সুশাসন ও বাংলাদেশ
মা হ ফু জ উ ল্লা হ
রাষ্ট্র পরিচালনার পদ্ধতিগত বিতর্কে পৃথিবীজুড়ে গত কয়েক বছরে
সুশাসনের প্রশ্নটি সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। উন্নত বিশ্বের তুলনায় উন্নয়নশীল
এবং অনুন্নত দেশগুলোয় সুশাসন নেই বলে উন্নয়ন বিশ্বের আহাজারি চরম পর্যায়ে
পৌঁছেছে।
সুশাসনকে সংজ্ঞায়িত করতে গিয়ে বিভিন্ন ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান নানা তত্ত্ব ও উপকরণ ব্যবহার করেছে। জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থাও এই প্রেসক্রিপশন দাতাদের তালিকার বাইরে নয়। সুশাসনের লোভ দেখানো হচ্ছে কয়েকটি কথা বলে। এর মধ্যে একটি হচ্ছে—এর ফলে জাতীয় উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে, দুর্নীতি হ্রাস পাবে, উন্নয়নের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় জনগণের অংশগ্রহণ আরও বাড়বে। সর্বোপরি সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হলেই একটি দেশ সামনে এগিয়ে যাবে।
সুশাসনের যেসব উপাদান পশ্চিমা বিশ্বে তাত্ত্বিক ভিত্তির ওপরে দাঁড়িয়ে আছে, তথ্যের নিরিখে বিচার করলে দেখা যাবে—এসব উপাদানের অনুপস্থিতি সত্ত্বেও এশিয়ার বিভিন্ন দেশ চমক লাগানো অগ্রগতি অর্জন করেছে। অপরদিকে সুশাসনের প্রবক্তা পশ্চিমা বিশ্বের অনেক দেশেই প্রতিনিয়ত তৈরি হচ্ছে নতুন সঙ্কট এবং প্রচলিত আর্থ-রাজনৈতিক ব্যবস্থা জনগণকে সন্তুষ্ট করতে পারছে না। সুশাসন সত্ত্বেও দুর্নীতির অপবাদ সইতে হচ্ছে ব্রিটেনকে, অর্থনীতি ভেঙে পড়েছে গ্রিসের।
এশিয়ার যে ক’টি দেশ অর্থাত্ চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর বিগত বছরগুলোতে প্রভূত অগ্রগতি সাধন করেছে তাদের ক্ষেত্রে সুশাসনের বর্তমান ধারণাগত অবস্থার কোনো সাযুজ্য নেই। প্রত্যেকেই স্বীকার করবেন এসব দেশে অর্জিত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সময় একদলীয় শাসন ছিল চূড়ান্ত পর্যায়ে, এমনকি দুর্নীতির ঘটনাও ঘটেছে প্রচুর। অবশ্য বহু ক্ষেত্রেই পুঞ্জীভূত দুর্নীতির বহিঃপ্রকাশ ঘটছে সামপ্রতিক সময়ে। মালয়েশিয়ায় দুর্নীতির বিষয়টি অনেকেই জানলেও তা প্রকাশ্যে খুব একটা আলোচিত হয়নি। অপরদিকে বারবার সামরিক শাসন এবং গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ সত্ত্বেও থাইল্যান্ডের অগ্রগতি চোখে পড়ার মতো।
এ রকম অসংখ্য উদাহরণ সত্ত্বেও রাষ্ট্র পরিচালনায় সুশাসনের প্রশ্নটি অবজ্ঞা করার বিষয় নয়। বাংলাদেশে প্রতিটি রাজনৈতিক দল সামপ্রতিক সময়ে প্রকাশ্যে সুশাসনের প্রতি অঙ্গীকারা বদ্ধ থাকলেও বাস্তবে এর প্রয়োগ নেই বললেই চলে। বিশেষ করে বর্তমান সরকারের আমলে সুশাসনের সবক’টি উপাদান ক্রম অপসৃয়মাণ। মোটাদাগে বললে, সুশাসনের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হচ্ছে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ, জাতীয় উন্নয়নে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় জনগণের অংশগ্রহণ, মানবাধিকারের নিশ্চয়তা প্রভৃতি। কিন্তু ২০০৯ সালের জানুয়ারি থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত বিবেচনা করলে দেখা যাবে, বাংলাদেশে উপরিউক্ত উপাদানগুলোর প্রায় সবক’টি অনুপস্থিত অথবা ব্যক্তির ইচ্ছা দিয়ে সরকার পরিচালনা করা হচ্ছে।
একই সঙ্গে বাইরের পৃথিবীতে গিয়ে নিজের আত্মসম্মান খুইয়ে ফেলার ঘটনাও ঘটছে অহরহ। বর্তমান সময়ে ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠনের বিভিন্ন আচরণ যেমন—হল দখল, টেন্ডারবাজি, রাহাজানি, সহপাঠী ছাত্রীর সম্ভ্রমহানি, ক্যাম্পাসে আধিপত্য বিস্তার করার জন্য প্রকাশ্যে পিস্তল উঁচিয়ে এবং দা-কুড়াল দিয়ে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার ঘটনা অহরহ ঘটছে। যেটা আরও বেশি দুঃখজনক তা হচ্ছে, এসব অপকর্মে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা পর্যন্ত জড়িয়ে পড়ছেন। টেলিভিশনের পর্দায় শিক্ষক ছাত্রীকে ঘুষি মারছেন—এমন দৃশ্য দেখার পর সেই শিক্ষকের জন্য লা’নত প্রার্থনা করা ভিন্ন অন্য কোনো গত্যন্তর থাকে না। এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকের বিরুদ্ধে যখন ছাত্রীকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ ওঠে, তখন এক অবিশ্বাস্য ঘৃণায় বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্রদের মাথানত করা ভিন্ন অন্য কোনো পথ থাকে না। এ-সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ক্ষমতাসীন দলের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্তাব্যক্তিদের বর্ণনাতীত বিভিন্ন অপরাধ।
এমন কোনো কর্ম নেই, যার সঙ্গে তারা জড়িত নয়। তারা নিজের দলকে যেমন ক্ষতিগ্রস্ত করেছেন তেমনি প্রশাসন, পুলিশ বিভাগ, বিচার বিভাগ সব কিছুকেই বিপর্যস্ত করে দিয়েছেন। এই সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দুর্নীতির মহোত্সব। অতি সামপ্রতিক হলমার্ক কেলেঙ্কারি থেকে শুরু করে পেছনের দিকে তাকালে অর্থনৈতিক দুর্বৃত্তপনার অসংখ্য নজির উপস্থিত করা যাবে। এমন একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারি। যে কেলেঙ্কারির মাধ্যমে প্রায় ৩৫ লাখ সাধারণ মানুষের পকেট কেটে হাজার হাজার কোটি টাকা দেশের বাইরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এমনকি কালো বিড়াল নামে খ্যাত মন্ত্রীও দুর্নীতির দায় এড়াতে পারছেন না—যিনি অহংকার করতেন তার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের। অপরদিকে রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল বিদ্যুেকন্দ্র থেকে অবৈধভাবে অর্জিত অর্থ বৈধ করার জন্য ব্যবস্থা করা হয়েছে দায়মুক্তির। এসব বিষয়ে কোনো কোনো ক্ষেত্রে সরকারের উদাসীনতা এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে ষড়যন্ত্র মানুষকে ব্যথিত করলেও নির্যাতনের ভয়ে অনেকেই মুখ খুলতে পারেন না।
মানবাধিকার লঙ্ঘনের অসংখ্য উদাহরণ এর মধ্যে তৈরি হয়েছে। সবচেয়ে বেশি সঙ্কটজনক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বিনা বিচারে হত্যা, গুম ও খুনের কারণে। সরকারের উদাসীনতা যে কোন পর্যায়ে গেছে, তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে বিরোধী নেতা চৌধুরী আলম ও ইলিয়াস আলীসহ বিভিন্ন ব্যক্তির গুম হয়ে যাওয়ার ঘটনায়। বিনা বিচারে এবং বন্দি অবস্থায় মেরে ফেলার প্রশ্নে বাংলাদেশ সরকার একসময় জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে কড়ার করেছিল। কিন্তু সেটা ভুলতে খুব বেশি দিন লাগেনি। আর মিডিয়ার বিরুদ্ধে আক্রমণের কথা উল্লেখ না করাই বাঞ্ছনীয়।
সরকার অনির্বাচিত ব্যক্তিদের দিয়ে জাতীয় নির্বাচন না করতে ধনুক ভাঙার পণ করলেও রাষ্ট্রের ও জনগণের বহু প্রতিষ্ঠানকে পরিচালনা করছে অনির্বাচিত ব্যক্তিদের দিয়ে। শাসনতান্ত্রিক ও আইনগত বাধ্যবাধকতা থাকলেও সরকারের সে বিষয়ে কোনো উদ্বেগ নেই। কারণ এসব অনির্বাচিত ব্যক্তিকে ক্ষমতা দিয়ে বসিয়ে রাখলে সেটা সরকারের জন্য সহায়ক হয় এবং সরকার নিশ্চিত নয় নির্বাচন হলে সরকারের অনুগতরা নির্বাচিত হতে পারবেন কি না। তাই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে জেলা পরিষদ, ঢাকা সিটি করপোরেশনসহ সবকিছুই চলছে আজ্ঞাবহ অনির্বাচিত ব্যক্তিদের দিয়ে।
সুশাসনের ক্ষেত্রে আরেকটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রশাসন ও বিচার বিভাগের রাজনীতিকীকরণ এবং ন্যায়বিচার পরিপন্থী কর্মকাণ্ড। প্রবীণ রাজনীতিবিদ প্রেসিডেন্ট যখন খুনের আসামিকে মাফ করে দেন; তখন অবাক হওয়া ছাড়া গত্যন্তর থাকে না। একইভাবে কয়েকশ’ সরকারি কর্মকর্তাকে অনুমানের ভিত্তিতে ওএসডি বানিয়ে রাখাটাও গ্রহণযোগ্য ব্যবস্থা হতে পারে না। সরকার ও সরকার প্রধান যে এ বিষয়গুলো জানেন না, এমন নয়। এ কারণেই গত কিছুদিন ধরে তাদের বক্তৃতা থেকে সুশাসনের প্রশ্নটি হারিয়ে গেছে।
