি উট ও গরু সাতজন করে শরিক হয়ে কোরবানি করি। —সহীহ মুসলিম ১/৪২৪
অন্য বর্ণনায় আছে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, (একটি) গরু সাতজনের পক্ষ থেকে এবং (একটি) উট সাতজনের পক্ষ হতে (কোরবানি করা যায়)।—সুনানে আবু দাউদ ২/৩৮৮
তবে শরিক নির্বাচনে সতর্কতা কাম্য। আল্লাহর কাছে কোরবানি কবুল হওয়ার অন্যতম শর্ত হলো হালাল উপার্জন দ্বারা কোরবানি করা। হাদিস শরীফে আছে, ‘নিশ্চয় আল্লাহ পবিত্র আর তিনি শুধু পবিত্র বস্তুই গ্রহণ করে থাকেন।’ —(সহীহ মুসলিম, হাদিস : ১০১৫) তেমনি কোরবানির উদ্দেশ্য হতে হবে আল্লাহ তাআলার নৈকট্য ও সন্তুষ্টি। হাদিস শরীফে বলা হয়েছে, ‘সকল আমল নিয়তের ওপর নির্ভরশীল।...’—সহীহ বুখারী, হাদীস : ১
যেহেতু সব শরিকের পক্ষ থেকে একটি পশু যবেহ করা হচ্ছে তাই সবার নিয়ত ও উপার্জন শুদ্ধ হওয়া জরুরি। ইসলামী ফিকহ বিশারদরা বলেছেন, কোনো শরিকের পুরা বা অধিকাংশ উপার্জন হারাম হলে কিংবা কেউ শুধু গোশত খাওয়ার উদ্দেশ্যে শরিক হলে কারও কোরবানি সহীহ হবে না। (দ্র. খানিয়া ৩/৩৪৯, ৪০০; আলমগিরি ৫/৩৪২; আহসানুল ফাতাওয়া ৭/৫০৩)
অনেকে কোরবানির সঙ্গে আকিকাও দিতে চান। ফকীহরা বিষয়টিকে উত্সাহিত করেননি। কোরবানি ও আকিকা আলাদাভাবেই করা উচিত। তবে কেউ একত্রে করলে কোরবানি ও আকিকা দুটোই আদায় হবে। কারণ আকিকাও এক ধরনের কোরবানি। হাদীস শরীফে আকিকাকেও বলা হয়েছে ‘নুসুক’, যার অর্থ কোরবানি (দ্র. আলমুসান্নাফ, আবদুর রাযযাক : ৭৯৬১; আলমুসনাদ, ইমাম আহমদ : ৬৭১৩, ৬৭২২; আসসুনান, আবু দাউদ (আকিকা অধ্যায়) : ২৮৪২; আসসুনান, নাসাই : ৭/১৬২, ১৬৩)। আকিকাতেও পশু জবাইয়ের উদ্দেশ্য আল্লাহর নৈকট্য ও সন্তুষ্টি। তাছাড়া মৌলিকভাবে এক হওয়ার কারণে আকিকার অনেক বিধান নেয়া হয়েছে কোরবানির হাদিস থেকে। সুতরাং উট ও গরু দ্বারা একাধিক ব্যক্তির কোরবানি আদায় হওয়ার হাদিসগুলোর অন্তর্নিহিত যুক্তি ও ব্যাপকতা কোরবানি ও আকিকা একত্রে আদায়ের অবকাশকেও ধারণ করে। তাছাড়া বিভিন্ন জনের বিভিন্ন ‘প্রকারের’ কোরবানি যে এক পশু দ্বারা আদায় হতে পারে তা স্পষ্টভাবেই বলেছেন বিখ্যাত তাবেয়ী ইমাম আতা ইবনে আবি রাবাহ রাহ.। তিনি বলেছেন, ‘উট ও গরু সাতজনের পক্ষ হতে কোরবানি হতে পারে। আর এতে শরিক হতে পারে কোরবানিকারী, তামাত্তু হজকারী এবং হজের ইহরাম গ্রহণের পর হজ আদায়ে অপারগ ব্যক্তি। (দ্র. সুনানে সায়ীদ ইবনে মানসুর-আল কিরা লি-কাসিদি উম্মিল কুরা পৃ. ৫৭৩)
সুতরাং কোরবানির সঙ্গে আকিকার অংশ দেয়াই যাবে না— এমন সিদ্ধান্তের জন্য সুস্পষ্ট ও শক্তিশালী প্রমাণ লাগবে, যা আমাদের জানা মতে পাওয়া যায় না।
শরিকে কোরবানির ক্ষেত্রে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় গোশ্ত বণ্টন। আলাদা আলাদা পরিবারের কয়েক ব্যক্তি শরিকে কোরবানি করলে প্রত্যেকের অংশ মেপে বণ্টন করতে হবে। শুধু অনুমান করে ভাগ করা যাবে না। (দ্র. আদ্দুররুল মুখতার ৬/৩১৭; কাজিখান ৩/৩৫১)
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সঠিকভাবে কোরবানি করার এবং কোরবানির পূর্ণ কল্যাণ অর্জনের তাওফিক দান করুন। আমীন।
                                        লেখক : গবেষক আলেম, খতিব

