প্রসাধনীর আড়ালে প্রতারণা
লেখক: আবুলখায়ের:
সোমবার, ১৯ নভেম্বর ২০১২, ৫ অগ্রহায়ণ ১৪১৯
‘এ প্রসাধনী ব্যবহার করুন, এক মাসেই ত্বক ফর্সা’ কিংবা ‘মেকআপ ছাড়াই
সুন্দরী হোন’। টিভি কিংবা পত্রিকা খুললেই দেখা যায় এমন চটকদার বিজ্ঞাপন।
মডেল দেশের নামীদামী মডেল, অভিনেতা ও অভিনেত্রী। এভাবে বিজ্ঞাপন দিয়ে
দেদারসে বিক্রি করা হচ্ছে ‘ত্বক ফর্সাকারী’ প্রসাধনী। বিজ্ঞাপনে প্রলুব্ধ
হয়ে নারীরা ত্বক ফর্সা করার জন্য হুমড়ি খেয়ে কিনছেন ক্রিম। তারা জানেন না এ
সব ক্রিমে ব্যবহার করা হয় এমন সব উপাদান যাতে ক্যান্সার অনিবার্য। এতে
ব্যবহার করা হয় মার্কারি (পারদ), হাইড্রোকুইনসহ নানা বিষাক্ত উপাদন।
ক্যান্সার ছাড়াও, কিডনির সমস্যা, মস্তিষ্কে প্রদাহ ও প্রতিবন্ধী সন্তান
জন্ম দানসহ নানা ধরনের সমস্যায় পড়তে পারেন নারীরা।
পরমাণু শক্তি কমিশনের পরীক্ষাগারসহ বিভিন্ন পরীক্ষাগারে পরীক্ষায় ‘ত্বক
ফর্সাকারী’ ক্রিমে মার্কারিসহ বিষাক্ত দ্রবণ থাকার প্রমাণ মিলেছে। সমপ্রতি
পরিচালিত মোবাইল কোর্টের অভিযানে ঐ সব ‘ত্বক ফর্সাকারী’ ক্রিম
প্রস্তুতকারীরা নিজেরাই স্ব্বীকার করেছেন এসব প্রসাধনে ত্বক ফর্সা করে এমন
উপাদান নেই। এভাবে বিষাক্ত ক্রিম বিক্রি করে হাজার হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে
নিচ্ছে এসব প্রসাধনী প্রস্তুতকারীরা। বিনিময়ে নারীদেরকে উপহার দিয়েছে
মরণব্যাধি ।
এক প্রসাধন প্রস্তুতকারী স্বীকার করেছেন এ পর্যন্ত তিনি ৫০ লাখ লোকের কাছে
তার বিষাক্ত ক্রিম বিক্রি করেছেন। বিএসটিআই ও ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের
কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন বিষাক্ত ক্রিম প্রস্তুতকারী অনেকের বিএসটিআইয়ের
অনুমোদন রয়েছে। সমপ্রতি প্রসাধনী প্রতিষ্ঠান বোটানিকা এ্যারোমার মালিক ও
তার স্ত্রীসহ তিন জনকে দুই বছর জেল এবং চার জনের বিরুদ্ধে বিশেষ ক্ষমতা
আইনে মামলা করার নির্দেশ দিয়েছে মোবাইল কোর্ট। কারখানা সিলগালা এবং
কোম্পানির বাজার থেকে সব ক্রিম প্রত্যাহার করার আদেশ দিয়েছে মোবাইল কোর্ট।
যেভাবে বিষাক্ত ত্বক ফর্সাকারী ক্রিমের সন্ধান লাভ
ত্বক ফর্সার চটকদার বিজ্ঞাপন রাজধানী থেকে গ্রামাঞ্চলে সর্বত্র ছড়িয়ে
পড়েছে। এসব প্রসাধনী ব্যবহার করে নানা ধরনের শারীরিক সমস্যায় পড়েন
ব্যবহারকারীরা। বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকদের কাছে এ ধরনের অনেক রোগী আসতে থাকেন।
পরে চিকিত্সকরা এ ব্যাপারে সোচ্চার হন।
অভিযোগ আসে র্যাবের কাছেও। র্যাব-১ বাজার থেকে বোটানিক এ্যারোমার ও
বোটানিক হারবালের ১১টি প্রসাধনী বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের আন্তর্জাতিক
মানসম্পন্ন পরীক্ষাগার পরমাণু কেন্দ্রে পরীক্ষা করে। পরীক্ষায় উদ্বেগজনক