এই হারিয়ে যাওয়ার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অস্বীকৃতির সংস্কৃতি। কোনো তথ্য বা প্রমাণই অস্বীকৃতির সংস্কৃতি থেকে সরকারি ব্যক্তিদের মুক্ত করতে পারেননি। যে কোনো ঘটনা ঘটলেই নিজেদের জড়িত থাকার বিষয়টি অস্বীকার করে দোষ চাপিয়ে দেয়া হয় প্রতিপক্ষের ওপর অথবা ভয় দেখানো হয় জঙ্গিবাদী আক্রমণের। জঙ্গি সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ শুরু হয়েছে সরকার ক্ষমতায় আসার পর ২০০৯ সালে সংঘটিত বিডিআর বিদ্রোহের সময় থেকে। এরপর দেশের প্রতিটি ঘটনায় শুরুতেই জঙ্গি সম্পৃক্ততার কথা সদম্ভে ঘোষণা করেছেন সরকারের মন্ত্রীরা। আবার ঘটনার বিবর্তনে সে অবস্থান থেকে সরে আসতেও তাদের খুব একটা বেগ পেতে হয়নি। যেমন বেগ পেতে হয়নি দুর্নীতি দমন কমিশনকে। প্রথমে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে ধোয়া তুলসী পাতার সার্টিফিকেট দিয়ে পরে সে অবস্থান থেকে সরে আসতেও এ প্রতিষ্ঠানটির কোনো সমস্যা হয়নি। একটু খতিয়ে দেখলে বোঝা যাবে, এ প্রতিষ্ঠানটি সরকারের আজ্ঞাবহ প্রতিষ্ঠান হিসেবেই কাজ করছে।
জঙ্গি দমনে বর্তমান সরকারপ্রধান তার সাফল্যের বিষয়টি জোর গলায় আন্তর্জাতিক ফোরামে বলে এসেছেন। এতে মনে হতে পারে, বাংলাদেশ এখন জঙ্গিমুক্ত। তাই যদি হয়, তাহলে কথায় কথায় জঙ্গি-জুজুর ভয় দেখিয়ে লাভ কী? অবশ্য কয়েকদিন আগে বাংলাদেশ-ভারত স্বরাষ্ট্রসচিব পর্যায়ে বৈঠকের পর বাংলাদেশ স্বীকার করে নিয়েছে দেশের ভেতরে ভারতীয় জঙ্গিদের এখনও উপস্থিতির কথা। এ কারণেই বলতে হয়, জঙ্গি দমনের বিষয়টি দেশের বাইরের প্রভুদের খুশি করার জন্য ব্যবহৃত হয়। কেননা আজকের দুনিয়ায় সুশাসন, দুর্নীতি হ্রাস ও জঙ্গি দমন অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আবার জঙ্গি দমনের ব্যাপারে মার্কিনরা যত আগ্রহী, অন্যেরা ততটা নন। ইউরোপীয় প্রভুদের কাছে দুর্নীতি, সুশাসন, মানবাধিকার এসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। পাশের বাড়ির দাদাদের কাছে এগুলো কোনো বিষয় নয়। বড় দেশ হওয়ার কারণে তারা খুব সহজেই অন্য বড়দের মোকাবিলা করতে পারে। অথচ উল্লিখিত অভিযোগগুলো থেকে তারাও মুক্ত নন।
সুশাসনের এমন একটি সংক্ষিপ্ত আলোচনায় বাংলাদেশের অবস্থান কোথায় তা সহজেই অনুমেয়। বর্তমান সরকারের আমলেই দুর্নীতি ও অস্বীকৃতির সংস্কৃতি বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। অস্বীকৃতির সংস্কৃতির কারণেই পদ্মা সেতু নিয়ে তৈরি হয়েছে এত জটিলতা। এ কারণেই কড়া মেজাজে নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণের অহঙ্কার নাকে খত দিয়ে ভুলে যেতে হয়েছে।
এসব ক্ষেত্রে তালিকা অনেক দীর্ঘ। আর প্রতিপক্ষকে দমন করা ও গাল দেয়ার ব্যাপারেও সরকার সিদ্ধহস্ত। এরই সর্বশেষ উদাহরণ রামুর ঘটনা নিয়ে সরকারের প্রধান থেকে শুরু করে বহু কর্তার বহু রকম উপদেশ বাণী। সবশেষে তারা এটাও আবিষ্কার করেছেন, রামুর ঘটনা নিয়ে বিচার দেয়ার জন্য বিরোধীদলীয় নেত্রী চীন সফরে গিয়েছেন। বিচার কে কোথায় দিল তা জানা না গেলেও, সরকারপ্রধান কিছুদিন আগে জাতিসংঘ প্রদত্ত সর্বশেষ ভাষণে বিরোধী দলের বিরুদ্ধে বিচার দিয়েছেন।
সুশাসনের কথা সরকারের বাইরে বহু লোক বিশেষ করে বুদ্ধিজীবী ও নাগরিক সমাজের সদস্যরা জোর গলায় বললেও এর অন্তর্নিহিত সত্যটি জনসমক্ষে আলোচনা করেন না। রাজনৈতিক আনুগত্যের কুণ্ঠা প্রায় প্রত্যেকের মনোজগতে এমনভাবে অবস্থান নিয়েছে যে, সুশাসন প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন সুদূরপরাহত থেকে যাবে। কারণ সরকার প্রতিহিংসার যে পথে হাঁটছেন, তাতে ভবিষ্যতে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধক হবে প্রতিহিংসা।
সুশাসনকে সংজ্ঞায়িত করতে গিয়ে বিভিন্ন ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান নানা তত্ত্ব ও উপকরণ ব্যবহার করেছে। জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থাও এই প্রেসক্রিপশন দাতাদের তালিকার বাইরে নয়। সুশাসনের লোভ দেখানো হচ্ছে কয়েকটি কথা বলে। এর মধ্যে একটি হচ্ছে—এর ফলে জাতীয় উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে, দুর্নীতি হ্রাস পাবে, উন্নয়নের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় জনগণের অংশগ্রহণ আরও বাড়বে। সর্বোপরি সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হলেই একটি দেশ সামনে এগিয়ে যাবে।
সুশাসনের যেসব উপাদান পশ্চিমা বিশ্বে তাত্ত্বিক ভিত্তির ওপরে দাঁড়িয়ে আছে, তথ্যের নিরিখে বিচার করলে দেখা যাবে—এসব উপাদানের অনুপস্থিতি সত্ত্বেও এশিয়ার বিভিন্ন দেশ চমক লাগানো অগ্রগতি অর্জন করেছে। অপরদিকে সুশাসনের প্রবক্তা পশ্চিমা বিশ্বের অনেক দেশেই প্রতিনিয়ত তৈরি হচ্ছে নতুন সঙ্কট এবং প্রচলিত আর্থ-রাজনৈতিক ব্যবস্থা জনগণকে সন্তুষ্ট করতে পারছে না। সুশাসন সত্ত্বেও দুর্নীতির অপবাদ সইতে হচ্ছে ব্রিটেনকে, অর্থনীতি ভেঙে পড়েছে গ্রিসের।
এশিয়ার যে ক’টি দেশ অর্থাত্ চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর বিগত বছরগুলোতে প্রভূত অগ্রগতি সাধন করেছে তাদের ক্ষেত্রে সুশাসনের বর্তমান ধারণাগত অবস্থার কোনো সাযুজ্য নেই। প্রত্যেকেই স্বীকার করবেন এসব দেশে অর্জিত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সময় একদলীয় শাসন ছিল চূড়ান্ত পর্যায়ে, এমনকি দুর্নীতির ঘটনাও ঘটেছে প্রচুর। অবশ্য বহু ক্ষেত্রেই পুঞ্জীভূত দুর্নীতির বহিঃপ্রকাশ ঘটছে সামপ্রতিক সময়ে। মালয়েশিয়ায় দুর্নীতির বিষয়টি অনেকেই জানলেও তা প্রকাশ্যে খুব একটা আলোচিত হয়নি। অপরদিকে বারবার সামরিক শাসন এবং গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ সত্ত্বেও থাইল্যান্ডের অগ্রগতি চোখে পড়ার মতো।
এ রকম অসংখ্য উদাহরণ সত্ত্বেও রাষ্ট্র পরিচালনায় সুশাসনের প্রশ্নটি অবজ্ঞা করার বিষয় নয়। বাংলাদেশে প্রতিটি রাজনৈতিক দল সামপ্রতিক সময়ে প্রকাশ্যে সুশাসনের প্রতি অঙ্গীকারা বদ্ধ থাকলেও বাস্তবে এর প্রয়োগ নেই বললেই চলে। বিশেষ করে বর্তমান সরকারের আমলে সুশাসনের সবক’টি উপাদান ক্রম অপসৃয়মাণ। মোটাদাগে বললে, সুশাসনের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হচ্ছে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ, জাতীয় উন্নয়নে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় জনগণের অংশগ্রহণ, মানবাধিকারের নিশ্চয়তা প্রভৃতি। কিন্তু ২০০৯ সালের জানুয়ারি থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত বিবেচনা করলে দেখা যাবে, বাংলাদেশে উপরিউক্ত উপাদানগুলোর প্রায় সবক’টি অনুপস্থিত অথবা ব্যক্তির ইচ্ছা দিয়ে সরকার পরিচালনা করা হচ্ছে।
একই সঙ্গে বাইরের পৃথিবীতে গিয়ে নিজের আত্মসম্মান খুইয়ে ফেলার ঘটনাও ঘটছে অহরহ। বর্তমান সময়ে ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠনের বিভিন্ন আচরণ যেমন—হল দখল, টেন্ডারবাজি, রাহাজানি, সহপাঠী ছাত্রীর সম্ভ্রমহানি, ক্যাম্পাসে আধিপত্য বিস্তার করার জন্য প্রকাশ্যে পিস্তল উঁচিয়ে এবং দা-কুড়াল দিয়ে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার ঘটনা অহরহ ঘটছে। যেটা আরও বেশি দুঃখজনক তা হচ্ছে, এসব অপকর্মে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা পর্যন্ত জড়িয়ে পড়ছেন। টেলিভিশনের পর্দায় শিক্ষক ছাত্রীকে ঘুষি মারছেন—এমন দৃশ্য দেখার পর সেই শিক্ষকের জন্য লা’নত প্রার্থনা করা ভিন্ন অন্য কোনো গত্যন্তর থাকে না। এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকের বিরুদ্ধে যখন ছাত্রীকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ ওঠে, তখন এক অবিশ্বাস্য ঘৃণায় বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্রদের মাথানত করা ভিন্ন অন্য কোনো পথ থাকে না। এ-সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ক্ষমতাসীন দলের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্তাব্যক্তিদের বর্ণনাতীত বিভিন্ন অপরাধ।