পবিত্র ঈদুল আজহা ও কুরবানির ইতিহাস

লেখক: জাকিরহোসাইন আজাদী  |  শুক্রবার, ২৬ অক্টোবর ২০১২
Details
একবার ইব্রাহীম (আ.) বললেন, হে আমার প্রতিপালক; আমাকে একটি সুসন্তান দান করুন (সূরা সাফফাত ১০০ আয়াত)। কথায় বলে অন্তর থেকে যে কথা বের হয় তদ্বারা কাজ নিশ্চয়ই হয়/ তাই ব্যথিতের ফরিয়াদ গ্রহণকারী আল্লাহ বললেন, অতঃপর আমিও তাকে (ইব্রাহীমকে) একটি ধৈর্যশীল ছেলে দান করার সুসংবাদ শুনিয়ে দিলাম (ঐ সুরা ১০১)। ছেলেটি যখন দৌড়-ঝাঁপ করতে শিখলো এবং মুফাসসিরে কুরআন ফাররার মতানুযায়ী ছেলেটি যখন ১৩ বছর বয়সে পা দিল তখন হযরত ইব্রাহীমকে (আ.) স্বপ্নে হুকুম দেয়া হল যে, তুমি তোমার কলিজার টুকরা ইসমাইলকে আল্লাহর রাহে কুরবানি কর। মুকাতিল বলেন, এই স্বপ্ন তিনি উঠোউঠি তিন রাতেই দেখলেন (ফাতহুল বায়ান, ৮ম খণ্ড, ৬৯ পৃষ্ঠা)। জিলহজ্বের ৮ম রাতে তিনি সর্বপ্রথম স্বপ্ন দেখেন যে, একমাত্র পুত্রকে নিজ হাতে যবে্হ করছেন। স্বপ্নটি দেখার পর ঐদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত তিনি এই চিন্তায় বিভোর থাকেন যে, এটা আল্লাহর তরফ থেকে সুস্বপ্ন, না দুঃস্বপ্ন। অতঃপর ৯ম রাতে তিনি আবার ঐ স্বপ্ন দেখেন। ফলে ঐদিন তিনি জানতে ও বুঝতে পারেন যে, এটা স্বপ্ন। তারপর ১০ম রাতে তিনি আবার ঐ স্বপ্ন দেখেন। তাই ঐদিনে তিনি কুরবানি করতে উদ্যত হন। পরপর তিনরাত স্বপ্ন দেখার পর তার মনে যে প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয় তারই পরিপ্রেক্ষিতে উক্ত তিনটি দিন বিশেষ নামে বিশেষিত হয়েছে। যেমন যিলহিজ্জার ৮ম দিনের নাম ‘ইয়াও্মুত তারভিয়াহ’ বা চিন্তা-ভাবনার দিন। ৯ম দিনের নাম ‘ইয়াও্মুল আরাফাহ’ বা জানার দিন। ১০ম দিনের নাম ‘ইয়াও্মুন নাহর’ বা কুরবানির দিন (তফসীরে কাবীর, ৭ম খণ্ড, ১৪৯ পৃষ্ঠা, তফসীরে বাগাভী ও খাযিন ৬ষ্ঠ খণ্ড, ২৩ পৃষ্ঠা, রুহুল মাআ-নী, ২৩ খণ্ড, ১২৮ পৃষ্ঠা)। এই স্বপ্ন দেখার পর ইব্রাহীম (আ.) পুত্রকে কুরবানি করার জন্য তৈরি হলেন এবং স্বীয় বিবি হাজেরাকে বললেন, ছেলেটাকে মুখ-হাত ধুইয়ে কাপড় পরিয়ে দাও। ওকে একটা কাজে নিয়ে যাব। একটি রেওয়ায়াত রয়েছে যে, যখন ইব্রাহীমকে কুরবানির স্বপ্ন দেখানো হয় তখন শয়তান মনে মনে বলে যে, এই সময় যদি আমি তাদেরকে ফেতনায় না ফেলতে পারি তাহলে আর কখনো পারবো না। অতঃপর দুই বাপ-বেটা যখন ঘর থেকে বের হলেন তখন শয়তান বিবি হাজেরার নিকটে গিয়ে হাজির হল এবং বললো, তোমার বেটাকে ইব্রাহীম কোথায় নিয়ে গেলো? তিনি বললেন, কোন কাজে নিয়ে গেছেন। এবার শয়তান বলল, না না। তিনি তাকে কোন দরকারে নিয়ে যাননি বরং তাকে যবেহ করতে নিয়ে গেছেন। হাজেরা জিজ্ঞেস করলেন, তিনি তাকে যবেহ করবেন কেন? শয়তান বললো— ইব্রাহীমের ধারণা যে, তার রব নাকি তাকে এই কাজের হুকুম দিয়েছেন। এ কথা শুনে হাজেরা বললেন, তাহলে তো তিনি তার পরওয়ারদেগারের হুকুম তামিল করে খুব ভাল কাজ করেছেন। তার নিকট থেকে শয়তান নিরাশ হয়ে ফিরতে বাধ্য হলো। এখানে শয়তান নিরাশ হয়ে তাদের দু’জনের পেছনে ছুটলো তাদের কাছেও শয়তান পরাস্ত হলো। মিনায় পৌঁছিয়ে ছেলেকে ইব্রাহীম (আ.) বললেন, প্রিয় পুত্র! আমি স্বপ্নে দেখেছি যে, তোমাকে আমি যবেহ করছি। অতএব এ ব্যাপারে তোমার মতামত কি? ছেলেটি বললো, বাবা! আপনি তাই করুন আপনাকে যা হুকুম দেয়া হয়েছে। এ ব্যাপারে আপনি আমাকে ধৈর্যশীল পাবেন (সূরা সা-ফফা-ত ১০২ আয়াত)। এভাবে বাপ-বেটার সওয়াল জওয়াবের পর ছেলেটি যখন রাজি হয়ে গেল তখন দু’জনই আল্লাহর কাছে নিজেদের সঁপে দিল। কাতাদাহ (রা.) বলেন, ছেলেটি জানদেনেওয়ালার সামনে তার জানের তোহফা পেশ করল এবং তার বাপ নিজ কলিজার টুকরা ছিঁড়ে আল্লাহর সামনে রেখে দিল (তফসীরে কাবীর, ৭ম খণ্ড, ১৫৩ পৃষ্ঠা, ফাতহুল বায়ান, ৮ম খণ্ড, ৭১ পৃষ্ঠা)। ইবনুল মুনযির ও মুস্তাদরকে হাকিমে মুজাহিদ থেকে বর্ণনা রয়েছে যে, তারপর ছেলেটি তার বাপকে বললো, আপনি আমাকে চোখে দেখা অবস্থায় যবেহ করতে পারবেন না। কারণ আপনার হয়তো ছেলের মায়া উথলে উঠতে পারে। ফলে আপনার ছুরি নাও চলতে পারে? কিংবা আমি হয়তো অধৈর্য হয়ে ছটফট করতে পারি এবং আপনার কাজে ব্যাঘাত ঘটিয়ে দিতে পারি? সেজন্য আপনি আমার হাত থেকে ঘাড় পর্যন্ত কষে বেঁধে নিন। তারপর আমাকে উপুড় করে শুইয়ে দিন। অন্য বর্ণনায় আছে, ছেলেটি আবার বললো, বাবা! আপনি নিজের কাপড়টা সামলে নিন এবং আমাকে ভাল করে বেঁধে দিন। যাতে আমার রক্তের ছিটে আপনার গায়ে না লাগে এবং আমার নেকি কমে না যায়। আর যবহের পর আপনি যখন আমার মায়ের কাছে যাবেন তখন তাকে আমার সালাম দেবেন। আর আপনি যদি আমার জামাটা মায়ের কাছে নিয়ে যেতে চান তাহলে নিয়ে যাবেন। যাতে তিনি কিছুটা সান্ত্বনা পাবেন। কলিজার টুকরা একমাত্র কচি বাচ্চার মুখ দিয়ে এরূপ কথা শুনে হযরত ইব্রাহীমের মনে কি প্রতিক্রিয়াই না হতে পারে! তথাপি তিনি ধৈর্যের অটল পাহাড় হয়ে জওয়াব দিচ্ছেন, বাবা! তুমি আল্লাহর হুকুম পালনার্থে আমার কি উত্তম সাহায্যকারী! কথাটি বলে তিনি পুত্রকে চুমু খেলেন এবং ছলছল চোখে তাকে বাঁধলেন (তফসীরে বাগাভী ও খাযেন, ৬ষ্ঠ খণ্ড, ২৬ পৃষ্ঠা এবং কাবীর, ৭ম খণ্ড, ১৫৪ পৃষ্ঠা)। অতঃপর কুরআনের ভাষায়— ইব্রাহীম তাকে উপুড় করে শুইয়ে দিলেন। মুসনাদে আহমাদে একটি হাদীস রয়েছে যে, তখন ইসমাইলের গায়ে একটি সাদা জামা ছিল। তাই সে বললো, হে আব্বাজান! এটা ছাড়া আমার কাছে আর তো কোন কাপড় নেই যদ্বারা আপনি আমাকে কাফন দিতে পারেন। অতএব আপনি এই জামাটি খুলে নিন যাতে আমার কাফনের কাজ হয়ে যায়। সুতরাং তিনি জামাটা খুলে নিলেন (ইবনে কাসীর, ৪র্থ খণ্ড, ১৬ পৃষ্ঠা)। এবার শুরু হল আসল ঘটনা। অর্থাত্ ছেলেটির গলায় ছুরি চালাবার পালা। ইলাহী হুকুমের কাছে আত্মসমর্পণের মূর্ত প্রতীক ইব্রাহীমের হাত যখন ছেলেটির ঘাড়ে ছুরি চালিয়ে দিল ত্রিভুবন তখন কেঁপে উঠলো। সে কি অভাবনীয় দৃশ্য। পৃথিবীর ইতিহাসে আজ পর্যন্ত এমন ঘটনার অবতারনা হয়নি এবং ভবিষ্যতে হবে কিনা তাও কেউ বলতে পারে না। একদিকে জনমানবহীন, পশুপাখি ও প্রাণীহীন মক্কা শহর, অন্যদিকে ধূ ধূ বালুর মধ্যে খাঁ খাঁ করছে মিনার ঐতিহাসিক প্রান্তর। আর তারই মাঝে একজন ৯৯ বছরের বৃদ্ধ পিতা এবং তাঁর ছুরির তলায় পড়ে রয়েছে ১৩ বছরের ফুল্ল-কুসুমিত এক শিশুপুত্র ইসমাইল (আ.)। এই অকল্পনীয় দৃশ্য দেখে আকাশ যেন ফ্যাল-ফ্যাল করে চেয়ে আছে এবং আদমের জন্মের সময় প্রবল আপত্তিকারী ফেরেশতারাও যেন ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। গাছপালা কেউ আর নড়ছে না এবং পশু-পাখিরাও যেন চলাফেরা করতে পারছে না। বাতাসের গতিও যেন স্তব্ধ হয়ে গেল এবং পাহাড় ও পর্বতেও যেন একটা নিঝুম ভাব ফুটে উঠলো। সবাই যখন বিস্ময় বিমূঢ় হয়ে এই অভাবনীয় দৃশ্য দেখছে ইব্রাহীমের (আ.) হাত তখন ইসমাইলের গলায় অনবরত চলছে। কিন্তু বিধাতার লীলা বুঝা বড় ভার। তাই ইমাম সুদ্দী বলেনঃ এদিকে আল্লাহ ইব্রাহীমকে (আ.) হুকুম দিয়েছেন নিজহাতে ছেলে যবেহ কর, আর ওদিকে তিনি ছুরিকে নির্দেশ দিয়েছেন, তুমি মোটেই কেটো না। ফলে ছুরি এবং তার গলার মাঝখানে আল্লাহর কুদরতে একটি পিতলের পাত আড় সৃষ্টি করে। সেজন্য ইব্রাহীম বারবার ছুরি চালালেও কোন কাজ হচ্ছিল না (ঐ ১৭ পৃষ্ঠা ও ফাতহুল বায়ান, ৮ম খণ্ড, ৭২ পৃষ্ঠা)। এই অচিন্তনীয় পরিস্থিতিতে ত্রিভুবনের সবাই যখন হতভম্ব এবং হতবাক ও শ্বাসরুদ্ধ তখন আল্লাহ তার রহস্য ফাঁস করে দিয়ে জান্নাত থেকে জিব্রাইলের মাধ্যমে একটি দুম্বা পাঠিয়ে দিলেন এবং ইসমাইলকে বাঁচিয়ে নিয়ে ইব্রাহীমের অজান্তে সেই দুম্বাটিকে তার দ্বারা যবেহ করিয়ে নিয়ে জলদগম্ভীর স্বরে ঘোষণা করলেন— হে ইব্রাহীম! তুমি তোমার স্বপ্নকে সত্য করে দেখিয়েছো। আমি এভাবে (পরীক্ষার মাধ্যমে) নেক ও সত্ লোকদেরকে পুরস্কৃত করে থাকি। নিঃসন্দেহে এটাও একটা বিরাট পরীক্ষা। তাই আমি এক বিরাট কুরবানির বদলে তাকে (অর্থাত্ তোমার ছেলে ইসমাইলকে) বাঁচিয়ে নিয়েছি (সূরা সাফফা-ত-১০৪-৭ আয়াত) ওয়াহিদী বলেন: ইবনে আব্বাসসহ অধিকাংশ মুফাসসিরীনের মতে ইব্রাহীমের নিকট সেই দুম্বাটি পাঠানো হয়েছিল যেটাকে জান্নাতে চল্লিশ বছর ধরে লালন-পালন করা হয়েছিল (ফা, বা ৭৩ পৃষ্ঠা)। কিন্তু ইবনে আবী হাতেম ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণনা করেছেন যে, এটা সেই দুম্বা যেটা আদম (আ.)-এর ছেলে (হাবীল) আল্লাহর দরবারে কুরবানি করেছিল এবং সেটা কবুলও হয়েছিল। তখন থেকে ওটা জান্নাতে চড়তে থাকে। পরিশেষে ওর দ্বারা আল্লাহতাআলা ইসমাইলকে বাঁচিয়ে নেন। ইবনে কাসীর, ৪র্থ খণ্ড, ১৭ পৃষ্ঠা, কাবীর ৭ম খণ্ড, ১৫৪ পৃষ্ঠা। একটি বর্ণনায় আছে, ইব্রাহীম যখন ইসমাইলকে যবেহ করছিলেন তখন জিব্রাইল (আ.) বলেছিলেন, আল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার এবং ইসমাইল বলেছিলেন- লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু আল্লাহু আকবার। অতঃপর ইব্রাহীম (আ.) বলেন, আল্লাহু আকবার অলিল্লাহিল হামদ। তারপর থেকে এই তকবীরটা চিরস্থায়ী সুন্নতে পরিণত হয়। তফসীরে নাসাফী ৪র্থ খণ্ড, ২০ পৃষ্ঠা কাশশাফ ৩য় খণ্ড, ৩০৮ পৃষ্ঠা, তাফসীরে আবু সসউদ ৭ম খণ্ড, ৫৪৮ পৃষ্ঠা, ফাতহুল বায়ান, ৮ম খণ্ড ৭৪ পৃষ্ঠা)। জন্মদিন থেকে জীবনের ৯৯টি বছর ধরে একটার পর একটা পরীক্ষা করে যখন পরওয়ারদেগারে আলম ইব্রাহীমের প্রতি সন্তুষ্ট হলেন তখন তার এই চিত্তহারী রোমাঞ্চকর ও বিপ্লব সৃষ্টিকারী কীর্তিকে কেয়ামত পর্যন্ত অক্ষয় করে দিলেন এই বলে- আমি তোমার এই সুমহান আদর্শকে পরবর্তীদের জন্য চিরস্মরণীয় করে রাখলাম। তোমার এইসব কীর্তির দরুন তোমার প্রতি আমার রহমত ও শান্তিধারা বর্ষিত হোক (সূরা সাফফাত ১০৮ আয়াত)। অতঃপর আল্লাহর ঘোষণা মোতাবেক তখন থেকে চলে আসছে এই ইব্রাহীমী আদর্শের বাস্তবায়ন। তাই আজও লাখ লাখ মানুষ আল্লাহর হুকুম তামিলের সাথে সাথে প্রতিবছর ইব্রাহীমের স্মৃতি পালন করে পাপমোচন সাগরে করছে অবগাহন।
 ------------------------------------------------------
          নিয়তের ওপর আমল নির্ভর করে
লেখক: হোসাইন আল খালদুন  |  শুক্রবার, ২৬ অক্টোবর ২০১২
Details যে ব্যক্তি দুনিয়া কামনা (নিয়াত) করে আমি তাকে (দুনিয়াতে) যা ইচ্ছা অতি সত্বর প্রদান করবো। অতঃপর তার জন্য জাহান্নাম নির্ধারণ করবো সে তাতে নিন্দিত বিতাড়িত অবস্থায় প্রবেশ করবে। আর যে ব্যক্তি আখেরাত কামনা (নিয়াত) করবে এবং মুমিন অবস্থায় তার (পরকালের) জন্য যথাযথ চেষ্টা সাধনা করবে, এমন লোকদের চেষ্টা কবুল হবে (সূরা বানি ইসরাইল, ১৮-১৯ আয়াত)। হে রসূল, আপনি বলে দিন- প্রত্যেকেই নিজ নিজ রীতি অনুযায়ী কাজ করেন। অতঃপর আপনার পালনকর্তা বিশেষভাবে জানেন, কে সর্বাপেক্ষা নির্ভুল পথে আছে (সূরা বানি ইসরাইল, ৮৪ আয়াত)। যে কেউ পরকালের ফসল কামনা করে, আমি তার জন্য সেই ফসল বৃদ্ধি করে দেই। আর যে কেউ দুনিয়ার ফসল কামনা করে আমি তাকে আর কিছু দিয়ে দেই এবং পরকালে তার কোনো প্রাপ্যই থাকবে না (সূরা আশ-শুরা ২০ আয়াত)। হযরত ওমর ইবনে খাত্তাব (রা.) হতে বর্ণিত, রসূল (স.) বলেছেন, যাবতীয় কাজের ফলাফল নিয়াতের ওপরই নির্ভর করে। আর প্রত্যেক ব্যক্তি আপন নিয়াত অনুসারে অধিকারী হয়। সুতরাং যে ব্যক্তি আল্লাহ ও রসূলের সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে হিজরত করে তার হিজরত আল্লাহ ও রসূলের উদ্দেশ্যেই হবে। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি দুনিয়ার কোন স্বার্থ উদ্ধারের আশায় কিংবা কোন রমণীকে (বিবাহ সূত্রে) আবদ্ধ হওয়ার (গোপন) বাসনায় হিজরত করে, তার হিযরত সেদিকেই হবে যে উদ্দেশ্যে সে হিযরত করে (বুখারী ও মুসলিম)। হযরত আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত, রসূল (স.) বলেছেন, (বিচারের দিন) আল্লাহ তোমাদের চেহারার সৌন্দর্য ও ধন সম্পদের দিকে লক্ষ্য করবেন না বরং তোমাদের অন্তকরণ (নিয়াত) ও আমলের (কাজের) দিকে লক্ষ্য করবেন (মুসলিম)। রসূল (স.) বলেছেন, কর্মছাড়া মৌখিক দাবি বিফল আর মৌখিক দাবি ও কর্ম উভয়ই বিনা নিয়াতে কার্যকরী নহে এবং মৌখিক দাবি, কর্ম ও নিয়াত আদৌ ফলপ্রসূ হবে না যদি তা সুন্নাত অনুযায়ী সম্পাদিত না হয় (হাকেম)। হযরত ওমর ইবনে খাত্তাব (রা.) বলেন, রসূলের সময়ে লোকদের যাচাই করা হতো ওহি দ্বারা। কিন্তু (তার ইন্তেকালে) ওহি বন্ধ হয়ে গেছে। এখন আমরা তোমাদের বাহ্যিক কাজের দ্বারা যাচাই করবো। অতএব কেউ আমাদের সামনে বাহ্যত ভালো কাজ করলে আমরা তাকে বিশ্বাস করবো এবং আমাদের নিকটবর্তী বলে মনে করবো, তার অন্তরের (নিয়াতের) অবস্থা অনুযায়ী বিচারের জন্য তো আল্লাহই রয়েছেন। আর কেউ আমাদের সামনে বাহ্যত খারাপ কাজ করলে আমরা তাকে মানবো না এবং তাকে বিশ্বাসও করবো না, সে যতই বলুক তার অন্তরের অবস্থা খুবই ভালো অর্থাত্ খুবই ভালো মানুষ (বুখারী)। হযরত আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রসূল (স.) বলেছেন, আল্লাহতায়ালা ফেরেশতাদেরকে বলেন, আমার বান্দা কোন গুনাহর কাজ করার ইচ্ছা (নিয়াত) করলে তা না করা পর্যন্ত তার জন্য কোন গুনাহ লিখো না। তবে সে যদি গুনাহের কাজটি করে ফেলে তাহলে কাজটির অনুপাতে তার গুনাহ লিখো। আর যদি তা আমার কারণে পরিত্যাগ করে তাহলে তার জন্য একটি নেকী লিপিবদ্ধ কর। আর যদি তা করে তাহলে কাজটি অনুপাতে তার জন্য দশগুণ থেকে সাতাশ গুণ পর্যন্ত নেকী লিপিবদ্ধ করো (বুখারী)। নবী (স.) বলেছেন, অশুভ বা কুলক্ষণ বলতে কিছু নেই। বরং তা শুভ বলে মনে করা ভালো। সাহাবীরা জিজ্ঞাসা করলো হে আল্লাহর রসূল (স.) শুভ লক্ষণ কি? তিনি বললেন, এরূপ অর্থবোধক কথা যা তোমাদের কেউ শুনতে পায় (বুখারী)। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আমর (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, বারকারাহ নামক এক ব্যক্তির ওপর নবী করিম (স.) এর আসবাবপত্র দেখাশোনা করার দায়িত্ব ছিল। সে মারা গেলে রসূল (স.) তাকে জাহান্নামী বলে ঘোষণা করেছিলেন। সাহাবীরা এ ব্যাপারে খোঁজ নিয়ে জানতে পারলেন যে, সে গনীমতের মাল থেকে একটি ‘আবা’ (কোর্তা) আত্মসাত্ করেছিল (বুখারী)।