মাত্রায় মার্কারি পাওয়া যায়। র্যাবের সংগৃহীত পণ্যের মধ্যে জেন্টস স্পট
অডিট ক্রিম, নাইট কুইন ক্রিম, ব্লাক ডায়মন্ড ক্রিম ও ফেয়ারনেস ক্রিমে
সবচেয়ে মার্কারি থাকার পরীক্ষা প্রমাণ মেলে। নামিদামি মডেল তারকারা বিপুল
টাকার লোভে এ বিষাক্ত ত্বক ফর্সাকারী ক্রিমের চটকদার বিজ্ঞাপনে অংশ নেয়।
মডেল অভিনেতা ও অভিনেত্রীদের দেখে গ্রাম কিংবা শহরের তরুণ-তরুণীরা এ ক্রিম
ব্যবহারে উদ্বুদ্ধ হন।
পরীক্ষার রিপোর্ট, প্রতারণার তথ্য প্রমাণ ও ব্যবহারকারীদের অভিযোগের
ভিত্তিতে র্যাব-১ এর অধিনায়ক লে. কর্নেল রাশিদুল আলমের পরিচালনায়
ম্যাজিস্ট্রেট আনোয়ার পাশার নেতৃত্বে গত শনিবার কেরানীগঞ্জের তিরনি এলাকার
বোটানিক এ্যারোমার কারখানায় অভিযান চালানো হয়। রাত ১২টা পর্যন্ত অভিযান
চলে। বিপুল পরিমাণ ত্বক ফর্সার ক্রীম আটক করে র্যাব। বোটানিক এ্যারোমার
মালিক মো. আসাদুজ্জামান লিটন ও তার স্ত্রী ফেরদৌসী জামান এবং সুপার
ভাইজারের ভাগ্নে আখতার বেপারীকে আটক করা হয়। তার শ্যালক হেমায়েত হাওলাদার
পলাতক। বিষাক্ত মার্কারি ও হাইড্রোকুইনন সংমিশ্রণের বিষয়টি মালিকপক্ষের
চারজন ছাড়া কারখানার আর কেউ জানতেন না বলে মোবাইল কোর্ট জানায়। মোবাইল
কোর্ট মালিক ও তার স্ত্রী এবং ভাগ্নেকে দুই বছর জেল দিয়ে কারাগারে পাঠিয়ে
দেয়। এছাড়া উক্ত চারজনের বিরুদ্ধে বিশেষ ক্ষমতা আইনের ২৫(গ) ধারায় (জামিন
অযোগ্য) মামলা দায়ের করা হয়।
যে ধরনের ক্ষতি হয়
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় ডারমাটোলজী বিভাগে বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকরা ত্বক ফর্সা ক্রিমে অনেক ক্ষতিকর দিক পেয়েছেন।
চর্ম ও যৌন রোগী বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. কবির চৌধুরী বলেন, শুধু বোটানিক
এ্যারোমা ও হারবাল প্রসাধনী নয়, অনেক কোম্পানি মার্কারি ও হাইড্রোকুইনন
মিশিয়ে ‘ত্বক ফর্সাকারী ক্রিম’ তৈরি করে। হারবালের নামে নানা বিষাক্ত
প্রসাধনীতে এখন বাজার সয়লাব।
এগুলো ব্যবহারে মানুষের ত্বকে নানা ধরনের সংক্রমণ হয়। ঘরে ঘরে চামড়ায়
ক্যান্সার ও মুখমণ্ডলে ক্যান্সার দেখা দেয়ার জন্য এই বিষাক্ত ক্রিমই দায়ী।
বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকদের মতে, এসব ক্ষতিকর ক্রিম ব্যবহারে কিডনি ও লিভার
নষ্ট, গর্ভবতী মায়ের গর্ভের সন্তানের মস্তিষ্কের গঠন বাধাগস্ত হয়ে
প্রতিবন্ধী সন্তানের জন্ম দেয়ার সম্ভাবনা বাড়ে। এছাড়া স্মৃতিশক্তি লোপ,
মানসিক উদ্বেগ বৃদ্ধি, হতাশা বৃদ্ধি, হাত-পা অবশ, স্নায়ুতন্ত্রের ক্রিয়া
নষ্ট, চামড়া বিবর্ণ ও রেশ সৃষ্টি হয়ে থাকে। ব্যাকটেরিয়া ও ফাংগাসজনিত রোগ
মস্তিষ্কে বিষক্রিয়া করে মানসিক বিকৃতি ঘটায় ও পরিপাকতন্ত্রে বিষক্রিয়া
সৃষ্টি করে। এছাড়া পরিবারের কোনো সদস্য উক্ত ক্রিম ব্যবহার করলে শিশুরা