এমন কোনো কর্ম নেই, যার সঙ্গে তারা জড়িত নয়। তারা নিজের দলকে যেমন ক্ষতিগ্রস্ত করেছেন তেমনি প্রশাসন, পুলিশ বিভাগ, বিচার বিভাগ সব কিছুকেই বিপর্যস্ত করে দিয়েছেন। এই সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দুর্নীতির মহোত্সব। অতি সামপ্রতিক হলমার্ক কেলেঙ্কারি থেকে শুরু করে পেছনের দিকে তাকালে অর্থনৈতিক দুর্বৃত্তপনার অসংখ্য নজির উপস্থিত করা যাবে। এমন একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারি। যে কেলেঙ্কারির মাধ্যমে প্রায় ৩৫ লাখ সাধারণ মানুষের পকেট কেটে হাজার হাজার কোটি টাকা দেশের বাইরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এমনকি কালো বিড়াল নামে খ্যাত মন্ত্রীও দুর্নীতির দায় এড়াতে পারছেন না—যিনি অহংকার করতেন তার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের। অপরদিকে রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল বিদ্যুেকন্দ্র থেকে অবৈধভাবে অর্জিত অর্থ বৈধ করার জন্য ব্যবস্থা করা হয়েছে দায়মুক্তির। এসব বিষয়ে কোনো কোনো ক্ষেত্রে সরকারের উদাসীনতা এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে ষড়যন্ত্র মানুষকে ব্যথিত করলেও নির্যাতনের ভয়ে অনেকেই মুখ খুলতে পারেন না।
মানবাধিকার লঙ্ঘনের অসংখ্য উদাহরণ এর মধ্যে তৈরি হয়েছে। সবচেয়ে বেশি সঙ্কটজনক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বিনা বিচারে হত্যা, গুম ও খুনের কারণে। সরকারের উদাসীনতা যে কোন পর্যায়ে গেছে, তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে বিরোধী নেতা চৌধুরী আলম ও ইলিয়াস আলীসহ বিভিন্ন ব্যক্তির গুম হয়ে যাওয়ার ঘটনায়। বিনা বিচারে এবং বন্দি অবস্থায় মেরে ফেলার প্রশ্নে বাংলাদেশ সরকার একসময় জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে কড়ার করেছিল। কিন্তু সেটা ভুলতে খুব বেশি দিন লাগেনি। আর মিডিয়ার বিরুদ্ধে আক্রমণের কথা উল্লেখ না করাই বাঞ্ছনীয়।
সরকার অনির্বাচিত ব্যক্তিদের দিয়ে জাতীয় নির্বাচন না করতে ধনুক ভাঙার পণ করলেও রাষ্ট্রের ও জনগণের বহু প্রতিষ্ঠানকে পরিচালনা করছে অনির্বাচিত ব্যক্তিদের দিয়ে। শাসনতান্ত্রিক ও আইনগত বাধ্যবাধকতা থাকলেও সরকারের সে বিষয়ে কোনো উদ্বেগ নেই। কারণ এসব অনির্বাচিত ব্যক্তিকে ক্ষমতা দিয়ে বসিয়ে রাখলে সেটা সরকারের জন্য সহায়ক হয় এবং সরকার নিশ্চিত নয় নির্বাচন হলে সরকারের অনুগতরা নির্বাচিত হতে পারবেন কি না। তাই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে জেলা পরিষদ, ঢাকা সিটি করপোরেশনসহ সবকিছুই চলছে আজ্ঞাবহ অনির্বাচিত ব্যক্তিদের দিয়ে।
সুশাসনের ক্ষেত্রে আরেকটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রশাসন ও বিচার বিভাগের রাজনীতিকীকরণ এবং ন্যায়বিচার পরিপন্থী কর্মকাণ্ড। প্রবীণ রাজনীতিবিদ প্রেসিডেন্ট যখন খুনের আসামিকে মাফ করে দেন; তখন অবাক হওয়া ছাড়া গত্যন্তর থাকে না। একইভাবে কয়েকশ’ সরকারি কর্মকর্তাকে অনুমানের ভিত্তিতে ওএসডি বানিয়ে রাখাটাও গ্রহণযোগ্য ব্যবস্থা হতে পারে না। সরকার ও সরকার প্রধান যে এ বিষয়গুলো জানেন না, এমন নয়। এ কারণেই গত কিছুদিন ধরে তাদের বক্তৃতা থেকে সুশাসনের প্রশ্নটি হারিয়ে গেছে।
এই হারিয়ে যাওয়ার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অস্বীকৃতির সংস্কৃতি। কোনো তথ্য বা প্রমাণই অস্বীকৃতির সংস্কৃতি থেকে সরকারি ব্যক্তিদের মুক্ত করতে পারেননি। যে কোনো ঘটনা ঘটলেই নিজেদের জড়িত থাকার বিষয়টি অস্বীকার করে দোষ চাপিয়ে দেয়া হয় প্রতিপক্ষের ওপর অথবা ভয় দেখানো হয় জঙ্গিবাদী আক্রমণের। জঙ্গি সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ শুরু হয়েছে সরকার ক্ষমতায় আসার পর ২০০৯ সালে সংঘটিত বিডিআর বিদ্রোহের সময় থেকে। এরপর দেশের প্রতিটি ঘটনায় শুরুতেই জঙ্গি সম্পৃক্ততার কথা সদম্ভে ঘোষণা করেছেন সরকারের মন্ত্রীরা। আবার ঘটনার বিবর্তনে সে অবস্থান থেকে সরে আসতেও তাদের খুব একটা বেগ পেতে হয়নি। যেমন বেগ পেতে হয়নি দুর্নীতি দমন কমিশনকে। প্রথমে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে ধোয়া তুলসী পাতার সার্টিফিকেট দিয়ে পরে সে অবস্থান থেকে সরে আসতেও এ প্রতিষ্ঠানটির কোনো সমস্যা হয়নি। একটু খতিয়ে দেখলে বোঝা যাবে, এ প্রতিষ্ঠানটি সরকারের আজ্ঞাবহ প্রতিষ্ঠান হিসেবেই কাজ করছে।
জঙ্গি দমনে বর্তমান সরকারপ্রধান তার সাফল্যের বিষয়টি জোর গলায় আন্তর্জাতিক ফোরামে বলে এসেছেন। এতে মনে হতে পারে, বাংলাদেশ এখন জঙ্গিমুক্ত। তাই যদি হয়, তাহলে কথায় কথায় জঙ্গি-জুজুর ভয় দেখিয়ে লাভ কী? অবশ্য কয়েকদিন আগে বাংলাদেশ-ভারত স্বরাষ্ট্রসচিব পর্যায়ে বৈঠকের পর বাংলাদেশ স্বীকার করে নিয়েছে দেশের ভেতরে ভারতীয় জঙ্গিদের এখনও উপস্থিতির কথা। এ কারণেই বলতে হয়, জঙ্গি দমনের বিষয়টি দেশের বাইরের প্রভুদের খুশি করার জন্য ব্যবহৃত হয়। কেননা আজকের দুনিয়ায় সুশাসন, দুর্নীতি হ্রাস ও জঙ্গি দমন অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আবার জঙ্গি দমনের ব্যাপারে মার্কিনরা যত আগ্রহী, অন্যেরা ততটা নন। ইউরোপীয় প্রভুদের কাছে দুর্নীতি, সুশাসন, মানবাধিকার এসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। পাশের বাড়ির দাদাদের কাছে এগুলো কোনো বিষয় নয়। বড় দেশ হওয়ার কারণে তারা খুব সহজেই অন্য বড়দের মোকাবিলা করতে পারে। অথচ উল্লিখিত অভিযোগগুলো থেকে তারাও মুক্ত নন।
সুশাসনের এমন একটি সংক্ষিপ্ত আলোচনায় বাংলাদেশের অবস্থান কোথায় তা সহজেই অনুমেয়। বর্তমান সরকারের আমলেই দুর্নীতি ও অস্বীকৃতির সংস্কৃতি বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। অস্বীকৃতির সংস্কৃতির কারণেই পদ্মা সেতু নিয়ে তৈরি হয়েছে এত জটিলতা। এ কারণেই কড়া মেজাজে নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণের অহঙ্কার নাকে খত দিয়ে ভুলে যেতে হয়েছে।
এসব ক্ষেত্রে তালিকা অনেক দীর্ঘ। আর প্রতিপক্ষকে দমন করা ও গাল দেয়ার ব্যাপারেও সরকার সিদ্ধহস্ত। এরই সর্বশেষ উদাহরণ রামুর ঘটনা নিয়ে সরকারের প্রধান থেকে শুরু করে বহু কর্তার বহু রকম উপদেশ বাণী। সবশেষে তারা এটাও আবিষ্কার করেছেন, রামুর ঘটনা নিয়ে বিচার দেয়ার জন্য বিরোধীদলীয় নেত্রী চীন সফরে গিয়েছেন। বিচার কে কোথায় দিল তা জানা না গেলেও, সরকারপ্রধান কিছুদিন আগে জাতিসংঘ প্রদত্ত সর্বশেষ ভাষণে বিরোধী দলের বিরুদ্ধে বিচার দিয়েছেন।
সুশাসনের কথা সরকারের বাইরে বহু লোক বিশেষ করে বুদ্ধিজীবী ও নাগরিক সমাজের সদস্যরা জোর গলায় বললেও এর অন্তর্নিহিত সত্যটি জনসমক্ষে আলোচনা করেন না। রাজনৈতিক আনুগত্যের কুণ্ঠা প্রায় প্রত্যেকের মনোজগতে এমনভাবে অবস্থান নিয়েছে যে, সুশাসন প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন সুদূরপরাহত থেকে যাবে। কারণ সরকার প্রতিহিংসার যে পথে হাঁটছেন, তাতে ভবিষ্যতে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধক হবে প্রতিহিংসা।
অনলাইন পত্রিকার বিকল্প শুধুই অনলাইন পত্রিকা
নাজমুল আশরাফ
2012-09-07
বিশ্বজুড়েই বাড়ছে অনলাইন সংবাদের পাঠক। আর কমছে কাগজের পত্রিকার গ্রাহক।