 --------------------------------------------------------------------------
পবিত্র হজ পালিত : লাব্বাইক ধ্বনিতে মুখরিত আরাফাত
'লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক, লাব্বাইক লা শারিকালাকা লাব্বাইক, ইন্নাল হামদা ওয়াননিমাতা লাকা ওয়ালমুলক'_ মধুধ্বনি-প্রতিধ্বনি পবিত্র আরাফাতের পাহাড় ঘেরা ময়দান ছাপিয়ে আকাশ-বাতাস মুখর ও প্রকম্পিত করে গতকাল পবিত্র হজ পালন করেছেন গোটা দুনিয়া থেকে আগত লাখো লাখো ধর্মপ্রাণ মুসলমান। এভাবে তালবিয়া পাঠ করে মহান সৃষ্টিকর্তার কাছে নিজের উপস্থিতি জানান লাখ লাখ ধর্মপ্রাণ মুসলমান। গতকাল ভোরে মিনা থেকে ১০ কিলোমিটার দূরে আরাফাতের ময়দানে সমবেত হন তারা। সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত তারা সেখানে অবস্থান করেন। মসজিদে নামিরা থেকে হজের খুতবা দেন সৌদি আরবের গ্র্যান্ড মুফতি আবদুল আজিজ আল শাইখ। এ খুতবা রেডিও ও টেলিভিশনেও সম্প্রচার করা হয়। সৌদি আরবের সংবাদ মাধ্যমের খবরে বলা হয়, বুধবার হজের আনুষ্ঠানিকতা শুরুর পর মক্কা নগরীর কাবা শরিফ থেকে রওনা হয়ে পাঁচ কিলোমিটার দূরে মিনায় জড়ো হন বিশ্বের ১৫০টি দেশের প্রায় ২০ লাখ ধর্মপ্রাণ মুসলমান, যার মধ্যে এক লাখ ১১ হাজার ২৭৯ জন গেছেন বাংলাদেশ থেকে।
গতকাল আরাফাতের ময়দানে খুতবার পর জোহর ও আসরের নামাজ আদায় করেন হাজিরা। তারা সূর্যাস্ত পর্যন্ত আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করে পাঁচ কিলোমিটার দূরের মুজদালিফায় গিয়ে মাগরিব ও এশার নামাজ আদায় করেন। রাতে সেখানে অবস্থান করেন খোলা মাঠে। শয়তানকে পাথর নিক্ষেপের জন্য প্রয়োজনীয় পাথর সেখান থেকে সংগ্রহ করেন। আজ মুজদালিফায় ফজরের নামাজ আদায় করে হাজীদের কেউ ট্রেনে, কেউ গাড়িতে, কেউ হেঁটে মিনায় যাবেন এবং নিজ নিজ তাঁবুতে ফিরবেন। মিনায় বড় শয়তানের উদ্দেশে সাতটি পাথর মারার পর পশু কোরবানি দিয়ে মাথার চুল ছেঁটে (মাথা ন্যাড়া করে) গোসল করবেন। সেলাইবিহীন দুই টুকরা কাপড় বদল করবেন। এরপর স্বাভাবিক পোশাক পরে মিনা থেকে মক্কায় গিয়ে কাবা শরিফ সাতবার তাওয়াফ করবেন। কাবা শরিফের সামনের দুই পাহাড় সাফা ও মারওয়ায় 'সাঈ' (সাতবার দৌড়াবেন) করবেন। সেখান থেকে তারা আবার মিনায় যাবেন। মিনায় আরও এক বা দুই দিন অবস্থান করে হজের অন্য আনুষঙ্গিক কাজ শেষ করবেন। এরপর আবার মক্কায় ফিরে বিদায়ী তাওয়াফ করবেন। আগে যারা মদিনায় যাননি তারা বিদায়ী তাওয়াফের পর মদিনায় যাবেন। যারা আগে মদিনায় গেছেন তারা নিজ নিজ দেশে ফিরবেন।
মিনায় আনুষ্ঠানিকতা শুরু হলেও আরাফাতের ময়দানে কার্যক্রমকেই হজের মূল অনুষ্ঠান হিসেবে ধরা হয়। ১৪০০ বছরেরও বেশি সময় আগে এ আরাফাতের ময়দানেই বিদায়ী হজের ভাষণ দেন হজরত মুহাম্মদ (সা.)।
আরব নিউজের খবরে বলা হয়, বুধবার ফজরের নামাজের পর মক্কা থেকে মিনার উদ্দেশে রওনা হন মুসলি্লরা। অনেকেই আগের দিন মিনায় পেঁৗছান। মিনায় অসংখ্য সাদা তাঁবুতে অবস্থান করেন তারা।
হজ কমিটির চেয়ারম্যান ও সৌদি আরবের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আহমেদ বিন আবদুল আজিজ মুসলি্লদের মিনা যাত্রা দেখেন। হজ সুষ্ঠুভাবে পালনের জন্য সব ব্যবস্থাই নেয়া আছে বলে জানান তিনি।
হজ সুষ্ঠুভাবে শেষ করতে সৌদি সরকার মক্কা ও আশপাশের এলাকায় নিরাপত্তা বাহিনীর প্রায় ৫০ হাজার কর্মকর্তাকে নিয়োজিত করেছে। ভিড়ের চাপে পদপিষ্ট হওয়াসহ যে কোন অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি মোকাবিলায় নিয়োজিত রাখা হয়েছে কয়েক হাজার কর্মী।

