ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়
মিজানুর রহমান:
কাকরাইলের ডিপোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটের গেটে আসতেই চোখ আটকে যায়। গেটে বড়লোকদের ইফতারের উচ্ছিষ্টাংশ নিয়ে গোগ্রাসে গিলছে তিন ভাইবোন।
নাম জিজ্ঞেস করতেই বড় ছেলেটির সহাস্য উত্তর সাইফুদ্দিন। বয়স ১০ বছরের বেশি হবে না। এরই মধ্যে সংসার দেখাশোনা শুর“ করে দিয়েছে। বাড়ি ফরিদপুরের সদরপুরে।
বাবা নেই। মা অসুস্থ। কারওয়ানবাজারে থাকেন। দুই বোনকে নিয়ে সকালের নরম সূর্যোদয় গায়ে মেখে খাবারের সন্ধানে বেরিয়ে পড়ে সাইফুদ্দিন। সারাদিন দ্বারে দ্বারে ঘুরে খাবার সঞ্চয় করে তিন ভাইবোন। নিজেরা খেয়ে মায়ের জন্য খাবার নিয়ে ফেরে ওরা।
রমজান মাস শুর“ হলে ওদের কষ্ট অনেক লাঘব হয়েছে। ইফতারি বিকেল ও রাতে দু’বেলাই খেতে পারে। সঙ্গে আরো অনেক শুকনো খাবার পায়Ñযা সকালেও খাওয়া যায়।
সাইফুদ্দিনের কথা থেকে জানা যায়, রমজান মাসে মানুষের মনটা নরম থাকে। খাবার চাইলে না করে না কেউ। ইফতারির খাবার পেলে সবচেয়ে বেশি খুশি ছোট্ট মেয়েটি। ওদের ছোট বোন। তার দিকে তাকালে, ‘¶ুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়, পূর্ণিমার চাঁদ যেন ঝলসানো র“টি’ লাইনটির অর্থ স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
ছোট্ট শরীর। হাত-পা-মুখে ¶ুধার কামড়ের ¶ত চিহ্ন। নিষ্পাপ, অপলক দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে পথচারীদের দিকে। দেখলে সোমালিয়া-ইথিওপিয়ার কথা মনে করিয়ে দেয়। কেউ কিছু দিলে খুশি হয়। চারটা ভাতের জন্য সে-ও হাত পাততে শিখেছে। যে বয়সে এই দেবশিশুদের স্কুলে যাওয়ার কথা, সে বয়সে ওরা ছোট কোমল হাত অবলীলায় পেতে দেয় মানুষের কাছে। কেউ দেয়, কেউ না দিয়ে দু’কথা শুনিয়ে দেয়।
তবু ওরা অদম্য। জীবন সংগ্রামের পথ পাড়ি দিয়ে চলে; শঙ্কাহীন। সাইফুদ্দিনের সাধ, বড় হয়ে সে বোনেদের লেখাপড়া করাবে। মায়ের চিকিৎসা করাবে। ভালো থাকবে, ভালো খাবে। এ প্রত্যাশায় তার নিরš—র ছুটে চলা। চারদিকে তাকালে দেখা যায় থরে থরে সাজানো কত খাবার। এই শহরে নষ্ট হয়ে যায় কত খাবার। শুধু ওদের জন্য তার একটুও বরাদ্দ নেই।
ওদের কথায় বোঝা গেল, ঈদ ওদের জন্য বিশেষ কোনো পরিবর্তন আনে না। অভাব-অনটনের আর পাঁচটি দিনের মতোই। জীবনে নতুন কিছু আনে না। ওদের জীবন সংগ্রামের গল্প শুনতে শুনতে সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসে। জ্বলে ওঠে শহরের নিয়ন বাতি। এ বাতির নিচে সর্বগ্রাসী ¶ুধার রঙ বোঝা যায় না। সময়ের কালস্রোতে ভেসে যায় এসব সময়-অসময়ের ধূসর পাÊুলিপি। এসব ভাবতে ভাবতে পথচলা শুর“ হয়। তবু কানে বাজতে থাকে ছোট্ট মেয়ে সুইটির আবদার, জামা লাগব না, কয়ডা খাওন চাই, স্যার।
সৌজন্যে: দৈনিক মানবকণ্ঠ, ৯ আগস্ট ২০১২
No comments:
Post a Comment