খবরের ডিজিটালগ্রাহক বাড়ছে বিশ্বের নানান দেশে। উন্নত বিশ্বে বাড়ার এ হার
সবচেয়ে বেশি স্মার্টফোন এবং ট্যাবলেট ও ল্যাপটপ কম্পিউটারের মত ভ্রাম্যমান
যন্ত্র (মোবাইল ডিভাইস) ব্যবহারকারীদের মধ্যে। যন্ত্রের ধরনটা যাই হোক,
সেটার উল্লেখযোগ্য ব্যবহার হয়ে থাকে খবর জানার কাজে। যুক্তরাষ্ট্রে
স্মার্টফোন মালিকদের ৫১ শতাংশ এবং ট্যাবলেট মালিকদের ৫৬ শতাংশই অনলাইনে খবর
জেনে থাকেন। দেশটির প্রায় এক-চতুর্থাংশ (২৩ শতাংশ) মানুষই এখন খবরের
ডিজিটাল গ্রাহক। তারা ডেস্কটপ, ল্যাপটপ, ট্যাবলেট বা স্মার্টফোনের মত
একাধিক ডিজিটাল যন্ত্র ব্যবহার করেন। তাদের আবার ২৭ শতাংশ খবর জানার জন্য
শুধুই মোবাইল ডিভাইস (স্মার্টফোন, ট্যাবলেট ও ল্যাপটপ) ব্যবহার করে থাকেন।
এই চর্চা গত দুই বছর ধরে টানা বেড়েই চলেছে। ২০১১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ
২৫টি অনলাইন সংবাদমাধ্যমের গ্রাহক বেড়েছে ১৭ শতাংশ। গ্রাহক বাড়ার এ হার
আগের বছরেও একই রকম ছিল। মোবাইল ডিভাইসের মাধ্যমে যারা খবর জেনে থাকেন তারা
খবরের নতুন গ্রাহক; অন্য কোন ধরণের সংবাদমাধ্যম ছেড়ে আসা নয়। অর্থাৎ
ডিজিটাল গ্রাহকদের তালিকায় তারা নতুন করে যুক্ত হচ্ছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের চিত্রটি এমন হওয়ার কারণ দেশটি এখন পুরোপুরি ডিজিটাল যুগে
আছে। প্রাপ্তবয়ষ্ক মার্কিন নাগরিকদের চারভাগের তিনভাগেরই ল্যাপটপ বা
ডেস্কটপ কম্পিউটার আছে। এছাড়া, ৪৪ শতাংশ নাগরিকের একটি করে স্মার্টফোন এবং
১৮ শতাংশের একটি করে ট্যাবলেট কম্পিউটার আছে। এসব ডিজিটাল যন্ত্রের
উল্লেখযোগ্য ব্যবহার হয়ে থাকে খবর জানার কাজে। বড় পত্রিকাগুলোর ওয়েবসাইটে
তারা ৯ শতাংশ করে যুক্ত হচ্ছেন। প্রযুক্তির সম্প্রসারনের ফলেই তারা এখন
খবরের ডিজিটাল গ্রাহক হবার সুযোগ পাচ্ছেন। যুক্তরাষ্ট্রে ডিজিটাল যুগের
প্রথম প্রজন্মের যেসব মানুষ (যারা মুলত গ্রামে থাকেন) ডেস্কটপ কম্পিউটারের
সুযোগ পাননি, মোবাইল ডিভাইসের সুবাদে তারা এখন সরাসরি ডিজিটাল যুগের সুবিধা
পাচ্ছেন।
অনলাইন সংবাদমাধ্যমে যখন সুদিনের হাওয়া বইছে, তখন দুর্দিন ভর করছে কাগজের
পত্রিকার ওপর। ডিজিটাল সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কোনমতেই পেরে ওঠছে না এই সনাতনী
সংবাদমাধ্যমটি। অনলাইন পত্রিকার পাশাপাশি কম করে হলেও বাড়ছে রেডিও-টিভির
মত সম্প্রচারমাধ্যমের সংবাদগ্রাহক। আর দিন দিন কমছে ছাপানো পত্রিকার পাঠক।
যুক্তরাষ্ট্রে গত বছর (এপ্রিল-সেপ্টেম্বর ২০১১) এক জরিপে দেখা গেছে,
কর্মদিবসগুলোতে পত্রিকার প্রচারসংখ্যা কমেছে চার শতাংশ, আর ছুটির দিনে
(রোববার) এক শতাংশ। কমার গড় হার পাঁচ শতাংশ। ২০১০ সালেও এই হার একই রকম
ছিল। তবে সুখের কথা হল, কাগজের পত্রিকার অনলাইন সংস্করণের পাঠক বাড়ছে। একই
পত্রিকার কাগুজে সংস্করণের চেয়ে এর অনলাইন বা ডিজিটাল সংস্করণ অনেক বেশি
জনপ্রিয় হচ্ছে।
এমন বাস্তবতায় নিজেদের টিকিয়ে রাখার জন্য বেশিরভাগ কাগজে ছাপা পত্রিকাই
তাদের ডিজিটাল বা অনলাইন গ্রাহক তৈরির চেষ্টা করছে। যুক্তরাষ্ট্রের ১৫০টি
পত্রিকা এরিমধ্যে তাদের অনলাইন সংস্করণ চালু করেছে। চলতি বছরেই আরো ১০০টির
মতো সংবাদপত্র অনলাইনে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে। নিউ ইয়র্ক টাইমস্-এর
সাফল্যে অনুপ্রাণিত হয়েই এতোসব পত্রিকা অনলাইনে আসছে। এই পত্রিকাটির শুধু
অনলাইন গ্রাহক প্রায় চার লাখ (৩,৯০,০০০)। গ্রাহক হারানোর পাশাপাশি কাগজের
পত্রিকাগুলোর বিজ্ঞাপন থেকে আয়ও প্রতিনিয়ত কমছে। গত ছয় বছরে মার্কিন
পত্রিকাগুলোর বিজ্ঞাপনের আয় অর্ধেকেরও বেশি কমে গেছে। অন্যদিকে বাড়ছে
অনলাইন বিজ্ঞাপন। ২০১১ সালে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদ ওয়েবসাইটগুলোর
বিজ্ঞাপণ থেকে আয় বেড়েছে ২৩ শতাংশ। একই সময়ে সংবাদপত্রশিল্পে বিজ্ঞাপনের আয়
৭.৬ শতাংশ কমেছে। সংবাদপত্রের অনলাইন সংস্করণ থেকে বিজ্ঞাপনবাবদ আয় বাড়তে
থাকলেও, এখন পর্যন্ত তা ক্ষতির তুলনায় দশভাগের একভাগ। ঠিক মত ডিজিটাল
গ্রাহক ধরতে না পারলে অনেক পত্রিকার পক্ষে টিকে থাকাই সম্ভব হবে না।
যুক্তরাষ্ট্রে বছরে গড়ে ১৫টি করে পত্রিকা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, যা দেশটির গোটা
সংবাদপত্র শিল্পের এক শতাংশ। এ অবস্থা চলছে গত পাঁচ বছর ধরে। এই শিল্পের
শীর্ষ কর্তাদের অনেকেরই ধারণা, আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে অনেক পত্রিকাই কেবল
ছুটিরদিনে (রোববার) ছাপা হবে বাড়ি বাড়ি বিলি করার জন্য। আর কর্মদিবসগুলোতে
শুধু অনলাইনে থাকবে। বিজ্ঞাপন ছাপিয়ে আয় করার জন্য ছুটির দিন ছাড়াও
দু-একদিন পত্রিকা ছাপা হতে পারে বলে তাদের ধারণা।
আসলে ডিজিটাল যুগে অনলাইন সংবাদমাধ্যমের কোন প্রতিদ্বন্দ্বী নেই। অন্য কোন
মাধ্যমই সার্বক্ষনিক খবর দেয়ার ক্ষমতা রাখে না। আর কোন মাধ্যমই যখন-তখন
সংবাদের চাহিদা মেটাতে পারে না, প্রতিমূহুর্তের হালনাগাদ খবরও দিতে পারে
না। যে কোন সময়, যে কোন জায়গায়, যে কোন অবস্থায় খবর জানার জন্য অনলাইনের
কোনও বিকল্প নেই, যদি মোবাইল ডিভাইস (ল্যাপটপ-ট্যাবলেট-সেলফোন ইত্যাদি)
হাতে থাকে। তথ্যপ্রযুক্তির পথে দেশ যত এগিয়ে যাবে, মানুষ যত বেশি
প্রযুক্তিবান্ধব হবে, অনলাইন সংবাদপত্রের পাঠক ততই বাড়বে।
কাগজের পত্রিকা মানুষের খবরের চাহিদা পূরণ করে দিনে বা ২৪ ঘণ্টায় মাত্র
একবার। অথচ অনলাইন পত্রিকা তা করতে পারছে প্রতি মূহুর্তেই। অর্থাৎ যখনই
ঘটনা তখনই খবর। কাগজের পত্রিকার পক্ষে ব্রেকিং নিউজ দেয়ার কোনও সুযোগ নেই।
এক্ষেত্রে অনলাইন পত্রিকার একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী রেডিও-টিভির মত
সম্প্রচারমাধ্যম। এখানেও অনলাইন সংবাদপত্র একটু এগিয়ে। কারণ, রেডিও-টিভিতে
ব্রেকিং নিউজটি কখন সম্প্রচার হবে, সেটা জানার সুযোগ থাকে না। কিন্তু
অনলাইনে যে কোন সময়ই সেটা পড়া সম্ভব। টেলিভিশনের টিকার বা স্ক্রলে ব্রেকিং
নিউজ জানা গেলেও তা খুবই সংক্ষিপ্ত আকারে। এখানেও অনলাইন পত্রিকার বাড়তি
সুবিধা হচ্ছে, প্রতিনিয়ত ব্রেকিং নিউজে নতুন নতুন তথ্য যোগ করে সেটাকে
পূর্ণাঙ্গ খবরে পরিণত করা।
সংবাদভিত্তিক রেডিও-টিভি সাধারণত প্রতিঘণ্টায় খবর দেয়। সেটা জানতে
নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। রেডিও সেট বহনযোগ্য হলেও টিভি
সেটের জন্য নির্দিষ্ট জায়গায় থাকতে হয়। এছাড়া, শোনার হোক বা দেখার হোক,
সম্প্রচারমাধ্যমের বার্তা ইচ্ছা মত বার বার দেখা বা শোনার সুযোগ নেই।
টেলিভিশনের টিকার একেতো খুবই সংক্ষিপ্ত, তারওপর তা বার বার পড়ার জন্য অনেক
সময়ের দরকার হয়। অনলাইন সংবাদের আরো একটা বাড়তি সুবিধা আছে। এতে সংশ্লিষ্ট
খবরগুলো (নতুন ও পুরনো) একসাথে থাকে। এছাড়াও থাকে পুরনো সব খবরের আর্কাইভ।
যা পাঠকের সব ধরণের চাহিদা পূরণ করে। খবরের ফলাবর্তন (ফীডব্যাক) বা
গ্রাহকের প্রতিক্রিয়া এতো তাড়াতাড়ি জানা অন্য কোন সংবাদমাধ্যমের পক্ষেই
সম্ভব না। এক কথায়, অনলাইন পত্রিকার বিকল্প কেবল অনলাইন পত্রিকাই।
তথ্যসূত্র: যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম পরিস্থিতি নিয়ে ‘প্রজেক্ট ফর এক্সেলেন্স ইন জার্নালিজম’ এর ২০১২ সালের প্রতিবেদন।
লেখক : সাংবাদিক ও কলামিষ্ট
nazmul.ashraf@gmail.com
-------------------------------------------------------------------------------
রাজনীতিবিদরা ক্ষমতাকে লাভজনক প্রতিষ্ঠান হিসেবে ব্যবহার করে : ড. ইফতেখারুজ্জামান
খাজা মাঈনুদ্দিন ও আলী আসিফ শাওন, প্রাইমখবর
2012-10-19
ঢাকা : টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান মনে করেন বাংলাদেশের
রাজনীতিবিদরা ক্ষমতাকে লাভজনক প্রতিষ্ঠান হিসেবে ব্যবহার করেন। এর ফলে