----------------------------------------------
ইসলামে হালাল উপার্জনের গুরুত্ব

ড. মোঃ আবদুল কাদের:  ইসলাম পরিপূর্ণ এক জীবন ব্যবস্থার নাম। এতে মানবজীবনের ব্যক্তিগত পারিবারিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলের যাবতীয় বিষয়ের সমাধানে হিকমতপূর্ণ বিধানের বর্ণনা রয়েছে। এটি মানুষের জন্য যা কল্যাণকর ও হিতকর সে বিষয় বৈধ করত: সবিশেষ গুরুত্বারোপ করেছে এবং যাবতীয় অকল্যাণ ও ক্ষতিকর বিষয় হতে মানবজাতিকে সর্তক করেছে। অতএব, ইসলাম মানবজাতির জন্য কল্যাণের আঁধার হিসেবে শান্তির বার্তা নিয়ে আবির্ভূত হয়েছে। মানবদেহের জীবনীশক্তি হিসেবে রক্তের যে গুরুত্ব রয়েছে, মানবজীবনে অর্থের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তাও তেমনি তাৎপর্যপূর্ণ। ফলে অর্থ মানব জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। আর এর জন্য প্রয়োজন মেধা, শ্রম ও সময়ের যথোপযুক্ত ব্যবহার। জীবন নির্বাহের এ মাধ্যমটিই পেশা হিসেবে পরিগণিত। মহান আল্লাহ তা‘আলা তাঁর নির্ধারিত ফরজ ইবাদত (যেমন নামায) সম্পন্ন করার পর জীবিকা অন্বেষনে জমীনে ছড়িয়ে পড়তে নির্দেশ দিয়েছেন। যাতে সর্বশ্রেষ্ঠ জীব নিজেই জীবিকা অর্জনে ব্রতী হয়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজের পরিশ্রম লব্দ উপার্জনকে সর্বোত্তম উপার্জন বলে আখ্যায়িত করেছেন। তবে নিশ্চয় উপার্জনের পন্থা শরীয়াত নির্ধারিত পন্থায় হতে হবে। এমন উপার্জনকে ইসলাম অবৈধ ঘোষনা করেছে, যাতে প্রতারনা, মিথ্যা, ধোঁকাবাজি, জনসাধারণের অকল্যাণ সর্বোপরি জুলুম রয়েছে। দুনিয়ার জীবনে অবৈধ পন্থায় উপার্জন করে সুখ-সাচ্ছন্দ লাভ করলেও পরকালীন জীবনে রয়েছে এর জন্য জবাবদিহিতা ও সুবিচার। সে লক্ষে ইসলাম হালাল উপার্জনের অপরিসীম গুরুত্ব প্রদান করেছে। নিম্নে এসম্পর্কে আলোচনা প্রদত্ত হলো:
উপার্জনের গুরুত্ব
খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা, মানুষের মৌলিক অধিকার। এগুলোর যোগান দিতে মানুষকে বেছে নিতে হয় সম্পদ উপার্জনের নানাবিধ পন্থা। জীবিকা নির্বাহের জন্য মানুষ যেসব পেশা অবলম্বন করে তা হলো: কৃষি, ব্যবসা-বানিজ্য, চাকুরী, শিল্প প্রভৃতি। উপার্জনের মাধ্যম ব্যতীত কোন ব্যক্তির পক্ষেই উপর্যুক্ত মৌলিক অধিকার সংরক্ষণ করা সম্ভব নয়। মানুষকে মহান আল্লাহ সৃষ্টির শ্রেষ্ট জীব হিসেবে সৃষ্টি করেই ক্ষান্ত হননি; বরং তাদের যাবতিয় মৌলিক অধিকারও সংরক্ষণের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। সে লক্ষে তিনি মহাশুণ্যের সব সৃষ্টিকে মানুষের সেবায় নিয়োজিত করেছেন। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে:
﴿هُوَ ٱلَّذِي خَلَقَ لَكُم مَّا فِي ٱلۡأَرۡضِ جَمِيعٗا ثُمَّ ٱسۡتَوَىٰٓ إِلَى ٱلسَّمَآءِ فَسَوَّىٰهُنَّ سَبۡعَ سَمَٰوَٰتٖۚ وَهُوَ بِكُلِّ شَيۡءٍ عَلِيمٞ ٢٩﴾ [البقرة:29]
‘‘তিনিই সেই মহান সত্তা, যিনি পৃথিবীর সবকিছু তোমাদের (ব্যবহারের জন্য) তৈরী করেছেন।’’
তবে এক্ষেত্রে তিনি মানুষকে দিয়েছেন পূর্ণ স্বাধীনতা যা তার ইখতিয়ারভুক্ত একান্ত নিজস্ব ব্যাপার। ফলে প্রত্যেকে স্ব-স্ব যোগ্যতা, মেধা, শ্রম ও সময়ের যথোপযুক্ত ব্যবহারের মাধ্যেমে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের প্রয়াস চালায়।
মানবজীবনে অর্থনীতির গুরুত্ব অপরিসীম। এটি মানুষের জীবন নির্বাহের অন্যতম চালিকা শক্তি হিসেবে সমাদৃত, মানব জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হিসেবে পরিগণিত। মহান আল্লাহ মানুষকে এর গুরুত্ব অনুধাবন বোধগম্য করার নিমিত্তে পবিত্র কুরআনে সালাতের পাশাপাশি যাকাত তথা অর্থের উল্লেখ ৮২ স্থানে করেছেন। শুধু তাই নয়, মহান আল্লাহ অর্থনৈতিক বিধানও নির্দেশ করেছেন। ফলে কুরআনুল কারিমকে একটি অর্থবিদ্যার মহাকোষ বললেও অত্যুক্তি হবে না। মানুষ কিভাবে উপার্জন করবে, কোন পন্থায় তা ব্যয় করবে এবং উপার্জনের ক্ষেত্রে যাবতীয় অর্জনীয় ও বর্জনীয় গুণাবলীর সম্পর্কে এর সুষ্পষ্ট নির্দেশনা বিদ্যমান। তাইতো ব্যক্তির উপার্জিত সম্পদে তিনি যাকাত ফরয করেছেন, যেন সম্পদ এক শ্রেণির লোকদের মাঝে সীমাবদ্ধ না থাকে। আল্লাহ তা‘আলা ফরয ইবাদত সমাপনান্তে জীবিকা নির্বাহে উপার্জন করার লক্ষ্যে যমিনে ছড়িয়ে পড়তে নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন:
﴿فَإِذَا قُضِيَتِ ٱلصَّلَوٰةُ فَٱنتَشِرُواْ فِي ٱلۡأَرۡضِ وَٱبۡتَغُواْ مِن فَضۡلِ ٱللَّهِ وَٱذۡكُرُواْ ٱللَّهَ كَثِيرٗا لَّعَلَّكُمۡ تُفۡلِحُونَ﴾ [الجمعة:10]
‘‘সালাত সমাপ্ত হলে তোমরা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়বে এবং আল্লাহর অনুগ্রহ সন্ধান করবে, এবং আল্লাহকে অধিক স্মরন করবে যাতে তোমরা সফলকাম হও।’’
এ আয়াতের ব্যাখ্যায় ইমাম কুরতুবী (র.) বলেন:
فاذا فرغتم من الصلاة فانتشروا في الأرض للتجارة والتصرع في حوائجكم
‘‘যখন নামায শেষ হয়ে যাবে, তখন তোমরা ব্যবসায়িক কাজকর্ম ও অন্যান্য পার্থিব প্রয়োজনাদি পূরণে বেড়িয়ে পড়ো।’’
এখানে উপার্জনের একটি মূলনীতি সুস্পষ্টভাবে প্রতিভাত হয়েছে। আর তাহলো এমন পন্থা অবলম্বন করতে হবে, যাতে আল্লাহর স্মরণে ব্রত থাকা যায়।
অতএব, যেসব পেশায় বা উপার্জনের পন্থায় আল্লাহর স্মরণে বিমুখ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে ইসলাম তা অবৈধ হিসেবে ঘোষনা করেছে। পবিত্র কুরআনে অন্যত্র এ বিষয়ে প্রমাণ পাওয়া যায়। সেটি হলো ব্যবসায়ের ক্ষেত্রে যদি কখনও আল্লাহর স্মরণে ব্রত হওয়ার আহবান আসে, তাহলে তখন যাবতীয় ব্যবসায়িক কর্ম পরিহার করা সকল ইমানদারদের জন্য ওয়াজিব।
জীবিকা অর্জনের নিমিত্তে বিদেশে পাড়ি জমানোরও নির্দেশও রয়েছে এবং এটিকে আল্লাহর রাস্তায় বের হওয়ার সমপর্যায়ভুক্ত বলে গণ্য করা হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন:
﴿وَءَاخَرُونَ يَضۡرِبُونَ فِي ٱلۡأَرۡضِ يَبۡتَغُونَ مِن فَضۡلِ ٱللَّهِ وَءَاخَرُونَ يُقَٰتِلُونَ فِي سَبِيلِ ٱللَّهِۖ﴾ [الجمعة:9]
‘‘আল্লাহ জানেন যে, তোমাদের মধ্যে কেউ কেউ অসুস্থ হয়ে পড়বে, কেউ আল্লাহর অনুগ্রহের সন্ধানে দেশভ্রমন করবে এবং কেউ কেউ আল্লাহর পথে যুদ্ধে লিপ্ত হবে।’’
أي مسافرين في الأرض يبتغون من فضل الله في المكاسب والمتاجر.
আলোচ্য আয়াতের ব্যাখ্যায় আল্লামা ইবনে কাসীর (রহ.) বলেন:
‘‘অর্থ্যাৎ যারা ব্যবসা-বানিজ্য ও রিযিক উপার্জনের বিভিন্ন উপায় অবলম্বনের মাধ্যমে আল্লাহর অনুগ্রহ লাভের অন্বেষায় পৃথিবীতে ভ্রমনরত।’’
তাছাড়া ব্যক্তি জীবনে অর্থনৈতিক স্বাবলম্বী হওয়ার ব্যাপারে বিশ্বনবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমনভাবে উৎসাহিত করেছেন যে, ভিক্ষাবৃত্তিকে তিনি নিন্দা করেছেন। এ মর্মে যুবাইর ইবনে ‘আউয়াম রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত হাদীসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
«لأن يغدو أحدكم، فيحطب على ظهره، فيتصدق به ويستغني به من الناس، خير له من أن يسأل رجلا، أعطاه أو منعه ذلك »
‘‘তোমাদের কেউ তার রশি নিয়ে চলে যাক, পিঠে কাঠের বোঝা বহন করে এনে বিক্রয় করুক এবং তার চেহারাকে আল্লাহর আযাব থেকে বাঁচিয়ে রাখুক এটা তার জন্য মানুষের নিকট ভিক্ষা করা, চাই তাকে দান করুক বা না করুক তার চাইতে উত্তম।’’
অতএব উপার্জন করার মনোবৃত্তি ব্যতিরেকে যারা ভিক্ষাবৃত্তিতে প্রবৃত্ত হয় তাদের এ ধরনের পেশাকে অবৈধ সাব্যস্ত করা হয়েছে। এ মর্মে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
«ما يزال الرجل يسأل الناس، حتى يأتي يوم القيامة ليس في وجهه مزعة لحم»
‘‘তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি সর্বদা মানুষের কাছে চেয়ে বেড়ায় সে কিয়ামতের দিন এমন অরস্থায় আগমন করবে যে, তার মুখমণ্ডলে এক টুকরো গোশতও থাকবে না।’’ ইসলাম মানবতার ধর্ম। দুস্থ মানবতার সেবায় দান করার রীতি ইসলামে চালু আছে। তবে ভিক্ষাবৃত্তিকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করতে ইসলাম অনুমোদন দেয় নি। বরং একে বার বার নিরুৎসাহিত করেছে যা, নিষেধের পর্যায় পৌঁছে গিয়েছে।
উপার্জনের ক্ষেত্রে ইসলাম নিজ হাতে উপার্জন করাকে সর্বোত্তম উপার্জন হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। এ মর্মে হাদীসে এসেছে:
عن رافع بن خديج، قال: قيل: يا رسول الله، أي الكسب أطيب؟ قال: «عمل الرجل بيده وكل بيع مبرور»
হযরত রাফে ইবনে খাদীজা রাদিয়াল্লাহু আনহা হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল যে, সর্বোত্তম উপার্জন কোনটি? জবাবে তিনি বলেন: ব্যক্তির নিজস্ব শ্রমলব্দ উপার্জন ও সততার ভিত্তিতে ক্রয়-বিক্রয়।’
নবী রাসূলগণের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, তাঁরা নিজ হাতে কর্ম সম্পাদনকে অধিক পছন্দ করতেন। আমাদের প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর জীবনে প্রাথমিক সময়ে ছাগল চড়ানো ও পরবর্তীতে খাদিজা রাদিয়াল্লাহু আনহার ব্যবসায়িক দায়িত্ব পালনের বর্ণনা পাওয়া যায়, যা নিজ হাতে জীবিকা নির্বাহে উৎকৃষ্ট প্রমাণ বহন করে।
---------------------------------------------------------