মার্কারির স্পর্শ দ্বারা এসব রোগে আক্রান্ত হতে পারে। গোসল বা হাত-মুখ ধোয়া
পানি মার্কারিযুক্ত হয়ে পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ে। খাবার পানি, মাছের মাধ্যমে তা
মানব দেহে প্রবেশ করে অনুরূপ রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।
চর্ম ও যৌন রোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. এমএন হুদা জানান, ‘ত্বক ফর্সাকারী’
ক্রিম ব্যবহার করে মুখমণ্ডলে ইনফেকশন, স্থায়ী জটিলতা ও স্কিন ক্যান্সারে
আক্রান্ত অনেক রোগী তার কাছে প্রতিদিনই আসছেন চিকিত্সার জন্য। বিজ্ঞাপন
দেখে এসব ক্রিম ব্যবহারের প্রবণতা অনেকটা মাদকাসক্তের মতো। কেউ একবার এসব
ক্রিম ব্যবহার করলে বার বার এগুলো ব্যবহারে উত্সাহিত হয়ে পড়েন নারীরা।
ক্যান্সার, কিডনি, লিভার, শিশু ও গাইনি বিশেষজ্ঞরাও একই মত পোষণ করে বলেন,
ত্বক ফর্সা ক্রিম ব্যবহারে চামড়া পাতলা হয়ে যায়। চামড়া পাতলা হয়ে সাদা হয়ে
গেলে ব্যবহারকারী ভাবে ত্বক ফর্সা হয়ে গেছে। ব্যবহার বন্ধ করলে আবার কালো
হয়ে যায় ত্বক।
অর্ধ শতাধিক হারবাল প্রসাধনী কোম্পনির প্রতারণা
বিএসটিআই ও ওষুধ প্রশাসনের সামনে অর্ধ শতাধিক কোম্পানি নানা চটকদার
বিজ্ঞাপন দিয়ে ‘ত্বক ফর্সাকারী’ ক্রিম ও যৌন উত্তেজক হারবাল ওষুধ প্রকাশ্যে
বিক্রি করে চলছে। নতুন করে বাজারে এসেছে বায়োলিফ বিউটি ক্যাপসুল। চুল পড়া
বন্ধ করাসহ নানা ধরনের চটকদার বিজ্ঞাপন দিয়ে মানুষকে বিভ্রান্ত করছে এসব
কোম্পানি। জনপ্রিয় মডেলদের এ সব প্রতারক কোম্পানি ক্রেতার বিশ্বাস বাড়ানোর
জন্য ব্যবহার করে থাকে। ঐ সব মডেল নিজেরা কখনো এসব বিষাক্ত ক্রিম ও ওষুধ
ব্যবহার করে না বলে বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকরা জানান। অনেক ভুয়া প্রতিষ্ঠান ত্বক
ফর্সা করার ইনজেকশন দেয়। ১৫টি ইনজেকশনের দাম পাঁচ লাখ টাকা। এক শ্রেণীর
বিউটি পারলার, স্কিন লেজার সেন্টার ও ডাক্তার ঐ সব বিষাক্ত ত্বক ফর্সা
ক্রিম, ক্যাপসুল ও ইনজেকশন ব্যবহারে নারীদের প্রলুব্ধ করে। এর বিনিময় তারা
মোটা অংকের কমিশন পেয়ে থাকে।
ওষুধ প্রশাসন অধিদফতরের এক শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, বিষাক্ত ত্বক ফর্সা
ক্রিম, ক্যাপসুল, ইনজেকশনের কোনো অনুমতি নেই। যারা এগুলো উত্পাদন ও বিপণনের
সঙ্গে জড়িত ঐ সব কোম্পানির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে বলে তিনি জানান।
ওষুধ প্রশাসন ও বিএসটিআইয়ের এক শ্রেণীর কর্মকর্তা ঐ সব প্রতারক কোম্পানি
থেকে প্রতি মাসে মোটা অংকের উেকাচ পেয়ে থাকেন। এ কারণে ঐ সব প্রতারক
কোম্পানি বিষাক্ত ত্বক ফর্সা ক্রিম, ক্যাপসুল ও ইনজেকশনসহ নানা ধরনের
প্রসাধনী নিরাপদে বাজারজাত করে আসছে বলে দুই শীর্ষ কর্মকর্তা জানান।
http://new.ittefaq.com.bd/news/view/172863/2012-11-19/2