বিরোধী দলে তারা দুর্নীতিবিরোধী অবস্থানে থাকলেও সরকারি দলে এসে দুর্নীতির
পক্ষেই অবস্থান নেন। রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনে জনগণের রায়কে দুর্নীতি করার
সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। রাজধানীর বনানীতে
টিআইবির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে প্রাইমখবরকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন
তিনি।
বাংলাদেশে সাধারণত চিহ্নিত দুর্নীতিবাজদের উপযুক্ত শাস্তি হয় না বলেই
বিভিন্ন সরকারি এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বপ্রাপ্ত ক্ষমতাসীনরা
দুর্নীতিকেই স্বাভাবিক বিষয় মনে করেন। একই কারণে অনেকেরই দুর্নীতি রীতিমতো
অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। তাই হরহামেশাই রাষ্ট্রের সব ক্ষেত্রে দুর্নীতিই
নীতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, বললেন ড. ইফতেখারুজ্জামানান।
তার ভাষায়; দুর্নীতির রাজনৈতিক অর্থনীতির কারণে এ দুষ্টুচক্র এখনো টিকে
আছে। এ ক্ষেত্রে তিনি মনে করেন, মূলত তিনটি কারণে বাংলাদেশে ক্রমান্বয়ে
বছরের পর বছর দুর্নীতির অভ্যাস গড়ে উঠেছে। প্রথমত, জাতীয় সংসদের সদস্যদের
বেশিরভাগেরই পেশা ব্যবসা। এই রাজনীতিবিদ ব্যবসায়ীরা তাদের ব্যবসায় মুনাফার
জন্য রাজনৈতিক শক্তিকে খেয়ালখুশি মতো ব্যবহার করেন। এছাড়াও জনগণের রায়ের
প্রতি আস্থাশীল না হওয়াতে দুর্নীতি দমনের অঙ্গিকার নির্বাচনী ইশতেহারে
উল্লেখ করলেও ক্ষমতায় আসার পর তার বিপরীতে গিয়ে বরং দুর্নীতিতেই মগ্ন থাকেন
রাজনৈতিক দলের নেতারা। বিরোধী এবং সরকারি উভয় দলের এই একটি দিকেই মিল
রয়েছে বলেও জানালেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক। যে কারণে টিআইবি প্রকাশিত
গবেষণা প্রতিবেদনের ফল নিয়ে বরাবর একই মন্তব্য করে সরকারি ও বিরোধী দল।
তিনি বলেন, যে দল ক্ষমতায় থাকে তারা বলেন-টিআইবির প্রতিবেদন গ্রহণযোগ্য
নয়; অন্যদিকে বিরোধী দল এটাকে কাজে লাগিয়ে বলেন, আমরা আগেই বলেছিলাম সরকারি
দলের লোকজন কীভাবে দুর্নীতি করছেন। অথচ মাত্র ৫ বছরের ব্যবধানেই অবস্থান
পাল্টে যায় সরকারি ও বিরোধী দলের। এ কারণে ড. ইফতেখারুজ্জামান মনে করেন,
টিআইবির কর্মকা- গতিশীল এবং নিরপেক্ষ।
প্রশাসনিক দলীয়করণও দুর্নীতির আরেকটি বড়ো কারণ বলে উল্লেখ করলেন ড.
ইফতেখারুজ্জামান। বিভিন্ন মন্ত্রণালয় থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়, ব্যাংক,
স্বায়ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠান সবখানে দলীয় লোক নিয়োগের ফলে দুর্নীতি বাড়ছে বৈ
কমছে না।
সাম্প্রতিক সময়ে বিরোধীদলীয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া দুদককে চোখরাঙানি
দিয়ে যে বক্তব্য দিয়েছেন এ প্রসঙ্গে ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, এই বক্তব্যের
মধ্য দিয়ে আসলে তার মানসিক গঠনের পরিচয় পাওয়া যায়। তিনি দুদককে দেখে নেবেন
বলে হুশিয়ারি দিয়েছেন, এর মাধ্যমে তিনি দুদককে নিয়ন্ত্রণ করার কথাই
বলেছেন।
টিআইবির এই কর্মকর্তা বলেন, এখনো পর্যন্ত দুদকের মতো প্রতিষ্ঠান
স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে না। প্রতিষ্ঠানটি সবসময় রাজনৈতিক চাপে থাকে।
সরকারি দলের লোকদের নিরবচ্ছিন্ন চাপে থাকেন দুদকের শীর্ষ ব্যক্তিরা।
দুর্নীতি দমন ব্যুরো ভেঙে দুদক গঠনের ফলে আগের কর্মকর্তারাই এখনো দুদকে
রয়েছেন। এর ফলে দুদকের মধ্যেও কিছু দক্ষ লোকবলের ঘাটতি লক্ষ্যণীয়। অবশ্য এর
জন্য দুদকের কর্তাব্যক্তিরাও কিছুটা দায়ী বলে মনে করেন তিনি। কারণ
আত্মমর্যাদাশীল না হওয়ায় রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের এসব কর্মকর্তারা বেশিরভাগ
সময়ই রাজনৈতিক ক্ষমতার ভয়ে থাকেন।
আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে প্রাধান্য
পেয়েছিল দুদককে শক্তিশালী এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা। কিন্তু সরকারের শেষ
সময়ে এসে গণমাধ্যমে বিভিন্ন দুর্নীতির খবর এবং একের পর এক শেয়ার বাজার,
হলমার্ক, পদ্মা সেতু, সুরঞ্জিতের এপিএসসহ বিভিন্ন কেলেঙ্কারির সংখ্যা এতো
বেড়ে যায় যে, টিআইবি মনে করে এমপিদের নিয়ে গবেষণা করা প্রয়োজন। মূলত সে
কারণেই এমপিদের সাড়ে তিন বছরের কর্মকা- নিয়ে টিআইবির এবারের গবেষণা
প্রতিবেদন। গবেষণায় দেখা গেছে, ৯৭ শতাংশ এমপি নেতিবাচক কর্মকা-ের সঙ্গে
জড়িত। সরকারদলীয় রাজনৈতিক নেতারা টিআইবির এই বক্তব্য প্রত্যাখান করলেও
টিআইবির এই কর্মকর্তা বলেন, গবেষণার সব পদ্ধতি মেনেই টিআইবি প্রতিবেদন
প্রকাশ করে।
তবে পদ্মা সেতুর দুর্নীতির বিষয়টি এখনো অমীমাংসিত। সরকারি দল এবং দুদক
উভয়েরই সুযোগ রয়েছে বিষয়টিকে কাজে লাগানোর। কারণ পদ্মা সেতু প্রকল্পে
দুর্নীতির তদন্ত করছে কানাডার তদন্ত কমিশন। তাদের প্রতিবেদনের ওপর নির্ভর
করছে সরকার এবং দুদকের ভাবমূর্তি, উল্লেখ করলেন তিনি।
টিআইবির এই প্রতিবেদনের প্রতিক্রিয়ায় আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক
মাহবুব উল আলম হানিফ বলেছিলেন, অনির্বাচিতদের ক্ষমতায় আনার উদ্দেশেই
টিআইবির এই গবেষণা।
এ প্রসঙ্গে ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, আমরা চাই জবাবদিহিমূলক গণতন্ত্র।
সংসদীয় গণতন্ত্রে জবাবদিহিতা থাকলে গণতান্ত্রিক শক্তি আরো শক্তিশালী হয়।
বিভিন্ন সময় রাজনীতিবিদদের নিয়ে এ ধরনের গবেষণা করে চাপের মুখে থাকেন কিনা
জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটা আসলে আমার পেশার বিড়ম্বনা। আমাদের পেশাটাই
ঝুঁকিপূর্ণ। তবে সমালোচকদের বন্ধু হিসেবেই দেখেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক।
(এএএস/এএইচ/এইচএসএম/কেএম/ অক্টোবর ১৯, ২০১২)
-------------------------------------------------------------------------------------------------------------------
Thursday, 18 October 2012 10:47:41 AM
কিছু প্রতিক্রিয়ার জবাব
এ প্রশ্নগুলো টিআইবির প্রতিবেদন প্রকাশের পর থেকেই আসা শুরু হয়েছে—বিশেষত,
সরকারদলীয় সাংসদদের কাছ থেকেই। সংসদ সদস্যের বাইরে আওয়ামী লীগের মুখপাত্রও
প্রতিবেদনের কড়া সমালোচনা করেছেন। তিনি এ কথাও বলেছেন যে, টিআইবি এই
প্রতিবেদনের মাধ্যমে অনির্বাচিত সরকার ডেকে আনার চক্রান্ত করছে।
অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনকভাবে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীও বুধবারের এক সভায় একই কথা
বলেছেন যে, এই প্রতিবেদন উদ্দেশ্যমূলক এবং অনির্বাচিত ব্যক্তিদের ক্ষমতায়
বসানোর ষড়যন্ত্রের একটি অংশ। একটি গণতান্ত্রিক দেশের প্রধান নির্বাহী যখন
কোনো মন্তব্য করেন, সেটির ওপর আর কথা থাকে না। তবুও গণতান্ত্রিক অধিকারবলে
বারবার অযৌক্তিকভাবে অঙ্গুলি নির্দেশিত হয়েই আজকে কলম ধরা।
টিআইবি যে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করেছে, যাঁরা এ বিষয়ে বিষোদগার করে যাচ্ছেন,
তাঁরা কি সেটা সম্পূর্ণ পড়েছেন? এর আগেও টিআইবির কিছু কিছু প্রতিবেদন নিয়ে
যাঁদের প্রসঙ্গে কথা উঠেছে তাঁরা ক্ষুব্ধ ও ক্রুদ্ধ মন্তব্য করেছেন।
টিআইবির বিরুদ্ধে মামলা পর্যন্ত করা হয়েছে। কিন্তু একটা পর্যায়ে এসে যাঁরা
মন্তব্য করেছেন, তাঁরাও বলেছেন যে সম্পূর্ণ প্রতিবেদন না পড়েই তাঁরা
গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরের ওপর ভিত্তি করে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন।
উল্লেখ করা যেতে পারে, যখন একই ব্যক্তি বা দল ক্ষমতায় থাকে, তাদের যে
প্রতিক্রিয়া টিআইবি পায়, তারা যখন ক্ষমতার বাইরে থাকে, তখন ঠিক তার বিপরীতে