কেমন হবে হজ্বের প্রস্তুতি?
ঢাকা টাইমস ডেস্ক

মাওলানা মুহাম্মদ আনসারুল্লাহ: হজ্ব একটি দৈহিক, আর্থিক ও আত্মিক ইবাদত। এতে যেমন আছে দীর্ঘ সফর ও বিশেষ স্থানে বিশেষ আমলের অপিরিহার্যতা তেমনি আছে গভীর রূহানিয়ত ও আধ্যাত্মিক তাৎপর্যের বিষয়।
আল্লাহর ঘরে হাজিরি মুমিন জীবনের পরম সৌভাগ্য। ঐ পুণ্যভূমিতে পৌঁছে বান্দা তার রবের উদ্দেশ্যে নিজের আবদিয়ত ও দাসত্বের এবং ইশ্ক ও মহববতের প্রমাণ দিবে। আল্লাহর শিআর ও নিদর্শনাবলীর প্রতি ভক্তি ও শ্রদ্ধা প্রকাশ করবে। নিজের জাহের ও বাতেনকে ইবরাহীম খলীলুল্লাহর রঙে রঙিন করার অনুপ্রেরণা অর্জন করবে এবং ঐ পবিত্রভূমির নূর ও নূরানিয়াত দ্বারা নিজেকে আলোকিত করবে-এটাই তো হজ্বের দর্শন ও তত্ত্বকথা। বায়তুল্লাহ অভিমুখে হজ্বের সফর তো ইবাদতের সফর।
আল্লাহর সন্তুষ্টি ও নৈকট্য লাভের সফর। তাই আল্লাহর যে বান্দা হজ্বের নিয়ত করে তার অবশ্যকর্তব্য এই ইবাদতের জন্য প্রস্ত্ততি গ্রহণ করা। এক্ষেত্রে জাগতিক প্রস্ত্ততির চেয়ে বেশি প্রয়োজন রূহানী প্রস্ত্ততি। কারণ যে ইবাদত ইখলাস ও তাকওয়ার সাথে এবং সুন্নাহ-সম্মত পন্থায় আদায় করা হয় তা কবুলিয়তের অতি নিকটবর্তী হয়ে যায়। তাই শুধু হজ্ব নয়, নামায-রোযা, যাকাত-সদকাসহ সকল ইবাদতকে জাহের-বাতেন উভয় দিক থেকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নামায, রোযা, হজ্ব ও যাকাতের অনুরূপ করার চেষ্টায় নিয়োজিত হওয়া সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।
 
কিন্তু ধরুন, হজ্ব উপলক্ষে যদি শুধু বৈষয়িক প্রস্ত্ততির চিন্তা করা হয়, রূহানী বা আত্মিক প্রস্ত্ততির কানো প্রয়োজনই বোধ করা না হয় তাহলে তো প্রচুর অর্থ ও দীর্ঘ সময় ব্যয় করে যেভাবে যাওয়া হয় সেভাবেই ফিরে আসতে হবে।
বাস্তব জীবনে হজ্বের কোনো প্রভাব প্রতিক্রিয়াই পরিলক্ষিত হবে না।
এটা ঠিক যে, হজ্বের জন্য পাথেয় সংগ্রহ করা, বৈষয়িক প্রস্ত্ততি নেয়া সম্পূর্ণ জায়েয বরং প্রয়োজন পরিমাণ প্রস্ত্ততি তো আবশ্যক এবং শরীয়তের নির্দেশ। উপরন্তু শরীয়তে ঐসব লোকের নিন্দা করা হয়েছে, যারা তাওয়াক্কুল ও তাকওয়ার নামে হজ্বের সফরে প্রয়োজনীয় পাথেয় না নিয়েই চলে যেত এবং সেখানে মানুষের নিকট ভিক্ষার হাত প্রসারিত করত। তবে বৈষয়িক প্রস্ত্ততির চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে ভালোভাবে হজ্বের আহকাম ও মাসায়েল শেখা এবং নিজের হৃদয় ও অন্তরকে হজ্বের  কল্যাণ ধারণের উপযোগী করা।
কুরআনে কারীমে তাকওয়ার পাথেয় অর্জনের প্রতি অধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-
وتزودوا فان خير الزاد التقوى، واتقون يا اولى الالباب.
(তরজমা) হজ্বের সফরে তোমরা পাথেয়র ব্যবস্থা কর, বস্ত্তত তাকওয়াই উৎকৃষ্ট পাথেয়। হে জ্ঞানী লোকেরা তোমরা আমাকে ভয় করে চল।-সূরা বাকারা (২) : ১৯৭
স্মরণ রাখা উচিত, হজ্ব হল পুরো জীবনের আমল। পুরো জীবনে একবারই হজ্ব করা ফরয। তাহলে যে হজ্ব পুরো জীবন ব্যাপী পরিব্যপ্ত তার প্রভাব তো জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অবশিষ্ট থাকতে হবে। তাহলে হজ্বকে প্রথাগত হজ্বের চেয়ে জীবন্ত হজ্বে পরিণত করার চেষ্টা করা কি অবশ্য কর্তব্য নয়? এই প্রচেষ্টা ও সাধনায় আত্মনিয়োগ করতে পারাটাই তো হজ্ব কবুল হওয়ার অন্যতম বড় আলামত। আর আল্লাহ তাআলার রহমত, মাগফিরাত ও জান্নাতের ওয়াদা তো মকবুল হজ্বের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।
সকল ইবাদতের মতো এই ইবাদতেরও প্রাণ হচ্ছে ইখলাস। অর্থাৎ একমাত্র আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি ও নৈকট্য লাভের উদ্দেশ্যে হজ্ব করা। লৌকিকতা, সুনাম-সুখ্যাতি, হাজী উপাধী লাভ ইত্যাদি যে কোনো দুনিয়াবী স্বার্থ ও উদ্দেশ্য থেকে এই আমলকে মুক্ত রাখা অতি জরুরি। ইখলাস ছাড়া কোনো আমলই আল্লাহর দরবারে কবুল হয় না। আল্লাহ তাআলা বলেন-
واما امروا الا ليعبدوا الله مخلصين له الدين حنفاء
(তরজমা) তারা তো আদিষ্ট হয়েছিল আল্লাহর ইবাদত করতে তার আনুগত্যে বিশুদ্ধচিত্ত হয়ে একনিষ্টভাবে।-সূরা বায়্যিনাহ (৯৮) : ৫
হজ্ব ও উমরা সম্পর্কে তো আল্লাহ তাআলা আরো বিশেষ ঘোষণা দিয়েছেন-
واتموا الحج والعمرة لله
(তরজমা) আর তোমরা আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে হজ্ব ও উমরা পরিপূর্ণরূপে পালন কর।-সূরা বাকারা (২) : ১৯৬
জুনদুব আল-আলাকী রাহ. হতে বর্ণিত এক হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন-
من يسمع يسمع الله به ومن يرائي يرائي الله به.
 যে ব্যক্তি লোকসমাজে প্রচারের উদ্দেশ্যে নেক আমল করে, আল্লাহ তাআলা তার কর্মের প্রকৃত উদ্দেশ্যের কথা লোকদের শুনিয়ে দিবেন। আর যে ব্যক্তি লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে কোনো সৎকাজ করে, আল্লাহ তাআলাও তার প্রকৃত উদ্দেশ্যের কথা লোকদের মাঝে প্রকাশ করে দিবেন।-সহীহ বুখারী, হাদীস : ৬৪৯৯; সহীহ মুসলিম, হাদীস : ২৯৮৭
এজন্য হজ্বের সৌভাগ্যলাভকারীদের উচিত, আল্লাহ তাআলার নিকট রিয়ামুক্ত হজ্বের জন্য দুআ করতে থাকা। এ তো স্বয়ং আল্লাহর প্রিয় হাবিব সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আদর্শ ও শিক্ষা। আনাস রা. হতে বর্ণিত হয়েছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি পুরাতন বাহন এবং চার দিরহাম বা তার চেয়ে কম মূল্যের একটি পশমী বস্ত্রে হজ্ব করলেন, তখন তিনি এই দুআ করলেন-
اللهم حجة لا رياء فيها ولا سمعة
হে আল্লাহ! আমার হজ্বকে রিয়া ও খ্যাতির আকাঙ্খমুক্ত হজ্বরূপে কবুল করেন।-সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস : ২৮৯০; শামায়েলে তিরমিযী, ৩৩৪; মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা, হাদীস : ১৬০৫৩; সহীহ বুখারী, হাদীস : ১৫১৮
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে রাসূলের সুন্নত ও আদর্শ মোতাবেক হজ্ব করার তাওফীক দান করুন।
---------------------------------------------
রসুল (স.)-এর বিদায় হজ্বের ভাষণ
ঢাকা টাইমস ডেস্ক
ঢাকা, ১৫ অক্টোবর: দশম হিজরির যিলক্বদ মাসে রাসূলে পাক (স.) হজ্ব করার মনস্থ করেছিলেন। সংবাদটি পলকের মধ্যে সর্বত্র ছড়িয়ে গেল। সারা আরবের লোক হজ্বে অংশগ্রহণের জন্য উদ্বেলিত হয়ে উঠল। যিলক্বদের ২৬ তারিখ রোজ শনিবার রাসূলে পাক (স.) গোসল করলেন। তারপর তিনি লুঙ্গি ও চাদর পরিধান করলেন। জোহর নামায আদায় করার পর মদীনা থেকে দু’মাইল দূরে যুলহুলাইফা নামক একটি স্থান আছে। মদীনাবাসীদের হজ্বের এহরাম বাঁধার মীকাত এটাই।এখানে পৌঁছে রাত কাটালেন। পরদিন পুনরায় গোসল করলেন। হযরত আয়েশা (রা.) নিজ হাতে রাসূলে পাক (স.)-এর দেহ মুবারকে আতর মেখে দিলেন। তারপর রাসূলে পাক (স.) দু’রাকায়াত নামায আদায় করলেন। অতঃপর কাছওয়া নামক উটনীর পিঠে আরোহণ করে হজ্বের এহরাম বাঁধলেন। তারপর বুলন্দ আওয়াজে পাঠ করতে লাগলেন, ‘‘লাব্বাইকা আল্লাহুম্মা লাব্বাইক, লাব্বাইকা-লা শারীকালাকা লাব্বাইক, ইন্নাল হামদা অননি’মাতালাকা অল মুলকা লা শারীকালাকা’ অর্থাৎ হে আল্লাহ! আমি হাজির হয়েছি, হে আল্লাহ! আমি হাজির হয়েছি, হে আল্লাহ! আমি হাজির হয়েছি এবং ঘোষণা করছি, তোমার কোন অংশীদার বা শরীক নেই। হে আল্লাহ! আমি হাজির হয়েছি নিশ্চয়ই সমুদয় প্রশংসা ও নেয়ামত তোমারই জন্য নিবেদিত এবং আধিপত্য ও সার্বভৌমত্ব কেবল তোমারই জন্য। তোমার কোন অংশীদার নেই।
 
হযরত জাবের (রা.) এই হাদীসটি বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন, আমি তাকিয়ে দেখলাম ডানদিকে এমনকি সর্বত্র জনতার ঢল নেমে এসেছে। বস্তুতঃ রাসূলে পাক (স.) যখন লাব্বাইকা শব্দটি উচ্চারণ করতেন, তখন সাথে সাথে সহস্র কণ্ঠে একই শব্দ ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হয়ে পাহাড়-পর্বত ও প্রান্তর প্রকম্পিত করে তুলত। তারপর সরফ নামক স্থানে পৌঁছে রাসূলে পাক (স.) গোসল করলেন। পরদিন রবিবার যিলহজ্ব মাসের চার তারিখ সুবেহ সাদেকের সময় তিনি পবিত্র মক্কায় প্রবেশ করলেন। মদীনা থেকে মক্কা পর্যন্ত এই সফর নয় দিনে অতিক্রম করেছিলেন। বনু হাশেমের শিশু-কিশোররা রাসূলে পাক (স.)-এর আগমনের সংবাদ শুনে খুশিতে মাতোয়ারা হয়ে রাস্তায় বেরিয়ে পড়েছিল। রাসূলে পাক (স.) স্নেহ বাৎসল্যে কাউকে উটের পিঠে সামনে এবং কাউকে পেছনে বসিয়ে নিয়েছিলেন। তারপর যখন কা’বা শরীফ নজরে পড়ল, তখন তিনি দোয়া করলেন, হে আল্লাহ! আপনি এই গৃহের ইজ্জত, সম্মান ও মর্যাদা বাড়িয়ে দিন।
 
অতঃপর কা’বা শরীফ তাওয়াফ করলেন এবং মাকামে ইব্রাহীমে দু’রাকায়াত নামায আদায় করলেন। তারপর এই আয়াত পাঠ করলেনঃ ‘আত্তাখিযূ মিম্মাক্বামি ইব্রাহীমা মুছাল্লা’ অর্থাৎ মাকামে ইব্রাহীমকে তোমরা নামাযের স্থান হিসেবে গ্রহণ কর। তারপর ৮ যিলহজ্ব বৃহস্পতিবার সব মুসলমানকে সাথে নিয়ে রাসূলে পাক (স.) মিনায় চলে গেলেন।
 
তারপর ৯ যিলহজ্ব শুক্রবার দিন ভোরে নামায পড়ে আরাফাতের দিকে রওয়ানা হলেন। ঐদিনটিই ছিল ইসলামের গৌরব এবং মর্যাদা বিকাশের দিন। যার ফলে অন্ধকার যুগের যাবতীয় অহেতুক ও বাতিল কাজকর্ম বিলুপ্ত হয়ে গেল। রাসূলে পাক (স.) এরশাদ করলেন, জেনে রেখ, অন্ধকার যুগের সব দস্তুর ও লোকাচার আজ আমার পদতলে সংস্থাপিত হল। রাসূলে পাক (স.) এরশাদ করলেন, হে জনগণ! অবশ্যই তোমাদের প্রতিপালক এক এবং তোমাদের পিতাও এক; সুতরাং কোন আরবের কোন আজমের ওপর প্রাধান্য নেই। শ্বেতবর্ণের লোকের কালো বর্ণের লোকের ওপর এবং কালো বর্ণের লোকের শ্বেত বর্ণের লোকের ওপর কোনই প্রাধান্য নেই; কিন্তু তাকওয়া ও পারহেজগারী হল মর্যাদার একমাত্র মানদ-।
 
তার পর রাসূলে পাক (স.) বললেন, প্রত্যেক মুসলমান একে অন্যের ভাই এবং সব মুসলমান ভ্রাতৃত্ব বন্ধনে আবদ্ধ। অতঃপর রাসূলে পাক (স.) বললেন, হে জনগণ! তোমাদের গোলাম, তোমাদের গোলাম! যা তোমরা নিজেরা ভক্ষণ করবে তা তাদেরকেও খেতে দেবে। যা তোমরা পরিধান করবে তা তাদেরকেও পরিধান করাবে। আরবে কোন বংশের কেউ যদি কারো হাতে নিহত হতো তবে এই হত্যার প্রতিশোধ গ্রহণ করা বংশের ওপর অপরিহার্য হয়ে দাঁড়াত। এমনকি হাজার বছর অতিবাহিত হওয়ার পরও এই ফরজ অবশিষ্ট থাকত। এতে করে যুদ্ধ ও রক্তপাতের এক অনন্তকালীন অধ্যায়ের সূচনা হতো।
 
এ কারণে আরবের জমিন সর্বদাই রক্তে রঞ্জিত থাকত। তাই এসব আরবের পুরাতন পদ্ধতি ও লোকাচার, আভিজাত্যবোধ, বংশের গৌরব গাঁথার রেশ সর্বাংশে খতম করা হল। এর জন্য নবুয়তের এই ঘোষণা বিশ্ববাসীর সামনে সত্যিকার আদর্শের নমুনা পেশ করল। এই প্রেক্ষিতে ঘোষণা করা হল, অন্ধকার যুগের সব রক্তপাত বাতিল করে দেয়া হল এবং সর্বপ্রথম আমি আমার বংশের রক্ত অর্থাৎ রাবীআ বিন হারেছ-এর রক্তশোধ বাতিল ঘোষণা করলাম। ঘোষণা করা হল অন্ধকার যুগের সর্বপ্রকার সুদের কারবার বাতিল করা হল এবং সর্বপ্রথম আমার নিজের বংশের সুদ অর্থাৎ আব্বাস বিন আব্দুল মুত্তালিবের সুদী কারবার বাতিল ঘোষণা করা হল। স্মরণ রাখা দরকার যে, রাসূলে পাক (স.)-এর চাচা আব্বাস (রা.) ইসলাম গ্রহণের পূর্বে সুদের কারবারে জড়িত ছিলেন। সেসময় সব লোকের কাছেই তিনি সুদের টাকা পাওনাদার ছিলেন। রাসূলে পাক (স.) তা বাতিল করে দিলেন। ঘোষণা করলেন, তোমরা নারীদের বিষয়ে আল্লাহকে ভয় কর।
 