প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে। সব সময় একই ঘটনা ঘটেছে। ঠিক যেমন বর্তমান বিরোধী
দল এই প্রতিবেদনকে তাদের কথার প্রতিফলন বলে দাবি করছে। বর্তমান সরকারেরই
মন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত সম্প্রতি এক জনসভায় বলেছিলেন, টিআইবি সব সময়ই
প্রতিবেদন দেয়, আমরা সরকারে থাকলে বলি নাউজুবিল্লাহ আর বিরোধী দলে থাকলে
বলি আলহামদুলিল্লাহ।
প্রতিবেদনে টিআইবি স্পষ্ট করে বলেছে একটি আধুনিক গণতান্ত্রিকব্যবস্থায় সংসদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সে ভূমিকা হবে দলের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিকেন্দ্রিক। গণতন্ত্রে সংসদ সদস্যদের সঙ্গে সঙ্গে একই মাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে, সংসদের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করা। সেটার জন্য সময় সময় সব গণতান্ত্রিক দেশেই সংসদ সদস্যদের ভূমিকা নিয়ে আলাপ-আলোচনা, পর্যবেক্ষণ, বিশ্লেষণ ও প্রতিবেদন প্রকাশের মতো কর্মকাণ্ড স্বাভাবিক বিষয় বলেই ধরে নেওয়া হয়। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল শুধু বাংলাদেশে কাজ করে না, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এর অধ্যায় রয়েছে এবং সব দেশেই এ ধরনের কাজ তাদের নিয়মিত কর্মসূচি, কিংবা বলা চলে দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে।
মহান মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনা মানুষের কার্যকর ক্ষমতায়ন আর জবাবদিহিমূলক গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা। টিআইবি সেই রীতি অনুযায়ীই বাংলাদেশে কাজটি করে থাকে। টিআইবির মূল দায়িত্ব যেহেতু গণতন্ত্রকে জবাবদিহি ও দুর্নীতিমুক্ত করে একটি শক্তিশালী রূপ দেওয়ার চেষ্টা করা, তাই স্বাভাবিকভাবেই বিভিন্ন সূত্রে প্রাপ্ত দুর্নীতিসংক্রান্ত খবরাখবর, তথ্য ও অভিযোগ নিয়ে টিআইবি কাজ করার তাগিদ অনুভব করে এবং তারই অংশ হিসেবে এই প্রতিবেদনগুলো প্রকাশ করে।
সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে টিআইবি উল্লেখ করেছে, জানুয়ারি ২০০৯ থেকে সেপ্টেম্বর
২০১২ পর্যন্ত যেসব সংসদ সদস্যের নানা আইনবহির্ভূত কর্মকাণ্ড ও অনিয়ম
প্রকাশিত হয়েছে তাদের সংখ্যা ১৮১ জন। সংবাদপত্রে প্রকাশিত এসব তথ্য যা
সংশ্লিষ্ট সদস্যরা খণ্ডন করেননি বা করতে পারেননি। টিআইবি লক্ষ করেছে যে,
সংবাদমাধ্যমে সংসদ সদস্য সম্পর্কে উল্লেখযোগ্য কোনো ইতিবাচক কার্যক্রমের
তথ্য আসেনি। এ পরিপ্রেক্ষিতে টিআইবি জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত
গবেষণা পদ্ধতিতে তথ্যানুসন্ধাননির্ভর এ গবেষণাটি করে। মাঠপর্যায়ে ৪৪টি
অঞ্চলে বিভিন্ন পেশা ও শ্রেণীর সচেতন মানুষের অংশগ্রহণে দলীয় আলোচনার
মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। যাঁদের সঙ্গে কথা বলা হয়েছে, তাঁদের প্রত্যক্ষ
ও পরোক্ষ অভিজ্ঞতা হিসেবে বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। আবারও উল্লেখ করা যেতে
পারে, গবেষণার গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করতে শুধু যে ১৪৯ জন্য সদস্য সম্পর্কে
উত্তরদাতা বা আলোচকেরা তথ্য জানেন, তাঁদের সম্পর্কেই তথ্য সংগ্রহ করা
হয়েছে। মোট ৬০০ জন এসব দলগত আলোচনায় অংশ নিয়েছেন। যাঁরা ১৬ কোটি মানুষের
দেশে ৬০০ সংখ্যাটি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন, তাঁদের সবিনয়ে বিশ্বব্যাপী এ ধরনের
গবেষণা বা জরিপের নমুনা বা উত্তরদাতার সংখ্যা কেমন হয়, তা জেনে নেওয়ার
অনুরোধ করি।
আগেই বলা হয়েছে, আলোচকেরা, নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের নির্বাচনী ওয়াদার আলোকে তাঁদের বর্তমান কর্মকাণ্ড পর্যালোচনা করেছেন এবং মন্তব্য দিয়েছেন। আলোচকেরা অবশ্যই সংসদ সদস্যদের ইতিবাচক কর্মকাণ্ডের কথা বলেছেন, হিসাব অনুযায়ী যাঁদের সংখ্যা দাঁড়ায় ৫৩.৭%। আলোচিত সংসদ সদস্যদের মধ্যে আছেন আটজন নারী সংসদ সদস্যের ছয়জন, ২৭ জন মন্ত্রীর মধ্যে ১৯ জন এবং ১৩ জন বিরোধী দলের সংসদ সদস্যের মধ্যে পাঁচজন। (ইতিবাচক কার্যক্রম বিস্তারিত দেখুন, টিআইবির প্রতিবেদন, ওয়েবসাইটে প্রকাশিত)।
অন্যদিকে জরিপের জন্য নির্বাচিত সাংসদদের মধ্যে যাঁরা নেতিবাচক কর্মকাণ্ডে
জড়িত, তাঁরা মোট ১৪৯ জন সাংসদের ৯৭%। তাঁরা হলেন আটজন নারী সদস্যের মধ্যে
সাতজন, ২৭ জন মন্ত্রী/প্রতিমন্ত্রী সবাই এবং ১৩ জন বিরোধীদলীয় সদস্যের ১২
জন। এখানেই স্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে যে, গবেষণাটি ‘সরকারকে’ হেয় করার উদ্দেশ্যে
করা হয়নি, বরঞ্চ আমাদের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা যে অঙ্গীকার বা শপথনামা
স্পর্শ করে আমাদের কিছু কথা দিয়েছিলেন তা রাখছেন কি না, সেই উদ্দেশ্যেই
উদ্বুদ্ধ, যা গণতন্ত্রের একটি অবশ্য পালনীয় শর্ত। প্রশ্ন উঠতে পারে,
নেতিবাচক কর্মকাণ্ড বলতে টিআইবি কোন কোন কার্যক্রমকে বিবেচনায় নিয়েছে। এ
ব্যাপারে বিস্তারিত দেখুন, টিআইবির প্রতিবেদন।
এ ক্ষেত্রে টিআইবির সুপারিশমালা হচ্ছে—
ক. সংসদে কার্যকর অংশগ্রহণ বাড়ানো
১. সংসদ সদস্যদের স্থানীয় প্রশাসনিক ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ড বাস্তবায়নে ভূমিকা থেকে সরিয়ে নিয়ে আসা এবং এ বিষয়ে সুস্পষ্ট আইন প্রণয়ন করা।
২. দলগতভাবে সংসদ বর্জন আইন করে বন্ধ করা এবং নির্দিষ্ট কারণ ছাড়া সংসদ সদস্যদের সংসদে সর্বোচ্চ ৩০ দিন এবং একটানা সাত দিনের বেশি অনুপস্থিত থাকা নিষিদ্ধ করা
৩. বিরোধী দলের কার্যকর এবং ন্যায়ভিত্তিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা
বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন—নিজ দল থেকে পদত্যাগ
সরকারি হিসাব-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটিসহ অন্তত ৫০% সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি বিরোধী দল থেকে নির্বাচন।
৪. নিজ দল থেকে স্পিকারের পদত্যাগ।
৫. সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধন— অনাস্থা প্রস্তাব, জাতীয় বাজেট ও জাতীয় নিরাপত্তা-সংক্রান্ত কিছু বিষয় ছাড়া অন্যান্য যেকোনো বিষয়ে দলের বিপক্ষে ভোট দেওয়ার সুযোগ
খ. নেতিবাচক কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকা
৬. জাতীয় সংসদে উত্থাপিত ‘আচরণবিধি’ বিল আইনে পরিণত করা
৭. সংসদ সদস্যদের নেতিবাচক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া
সংসদ সদস্যের নিজ রাজনৈতিক দল থেকেও শক্তিশালী ভূমিকা
বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত সংসদ সদস্যদের দল থেকে বহিষ্কার
পরবর্তী নির্বাচনে মনোনয়ন না দেওয়ার ঘোষণা
প্রত্যাশিত পর্যায়ে কাজ না করার জন্য সংসদ সদস্যকে প্রত্যাহার, গণভোট বা বিশেষ উদ্দেশ্যে সাধারণ সভা করার বিধান করতে হবে।
৮. সংসদ সদস্যদের আর্থিক ও অন্যান্য তথ্য নিয়মিতভাবে প্রকাশ—সংসদ অধিবেশন ও সংসদীয় কমিটিতে অংশগ্রহণসংক্রান্ত তথ্য নিয়মিতভাবে প্রকাশ
৯. সাংসদদের দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে জনগণকে সচেতন করা—নির্বাচনী প্রচারণার সময় প্রার্থীদের সম্পর্কে তুলনামূলক তথ্য প্রকাশ ও প্রচার
১০. স্থানীয় পর্যায়ে নিয়মিত ‘জনগণের মুখোমুখি’ অনুষ্ঠান—সংসদ সদস্যদের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা।
১. সংসদ সদস্যদের স্থানীয় প্রশাসনিক ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ড বাস্তবায়নে ভূমিকা থেকে সরিয়ে নিয়ে আসা এবং এ বিষয়ে সুস্পষ্ট আইন প্রণয়ন করা।
২. দলগতভাবে সংসদ বর্জন আইন করে বন্ধ করা এবং নির্দিষ্ট কারণ ছাড়া সংসদ সদস্যদের সংসদে সর্বোচ্চ ৩০ দিন এবং একটানা সাত দিনের বেশি অনুপস্থিত থাকা নিষিদ্ধ করা
৩. বিরোধী দলের কার্যকর এবং ন্যায়ভিত্তিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা
বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন—নিজ দল থেকে পদত্যাগ
সরকারি হিসাব-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটিসহ অন্তত ৫০% সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি বিরোধী দল থেকে নির্বাচন।
৪. নিজ দল থেকে স্পিকারের পদত্যাগ।
৫. সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধন— অনাস্থা প্রস্তাব, জাতীয় বাজেট ও জাতীয় নিরাপত্তা-সংক্রান্ত কিছু বিষয় ছাড়া অন্যান্য যেকোনো বিষয়ে দলের বিপক্ষে ভোট দেওয়ার সুযোগ
খ. নেতিবাচক কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকা
৬. জাতীয় সংসদে উত্থাপিত ‘আচরণবিধি’ বিল আইনে পরিণত করা
৭. সংসদ সদস্যদের নেতিবাচক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া
সংসদ সদস্যের নিজ রাজনৈতিক দল থেকেও শক্তিশালী ভূমিকা
বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত সংসদ সদস্যদের দল থেকে বহিষ্কার
পরবর্তী নির্বাচনে মনোনয়ন না দেওয়ার ঘোষণা
প্রত্যাশিত পর্যায়ে কাজ না করার জন্য সংসদ সদস্যকে প্রত্যাহার, গণভোট বা বিশেষ উদ্দেশ্যে সাধারণ সভা করার বিধান করতে হবে।
৮. সংসদ সদস্যদের আর্থিক ও অন্যান্য তথ্য নিয়মিতভাবে প্রকাশ—সংসদ অধিবেশন ও সংসদীয় কমিটিতে অংশগ্রহণসংক্রান্ত তথ্য নিয়মিতভাবে প্রকাশ
৯. সাংসদদের দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে জনগণকে সচেতন করা—নির্বাচনী প্রচারণার সময় প্রার্থীদের সম্পর্কে তুলনামূলক তথ্য প্রকাশ ও প্রচার
১০. স্থানীয় পর্যায়ে নিয়মিত ‘জনগণের মুখোমুখি’ অনুষ্ঠান—সংসদ সদস্যদের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা।
যে অভিযোগ, অনুযোগগুলো এখানে তোলা হয়েছে, সেগুলোর কোনো প্রতিবাদ কখনো হয়নি
এবং এখনো যাঁরা টিআইবির প্রতিবেদন নিয়ে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করছেন,
তাঁদের মূল ভাষ্য হলো—‘কেন টিআইবি এই প্রতিবেদন প্রকাশ করল, এই সময় কেন
করল। টিআইবি উদ্দেশ্যমূলকভাবে এটা করেছে এবং অনির্বাচিত ব্যক্তিদের ক্ষমতায়
আসার পথ করে দেওয়ার জন্য এই কাজটা করেছে।’
কেন এই সময়ে এই প্রতিবেদন, তার উত্তর খুবই সহজ। আমরা চাই সংসদ সদস্যরা জনগণের কাছ থেকে আসা এ মূল্যায়ন বিবেচনায় নিয়ে সংসদের বাকি এক বছরের সামান্য বেশি সময়ে এমন কিছু করার সুযোগ নেন, যাতে তাঁরা সসম্মানে আবার ভোটারদের কাছে যেতে পারেন।
কেন এই সময়ে এই প্রতিবেদন, তার উত্তর খুবই সহজ। আমরা চাই সংসদ সদস্যরা জনগণের কাছ থেকে আসা এ মূল্যায়ন বিবেচনায় নিয়ে সংসদের বাকি এক বছরের সামান্য বেশি সময়ে এমন কিছু করার সুযোগ নেন, যাতে তাঁরা সসম্মানে আবার ভোটারদের কাছে যেতে পারেন।
একটি গণতান্ত্রিক দেশে বাস করে জনগণ তাঁদের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছ
থেকে প্রত্যাশিত আচরণ না পান, সে সম্পর্কে কথা বলতে পারবে না? কীভাবে
গণতন্ত্রকে আরও শক্তিশালী করা যায় সে ব্যাপারে চিন্তাভাবনা, আলোচনা, প্রশ্ন
তোলা কি এ দেশে বারণ? আমাদের সংবিধান কি ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠিত
সংগঠনগুলোকে সে অধিকার দেয়নি? টিআইবি যে নেতিবাচক আচরণ বা কর্মকাণ্ডের কথা
উল্লেখ করেছে তা যদি তথ্যভিত্তিক না হয়, টিআইবি প্রকাশ্যে ক্ষমা চাইবে।
কিন্তু এই সংবাদগুলো দীর্ঘদিন ধরে পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে, সাধারণ মানুষ
আমাদের কাছে অভিযোগ নিয়ে এসেছে, কিছু কিছু ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে মামলাও
হয়েছে—তার পরও এসব বিষয় নিয়ে মুখ বন্ধ করে থাকতে হবে? তা হলে কোন ধরনের
গণতন্ত্রে বাস করছি আমরা। কোন মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা বলি কিংবা ধারণ করি
আমরা। যারাই যখন যা কিছু বলবে, সরকার বা বিরোধী দলের কারও বিরুদ্ধে গেলেই
সেটা “রাজনীতিকদের” হেয়প্রতিপন্ন করা বলে দোষারোপ চলতে থাকবে? কোনো
‘রাজনীতিক’ যদি দোষ করেন সেটা উল্লেখ করা যাবে না? সংসদের রাজনীতিকদের
সম্পর্কে কিছু বলাতে মাননীয় স্পিকার অপমানিত বোধ করেছেন একজন সংসদ সদস্য
হিসেবে।
মাননীয় স্পিকার, আপনি শ্রদ্ধাভাজন ব্যক্তিত্ব। আপনার আদেশ, উপদেশ, নির্দেশ
উপেক্ষা করে, অসম্মান করে দিনের পর দিন বিরোধী দল সংসদ বর্জন করে যায়,
আপনার উপস্থিতিতে একজন সংসদ সদস্য অপর সংসদ সদস্যকে অশালীন ভাষায় আক্রমণ
করেন, আপনাকে আমরা দেখি অসহায়ভাবে তাঁদের মানাতে চেষ্টা করতে থাকেন।
তাঁদের হেয়প্রতিপন্ন করতে আমাদের মতো সাধারণ মানুষের প্রয়োজন হয়? কারও
কারও ভাষায় ‘তৃতীয় পক্ষের’ প্রয়োজন হয়। সংসদে যে ভাষা ব্যবহার করা হয়, আমার
ব্যক্তিগত মতামত—চেষ্টা করলেও সে ভাষায় একটি বাক্যও উচ্চারণ করতে পারব না
আমরা। মাননীয় স্পিকার, শ্রদ্ধেয় হামিদ ভাই, একটি তথ্যনিষ্ঠ, গণতান্ত্রিক
পদ্ধতিতে রচিত, জনস্বার্থমূলক প্রতিবেদনকে উপলক্ষ করে গঠনমূলক সমালোচনার
জবাবে উচ্চতম পর্যায় থেকে ‘চক্রান্তকারী’র অভিযোগ শুনতে হয়, তাতে আমরা
যাঁরা দেশ নিয়ে ভাবি, দুর্নীতিমুক্ত, সুশাসন ও মানবাধিকারের প্রতি
শ্রদ্ধাশীল একটি দেশ গড়ার স্বপ্ন বাস্তবায়ন করার কাজ করতে চাই, তাঁরা
অপমানিত বোধ করি, তাঁরা শঙ্কিত বোধ করি। যাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ
মোটামুটিভাবে প্রমাণিত, ক্ষমতার কাছাকাছি থাকা তেমন মানুষদের আইনের ঊর্ধ্বে
রাখার পৃষ্ঠপোষকতার সংস্কৃতিতে মুক্তচিন্তার মানুষ যখন ভীত হতে শুরু করে,
মাননীয় স্পিকার, গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে এর চেয়ে বড় কিছু আর ঘটতে পারে না।
----- সুলতানা কামাল: চেয়ারপারসন, টিআইবি।
বাংলাদেশের অনেক মানুষ আওয়ামী লীগ না করেও তারা ‘নৌকা’য় ভোট দেন। কারণ,
তাদের আর কোনো উপায় নেই। তারা সরাসরি দলীয় সমর্থক নয়; কিন্তু মনে প্রাণে
মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে। এই ‘পক্ষ’টাই আওয়ামী লীগের একটা বড় প্লাস পয়েন্ট। সেই
প্লাস পয়েন্টকে তারা যথার্থ কাজে লাগাতে পারেন না। দুঃখজনক হলেও সত্য,
দলের অনেক নিষ্ঠাবান-দক্ষ-সৎ নেতাকর্মীদেরকেও মুল্যায়ণ করতে পারেন নি। পেছনের দিকে ফিরে তাকিয়ে বলতে হয়, বঙ্গবন্ধুর কাছের মানুষ হয়ে উঠেন
‘মোশতাকে’রা আর দূরের সরে যান ‘তাজউদ্দিনে’রা। শেখ হাসিনার ক্ষেত্রেও
অনেকটা তাই ঘটছে। ক্ষমতার অপব্যবহারকারী, দুর্নীতিবাজ হিসেবে অভিযুক্ত,
বিতর্কিত আমলা, এমপি, নেতামন্ত্রী, উপদেষ্টারা প্রতিনিয়ত সরকারকে বিব্রত
করছে। যা সামাল দিতে স্বয়ং শেখ হাসিনাকেই হিমশিম খেতে হচ্ছে।
জাতীয় সংসদে তোফায়েল-সেলিমেরা তো রীতিমতো বিরোধী দলের ভাষায় ও ভূমিকায় তীব্র সমালোচনা করছেন এই সব সুবিধাবাদী আমলা, নেতামন্ত্রী, উপদেষ্টাদের আচরণে। এদের তালিকা দিন দিন দীর্ঘ হচ্ছে। এখন আমলারাও এই তালিকায় যুক্ত হচ্ছেন। যেমন, প্রধানমন্ত্রীর সাবেক একান্ত সচিব নজরুল ইসলাম খান, বর্তমানে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের ‘সৎ’ সচিব এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।
আরেক ‘সৎ’ এবং মহা দুর্নীতিবাজ আমলা সাবেক আইজিপি নূর মোহাম্মদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে তাকে পুরস্কৃত করে মরক্কোয় বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত করা হয়েছে। অথচ বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে দুর্নীতিমুক্ত সমাজ নির্মাণের প্রতিশ্রুতি ছিল। নূর মোহাম্মদের চেয়ে আর কি কোনো যোগ্য লোক বাংলাদেশে ছিল না?
তারেক-কোকো-ফালু-মামুনেরা ‘দুর্নীতির স্বর্গরাজ্য’ বানিয়েছিলেন। আর এখন কেন প্রশ্ন উঠছে, বর্তমান সরকারের লোকজন ‘দুর্নীতির নরকরাজ্য’ বানাচ্ছেন? তাহলে খালেদা আর হাসিনার মধ্যে কি তফাৎ থাকলো।
তিনি গত বছর কানাডায় এসে বলেছিলেন, ‘আমরা আমাদের ছেলেমেয়েকে চুরি করার শিক্ষা দেই নি, দিয়েছি উচ্চশিক্ষা। সেটাই তাদের বড় সম্পদ’। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর নেতাকর্মী, মন্ত্রী-উপদেষ্টারা কি করছেন? একের পর এক তাদের বিরোদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ উঠছে। আর তিনি তাদের পক্ষে বলছেন, আমার ‘আবুলেরা’ সৎ আর দেশপ্রেমিক। কেন? কয়েকজন আবুল বড় নাকি সরকারের ভাবমূর্তি বড়। আমার মতো সামান্য একজন মানুষের মনে এই প্রশ্ন জাগে। আমাদের প্রধানমন্ত্রীর কি একবারও সেই বিষয়টি ভেবে দেখেন না!!
বহুল আলোচিত শেয়ার কেলেঙ্কারির পর প্রশাসনে নিয়োগবাণিজ্য ও পদোন্নতি নিয়ে জনপ্রশাসনবিষয়ক উপদেষ্টা এইচটি ইমামের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠে। তারপর ধারাবাহিকভাবে বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটনমন্ত্রী ফারুক খান আর শিল্পমন্ত্রী দিলীপ বড়ুয়ার বিরুদ্ধে অভিযোগ, সাবেক রেলমন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের এপিএসের ঘুষ কেলেংকারি, পদ্মা সেতু দুর্নীতির আর্থিক কেলেংকারির কারণে যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেনের পদত্যাগ, উপদেষ্টা মসিউর রহমানের পদত্যাগপত্র জমা এবং সর্বশেষ হলমার্ক কেলেংকারির স্বাস্থ্য উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. সৈয়দ মোদাচ্ছের আলীর জড়িত থাকার ঘটনা সরকারকে ধাপে ধাপে নীচের দিকে নামাচ্ছে। অর্থমন্ত্রী ‘আবুল মাল আব্দুল’ মুহিত নিজেকেই সব চেয়ে ‘ঘৃণিত’ লোক বলে সংসদে স্বীকার করেছেন।
সরকারের অনেক যুগান্তকারী দৃষ্টান্তমূলক কাজকে ম্লান করে দিচ্ছেন মাত্র কয়েকজন আব্দুল-সৈয়দ-সেন-খানেরা। তাদের নেতিবাচক কর্মকাণ্ডের জন্য আগামী নির্বাচনে নৌকা ডুববে, তা টের পাওয়া যাচ্ছে।
সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল: কবি ও সাংবাদিক, কানাডা প্রবাসী
saifullahdulal@gmail.com
------------------------------------------------------------------
তারা হাসিনাকে ডুবাচ্ছেন, নির্বাচনে নৌকাও ডুববে!
--------- সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল:
--------- সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল:
জাতীয় সংসদে তোফায়েল-সেলিমেরা তো রীতিমতো বিরোধী দলের ভাষায় ও ভূমিকায় তীব্র সমালোচনা করছেন এই সব সুবিধাবাদী আমলা, নেতামন্ত্রী, উপদেষ্টাদের আচরণে। এদের তালিকা দিন দিন দীর্ঘ হচ্ছে। এখন আমলারাও এই তালিকায় যুক্ত হচ্ছেন। যেমন, প্রধানমন্ত্রীর সাবেক একান্ত সচিব নজরুল ইসলাম খান, বর্তমানে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের ‘সৎ’ সচিব এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।
আরেক ‘সৎ’ এবং মহা দুর্নীতিবাজ আমলা সাবেক আইজিপি নূর মোহাম্মদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে তাকে পুরস্কৃত করে মরক্কোয় বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত করা হয়েছে। অথচ বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে দুর্নীতিমুক্ত সমাজ নির্মাণের প্রতিশ্রুতি ছিল। নূর মোহাম্মদের চেয়ে আর কি কোনো যোগ্য লোক বাংলাদেশে ছিল না?
তারেক-কোকো-ফালু-মামুনেরা ‘দুর্নীতির স্বর্গরাজ্য’ বানিয়েছিলেন। আর এখন কেন প্রশ্ন উঠছে, বর্তমান সরকারের লোকজন ‘দুর্নীতির নরকরাজ্য’ বানাচ্ছেন? তাহলে খালেদা আর হাসিনার মধ্যে কি তফাৎ থাকলো।
তিনি গত বছর কানাডায় এসে বলেছিলেন, ‘আমরা আমাদের ছেলেমেয়েকে চুরি করার শিক্ষা দেই নি, দিয়েছি উচ্চশিক্ষা। সেটাই তাদের বড় সম্পদ’। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর নেতাকর্মী, মন্ত্রী-উপদেষ্টারা কি করছেন? একের পর এক তাদের বিরোদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ উঠছে। আর তিনি তাদের পক্ষে বলছেন, আমার ‘আবুলেরা’ সৎ আর দেশপ্রেমিক। কেন? কয়েকজন আবুল বড় নাকি সরকারের ভাবমূর্তি বড়। আমার মতো সামান্য একজন মানুষের মনে এই প্রশ্ন জাগে। আমাদের প্রধানমন্ত্রীর কি একবারও সেই বিষয়টি ভেবে দেখেন না!!
বহুল আলোচিত শেয়ার কেলেঙ্কারির পর প্রশাসনে নিয়োগবাণিজ্য ও পদোন্নতি নিয়ে জনপ্রশাসনবিষয়ক উপদেষ্টা এইচটি ইমামের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠে। তারপর ধারাবাহিকভাবে বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটনমন্ত্রী ফারুক খান আর শিল্পমন্ত্রী দিলীপ বড়ুয়ার বিরুদ্ধে অভিযোগ, সাবেক রেলমন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের এপিএসের ঘুষ কেলেংকারি, পদ্মা সেতু দুর্নীতির আর্থিক কেলেংকারির কারণে যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেনের পদত্যাগ, উপদেষ্টা মসিউর রহমানের পদত্যাগপত্র জমা এবং সর্বশেষ হলমার্ক কেলেংকারির স্বাস্থ্য উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. সৈয়দ মোদাচ্ছের আলীর জড়িত থাকার ঘটনা সরকারকে ধাপে ধাপে নীচের দিকে নামাচ্ছে। অর্থমন্ত্রী ‘আবুল মাল আব্দুল’ মুহিত নিজেকেই সব চেয়ে ‘ঘৃণিত’ লোক বলে সংসদে স্বীকার করেছেন।
সরকারের অনেক যুগান্তকারী দৃষ্টান্তমূলক কাজকে ম্লান করে দিচ্ছেন মাত্র কয়েকজন আব্দুল-সৈয়দ-সেন-খানেরা। তাদের নেতিবাচক কর্মকাণ্ডের জন্য আগামী নির্বাচনে নৌকা ডুববে, তা টের পাওয়া যাচ্ছে।
সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল: কবি ও সাংবাদিক, কানাডা প্রবাসী
saifullahdulal@gmail.com
No comments:
Post a Comment