অবশ্যই তাদের হক তোমাদের ওপর আছে এবং তোমাদের হকও তাদের ওপর আছে। আরবে জান ও মালের কোন মূল্য ছিল না। তারা ইচ্ছানুযায়ী যাকে ইচ্ছা তাকেই হত্যা করত এবং মানুষের কাছ থেকে জোরপূর্বক ধন-সম্পদ ছিনিয়ে নেয়া হতো। তাই শান্তি ও নিরাপত্তা প্রদানকারী সম্র্রাট রাসূলে পাক (স.) সারা দুনিয়ার সামনে সন্ধি, স্বস্তি ও নিরাপত্তার আশ্বাস প্রদান করলেন এবং ঘোষণা করলেন, তোমাদের ধন-সম্পদ, তোমাদের রক্ত কেয়ামত পর্যন্ত এমনি হারাম যেমন, এই মাসে, এই দিনে, এই স্থানে এইসব বস্তু হারাম। এই নির্দেশ তোমাদের আল্লাহ পাকের সামনে হাজির হওয়া পর্যন্ত বলবত থাকবে। আমি তোমাদের কাছে দুটি জিনিস রেখে যাচ্ছি। তোমরা তা দৃঢ়ভাবে ধরে রাখলে কখনো পথভ্রষ্ট হবে না। তাহলো, আল্লাহর কিতাব।
 
এরপর তাঁর রাসূলের সুন্নত। হুকুম করা হল, আল্লাহ পাক সব হকদারকে তাদের ন্যায্য হক প্রদান করেছেন; সুতরাং এখন কোন উত্তরাধিকারীর জন্য অছীয়ত করার দরকার নেই। জেনে রেখো, ছেলে ঐ ব্যক্তির বলেই সাব্যস্ত হবে যার শয্যায় সে জন্ম লভ করেছে। আর ব্যাভিচারের শাস্তি হল প্রস্তরাঘাতে হত্যা করা এবং তার হিসাব আল্লাহ পাকই গ্রহণ করবেন। আর যে ছেলে নিজের পিতার বদলে অন্য কারো ঔরসে জন্ম নিয়েছে বলে দাবি করে এবং গোলাম স্বীয় মনিব ছাড়া অন্য কারো মালিকানায় নিজেকে সংযুক্ত করে তার ওপর আল্লাহর অভিসম্পাত অবধারিত। ধার করা বস্তু অবশ্যই ফেরত দিতে হবে। উপহারের বদলা উপহার প্রদান করতে হবে এবং কোন বস্তুর জিম্মাদার হলে এর পরিপূরণ অবশ্যই তাকে করতে হবে। তারপর রাসূলে পাক (স.) অগণিত জনসমুদ্রের প্রতি লক্ষ্য করে বললেন, আল্লাহ তোমাদেরকে আমার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করবেন।
 
তোমরা এর কি উত্তর দেবে ছাহাবীগণ বললেন, আমরা বলব, আপনি আল্লাহর পয়গাম পৌঁছে দিয়েছেন, আপনার কর্তব্য আদায় করেছেন। এর সময় রাসূলে পাক (স.) আকাশের দিকে আঙ্গুলি উত্তোলন করে বললেন, হে আল্লাহ! আপনি সাক্ষী থাকুন, হে আল্লাহ! আপনি সাক্ষী থাকুন, হে আল্লাহ! আপনি সাক্ষী থাকুন। রাসূলে পাক (স.)-এর আরাফাতের ময়দানে ভাষণদানকালেই এই আয়াত অবতীর্ণ হয়, “আল ইয়াওমা আকমালতু লাকুম দ্বীনাকুম ওয়া আতমামতু আলাইকুম নি’মাতী ওয়া রাদ্বীতু লাকুমুল ইসলামা দ্বীনা।” অর্থাৎ আজ আমি তোমাদের জন্য দ্বীনকে পরিপূর্ণ করে দিলাম এবং আমার নেয়ামত তোমাদের ওপর পরিপূর্ণ করলাম। আর তোমাদের ধর্ম হিসেবে ইসলামকে মনোনীত করলাম। হে লোক সকল! তোমরা কি জান আজকের দিনটি কোন দিন লোকজন উত্তর করল, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই ভাল জানেন।
 
রাসূলে পাক (স.) দীর্ঘ সময় নিশ্চুপ রইলেন। এতে লোকজন মনে করল, হয়তো রাসূলে পাক (স.) এই দিনটির নতুন করে কোন নামকরণ করবেন। দীর্ঘ সময় চুপ থাকার পর রাসূলে পাক (স.) বললেন, এটা কি আরাফার দিন নয় লোকজন বলল, অবশ্যই আরাফার দিন। তারপর জিজ্ঞেস করলেন, এটা কোন মাস লোকজন পূর্ববৎ উত্তর দিল। রাসূলে পাক (স.) অনেক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন, এটা কি যিলহজ্জের মাস নয় লোকজন বলল, হ্যাঁ, নিশ্চয়ই যিলহজ্জ মাস। তারপর জিজ্ঞেস করলেন, বল দেখি এটা কোন শহর লোকজন আগের মতই উত্তর দিল। রাসূলে পাক (স.) দীর্ঘক্ষণ নিশ্চুপ থাকার পর বললেন, এটা কি শহরে হারাম নয় লোকজন বলল, হ্যাঁ, অবশ্যই সম্মানিত শহর। যখন শ্রোতাদের মনে এই দিন এই মাস ও এই শহরের মর্যাদা ও সম্মান নতুন করে জেগে উঠল এবং তারা বিশ্বাস করল যে, এই দিনে এই মাসে, এই শহরে যুদ্ধ-বিগ্রহ ও রক্তপাত জায়েয নয়, তখন তিনি এরশাদ করলেন, তোমাদের রক্ত, তোমাদের মাল-সম্পদ ও তোমাদের ইযযত-হুরমত (কেয়ামত পর্যন্ত) এভাবেই পবিত্র। যেমন- এই দিন, এই মাস ও এই শহর সম্মানিত ও পবিত্র। তিনি বুলন্দ আওয়াজে ঘোষণা করলেন, হে জনগণ! তোমরা পরে যেন গোমরাহ হয়ে যেও না, একে অন্যের গর্দান উড়িয়ে দেয়ার মাধ্যমে।
 
তোমাদেরকে আল্লাহর সামনে হাজির হতে হবে এবং তোমাদেরকে জিজ্ঞেস করা হবে তোমাদের কৃত-কর্মের ব্যাপারে। তিনি দৃপ্তকণ্ঠে ঘোষণা করলেন, জেনে রেখ, অপরাধী নিজের অপরাধের জন্য দায়ী থাকবে আর পিতার অপরাধের ভার ছেলে বহন করবে না। এমন কি ছেলের অপরাধের জবাবও পিতাকে দিতে হবে না। রাসূলে পাক (স.) এরশাদ করলেন, যদি হাবশী অন্ধ গোলামও তোমাদের নেতা হয় এবং আল্লাহর কিতাব অনুসারে তোমাদেরকে পথ প্রদর্শন করে, তবে তার ফরমাবরদার হওয়াও তোমাদের কর্তব্য। মরু আরবের প্রতিটি ধূলিকণা ইসলামের নূরে সমুজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল এবং খানায়ে কা’বা চিরকালের জন্য মিল্লাতে ইব্রাহিম (আ.)-এর প্রাণকেন্দ্র হয়ে উঠেছিল। সত্য প্রতিষ্ঠার সাথে সাথে যাবতীয় অশুভ বস্তু নির্মূল হয়ে যাচ্ছিল। অতঃপর জনসমুদ্রকে লক্ষ্য করে বললেন, যারা এখন এখানে উপস্থিত আছো, তারা এই ভাষণ অন্যদের কাছে পৌঁছে দেবে যারা এখানে উপস্থিত নেই। খুত্বাহর শেষ পর্যায়ে তিনি সব মুসলমানকে লক্ষ্য করে বললেন, বিদায়, বিদায়।
 ---------------------------------------------------------------------------
ইয়াতীমের অধিকার রক্ষায় কুরআন-১
আবুল হোসেন : ‘ইয়াতিম’ শব্দটির অর্থ হচ্ছে নি:সঙ্গ। ইসলামী পরিভাষায় যে সকল শিশু সন্তানের পিতা ইন্তিকাল করেছেন, তাকে ইয়াতীম বলা হয়। সন্তান যখন বালেগ বয়সে উপনীত হয়, তখন তাকে আর ইয়াতীম বলা হয় না। হাদীস শরীফে বর্ণিত হয়েছে, মহানবী (সা) বলেছেন, বালেগ হবার পর আর কেউ এতীম থাকে না। (মেশকাত- পৃ-২৮৪) ইয়াতীমদের অধিকার রক্ষায় কুরআন ও হাদীসের অনেক জায়গায় সতর্কবাণী উল্লেখ করা হয়েছে।
পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে, এতীমের ধন-সম্পত্তি তার নিকট পৌঁছে দাও। আর এর অর্থ হচ্ছে এই যে, সে বালেগ হলেই কেবল তার নিকট তার গচ্ছিত মালামাল পৌঁছে দেয়া যেতে পারে। পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে:
‘যখন আমি বনী-ইসরাঈলের কাছ থেকে অঙ্গীকার নিলাম যে, তোমরা আল্লাহ ছাড়া কারও উপাসনা করবে না, পিতা-মাতা, আত্মীয়-স্বজন, এতীম ও দীন দরিদ্রদের সাথে সদ্ব্যবহার করবে, মানুষকে সৎ কথাবার্তা বলবে, নামায প্রতিষ্ঠা করবে এবং যাকাত দেবে, তখন সামান্য কয়েকজন ছাড়া তোমরা মুখ ফিরিয়ে নিলে, তোমরাই অগ্রাহ্যকারী।
 
‘সৎকর্ম শুধু এই নয় যে, পূর্ব কিংবা পশ্চিম দিকে মুখ করবে ; বরং বড় সৎকাজ হল এই যে, ঈমান আনবে আল্লাহর উপর, কিয়ামত দিবসের উপর, ফেরেশতাদের উপর এবং সমস্ত নবী-রাসূলগণের উপর, আর সম্পদ ব্যয় করবে তাঁরই মহব্বতে আত্মীয়-স্বজন, এতীম-মিসকীন, মুসাফির-ভিক্ষুক ও মুক্তিকামী ক্রীতদাসদের জন্যে। আর যারা নামায প্রতিষ্ঠা করে, যাকাত দান করে এবং যারা কৃত প্রতিজ্ঞা সম্পাদনকারী এবং অভাবে, রোগে-শোকে ও যুদ্ধের সময় ধৈর্যধারণকারী, তারাই হল সত্যাশ্রয়ী আর তারাই পরহেযগার। (সূরা বাক্বারা, আয়াত : ১৭৭)
 
তোমার কাছে জিজ্ঞেস করে, কি তারা ব্যয় করবে? বলে দাওÑযে বস্তুই তোমরা ব্যয় কর, তা হবে পিতা-মাতার জন্যে, আত্মীয়-আপনজনের জন্যে এতীম-অনাথদের জন্যে, অসহায়দের জন্যে এবং মুসাফিরদের জন্যে। আর তোমরা যে কোন সৎকাজ করবে, নিঃসন্দেহে তা অত্যন্ত ভালভাবেই আল্লাহর জানা রয়েছে। (সূরা বাক্বারা, আয়াত : ২১৫)
 
দুনিয়া ও আখেরাতের বিষয়ে। আর তোমার কাছে জিজ্ঞেস করে, এতীম সংক্রান্ত হুকুম। বলে দাও, তাদের কাজ-কর্ম সঠিকভাবে গুছিয়ে দেয়া উত্তম আর যদি তাদের ব্যয়ভার নিজের সাথে মিশিয়ে নাও, তাহলে মনে করবে তারা তোমাদের ভাই। বস্তুত অমঙ্গলকামী ও মঙ্গলকামীদেরকে আল্লাহ জানেন। আল্লাহ যদি ইচ্ছা করতেন, তাহলে তোমাদের উপর জটিলতা আরোপ করতে পারতেন। নিশ্চয়ই তিনি পরাক্রমশালী, মহাপ্রাজ্ঞ। (সূরা বাক্বারা, আয়াত : ২
এতীমদেরকে তাদের সম্পদ বুঝিয়ে দাও। খারাপ মালামালের সাথে ভালো মালামালের অদল-বদল করো না। আর তাদের ধন-সম্পদ নিজেদের ধন-সম্পদের সাথে সংমিশ্রন করে তা গ্রাস করো না। নিশ্চয়ই এটা বড়ই মন্দ কাজ।(সূরা নিসা, আয়াত : ২)
 
আর যদি তোমরা ভয় কর যে, এতীম মেয়েদের হক যথাযথভাবে পূরণ করতে পারবে না, তবে সেসব মেয়েদের মধ্য থেকে যাদের ভাল লাগে তাদের বিয়ে করে নাও দুই, তিন কিংবা চারটি পর্যন্ত। আর যদি এরূপ আশঙ্কা কর যে, তাদের মধ্যে ন্যায়সঙ্গত আচরণ বজায় রাখতে পারবে না, তবে একটি অথবা তোমাদের অধিকারভুক্ত দাসীদেরকে, এতে পক্ষপাতিত্বে জড়িত না হওয়ার অধিকতর সম্ভাবনা। (সূরা নিসা, আয়াত: ৩)
আর এতীমদের প্রতি বিশেষভাবে নজর রাখবে, যে পর্যন্ত না তারা বিয়ের বয়সে পৌঁছে। যদি তাদের মধ্যে বুদ্ধি-বিবেচনার উন্মেষ আঁচ করতে পার, তবে তাদের সম্পদ তাদের হাতে অর্পণ করতে পার। এতীমের মাল প্রয়োজনাতিরিক্ত খরচ করো না বা তারা বড় হয়ে যাবে মনে করে তাড়াতাড়ি খেয়ে ফেলো না। যারা স্বচ্ছল তারা অবশ্যই এতীমদের মাল খরচ করা থেকে বিরত থাকবে। আর যে অভাবগ্রস্ত সে সঙ্গত পরিমাণ খেতে পারে। যখন তাদের হাতে তাদের সম্পদ প্রত্যার্পন কর, তখন সাক্ষী রাখবে। অবশ্য আল্লাহই হিসাব নেয়ার ব্যাপারে যথেষ্ট।    (সূরা নিসা, আয়াত : ৬)
 
সম্পত্তি বণ্টনের সময় যখন আত্মীয়-স্বজন, এতীম ও মিসকীন উপস্থিত হয়, তখন তা থেকে তাদের কিছু খাইয়ে দাও এবং তাদের সাথে কিছু সদালাপ করো। (সূরা নিসা, আয়াত : ৮)
যারা এতীমদের অর্থ-সম্পদ অন্যায়ভাবে খায়, তারা নিজেদের পেটে আগুনই ভর্তি করেছে এবং সত্ত্বরই তারা অগ্নিতে প্রবেশ করবে। (সূরা নিসা, আয়াত: ১০)
আর উপাসনা কর আল্লাহর, শরীক করো না তাঁর সাথে অপর কাউকে। পিতা-মাতার সাথে সৎ ও সদয় ব্যবহার কর এবং নিকটাত্মীয়, এতীম-মিসকীন, প্রতিবেশী, অসহায় মুসাফির এবং নিজের দাস-দাসীর প্রতিও। নিশ্চয়ই আল্লাহ পছন্দ করেন না দাম্ভিক-গর্বিতজনকে।  (সূরা নিসা, আয়াত : ৩৬)
 
তারা আপনার কাছে নারীদের বিবাহের অনুমতি চায়। বলেদিন- আল্লাহ তোমাদেরকে তাদের সম্পর্কে অনুমতি দেন এবং কুরআনে তোমাদেরকে যা যা পাঠ করে শুনানো হয়, তা ঐ সব পিতৃহীনা নারীদের বিধান, যাদেরকে তোমরা নির্ধারিত অধিকার প্রদান কর না অথচ বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ করার বাসনা রাখ। আর অক্ষম শিশুদের বিধান এই যে, এতীমদের জন্যে ইনসাফের উপর কায়েম থাক। তোমরা যা ভাল কাজ করবে, তা আল্লাহ জানেন।   (সূরা নিসা, আয়াত : ১২৭)
 
এতীমদের ধন-সম্পদের কাছেও যেয়ো না, কিন্তু উত্তম পন্থায় যে পর্যন্ত সে বয়:প্রাপ্ত না হয়। ওজন ও মাপ পূর্ণ কর ন্যায় সহকারে। আমি কাউকে তার সাধ্যের অতীত কষ্ট দেই না। যখন তোমরা কথা বল তখন সুবিচার কর, যদি সে আত্মীয়ও হয়। আল্লাহর অঙ্গীকার পূর্ণ কর। (সূরা আল আনআম, আয়াত : ১৫২)
 
আর এ কথাও জেনে রাখ যে, কোন বস্তু-সামগ্রীর মধ্য থেকে যা কিছু তোমরা গনীমত হিসেবে পাবে, তার এক পঞ্চমাংশ হল আল্লাহর জন্য, রাসূলের জন্য, তাঁর নিকটাত্মীয়-স্বজনের জন্য এবং এতীম-অসহায় ও মুসাফিরদের জন্য ; যদি তোমাদের বিশ্বাস থাকে আল্লাহর উপর এবং সে বিষয়ের উপর যা আমি আমার বান্দার প্রতি অবতীর্ণ করেছি ফয়সালার দিনে, যেদিন সম্মুখীন হয়ে যায় উভয় সেনাদল। আর আল্লাহ সব কিছুর উপরই ক্ষমতাশীল।   (সূরা আল আনফাল, আয়াত : ৪১)
 
আর, এতীমের মালের কাছেও যেয়ো না, একমাত্র তার কল্যাণ আকাক্সক্ষা ছাড়া ; সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির যৌবনে পদার্পণ করা পর্যন্ত এবং অঙ্গীকার পূর্ণ কর। নিশ্চয়ই অঙ্গীকার সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। (সূরা বনী ইসরাঈল, আয়াত: ৩৪)
প্রাচীরের ব্যাপার- সেটি ছিল নগরীর দু’জন পিতৃহীন বালকের। এর নীচে ছিল তাদের গুপ্তধন এবং তাদের পিতা ছিল সৎকর্ম পরায়ন। সুতরাং আপনার পালনকর্তা দয়াবশত ইচ্ছা করলেন যে, তারা যৌবনে পদার্পন করুক এবং নিজেদের গুপ্তধন উদ্ধার করুক। আমি নিজ মতে এটা করিনি। আপনি যে বিষয়ে ধৈর্যধারণ করতে অক্ষম হয়েছিলেন, এই হল তার ব্যাখ্যা। (সূরা কাহাফ, আয়াত : ৮২)
 
আল্লাহ জনপদবাসীদের কাছ থেকে তাঁর রাসূলকে যা দিয়েছেন, তা আল্লাহর রাসূলের, তাঁর আত্মীয়-স্বজনের, ইয়াতীমদের, অভাবগ্রস্তদের এবং মুসাফিরদের জন্যে, যাতে ধনৈশ্বর্য কেবল তোমাদের বিত্তশালীদের মধ্যেই পুঞ্জীভূত না হয়। রাসূল তোমাদেরকে যা দেন, তা গ্রহণ কর এবং যা নিষেধ করেন, তা থেকে বিরত থাক এবং আল্লাহকে ভয় কর। নিশ্চয় আল্লাহ কঠোর শাস্তিদাতা। (সূরা আল হাশর, আয়াত : ৭)
 
তারা আল্লাহর প্রেমে অভাবগ্রস্ত, এতীম ও বন্দীকে আহার্য দান করে। (সূরা আদ দাহর, আয়াত : ৮)
কখনই নয়, বরং তোমরা এতিমের সাথে সম্মানজনক ব্যবহার কর না।  (সূরা আল ফাজর, আয়াত : ১৭)
এতীম আত্মীয়কে (অথবা ধুলি ধূসরিত মিসকিনকে।)  (সূরা আল বালাদ, আয়াত :১৫)
তিনি কি আপনাকে এতীম রূপে পাননি?  (সূরা আদ্ব দ্বুহা, আয়াত : ৬)
সুতরাং আপনি এতীমের প্রতি কঠোর হবেন না।  (সূরা আদ্-দুহা, আয়াত : ৯)
 

No comments: