Monday, December 31, 2012

কী রেখে গেল ২০১২

আবুল কাসেম ফজলুল হক
২০১২ সাল চলে যাচ্ছে আজ। বছরের ঘটনাগুলো স্মরণ করতে ইচ্ছা করছে। কিন্তু অনেক কিছুই মনে থাকে না। অনেক কিছুই মনে রাখতে পারি না। রবীন্দ্রনাথের উক্তি মনে পড়ে : 'কালস্রোতে ভেসে যায় জীবন যৌবন ধন ও মান।' ইংরেজ কবি গ্রের উক্তি স্মরণ হয় :'The boast of heraldry,

the pomp of power/All but leads to the grave.' তবু স্বভাবগত সামাজিক দায়িত্ববোধ মনের মধ্যে কাজ করে। প্রগতির তাগিদ ও চেতনায় ক্রিয়াশীল আছে।

ঘটনাবলি স্মৃতিতে ঠিকমতো না থাকার এবং আলোচনার পরিসর ক্ষুদ্র হওয়ার কারণে কোনো কিছুই ঠিকমতো বর্ণনা করতে পারব না। মনের মধ্যে ঘটনাবলি থরে থরে সাজানো না থাকলেও অনেক ঘটনারই ছাপ মনে আছে। তার উপর নির্ভর করেই কিছু কথা বলতে ইচ্ছা করছে।

কেউ কেউ বলেন, লেখেনও—ইতিহাসের শিক্ষা এই যে, ইতিহাস থেকে কেউ শিক্ষা নেয় না। দেশের রাজনৈতিক নেতাদের এবং প্রধান রাজনৈতিক ধারাগুলোতে (সিভিল সোসাইটি ও এনজিও একটি সক্রিয় রাজনৈতিক ধারা) সক্রিয় বুদ্ধিজীবীদের আচরণ লক্ষ করেই এ কথা বলা যায়। আমার মনে হয় কেবল কর্তৃত্বশীলেরাই সব নয়, সমাজের আরও নানা অংশ আছে, সবার অনুভূতি উপলব্ধি ও চিন্তা এক রকম নয়। কেবল শাসক শ্রেণীর দিকে তাকিয়ে যারা চিন্তা করেন তাদের চিন্তা কি ঠিক? কেবল উপস্থিত অস্থিরতায় বিচলিত হয়ে যারা চিন্তা করেন তাদের চিন্তা কি ঠিক? আমার মনে এ ধারণা দৃঢ়মূল আছে যে, উন্নত ভবিষ্যত্ সৃষ্টির প্রয়োজনে ইতিহাস থেকে শিক্ষা গ্রহণের কোনো বিকল্প নেই। যেকোনো সরকার ক্ষমতায় থাকার জন্য জনস্বার্থে কিছু কাজ করার চেষ্টা করে। কোনো আদর্শবাদী দল হলে অনেক কিছু করতে চায়, করে—সে কথা আমি বলছি না। আমাদের দেশে শাসক শ্রেণীর ক্ষমতাসীন দল কিছু করার চেষ্টা করলে বিরোধী দল তা ব্যর্থ করে দেওয়ার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা চালায়। আমাদের শাসক শ্রেণীতে—সরকারি দল ও বিরোধী দলের মধ্যে—এই অন্ধ ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ২০১২ সালে আগের মতোই দেখা গেছে, এবং জাতীয় সংসদের নির্বাচন (২০১৪) সামনে নিয়ে এটা এখন তীব্রতার দিকে যাচ্ছে। এরই মধ্যে সরকার বিদ্যুতের উত্পাদন বাড়াবার ও বিদ্যুতের ঘাটতি কমাবার চেষ্টা করেছে। বিদ্যুত্ পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি দেখা যাচ্ছে। তবে বিদ্যুত্ খাতে বিপুল ব্যয়ের মধ্যে দুর্নীতির ও অর্থ-আত্মসাতের অভিযোগ আছে। সরকার নতুন শিক্ষানীতি জারি করেছে এবং শিক্ষাক্ষেত্রে যুগান্তকারী উন্নয়ন সাধন করা হয়েছে বলে শিক্ষামন্ত্রণালয় থেকে প্রচার চালানো হয়েছে। আমার কাছে এই প্রচারকে একেবারেই অন্তঃসারশূন্য মনে হয়। সরকার ২০১৪ সালের জানুয়ারি মাসেই প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের বিনামূল্যের পাঠ্যপুস্তুক সারা দেশে স্কুলে স্কুলে পাঠিয়ে দেবে—এতে সরকারের নৈপুণ্যের পরিচয় আছে। দুঃখজনক ব্যাপার এই যে, পাঠ্যপুস্তকসমূহের অন্তর্গত পাঠ্যসূচি ও পাঠক্রম আগের মতোই খারাপ। এতে পরাশক্তির সাম্রাজ্যবাদী নীতির প্রকাশ আছে, বাংলাদেশের কল্যাণে জাতীয়তাবাদ ও তার সম্পূরক আন্তর্জাতিকতাবাদের প্রকাশ নেই। এতে পরাশক্তির লিবারেল ডেমোক্রেসির প্রকাশ আছে, বাংলাদেশের জনগণের গণতন্ত্রের প্রকাশ নেই। ধর্ম শিক্ষার ও ধর্মীয় নীতি শিক্ষাদানের যে ব্যবস্থা প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের জন্য করা হয়েছে, তা মারাত্মকভাবে ত্রুটিপূর্ণ। তৃতীয় শ্রেণী থেকে দশম শ্রেণী পর্যন্ত ইসলাম শিক্ষার বইগুলোতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে ইসলামের অলৌকিক বিষয়গুলোর উপর। এর দ্বারা শিক্ষার্থীদের অদৃষ্টবাদী করে তোলার এবং নৈতিক দিক দিয়ে দুর্বল করে ফেলার গভীরতর ও ব্যাপকতর আয়োজন করা হয়েছে। ব্রিটিশ আমলে, পাকিস্তান আমলে, বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পরেও এমন ছিল না। স্কুলের এমপিও-ভুক্তির রীতিকে কি উন্নত করা হয়েছে? কোচিং সেন্টার, গাইড বুক ইত্যাদি আছে। এসবের ব্যবসা জোরদার হয়েছে পঞ্চম শ্রেণীতে ও অষ্টম শ্রেণীতে পাবলিক পরীক্ষার ব্যবস্থা করার ফলে। ছাত্রদের থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অতিরিক্ত টাকা আদায়ের প্রবণতা কমাবার চেষ্টা সরকার করছে। কিন্তু পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্থায় এটা কি সফল হতে পারে? আগের মতোই প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিল্প বহুধা বিভক্ত আছে। এমনিভাবে সরকার যেসব সদর্থক কাজ করছে, সেগুলোর মূল্য বিচার করে দেখার চেষ্টা করা যেতে পারে। কিন্তু মূল্য বিচার করবেন কারা। যাদের সবচেয়ে বেশি যোগ্যতা আছে, তারা সবাই তো বিভিন্ন সিভিল সোসাইটির বুদ্ধিজীবী এবং বিভিন্ন এনজিওর কর্তাব্যক্তি। যে ছকে তাদের চিন্তা ধাঁধা, তা দিয়ে হবে না।

আওয়ামী লীগ ছাড়া চৌদ্দ-দলীয় জোটের যেসব দল আছে সেগুলোর মধ্যে গতানুগতির বাইরে সদর্থক কোনো চিন্তা নেই, কাজ তো নেই-ই। আওয়ামী লীগকে ধরে তারা সুবিধা হাসিল করতে তত্পর।

বিএনপি-জামায়াতকে নিয়ে আছে। বিএনপির ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ ও নির্যাতন দুটোই সীমাহীন। মনে হয়, দৃশ্যমান ঘটনাবলির বাইরে অদৃশ্যও অনেক কিছু আছে। বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলীর গুম হওয়ার পর আন্দোলনের যে চরমপন্থা বিএনপি অবলম্বন করেছিল, সরকার তা অত্যন্ত সাফল্যের সঙ্গে দমন করেছে এবং দল হিসেবে বিএনপিকে বিপন্ন করে দিয়েছে। বিএনপি নৈতিক দিক দিয়ে দুর্বল, সাহস কম। যে বছরটা চলে গেল তাতে বিএনপি তার আন্দোলনে আর কোনো অগ্রগতি সাধন করতে পারেনি। সবচেয়ে বড় কথা হলো, ক্ষমতার লড়াই ছাড়া বিএনপির কোনো রাজনৈতিক বক্তব্য নেই। রাজনৈতিক বক্তব্য আওয়ামী লীগেরও নেই। তবে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক এবং উন্নয়নমূলক কিছু বিক্ষিপ্ত কথা আওয়ামী লীগ বলে থাকে। পত্রিকায় খবর দেখেছি, আওয়ামী লীগ তার নির্বাচনী ইশতিহার প্রস্তুত করছে। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি দুই দলের কোনোটাই শক্তি হিসেবে বাংলাদেশের জনসাধারণকে ঐক্যবদ্ধ করতে, জাতীয় একমত্য প্রতিষ্ঠা করতে, রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশকে গড়ে তুলতে সচেষ্ট নয়। ক্ষমতা দখল করা আর ক্ষমতা উপভোগ করাই দুই দলেরই মূল রাজনীতি। স্বাধীনতার বোধ নেই, প্রগতির চেতনা নেই।

বামপন্থী দলগুলোর অবস্থা উন্নত হয়নি। বাংলাদেশে বামপন্থী রাজনীতি ক্ষয়িষ্ণুদশায় পৌঁছে গেছে। এসব দল অন্যায়-অবিচারের প্রতিবাদ করে, ইস্যুভিত্তিক আন্দোলন ছাড়া জনস্বার্থে সরকারের উপর চাপ সৃষ্টি করে; কিন্তু রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে নিজেদের আদর্শ ও কর্মসূচি বাস্তবায়ন করার কথা ভাবে না। তেল-গ্যাস-বিদ্যুত্-বন্দর রক্ষায় আন্দোলনে অধিকাংশ বামপন্থী দল সক্রিয় আছে। চাপ সৃষ্টি করে সমস্যার সমাধান করার জন্য সরকারের সঙ্গে সঙ্গে যে নীতিভিত্তিক সুসম্পর্ক দরকার, জাতীয় সম্পদ রক্ষা আন্দোলনের তা নেই। আওয়ামী লীগ কিংবা বিএনপি কোনোটার সঙ্গেই তাদের আন্তরিক সুসম্পর্ক নেই। চাপ সৃষ্টির আন্দোলন কখনও কখনও পুলিশের সঙ্গে সংঘাতে রূপ নেয় এবং আন্দোলনের উদ্দেশ্য সফল হয় না। ২০১২ সালে একটি পনেরো দফা কর্মসূচি নিয়ে সিপিবি ও বাসদ দ্বিদলীয় জোট গঠন করেছে। কিন্তু জনসাধারণের কাছে তারা পনেরো দফা কর্মসূচি প্রচার করছে না। মনে হয় পনেরো দফা বাস্তবসম্মত হয়নি। বামপন্থী দলগুলোর সামনে বিকাশের সুযোগ আছে। তবে যেভাবে তারা কাজ করছে, চিন্তা করছে, তা নিয়ে তারা ক্ষয়িষ্ণুতা কাটাতে কিংবা বিকশিত হতে পারবে না। নতুন বাস্তবতাকে উপলব্ধি করে নতুন কর্মসূচি ও কর্মনীতি প্রণয়ন দরকার। কিছু সংগঠন নক্সালপন্থী ধারায় ও সর্বহারা পার্টির ধারায় সশস্ত্র কর্মকাণ্ডে সক্রিয় আছে। বর্তমান সরকারের আমলে তারা র্যাব দ্বারা বিনা বিচারে কথিত বন্দুকযুদ্ধে প্রাণ হারাচ্ছেন। ২০০৪ সাল থেকে ধারাবাহিকভাবে তারা ক্লিনহার্ট অপারেশন, এনকাউন্টার ও ক্রসফায়ারের নামে বিনা বিচারে প্রাণ হারিয়ে চলছেন। ২০১২ সালে পৌঁছে দেখা যাচ্ছে, আমাদের সমাজ এই বন্দুকযুদ্ধ, ক্রসফায়ার, এনকাউন্টার ও ক্লিনহার্ট অপারেশনকে স্বাভাবিক ব্যাপার বলে মেনে নিয়েছে।

রাষ্ট্রীয় অর্থনীতি ব্যবস্থাপনায় সরকারের চরম দুর্বলতা ও অযোগ্যতা স্পষ্ট হয়ে গেছে। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ জোট ক্ষমতায় আসার পর থেকেই শেয়ার মার্কেটে নানা কেলেঙ্কারির উত্তেজনাকর সব খবর প্রচারমাধ্যমের খোরাক হয়েছে। প্রতারণার ব্যবসা অতীতের সকল রেকর্ড ভঙ্গ করে সামনে এসেছে। চাকরি দেওয়ার নামে প্রতারণা, হাউজিং সোসাইটির নামে প্রতারণা, মানবসম্পদ রফতানির নামে আদম বেপারিদের প্রতারণা, বড় বড় অনেক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের বেশি লাভের লোভ দেখিয়ে লোকের কাছে শেয়ার বিক্রি করে সুদ-আসল কোনোটাই না দেওয়া, রাষ্ট্রীয় ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে পরিশোধ না করা, ভর্তি বাণিজ্য, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, মুক্তিপণ ইত্যাদির ব্যাপক প্রসার ঘটেছে। এর মধ্যে এসব অতীতের সকল রেকর্ড অতিক্রম করে গেছে। সরকার এ ক্ষেত্রে শৈথিল্যের, দুর্বলতার ও অযোগ্যতার পরিচয় দিয়ে চলছে। ডেসটিনির ব্যবসা এ ক্ষেত্রে বৃহত্তম। লক্ষ লক্ষ মানুষ লাভ পাচ্ছে না, মূল টাকা ফেরত পাচ্ছে না, ভবিষ্যতের ভরসা নেই। সরকার ব্যাংক অ্যাকাউন্ট বন্ধ রেখে, কর্তাব্যক্তিদের জেলে নিয়ে প্রায় নিষ্ক্রিয় আছে। প্রতারিত মানুষদের ক্ষতি কোনোভাবে পূরণ করা যায় কি-না, সে সম্পর্কে সরকারের পরিচ্ছন্ন কোনো বক্তব্য নেই। কেবল ডেসটিনিই নয়, আরও কিছু প্রতিষ্ঠানের বৃহদায়তন প্রতারণার খবর এর মধ্যে প্রকাশিত হয়েছে। সরকার যেন শাস্তি দেওয়ার কথা বলে হাম্বিতাম্বি করার ও দু-চারজনকে গ্রেফতার করার মাধ্যমেই কর্তব্য সমাধা করে ফেলেছে। ভাবখানা এমন যে, সরকারের কোনো দায়-দায়িত্বই নেই। আইন নিজস্ব গতিতে চলছে? আইনের নিজস্ব গতিটা কাদের হাতে? ব্যাংকিং ব্যবস্থায়ও অতীতের সকল রেকর্ড ভঙ্গকারী কেলেঙ্কারির তুল্য কেলেঙ্কারির রেকর্ড পৃথিবীতে কয়টি আছে? হাজার হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের ঘটনাকে অর্থমন্ত্রী খুব সহজভাবে মামুলি ব্যাপার বলে উড়িয়ে দেন! এর মধ্যে ঘুষ-দুর্নীতির অনেক ব্যাপ্তি ঘটেছে। কয়েকটি নতুন প্রাইভেট ব্যাংক সরকারের অনুমোদন নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ২০১২ সালে। বেশ কয়েকটি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় সরকারের অনুমোদন নিয়ে কাজ আরম্ভ করেছে। উল্লেখ্য যে, প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের একাডেমিক অটোনোমি বলে কিছুই দেওয়া হয়নি, পাঠ্যসূচি প্রণয়নের ক্ষমতাও সরকার নিজের হাতে রেখেছে। তবে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে আর্থিক ব্যাপারে অটোনোমি দেওয়া হয়েছে। এগুলোর ব্যবস্থাপনা যতটা একাডেমিক, তার চেয়ে বেশি ফিন্যান্সিয়াল।

সরকার ক্ষমতায় আসার পরেই দলীয়করণ ও দলবাজির তাণ্ডব চলছিল। ২০১২ সালে, মনে হয়, দলবাজি সামান্য কমেছে। তবে অন্তর্লীন ধারায় দলীয়করণ যথাবিহিত আছে। নির্বাচন সামনে নিয়ে বাইরের চেহারাকে একটু ভদ্র করার চেষ্টা করা হচ্ছে। ২০১২ সালে সড়ক দুর্ঘটনা তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি ঘটেছে। খ্যাতিমান ও অখ্যাত অনেক লোকের প্রাণ দিয়েছে দুর্ঘটনায়। সরকারের লোকেরা এসব দুর্ঘটনার জন্য প্রধানভাবে দাবি করেছেন ড্রাইভারদের। প্রচারমাধ্যম এসব কথা প্রচার করেছে। কেবল ড্রাইভারদের দোষ দিয়ে, শাস্তি দিয়ে প্রতিকার হয়? রাস্তাঘাটের দুরবস্থার কথা তোলা হয়েছে সব মহল থেকে। সরকারি লোকরা রাতারাতি রাস্তাঘাট ঠিক করে ফেলার তত্পরতা প্রদর্শন করেছেন।

২০১২ সালে সবচাইতে মর্মান্তিক ও আতঙ্কের ঘটনা হলো হত্যাকাণ্ড। সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ড থেকে বিশ্বজিত্ হত্যা পর্যন্ত বেশ কয়েকটি নৃশংস হত্যাকাণ্ডের খবর দীর্ঘদিন ধরে পত্র-পত্রিকায়, রেডিও-টেলিভিশনে প্রচারিত হয়েছে। ক্রমাগত অপরাধীদের শাস্তি দাবি করা হচ্ছে। প্রায় সব হত্যাকাণ্ডই রহস্যের মধ্যে আছে। নানা রকম মিথ্যা প্রচারমাধ্যমে স্থান করে নিয়েছে। সমাজের সর্বস্তরে সব মানুষের মধ্যে জান-মাল নিয়ে আতঙ্ক ও সংশয় দেখা দিয়েছে। কেবল শাস্তিমূলক ব্যবস্থাই কি প্রতিকার? এত দাবি, এত প্রচার, তার পরও বিচার এগোয় না! সাগর-রুনিকে কারা কেন হত্যা করেছে?

দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, খাদ্যে ভেজাল, ওষুধের নিম্নমান ও দাম বাড়ানো জন্য কৃত্রিম অভাব সৃষ্টি, ফরমালিনের ব্যবস্থা ইত্যাদি যথাবিহিত ক্রমবর্ধমান আছে। সরকার নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে, পারে না। মনে হয়, সকলেই এখন এগুলোকে মেনে নিয়েছে। ২০১২ সালের বড় ঘটনাগুলোর মধ্যে ড. ইউনূস ও গ্রামীণ ব্যাংকের ঘটনা অবশ্য উল্লেখ্য। গ্রামীণ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের পদে ড. ইউনূসের ৬০ বছর বয়সে চাকরির মেয়াদ শেষ হয়েছে, কিন্তু ৭২ বছর বয়সেও তিনি তার পদ আঁকড়ে আছেন। সরকার অনেক দিন দরে ইউনূসের জায়গায় নতুন ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগ করার চেষ্টা করছে। কিন্তু ইউনূসকে সরিয়ে দেওয়ার পরও তা পারছে না। এ নিয়ে পশ্চিমা বৃহত্ শক্তিগুলো—বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশ সরকারের উপর ইউনূসের অনুকূলে প্রত্যক্ষ চাপ দিয়ে চলেছে। এ থেকে স্পষ্ট হয়ে যায় যে, বাংলাদেশ কোনো স্বাধীন রাষ্ট্র না।

পদ্মসেতুর নির্মাণের জন্য বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে বিশ্বব্যাংকের ঋণচুক্তি বিশ্ব ব্যাংক বাতিল করে দেয়। দুর্নীতির অভিযোগ তুলে এটা করা হয়। বাংলাদেশ সরকারের ভূমিকা যেমন স্বচ্ছ নয়, বিশ্ব ব্যাংকের ভূমিকাও তেমনি স্বচ্ছ নয়। পত্র-পত্রিকায়, রেডিও টেলিভিশনে অজস্র কথা প্রচারিত হয়। কিন্তু দুর্নীতিটা কী তা বোঝা যায় না। বিশ্বব্যাংক একরকম বলে বাংলাদেশ সরকার মধ্য অন্যরকম বলে। দুর্নীতি সম্পর্কে বাংলাদেশের দুর্নীতি দমন কমিশনারের বক্তব্যেও পারম্পর্য পাওয়া যায় না। বিশ্বব্যাংকের লোকেরা সব সাধু—এমনটা ভাববার কোনো কারণ দেখি না। মনে হয়, বাংলাদেশ যে পরাধীন, এই কথাটাই বিশ্বব্যাংক ভালো করে বুঝিয়ে দিতে চায়। গ্রামীণ ব্যাংক ও ড. ইউনূসের ঘটনা নিয়ে পদ্মাসেতুর ঋণচুক্তি বাতিল সংক্রান্ত ঘটনা যেভাবে প্রচারমাধ্যমে এসেছে তাতে বোঝা যায়, বাংলাদেশ স্বাধীনতা হারিয়েছে।

বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিল, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী, অর্থমন্ত্রী ও আরও কোনো কোনো মন্ত্রী কখনও কখনও বিরূপ কথা বলে থাকেন। তাদের কথায় জনগণ সমর্থন দেয় না এই কারণে যে, সরকার কোনো দৃঢ় নীতিগত অবস্থান না নিয়েই এসব কথা বলছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের সুনির্দিষ্ট কিছু নীতি ঘোষণা করে সেই নীতিকে দৃঢ়ভাবে অবলম্বন করলে অবশ্যই তা জনগণের সমর্থন পাবে।

বাংলাদেশের সমস্যাবলি জটিল। যুক্তরাষ্ট্রের অধীন থেকে, তাদের প্রতি আনুগত্য নিয়ে, তাদের ইচ্ছানুযায়ী কাজ করতে হয় বলে বাংলাদেশের কোনো সরকার কোনো সমস্যার সমাধান করতে পারে না। সমস্যার সমাধানের জন্য রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতা দরকার। গত তিন দশক ধরে রাজনীতি যে ধারায় চলছে তাতে রাজনৈতিক দলগুলো রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতার বোধ হারিয়ে ফেলেছে। লিবারেল ডেমোক্রেসির নামে যে গণতন্ত্র বাংলাদেশে চলছে, জনগণের দৃষ্টিতে তা আদৌ গণতন্ত্র নয়।

সকলেই অন্ধভাবে বিশ্বাস করত যে, আওয়ামী লীগের ও বিএনপির নেতৃত্বে দ্বিদলীয় কথিত লিবারেল ডেমোক্রেসি বাংলাদেশে কায়েম হবে। কিন্তু দল দুটোর মধ্যে গণতান্ত্রিক মনোভাবের বদলে বিরাজ করছে সরাসরি শত্রুতার মনোভাব। কথিত এই গণতন্ত্রের পরিচালনায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের স্টেট ডিপার্টমেন্টের সাউথ এশিয়া ডেস্ক, বর্তমানে সাউথ এশিয়া অ্যান্ড মিডল ইস্ট ডেস্ক সরাসরি সক্রিয়। বাংলাদেশের রাজনীতিবিদেরা যুক্তরাষ্ট্রের কূটনীতিকেই বাংলাদেশের জন্য সর্বোত্কৃষ্ট নীতি মনে করেন। বাংলাদেশের উন্নতি হবে কীভাবে? কথিত ডোনার এজেন্সিসমূহের 'উন্নয়ন প্রকল্প'ই বাংলাদেশের উন্নয়ন পরিকল্পনা। বাংলাদেশ উন্নতি করবে কীভাবে? ২০১২ সালে সিভিস সোসাইটির রাজনৈতিক ভূমিকা সম্পর্কে শিক্ষিত সাধারণের মধ্যে নতুন উপলব্ধি দেখা দিয়েছে। ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারির জরুরি অবস্থা ঘোষণা মইন উ আহমদের নেতৃত্বে হয়নি, ইয়াজউদ্দিনের বুদ্ধিতেও হয়নি, হয়েছে সিভিল সোসাইটি মহলের মাধ্যমে, সিভিল সোসাইটি মহলের পেছনে সক্রিয় ছিল যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট ও স্থানীয় দূতাবাস—এই রকম কথাবার্তা এখন খবরের কাগজ পড়েন এমন সাধারণ লোকদের মুখেও শোনা যায়। বাংলাদেশের শিক্ষিত লোকেরা খুব সহজে এখন বাংলাদেশের পরাধীনতাকে মেনে নিয়েছে। এই পরাধীনতার মধ্যে বাংলাদেশের মুত্সুদ্দি-বণিক শ্রেণী বিরাটভাবে লাভবান। গ্রামে শহরে খবরের কাগজ পড়েন এমন লোকদের মুখে এখন প্রায়শ শোনা যায়, ২০১৪ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচন সাংবিধানিক নিয়মে হবে না, এরপর সিভিল সোসাইটি ক্ষমতায় আসবে, মিলিটারিরা ব্যাকে থাকবে। যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় দূতাবাস এবং সিভিল সোসাইটিসমূহ রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় আছে।

২০১২ সালের ঘটনাবলি থেকে ভবিষ্যতের জন্য বাংলাদেশের অনেক কিছু শিক্ষণীয় আছে। সমস্যাবলিকে ভাসাভাসা দৃষ্টিতে দেখলেই হবে না, গভীরেও দৃষ্টি দিতে হবে এবং সমাধানের উপায় ভাবতে হবে।

লেখক :রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও শিক্ষাবিদ
http://ittefaq.com.bd/index.php?ref=MjBfMTJfMzFfMTJfM180OV8xXzc1ODM=

দেশের মাত্র ৮৫ জনের কাছে রয়েছে ১ হাজার ৩০০ কোটি ডলার

দেশের মাত্র ৮৫ জনের কাছে রয়েছে ১ লাখ 
৫ হাজার কোটি টাকার সম্পদ
সাইফুল হাসান:
আমাদের দেশে এ রকম মানুষের সংখ্যা একেবারেই কম নয়, যারা অর্থনৈতিক বিকাশের মধ্যে নীতি খোঁজেন। বাস্তবত, বাংলাদেশ এখন অস্বস্তিকর অবস্থার মধ্যে রয়েছে। একদিকে বৈশ্বিক বিচারে মোট দেশজ উত্পাদন (জিডিপি) বাড়ছে গর্ব করার মতো হারে; অন্যদিকে মুুষ্টিমেয় কিছু মানুষের হাতে চলে যাচ্ছে দেশের সম্পদ।
আল্ট্রা ওয়েলথ রিপোর্ট ২০১২-১৩ বলছে, বাংলাদেশে মাত্র ৮৫ জনের হাতে রয়েছে ১ হাজার ৩০০ কোটি ডলার বা প্রায় ১ লাখ ৫ হাজার কোটি টাকার সম্পদ। অর্থাত্ মাত্র ৮৫ জন ব্যক্তির কাছে বাংলাদেশের মোট জিডিপির ১২ শতাংশের বেশি সম্পদ রয়েছে। অন্যভাবে দেখলে চলতি বছর বাজেটের প্রায় অর্ধেকের বেশি বা সমমানের সম্পদ রয়েছে এ ব্যক্তিদের কাছে।
গত মঙ্গলবার সারা বিশ্বে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করে সিঙ্গাপুরভিত্তিক ওয়েলথ এক্স নামে একটি গবেষণাধর্মী প্রতিষ্ঠান। বিশ্বে যাদের কাছে বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ, সম্পত্তি, চিত্রকর্ম ও প্রত্নতত্ত্ব, নিজস্ব উড়োজাহাজ, সামুদ্রিক জাহাজ, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শেয়ার বা মালিকানা, দামি গাড়ি-বাড়ি, ফ্ল্যাট আছে, তাদের দেশভিত্তিক সংখ্যা ও সম্পদের পরিমাণ প্রকাশ করে প্রতিষ্ঠানটি। বিশ্বের সব দেশের বিত্তবানদের সম্পদের ওপর পরিচালিত তথ্যের ভিত্তিতে এ প্রতিবেদন তৈরি হয়। এ ক্ষেত্রে
শুধু বৈধ বা প্রকাশিত সম্পদকে হিসাবে
নেয়া হয়।
তথ্যটি জানার পর বণিক বার্তার পক্ষ থেকে একটি অনুসন্ধান চালানো হয়। দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংক, ব্যবসায়ী, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও অর্থনীতিবিদদের কাছে এ ধরনের তথ্যের সত্যতা সম্পর্কে জানতে চাওয়া হয়। অধিকাংশই এ তথ্যের মধ্যে বস্তুনিষ্ঠতা রয়েছে বলে স্বীকার করেন।
বণিক বার্তা এসব সূত্রের ওপর ভিত্তি করে দেশের অতিধনী ৫০ জনের একটি প্রাথমিক তালিকা প্রস্তুত করলেও নানা বিষয় বিবেচনা করে কারোরই নাম প্রকাশ করছে না। শুধু এ-সম্পর্কিত পর্যালোচনাই তুলে ধরা হচ্ছে।
অর্থনীতিবিদ ড. আহসান মনসুর বলেন, আপাতদৃষ্টিতে ধনীদের নিয়ে এ প্রতিবেদন গ্রহণযোগ্য। তবে বাংলাদেশের সংস্কৃতিতে সম্পদ গোপন, কর ফাঁকি, কমিশন ভোগ, দালালিসহ নানা উপায়ে উপার্জিত সম্পদ গোপন করার প্রবণতা আছে। এটা প্রতিফলিত হলে ভালো হতো।
এ প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, ৮৫ জনের কাছে মোট জিডিপির ১০ শতাংশের বেশি সম্পদ থাকার খারাপ-ভালো দুটো দিকই আছে। পুঁজিবাদ বিষয়টাই এমন। এখানে দুর্নীতি-রাজনৈতিক প্রভাবের মধ্য দিয়ে সম্পদ অর্জনকারী আছেন আবার উদ্ভাবনী শক্তিসম্পন্ন উদ্যোক্তাদের পরিশ্রম ও স্বপ্নও আছে। সারা দুনিয়ায় ধনীরা সম্পদ কমিয়ে দেখানোর চেষ্টা করেন। এটা স্বাভাবিক প্রবণতা। কিন্তু বাংলাদেশের আর্থসামাজিক বাস্তবতায় অল্প কিছু মানুষের কাছে ১৩ বিলিয়ন ডলারের বেশি সম্পদ আছে বলে সাধারণের ধারণা। এটাকে উড়িয়ে দেয়ার কোনো উপায় নেই।
কারা অতিধনী বলে বিবেচিত? এ প্রশ্নের উত্তরে সিঙ্গাপুরের সংশ্লিষ্ট সংস্থার গবেষকরা বলেছেন, ন্যূনতম ৩০ মিলিয়ন ডলার বা ২৫০ কোটি টাকা ও এর ওপরে অর্থ-সম্পদের মালিকদেরই ধনী হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। এ ধনীদের খুঁজে বের করার ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানটি বিশ্বের সেরা ১০ বেসরকারি ব্যাংকের ৮টির কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করেছে। এর পাশাপাশি বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় শিক্ষা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান, অলাভজনক প্রতিষ্ঠান এবং বিলাসবহুল ব্র্যান্ড প্রস্তুতকারক— এমন প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতা নেয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে তথ্য হিসেবে বিত্তশালীদের সম্পদ, আয়, প্যাশন, দান ও অনুদানের আগ্রহের জায়গা, সমাজ-রাষ্ট্রের বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্টতা, রাজনীতি, পরামর্শক, পরিবার তাদের পছন্দ-অপছন্দের মতো গোপনীয় এবং খুঁটিনাটি বিষয় বিবেচনা করা হয়েছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান গোলাম হোসেন এ বিষয়ে বলেন, ধনী কে, এর ন্যূনতম ভিত্তি কী, কত লোক সত্যিকার অর্থে ধনী, তার কোনো হিসাব নেই। কেউ কিছু জানেও না। আবার যারা নিয়মিত কর দেন, তারা যে সবকিছু ঠিকঠাক নিয়মমাফিক দেন, এমন ভাবারও কোনো কারণ নেই। এর পরও একটা বিষয় ঠিক, ধনীদের সংখ্যা বাড়ছে এবং মুষ্টিমেয় কিছু লোকের কাছে হাজার হাজার কোটি টাকার সম্পদও পুঞ্জীভূত হচ্ছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দেশের শীর্ষ এক ব্যাংক কর্মকর্তা জানান, এটি শুধু দেশের অভ্যন্তরে সম্পদের উপস্থিতির কথা বিবেচনা করা হয়, তাহলে ঠিক আছে। কিন্তু অনেক বিত্তশালী বাংলাদেশীর বিদেশে সম্পদ রয়েছে। গত কয়েক বছরে যুক্তরাষ্ট্র-কানাডা-মালেশিয়ায় অনেক ব্যবসায়ী নাগরিকত্ব নিয়েছেন বলেও তিনি দাবি করেন। ফলে দেশের অতিধনীদের সম্পদের পরিমাণ ১ হাজার ৩০০ কোটি ডলার নয়, আরও বেশি হতে পারে বলে তার অনুমান।
ব্র্যাক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতি ও বিভিন্ন সূচকের দিকে তাকালে দেখা যায়, ধনী মানুষ ও তাদের সম্পদের পরিমাণ ক্রমেই বাড়ছে। আমি মনে করি, ধনী লোকের সংখ্যা ও তাদের সম্পদ বাড়ছে, যার প্রতিফলনও সমাজ-রাষ্ট্রে
স্পষ্ট প্রতীয়মান।’
সরকারি ও বেসরকারি তথ্য বলছে, হাজার কোটি টাকার ওপরে ব্যবসায়িক আয়তন আছে, এমন উদ্যোক্তার সংখ্যা নিতান্ত ছোট নয়। এদের মধ্যে কারও কারও ব্যবসায়িক আয়তন ৫-১০ হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত। এদের মধ্যে
কেউবা শুরু করেছেন তামাক ব্যবসা দিয়ে আবার কেউ ওষুধ বা গার্মেন্ট। তবে আদি ব্যবসা না ছেড়েই তারা গড়ে তুলেছেন স্টিল মিল, সিমেন্ট কারখানা, চায়ের বাগান, ডেইরি শিল্পসহ আরও অনেক প্রতিষ্ঠান।
এ বিষয়ে সামিট গ্রুপের চেয়ারম্যান আজিজ খান বলেন, ‘দুনিয়ায় ন্যূনতম ১ বিলিয়ন ডলারের কম সম্পদ কারও থাকলে তাকে ধনী বলা হয় না। বিল গেটস, ওয়ারেন বাফেটরা শত বিলিয়ন ডলারের মালিক। পাশের দেশ ভারতেই অন্তত ১৩ জন ব্যবসায়ী আছেন, যাদের প্রত্যেকের ব্যক্তিগত সম্পদের পরিমাণ ১৩ বিলিয়ন ডলার বা তারও বেশি আর ৮৫ জনের কাছে ১৩ বিলিয়ন ডলার। এটা কোনো সম্পদ হলো? সম্পদ নেই বলে বিনিয়োগ করতে পারি না আমরা। এ কারণেই মনে হচ্ছে, মুষ্টিমেয় কিছু লোকের কাছে অনেক সম্পদ।’
http://bonikbarta.com/?view=details&pub_no=189&menu_id=1&news_id=24013&news_type_id=1

Sunday, December 30, 2012

২০১২: রাজনীতিতে ছিল ব্যাপক আলোড়ন

২০১২ সালে আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক অঙ্গনে বারবার আলোড়ন সৃষ্টি করেছে বিভিন্ন ঘটনা। যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা বিশ্ব, মধ্যপ্রাচ্য, এশিয়া, লাতিন আমেরিকা ও আফ্রিকার দেশগুলোতে রাজনৈতিক উত্থান-পতনের ঘটনা ছিল লক্ষণীয়
ছবি: সৌজন্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট পদে পুনরায় বারাক ওবামার নির্বাচিত হওয়া, রাশিয়ায় ভ্লাদিমির পুতিনের আবার প্রেসিডেন্ট হওয়া, মিসরে মোবারক-পরবর্তী গণতান্ত্রিক নির্বাচনে মুসলিম ব্রাদারহুড-সমর্থিত মোহাম্মদ মুরসির প্রেসিডেন্ট হওয়া ও ইসলামপন্থীদের উত্থান, ভেনেজুয়েলায় হুগো চাভেজের ক্ষমতায় বহাল থাকা, চীনে নেতৃত্বের পালাবদল—এমন অনেক ঘটনাই সারা বিশ্বে বেশ নাড়া দিয়েছে। 

সিরিয়ায় গৃহযুদ্ধ এখনো চলছে। সেখানে এ পর্যন্ত ৪৪ হাজারের বেশি লোক নিহত হয়েছে। গাজায় ফিলিস্তিন মুক্তিযোদ্ধা সংগঠন হামাস ও ইসরায়েলি সেনাদের আট দিনের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধও ছিল আলোচনায়। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়া এবং সে দেশে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সম্ভাব্য হামলা নিয়ে গুঞ্জনের কমতি ছিল না।
ওবামায় আস্থা: ২০০৮ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়ে ইতিহাস গড়েছিলেন বারাক ওবামা। দেশের দুই শতাব্দীর বেশি সময়ের ইতিহাসে প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ প্রেসিডেন্ট হিসেবে প্রবেশ করেছিলেন হোয়াইট হাউসে। ৬ নভেম্বর সেই সাফল্যের রেকর্ড তিনি যেন নিয়ে গেলেন অনন্য উচ্চতায়। কারণ, মন্দায় বিপর্যস্ত অর্থনীতি, নৈরাশ্যজনক বেকারত্বের ছায়া আর শেষ মুহূর্তে জ্বলে ওঠা শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বীর কঠিন বাধা পেরিয়ে দ্বিতীয় মেয়াদের জন্য জনগণের রায় পেয়েছেন তিনি। মার্কিন ভোটাররা তাঁর ওপর আস্থা রেখেছেন। সমীহ জাগানো ব্যবধানে রিপাবলিকান চ্যালেঞ্জারকে হারিয়েছেন বারাক ওবামা। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ৫৩৮টি ইলেকটোরাল কলেজ (নির্বাচকমণ্ডলী) ভোটের মধ্যে তিনি পেয়েছেন ৩৩২টি, যেখানে জয়ের জন্য প্রয়োজন ২৭০ ভোট। ওবামার প্রতিদ্বন্দ্বী রিপাবলিকান পার্টির প্রার্থী মিট রমনি পেয়েছেন ২০৬ ভোট।
ক্রেমলিনে পুতিন: ভ্লাদিমির পুতিন তৃতীয় মেয়াদে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেন ৭ মে। এর মধ্য দিয়ে ছয় বছরের জন্য ক্রেমলিনে উঠলেন তিনি। তাঁর ক্রেমলিনে প্রত্যাবর্তনের প্রতিবাদে কয়েক দিন রাশিয়ায় ব্যাপক বিক্ষোভ হয়েছে। এ সময় পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষ হয়। বিক্ষোভকারীদের দমনে ব্যাপক ধরপাকড় করে সরকার। বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, ক্ষমতা আঁকড়ে থাকার জন্য পুতিন অধিকার লঙ্ঘন করেছেন। এ ছাড়া গত ৪ মার্চ অনুষ্ঠিত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনেও বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ আনা হয়েছে। পুতিন যদি ২০১৮ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকতে পারেন, তাহলে তিনি জোসেফ স্তালিনের পর সবচেয়ে বেশি দিন মস্কো শাসনকারী সোভিয়েত নেতা লিওনিদ ব্রেজনেভের সমকক্ষ হবেন।
আবারও চাভেজ: গত ৭ অক্টোবরের নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট পুনর্নির্বাচিত হন ভেনেজুয়েলার নেতা হুগো চাভেজ। এর মধ্য দিয়ে টানা চতুর্থবারের মতো জয়ী হলেন তিনি। নির্বাচনে জয়ী করে দেশের জনগণ আগামী ছয় বছরের জন্য দেশের শাসনভার আবার বামপন্থী এই নেতার হাতে অর্পণ করেছে। গত এক দশকের মধ্যে এই নির্বাচনকে সবচেয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ বলে মনে করা হয়। নির্বাচন পর্ষদঘোষিত ফলাফলে দেখা যায়, প্রেসিডেন্ট হুগো চাভেজ পেয়েছেন ৫৪ শতাংশের কিছু বেশি ভোট। চাভেজ ১৯৯৯ সাল থেকে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট পদে আছেন। গত বছর ক্যানসারের চিকিত্সা নেন তিনি। এর পরিপ্রেক্ষিতে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অংশগ্রহণ ও তাঁর পুনর্নির্বাচিত হওয়া নিয়ে অনেকের মধ্যেই সংশয় ছিল।
চীনে নতুন নেতৃত্ব: চীনের ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিসি) ১৮তম সম্মেলনে দেশের নতুন নেতৃত্ব নির্বাচন করা হয়েছে। সম্মেলনের মধ্য দিয়ে সিপিসির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম পলিট ব্যুরো স্ট্যান্ডিং কমিটিতে শি জিনপিং ও লি কেকিয়াং ছাড়া স্থান পেয়েছেন ঝাং দেজিয়াং, ইউ ঝেংশেং, লিউ ইউনসান, ওয়াং কিসান ও ঝাং গাওলি। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী মার্চে চীনের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেবেন জিনপিং। প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পাবেন কেকিয়াং। অন্যরাও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পাবেন। জিনপিং বর্তমানে ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। কেকিয়াং দায়িত্ব পালন করছেন উপপ্রধানমন্ত্রী হিসেবে। সিপিসির ১৮তম সম্মেলন ৮ নভেম্বর শুরু হয়ে ১৪ নভেম্বর শেষ হয়। এবারের সম্মেলনে সর্বসম্মতিতে সংস্কারের পক্ষে মত দিয়েছেন দলীয় নেতারা। এ জন্য দলের শাসনতন্ত্রেও পরিবর্তন আনা হয়েছে। তবে বিশ্লেষকেরা বলছেন, এই সংস্কারই হবে নতুন নেতৃত্বের জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
জাপানের ক্ষমতায় শিনজো: প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের রেকর্ড গড়ে জাপানের ভোটারদের চরমভাবে হতাশ করেছে ক্ষমতাসীন ডেমোক্রেটিক পার্টি (ডিপিজে)। এ কারণে পার্লামেন্ট নির্বাচনে এই দলের ভরাডুবি হয়েছে। শিনজো আবের নেতৃত্বাধীন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি) পেয়েছে বিপুল বিজয়। ১৬ ডিসেম্বর জাপানের পার্লামেন্ট নির্বাচনে ভোট নেওয়া হয়।
পর্যবেক্ষক রাষ্ট্র ফিলিস্তিন: দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর জাতিসংঘের অসদস্য পর্যবেক্ষক রাষ্ট্রের স্বীকৃতি পেয়েছে ফিলিস্তিন। গত ২৯ নভেম্বর সাধারণ পরিষদে এ-বিষয়ক প্রস্তাবটি বিপুল ভোটে অনুমোদিত হয়। এর মধ্য দিয়ে সার্বভৌম রাষ্ট্রের পথে ফিলিস্তিন আরেক ধাপ এগিয়ে গেছে বলে মনে করা হচ্ছে। প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত বেশ কটি দেশ এবং রাশিয়া, চীন, ভারতসহ মোট ১৩৮টি দেশ। যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েলসহ মাত্র নয়টি দেশ এর বিপক্ষে ভোট দিয়েছে। ভোটদানে বিরত ছিল যুক্তরাজ্য, জার্মানিসহ ৪১টি দেশ। ফিলিস্তিন এত দিন জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে ‘পর্যবেক্ষক ভূখণ্ড’ হিসেবে যোগ দিত। এখন তারা ‘সদস্য নয় এমন পর্যবেক্ষক রাষ্ট্র’ হিসেবে মর্যাদা পাবে। এখন থেকে ফিলিস্তিনের প্রতিনিধি জাতিসংঘ অধিবেশনের বিতর্কে অংশ নিতে পারবেন। ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস এই রায়কে সার্বভৌম ফিলিস্তিনের ‘জন্মসনদ’ বলে অভিহিত করেছেন। সাধারণ পরিষদে ফিলিস্তিনের এই মর্যাদার উন্নীতকরণে যুক্তরাষ্ট্র ‘হতাশা’ ও ইসরায়েল ‘ক্ষোভ’ প্রকাশ করেছে।
মার্কিন রাষ্ট্রদূত নিহত: যুক্তরাষ্ট্রে নির্মিত একটি ইসলামবিরোধী চলচ্চিত্রের জেরে ১১ সেপ্টেম্বর লিবিয়ার বেনগাজিতে অবস্থিত মার্কিন উপদূতাবাসে সন্ত্রাসী হামলা হয়। এতে মার্কিন রাষ্ট্রদূত ক্রিস্টোফার স্টিভেন্সসহ একজন সেনা ও দুই কর্মকর্তা নিহত হন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন ও পরবর্তী রাজনীতিতে বেনগাজির ঘটনা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পরিণত হয়। রিপাবলিকানদের অভিযোগ, লিবিয়ায় মার্কিন কূটনীতিকদের নিরাপত্তার ব্যবস্থা জোরালো করার আহ্বান অগ্রাহ্য করেছে ওবামা প্রশাসন। ওই হামলার দায় নিজের কাঁধে তুলে নিয়ে ওবামাকে স্বস্তি দিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন।
মালালা গুলিবিদ্ধ: গত ৯ অক্টোবর পাকিস্তানের কিশোরী মালালা ইউসুফজাই তালেবানের গুলিতে আহত হয়। নারীশিক্ষার উন্নয়নে কাজ করতে গিয়ে তালেবানের রোষানলে পড়ে অকুতোভয় এই কিশোরী। একই ঘটনায় তার দুই সহপাঠীও আহত হয়। এ ঘটনায় সারা বিশ্বে সমালোচনার ঝড় ওঠে। বর্তমানে যুক্তরাজ্যের বার্মিংহামে চিকিত্সা নিচ্ছে মালালা।
মিয়ানমারে সহিংসতা: গত জুনের পর থেকে রাখাইন রাজ্যের জাতিগত বৌদ্ধ ও রোহিঙ্গাদের মধ্যকার দুই দফার সহিংসতায় মিয়ানমারে লক্ষাধিক মানুষ ঘরছাড়া হয়। সহিংসতায় সেখানে প্রায় ৩০ হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়। হাজার হাজার ঘরবাড়িতে আগুন দেওয়া হয়। সরকারি হিসাবে দুই দফা সহিংসতায় কমপক্ষে ১৬৮ জন নিহত হয়েছে।
মিসরের খসড়া সংবিধান: মিসরে বছরজুড়ে চলেছে রাজনৈতিক সংকট। প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসির ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং নতুন সংবিধানকে কেন্দ্র করে এ সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে। গত ২২ নভেম্বর মুরসির ডিক্রি জারির পর সেখানে সহিংস বিক্ষোভ ও ধর্মঘট শুরু হয় এবং ইসলামপন্থী প্রেসিডেন্ট মুরসির সঙ্গে বিচার বিভাগের বিরোধ তৈরি হয়। পার্লামেন্টে পাস হওয়া খসড়া সংবিধানের ওপর গণভোটের ডাক দেন মুরসি। ১৫ ডিসেম্বর প্রথম দফায় এবং ২২ ডিসেম্বর দ্বিতীয় দফায় গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। গণভোটের রায় খসড়া সংবিধানের পক্ষে গেছে।
http://www.prothom-alo.com/detail/date/2012-12-30/news/317373

১১ বছর ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে

রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ
১১ বছর ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে আজিজুলকে!
শরিফুল হাসান | তারিখ: ৩০-১২-২০১২

আজিজুল হক সরকারি প্রতিষ্ঠান হাউস বিল্ডিং ফাইন্যান্স করপোরেশনের সহকারী মহাব্যবস্থাপক ছিলেন। ১৯৯৭ সালে তিনি রাজউকের সম্প্রসারিত উত্তরা তৃতীয় পর্বের আবাসিক এলাকায় সরকারি প্লটের জন্য আবেদন করেন। ২০০১ সালে লটারিতে তিনি একটি প্লট পান। কিন্তু ওই প্লট নিয়ে এখন তাঁর জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে।
২০০১ সালের ৫ মে রাজউক প্লট বরাদ্দ পাওয়াদের যে তালিকা প্রকাশ করে, সেখানে বাবার নাম, আবেদন নম্বর, ব্যাংক রসিদ, বরাদ্দ তালিকার ক্রমিক—সব ঠিক থাকলেও আজিজুল হকের নাম অহিদুল হক ছাপা হয়। এই ভুলের বিষয়ে রাজউকে যোগাযোগ করলে কাগজপত্র দেখে সঙ্গে সঙ্গে তাঁকে বলা হয়, ভুল সংশোধনের জন্য একটা আবেদন করলেই চলবে। তিনি আবেদন করেন। কিন্তু আনুষ্ঠানিক যাচাই-বাছাই করতে চলে গেল তিন বছর। ২০০৪ সালে রাজউকের পরিচালনা পর্ষদ তাঁকে প্লটটির বরাদ্দপত্র দেওয়ার প্রস্তাব অনুমোদন করে।
তারপর? কিন্তু আজিজুলকে সে বরাদ্দপত্র না দিয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ে। মন্ত্রণালয় বলেছে, রাজউকই এ সিদ্ধান্ত নিতে পারে। তারপর? তারপর আর আজিজুলের নথি নড়ে না। আজিজুল আবার আবেদন করেন। আবার নতুন করে নথি তৈরি হয়। নিচ থেকে সে নথি ওপরে ওঠে। এভাবে কাটে আরও আট বছর। এই সময়ে আরও দুবার রাজউকের পরিচালনা পর্ষদ তাঁকে প্লট বুঝিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত দেয়। কিন্তু সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হয় না।
এ সরকারের সময়ে আজিজুল হক গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী, রাজউকের চেয়ারম্যান, সদস্য— সবার দ্বারে দ্বারে ধরনা দিয়েছেন। প্রত্যেকেই বলেছেন, এটা তো হয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু কিছুই হয় না। আাাজিজুল ঘুরতে থাকেন।
আজিজুল হক প্রথম আলোকে বলেন, ‘এই সরকারের সময়ে আমি পূর্ত প্রতিমন্ত্রীর কাছে গিয়েছি। রাজউকের চেয়ারম্যান নূরুল হুদার সঙ্গে অন্তত ১০ বার দেখা করেছি। সদস্য (সম্পত্তি) আখতার হোসেন ভূঁইয়ার সঙ্গে গত দুই বছরে অন্তত ৩০ বার দেখা করেছি। আমার সামনে তাঁর অধস্তন পরিচালক, সহকারী পরিচালককে ডাকেন তিনি। নির্দেশ দেন। কিন্তু কিছুই হয় না।’
২০০৪ সালের ৯ মে রাজউক সাধারণ সভায় সব সদস্যের উপস্থিতিতে আজিজুল হকের নামে প্লটের চূড়ান্ত বরাদ্দপত্র জারি করার সিদ্ধান্ত অনুমোদন করা হয়। কিন্তু বরাদ্দপত্র আর জারি হয়নি। কয়েক বছর পর তাঁর বরাদ্দপত্র উল্টো বাতিলও হয়ে যায়। আবার ছুটতে শুরু করেন আজিজুল। আবারও আবেদন এবং নানা দপ্তর পেরিয়ে পরিচালনা পর্ষদ। ২০০৮ সালের ২১ জানুয়ারি পর্ষদের সভায় সভাপতিত্ব করেন রাজউকের সেই সময়ের চেয়ারম্যান কে এ এম হারুন। সভার নথিতে বলা আছে, ‘মন্ত্রণালয় নথি না পাওয়ায় আজিজুল হকের বরাদ্দ বাতিল করা হয়েছে। তাঁর সব কাগজপত্র ঠিক আছে। তিনি যথাসময়ে হলফনামা ও অঙ্গীকারনামা দিয়েছেন। মন্ত্রণালয়ের চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে রাজউক থেকে প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে। অতএব, আজিজুল হকের প্লট বরাদ্দদানের বিষয়ে অনুমতির জন্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হলো।’
রাজউকের সর্বোচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের এ সিদ্ধান্ত আবারও আটকে গেল। গেল আরও নয় মাস। রাজউকের চেয়ারম্যান পাল্টে গেছে। আসছেন গোলাম কিবরিয়া। ২০০৮ সালের ২১ অক্টোবর পরিচালনা পর্ষদের সভায় আজিজুলের নথি এবং আবারও তাঁর নামে প্লট বরাদ্দের সিদ্ধান্ত হলো। কিন্তু ওই পর্যন্তই।
বারবার একই ঘটনা ঘটায় ২০১০ সালের ১১ জানুয়ারি আজিজুল হক দেখা করেন গৃহায়ণ প্রতিমন্ত্রী আবদুল মান্নান খানের সঙ্গে। ১৭ জানুয়ারি তিনি বিষয়টি সমাধান করার জন্য নির্দেশনা দেন রাজউকের চেয়ারম্যানকে। আজিজুল দেখলেন রাজউকের তৃতীয় চেয়ারম্যান। কিন্তু বরাদ্দপত্র দেখলেন না। বর্তমান চেয়ারম্যান নূরুল হুদাও বারবার আশ্বাস দেন, হয়ে যাবে। কিন্তু বাস্তবতা একই।
সর্বশেষ তিন বছর ধরে আজিজুলের নথিটি পড়ে আছে রাজউকের সম্পত্তি শাখার সহকারী পরিচালক হাফিজুর রহমানের দপ্তরে।
আজিজুল হক বলেন, ‘১১ বছর ঘুরে আমি যেটা এখন বুঝতে পারছি, তা হলো কিছু কর্মকর্তা আমার কাছে ঘুষ চায়। এদের কয়েকজন আবার চায়, বরাদ্দের পর আমি যেন প্লটটি কিছু টাকাপয়সার বিনিময়ে তাদের দিয়ে দেই। কিন্তু আমি সারাজীবন নীতি মেনে চাকরি করেছি। আমি কখনো অন্যায় করিনি, করবও না। দুঃখ হলো, আমাকেই আল্লাহ এনে ফেলেছে দুর্নীতিবাজদের খপ্পরে। তার পরও ছেলেমেয়েদের কথা চিন্তা করে আমি তাদের দ্বারে দ্বারে ঘুরছি। আর ভালো লাগে না! এই দেশে কি মন্ত্রী, রাজউক চেয়ারম্যানের চেয়ে কর্মচারীরা শক্তিশালী?’
রাজউক সূত্রে জানা গেছে, সম্পত্তি শাখার পরিচালক খিজির আহমেদ ও সহকারী পরিচালক হাফিজুর রহমানকে রাজউকের চেয়ারম্যান ও সদস্যরা অনেকবার বলেছেন আজিজুল হকের কাগজপত্র বুঝিয়ে দিতে। কিন্তু তাঁরা নানা সময়ে মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন লাগবে, সচিবের সিদ্ধান্ত লাগবে—এসব বলে তাঁকে ঘুরিয়েছেন। হাফিজুর রহমান সম্প্রতি অন্য এক ঘটনায় ওএসডি (বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা) হয়েছেন। রাজউকে গিয়ে তাঁকে পাওয়া যায়নি। মুঠোফোন বন্ধ থাকায় তাঁর সঙ্গে কথাও বলা যায়নি।
আর খিজির আহমেদের কাছে আজিজুল হকের দুর্ভোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘নথিপত্র না দেখে এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করা যাবে না।’
যাঁর কাছে নথি, সেই খিজির আহমেদ নথি না দেখে আজিজুলের ব্যাপারে কিছু বলতে না পারলেও রাজউকের সদস্য (সম্পত্তি) আখতার হোসেন ভূঁইয়া বলতে পারলেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘কিছু কারণে আসলে তাঁর কাজটি আটকে আছে। আর একবার কোনো কারণে ফাইল পিছিয়ে গেলে সেটি আর কেউ সামনে আনতে চায় না। তবে আজিজুল হক আমার সঙ্গে কয়েকবার দেখা করেছেন। আমি আমার কর্মকর্তাদের এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছি। কিন্তু কেন হলো না, আমি বলতে পারছি না। আমি আবারও আমার কর্মকর্তাদের দ্রুত এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে বলব। আর একজন মানুষের এ ভোগান্তির জন্য আমরাও লজ্জিত।’
আর রাজউকের চেয়ারম্যান নূরুল হুদা গতকাল শনিবার প্রথম আলোকে বললেন, ‘বোর্ড এবং আমার নির্দেশের পরেও কোনো কর্মকর্তার অবহেলায় যদি ওই ফাইলটি আটকে থাকে এবং আজিজুল হক যদি আমার কাছে এসে সেটি বলেন, তাহলে অবশ্যই দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
৬৬ বছর বয়সী আজিজুল হককে আবার রাজউক চেয়ারম্যানের কাছে যেতে হবে!
http://www.prothom-alo.com/detail/date/2012-12-30/news/317308

Saturday, December 29, 2012

শৈত্যপ্রবাহ থাকবে আরও কয়েক দিন

কয়েক দিন ধরে উত্তরাঞ্চলের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া শৈত্যপ্রবাহ গত বৃহস্পতিবার থেকে মাঝারি শৈত্যপ্রবাহে রূপ নিয়েছে। এর প্রভাবে গতকাল সারা দেশে শীতের তীব্রতা বৃদ্ধি পায়। শৈত্যপ্রবাহ দক্ষিণ ও পশ্চিমাঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়েছে। আরও কয়েক দিন এ ধারা অব্যাহত থাকবে বলে আবহাওয়া অধিদফতরের পূর্বাভাসে জানানো হয়েছে।
গতকাল সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত (পূর্ববর্তী ২৪ ঘণ্টায়) দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় যশোরে ৭ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আর ঢাকায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ১০ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
আবহাওয়া অধিদফতর বলছে, মধ্য রাত থেকে দুপুর পর্যন্ত দেশের নদী অববাহিকায় ঘন কুয়াশা এবং অন্যত্র মাঝারি থেকে ঘন কুয়াশা থাকতে পারে। এ সময় ময়মনসিংহ, মাদারীপুর, কুমিল্লা, হাতিয়া ও শ্রীমঙ্গলসহ রংপুর, খুলনা ও বরিশাল বিভাগের ওপর মৃদু থেকে মাঝারি ধরনের শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যেতে পারে। সারা দেশে রাত এবং দিনের তাপমাত্রা প্রায় অপরিবর্তিত থাকতে পারে।
রাজশাহী, রংপুর, খুলনা, বরিশাল ও সিলেট বিভাগের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া মাঝারি শৈত্যপ্রবাহের প্রভাবে মধ্যাঞ্চল মূলত ঢাকা ও আশপাশের তাপমাত্রা কমে গেছে। ঢাকায় এ অবস্থা আরও কয়েক দিন থাকবে।
আবহাওয়াবিদ হাফিজুর রহমান বলেন, চলমান শৈত্যপ্রবাহ ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিভাগের কিছু কিছু এলাকায়ও বিস্তৃত হবে। তবে তা মৃদু আকারে থাকবে। আর জানুয়ারিতে তীব্র  শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এ সময় তাপমাত্রা ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নেমে আসতে পারে।
এদিকে গতকাল ঘন কুয়াশায় মাওয়া-কাওড়াকান্দি রুটে ১০ ঘণ্টা ও দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া রুটে ৯ ঘণ্টা ফেরি চলাচল বন্ধ থাকে।
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন করপোরেশন (বিআইডব্লিউটিসি) মাওয়া ঘাটের সহকারী ব্যবস্থাপক শেখর চন্দ্র রায় জানান, মাওয়া-কাওড়াকান্দি নৌরুটে বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ১২টায় ফেরি চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে ফেরি চলাচল শুরু হয়। বৃহস্পতিবার রাতে মাঝপদ্মায় চারটি ফেরি প্রায় ১০০ যানবাহন নিয়ে আটকা পড়ে। কুয়াশা এতটাই ঘন যে, নৌপথের স্বল্প দূরত্বের কোনো কিছুই চোখে না পড়ায় দুর্ঘটনা এড়াতে রাত সাড়ে ১২টার দিকে নৌচলাচল বন্ধ রাখা হয়েছিল।
বিআইডব্লিউটিসির পাটুরিয়া কার্যালয়ের ব্যবস্থাপক আশরাফ উল্লাহ খান বলেন, কুয়াশার কারণে পাটুরিয়া ঘাট থেকে রাত ১১টায় ফেরি চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। গতকাল সকাল সাড়ে ৮টা পর্যন্ত ফেরি চলাচল বন্ধ থাকে। এর কিছুক্ষণ আগেও বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমান নামে একটি ফেরি দৌলতদিয়া ঘাট থেকে পাটুরিয়া যাওয়ার পথে মাঝনদীতে আটকা পড়ে।
এদিকে ঘনকুয়াশায় পদ্মা, মেঘনা ও ধলেশ্বরী নদীতে নৌযান চলাচল বিঘ্নিত হয়। দক্ষিণাঞ্চল থেকে ছেড়ে আসা লঞ্চগুলো রাত ৪টার পরিবর্তে ৬ ঘণ্টা দেরিতে রাজধানীতে পৌঁছায়।
http://bonikbarta.com/?view=details&menu_id=1&pub_no=187&news_id=23752

শীতের তীব্রতা বাড়ছেই দুর্ভোগ চরমে

স্বাস্থ্য দফতরের উদাসীনতায় এক সপ্তাহে সারাদেশে ৭২ জন মারা গেছে। এর মধ্যে ৩৭ জন শিশু রয়েছে। ওই শিশুরা হাইপোথার্মিয়া অর্থাৎ শীতের দাপটে মারা গেছে এমন কথা স্বীকার করে নিয়েছেন বিভিন্ন জেলা-উপজেলা স্বাস্থ্য কমপে­· অফিসাররা। শুক্রবার সারাদেশে ১৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ৭ শিশু রয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, জেলা-উপজেলা পর্যায়ে সরকারি স্বাস্থ্য কমপে­·গুলোতে শীতজনিত কারণে শিশুদের সুচিকিৎসায় প্রয়োজনীয় চিকিৎসক কিংবা সরঞ্জাম নেই। রংপুর, পঞ্চগড়, লালমনিরহাট, রাজশাহী, ঠাকুরগাঁও, কুড়িগ্রামসহ উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলোতে শীতের দাপট দিন দিন বাড়ছে। বাড়ছে তীব্র শীতের দাপটও। রংপুরে গত এক সপ্তাহে ১১ জন শিশু মারা গেছে। কুড়িগ্রামে ৭ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। পঞ্চগড়ে এ পর্যš— ৬ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। ঠাকুরগাঁওয়ে ১১ জনের মৃত্যু হয়েছে। তাছাড়া বিভিন্ন জেলায় শীতের দাপটে প্রতিনিয়তই শিশুসহ বৃদ্ধরা মারা যাওয়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে। এসব এলাকায় প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও শীতবস্ত্র না থাকা ও অ¯^াভাবিক হারে শিশুমৃত্যুর ঘটনা ঘটে যাওয়ায় তীব্র ¶োভ সৃষ্টি হচ্ছে। স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা কিংবা সংশি­ষ্ট জনপ্রতিনিধিরা শীতবস্ত্র বিতরণে এগিয়ে আসছে না বলেও অভিযোগ রয়েছে। তবে বেশ কয়েক জনজনপ্রতিনিধি বলেছেন, দেশের ধনাঢ্য ব্যক্তিরা শীতবস্ত্র বিতরণে এগিয়ে এলে অনেক শিশুর প্রাণ বাঁচবে। উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলোতে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, দিন দিন শীতের দাপট বাড়ছে। শীতের তীব্রতা মানুষের মধ্যে মারাত্মকভাবে প্রভাব ফেলছে। দরিদ্র ও খেটে খাওয়া মানুষ ভীষণ দুর্ভোগে পড়েছে। জানা যায়, আবহাওয়া দফতর সরকারিভাবে তাপমাত্রা আরও নেমে যাওয়ার সতর্কবার্তা দেয়ার পরও সদর হাসপাতালে শীত নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় কোন ব্যবস্থা নেয়নি হাসপাতাল কর্তৃপ¶। শুক্রবারও সারাদেশে শীতের দাপটে ১৬ জন মারা গেছেন। এর মধ্যে ৬ জন ছিল শিশু।
শুক্রবার সকালে রাজধানীর শিশু হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, শীতজনিত রোগে শিশুদের ভর্তি অনেক বেশি। জানা যায়, দেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলা ¯^াস্থ্যকেন্দ থেকে রেফার হওয়া অসুস্থ শিশুরা রাজধানীর এ শিশু হাসপাতালসহ বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে। শিশু হাসপাতালের প্রথম তলার ১ ন¤^র শিশু ওয়ার্ডে আকাশ নামক দেড় বছরের শিশুকে মা শাহেলা আক্তার জড়িয়ে ধরে কাঁদছেন। জানালেন, নারায়ণগঞ্জ থেকে তিনি এসেছেন। শীতে তার শিশুর শ্বাসকষ্ট বেড়ে গেছে। ২নং ওয়ার্ডের ৭ ন¤^র বেডে থাকা শিশু ইমরানের দেহ নীল হয়ে গেছে। শীতে নিউমোনিয়ায় ভুগছেন। মা শাহীনুর বেগম জানালেন, স্থানীয় হাসপাতালে চিকিৎসা করিয়ে কোন লাভ হয়নি, তাই শিশু হাসপাতালে নিয়া আসা। দ্বিতীয় তলার ২নং ওয়ার্ডের ৫ ন¤^র বেডে থাকা শিশু সালমা ৫ দিন ধরে শীতজনিত রোগে ভর্তি রয়েছে। ৪৫ ন¤^র বেডে থাকা শিশু মাসুদকে ভাল্বের আলো পাশে রেখে তাপ দিচ্ছেন ফুফু নাছিমা।
শিশু হাসপাতালের ওয়ার্ড মাস্টার হার“নুর রশিদ জানান, হাসপাতালটিতে ৫৬০টি বেড রয়েছে। দিন দিন রোগী বাড়ছে। শিশু রোগ চিকিৎসায় এ হাসপাতালে সচেতনতার সঙ্গে চিকিৎসা প্রদান করা হচ্ছে। ইমারজেন্সিতে থাকা ডা. লুনা জানান, বিভিন্ন জেলা থেকে শীতজনিত রোগে শিশুরা এখন বেশি আসছে। বেশির ভাগ শিশুই নিউমোনিয়ায় আক্রাš— হয়ে আসছে। ডা. লুনা বলেন, এ হাসপাতালে যেসব শিশু ভর্তি হচ্ছে তাদের অনেকেই জেলা-উপজেলা থেকে রেফার করা।
শুক্রবার দুপুরে আইসিডিডিআরবি ঢাকা হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, শীতজনিত রোগে ভোগা শিশুরা ভর্তি রয়েছে বেশি। দুপুর ২টা ৪৬ মিনিটে কথা হয় আইসিডিডিআরবির ইমারজেন্সিতে থাকা ডা. রাকিবুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি জানান, তাদের হাসপাতালে বেশির ভাগ শিশু ডায়রিয়াজনিত অবস্থায় ভর্তি হয়। তিনি জানান, তীব্র শীত ও গরমে শীতজনিত রোগেই শিশুরা বেশি আসছে। এখানে নিউমোনিয়ায় আক্রাš— শিশুদেরও চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। আলাদা করে নিউমোনিয়া আক্রাš— শিশুদের চিকিৎসা প্রদান করা হচ্ছে। তিনি বলেন, শীতজনিত কারণে কোল্ড ডায়রিয়াসহ নানা রোগই হতে পারে। কোনো শিশুকেই এখান থেকে ফেরত দেয়া হয় না। সম্পূর্ণ বিনা মূল্যে যথাযথ উন্নত চিকিৎসা দেয়া হয়। আইসিডিডিআরবি রেজিস্ট্রারের দায়িত্বে থাকা মোর্শেদ জানান, শীতে শিশু রোগীরা আসছে বেশি। শুক্রবার দুপুর ২টা ৫৩ মিনিট পর্যš— ২৬২ শিশু ভর্তি হয়েছে। প্রতিদিন প্রায় ৩ থেকে সাড়ে তিনশ’ শিশু ভর্তি হচ্ছে। যুগাš—র ব্যুরো ও প্রতিনিধিদের পাঠানো খবরÑ
রংপুর : রংপুর ব্যুরোপ্রধান মাহবুব রহমান জানান, গত এক সপ্তাহে তীব্র শীতে রংপুরে ১১ শিশু মারা গেছে। ১০ দিন ধরে সূর্যের আলোর দেখা মিলছে না। শীতবস্ত্রের অভাবে দরিদ্র শ্রেণীর লোকজন মারাÍক দুর্ভোগে পড়ছেন।
কুড়িগ্রাম : কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি আহসান হাবীব নীলু জানান, এক সপ্তাহে কমপ¶ে ৭ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। ৪৫০টি দ্বীপ চরে মানবতায় জীবন ধারণ করছেন লোকজন। প্রায় ২শ’ কিলোমিটার বাঁধ এলাকায় দরিদ্র লোকজন বিশেষ করে শিশুরা শীতের দাপটে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
ঠাকুরগাঁও : এক সপ্তাহে প্রায় ১১ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। দিন দিন শীতের দাপট বাড়ছে। শুক্রবার পর্যš— সদর হাসপাতালে ১৬০ শিশু শীতজনিত রোগে ভর্তি রয়েছে।
পঞ্চগড় : পঞ্চগড় প্রতিনিধি এসএ মাহমুদ সেলিম জানান, এ পর্যš— শীতজনিত রোগে ৬ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। সদর হাসপাতালে প্রায় অর্ধশত শিশু ভর্তি রয়েছে। জেলার দরিদ্র এলাকার লোকজন শীতবস্ত্রের অভাবে মারাত্মক দুর্ভোগে পড়ছে।
বরিশাল ব্যুরো : বরিশালে ৪৮ ঘণ্টায় আগুন জ্বালিয়ে শীত নিবারণ করতে গিয়ে বিভিন্ন স্থানে আগ্নিদগ্ধ হয়ে শেবাচিম হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ১৬ জন, যার মধ্যে এক জনের মৃত্যু ঘটেছে। এ ছাড়া ৪ জনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। বৃহস্পতিবার শেবাচিম হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু হয় র“বি বেগমের। সে পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জের ঘটকের আন্দুয়া গ্রামের কেরামত আলীর স্ত্রী। বুধবার খড়কুটায় আগুন দিয়ে শীত নিবারণ করতে গিয়ে তার শরীরে আগুন লেগে যায়। এ ছাড়া শীত নিবারণ করতে গিয়ে দগ্ধ হয়েছে বরিশাল নগরীর পলাশপুর এলাকার মোঃ কাওছার হোসেন, সদর উপজেলার উত্তর কড়াপুর এলাকার বাসিন্দা বৃদ্ধা সমেত বান, নবগ্রাম রোড এলাকার বাসিন্দা লিপি বেগম, রহমতপুর এলাকার নূর জাহান বেগম, মেহেন্দীগঞ্জ উপজেলার শারমিন বেগম, বাকেরগঞ্জ উপজেলার জাকিয়া বেগম, জাকির হোসেন, রিফাত, হƒদয়, আগৈলঝাড়া উপজেলার বাসিন্দা শাখয়াত হোসেন ও রাজাপুর উপজেলার পাখি বেগমসহ ১৫ জন।
কিশোরগঞ্জ ব্যুরো : প্রচÊ শীতে শুক্রবার কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চলে দুই বৃদ্ধের মৃত্যু হয়েছে। এ ছাড়া একই কারণে অর্ধশত গবাদিপশুর প্রাণহানি ঘটেছে। নিহত বৃদ্ধরা হচ্ছেন অষ্টগ্রাম উপজেলার কাস্তুল ইউনিয়নের ব্রাহ্মপাড়া গ্রামের মোজাব মিয়া ও উপজেলার হাবিলীরপাড় গ্রামের শফি মিয়া।
রায়গঞ্জ (সিরাজগঞ্জ) : রায়গঞ্জে হাড় কাঁপানো শীতে জনজীবন বিপর্য¯— হয়ে পড়েছে। শুক্রবার সকালে তীব্রশীতেআড়ষ্ট হয়ে চান্দাইকোনা ইউনিয়নের সরাইদহ গ্রামের মৃত রহমতুল­াহর স্ত্রী গোলেজান বেওয়ার মৃত্যু হয়েছে। ৫ দিনে এ নিয়ে ২ জনের মৃত্যু হলো।
ভাÊারিয়া : টানা কয়েক দিনের শৈত্যপ্রবাহ আর তীব্র শীতে ভাÊারিয়া উপজেলার জনজীবন স্থবির হয়ে পড়েছে। ঠাÊাজনিত কারণে বৃহস্পতিবার রাতে উপজেলার ল¶িপুরা গ্রামে সুমন নামের এক স্কুলছাত্র মারা গেছে। গত দু’দিন ধরে সূর্যের মুখ দেখা যায়নি। এলাকায় গরম কাপড় এবং শীতবস্ত্রের দেখা দিয়েছে। এদিকে ঘন কুয়াশার কারণে দূরপাল­ার যানবাহনগুলো নির্ধারিত সময়ের ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা পর গš—ব্যে পৌঁছাচ্ছে।
কুড়িগ্রাম : কুড়িগ্রামে শীতজনিত রোগে আরও তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। শুক্রবার ভোরে কুড়িগ্রাম সদর হাসপাতালে এক নিউ বেবী ও জয় নামে দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া সকালে সদর উপজেলার হলোখানা ইউনিয়নের সন্ন্যাসী গ্রামের কেতকেতু নামে এক বৃদ্ধ মারা গেছেন। এ নিয়ে জেলায় চলতি শীত মৌসুমে শীতজনিত রোগে মৃতের সংখ্যা দাঁড়াল ২৮ জনে। এর মধ্যে শিশুর সংখ্যা ১৯ জন। কনকনে শীত আর হিমেল হাওয়ায় স্থবির হয়ে আছে জনজীবন।
প্রচÊ শীতে এ অঞ্চলের জনজীবনে চরম দুর্ভোগ নেমে এসেছে। কুড়িগ্রামের ধরলা, ব্রহ্মপুত্র তি¯—া ,দুধকুমোরসহ ১৬টি নদ-নদীর ৪০৫টি চর-দ্বীপচরের ও বাঁধের পাড়ের প্রায় ১০ লাখ দুস্থ গরিব মানুষ দুঃসহ পরিস্থিতি মোকাবেলা করছে। টানা ১০ দিন থেকে শৈত্যপ্রবাহে মানুষের দুর্গতি আরও চরমে উঠেছে।
সরকার কুড়িগ্রাম জেলার শীতার্ত মানুষের সহায়তায় তিন দফায় ১৭ হাজার ৬৮৮টি ক¤^ল বরাদ্দ দিয়েছে।
নওগাঁ : তীব্র শীত আর ঘন কুয়াশার কারণে ঘর থেকে বের“তে পারছে না মানুষ। রোদের অভাবে জেলার দুই সহস্রাধিক চাতাল ও দেড় শতাধিক ইটভাটায় উৎপাদন প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে এসব শিল্প কারখানায় প্রায় ল¶াধিক শ্রমিক বেকার হয়ে পড়েছে। এদিকে জেলার বোরো বীজতলা কোল্ড ইনজুরিতে আক্রাš— হয়ে পড়েছে।
মাদারীপুর : মাদারীপুরে শীতের কারণে জেলার প্রায় ১০ লাখ দরিদ্র শীতার্ত মানুষের অবস্থা শোচনীয় হয়ে পড়েছে। ঠাÊাজনিত রোগের প্রকোপ দেখা দিয়েছে। শুক্রবার নতুন শহর কালীবাড়ি এলাকায় জুরান রায় নামে এক বৃদ্ধ মারা গেছে। জেলার চর অঞ্চল ও প্রত্যš— অঞ্চলের মানুষের দুর্ভোগ চরম আকার ধারণ করছে। এ ছাড়া শীতজনিত রোগ বালাই বাড়ছে আশংকাজনকভাবে।
মহেশপুর (ঝিনাইদহ) : মহেশপুরে প্রচÊ শীত ও শৈত্যপ্রবাহে জনজীবন বিপর্য¯— হয়ে পড়েছে। শীতে কয়েক দিনে চারজনের মৃত্যুর সংবাদ পাওয়া গেছে।
জানা গেছে, এলাকার ভাটা শ্রমিকরা তাদের সš—ানদের নিয়ে এই শীতে কাজকর্ম না থাকায় খুব কষ্টে দিন কাটচ্ছে। প্রচÊ শীতে এই উপজেলায় কয়েক দিনে নাটিমা গ্রামের ফতেমা বানু, কানাই ডাঙ্গা গ্রামের মনা মÊল, যুগিহুদা গ্রামের জিন্নাতুল আরা এবং সাড়াতলা গ্রামে জীবন নেছা মারা গেছে। ছিন্নমূল মানুষ শীতের কারণে ঘরের বাইরে যেতে পারছে না।
আগৈলঝাড়া : শৈত্যপ্রবাহে বরিশালের আগৈলঝাড়ায় জনজীবন বিপর্য¯— হয়ে পড়েছে। ভোগাšি—তে পড়েছে নিæআয়ের পরিবারগুলো। ঠাÊার কারণে বৃহস্পতিবার রাত ১০টায় উপজেলার আস্কর গ্রামে সুখরঞ্জন বাড়ৈ নিজ বাড়িতে মারা যায়। বৃহস্পতিবার সকালে উপজেলার পূর্ব সুজনকাঠি গ্রামের জেন্নাত আলী মোল­ার মৃত্যু হয়েছে। ঠাÊার কারণে নিউমোনিয়া রোগে আক্রাš— গড়ে প্রতিদিন আগৈলঝাড়া উপজেলা হাসপাতালে ২০ জন রোগী চিকিৎসা নিচ্ছে।
রাজাপুর (ঝালকাঠি) : ঝালকাঠির রাজাপুর উপজেলার পালট ও বড়ইয়া গ্রামের পাঁচ শতাধিক প্রতিবন্ধী প্রচÊ শীতে গরম কাপড় ছাড়াই অত্যš— মানবেতর দিন কাটাচ্ছে। বিষখালি নদীর তীরবর্তী ভাঙনকবলিত সহায় স¤^লহীন এসব প্রতিবন্ধীরা ঝুঁপড়ি ঘরে শীতের সঙ্গে যুদ্ধ করেই দিনাতিপাত করছেন। তিনদিনের একটানা শৈত্যপ্রবাহ ও প্রচÊ ঠাÊায় ১২ প্রতিবন্ধীর অসুস্থের খবর পাওয়া গেছে।
ভোলা : শুক্রবার প্রচÊ শীতে দোকানপাট ছিল বন্ধ। রা¯—াঘাট সবটাই ছিল ফাঁকা। ঘর থেকে মানুষজনকে বের হতে দেখা যায়নি। বর্তমানে চরম দুর্বিষহ জীবন কাটাচ্ছে বেড়ি ও চরাঞ্চলের ২ লাখ মানুষ। তীব্র শীতের কারণে ঠাÊাজনিত রোগে আক্রাš— হচ্ছে শিশুসহ বৃদ্ধরা।
দুমকি : ঘন কুয়াশা আর অব্যাহত শৈত্যপ্রবাহে পটুয়াখালীর দুমকিসহ উপক‚লীয় এলাকায় হাড় কাঁপানো শীতে জনজীবন বিপর্য¯— হয়ে পড়েছে। বৃহস্পতিবার বিকাল ৩টা থেকে ঘন কুয়াশায় আচ্ছাদিত হয়ে পড়ে জেলার দুমকিসহ পুরো উপক‚লীয় এলাকা। শীতবস্ত্রের অভাবে মানবেতর জীবনযাপন করতে হচ্ছে ওইসব ছিন্নমূল পরিবারের অসহায় মানুষদের। হাড় কাঁপানো শীতে এ অঞ্চলের অসহায় দরিদ্র জনগোষ্ঠীর দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে।
চুনার“ঘাট : শৈতপ্রবাহের কারণে চুনার“ঘাটের জনজীবনে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। পাশাপাশি নানা রোগে আক্রাš— হয়ে মানুষ হাসপাতালে আসছে। অনেকে আক্রাš— হয়ে স্থানীয় ¯^াস্থ্য কমপে­·ে চিকিৎসা নিচ্ছেন।
হাটহাজারী : কনকনে শীত ও ঘন কুয়াশা হঠাৎ করেই যেন জনজীবনে ঝাঁকিয়ে বসেছে। তবে পৌষ মাসের শেষের দিকে এই শীতল আবহাওয়া অ¯^াভাবিক না থাকলেও প্রস্তুতিহীন মানুষের জন্য নিয়ে এসেছে কঠিন দুর্ভোগ। দুই দিন ধরে ঘন কুয়াশা ও হিমেল হাওয়ায় হাটহাজারী উপজেলার হাজার হাজার অসহায় পরিবার ও প্রত্যš— অঞ্চলের মানুষরা শীতে কাবু হয়ে পড়েছে। তাছাড়া ঘন কুয়াশার কারণে যান চলাচলও বিঘিœত হচ্ছে।
গোয়ালন্দ (রাজবাড়ী) : ঘন কুয়াশার কারণে শুক্রবার মধ্যরাত থেকে সকাল পর্যš— দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া নৌর“টে ফেরিসহ সব ধরনের নৌযান চলাচল সাড়ে ৮ ঘণ্টা বন্ধ ছিল। এ সময় কনকনে শীতে চরম দুর্ভোগের শিকার হন হাজারও যাত্রী ও পরিবহন শ্রমিকরা। সরেজমিন দেখা গেছে, দীর্ঘ সময় ফেরি চলাচল বন্ধ থাকায় দ¶িণাঞ্চলের বিভিন্ন জেলা থেকে আগত যানবাহনের চাপে সৃষ্টি হয় বিশাল যানজট। ফেরিঘাটের জিরো পয়েন্ট থেকে মহাসড়কের দৌলতদিয়া ইউনিয়ন পরিষদ পর্যš— যানবাহনগুলো মহাসড়কের ওপর দুই-তিন সারিতে আটকা পড়েছে।
শিবচর (মাদারীপুর) :ঘন কুয়াশার কারণে ঢাকা-খুলনা মহাসড়কের মাওয়া-কাওড়াকান্দি নৌ-র“টে ফেরিসহ নৌ-যান চলাচল ১০ ঘণ্টা বন্ধ ছিল। ৪৫টি ছোট-বড় গাড়ির তিন শতাধিক যাত্রী নিয়ে মাঝ নদীতে আটকে ছিল ৬টি ফেরি। ফেরি চলাচল বন্ধ থাকায় কাওড়াকান্দি ফেরিঘাট থেকে পাঁচ্চরের বাখরেরকান্দি পর্যš— প্রায় তিন কিলোমিটার দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়েছে। পদ্মা নদী পার হওয়ার অপে¶ায় আছে প্রায় ৮শ’ দূরপাল­ার যাত্রীবাহী ও পণ্যবাহী যানবাহন। দীর্ঘ যানজটের কবলে আটকে পড়ে দ¶িণাঞ্চলের ২১ জেলার যাত্রীসাধারণকে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।
কিশোরগঞ্জ ব্যুরো : শুক্রবার দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চল ছিল কুয়াশার চাদরে ঢাকা। ক’দিন ধরেই তীব্র শীত ও শৈত্যপ্রবাহ বিরাজ করলেও শুক্রবারের শৈত্যপ্রবাহের মাত্রা ছিল অ¯^াভাবিক। এ শৈত্যপ্রবাহে ¯^াভাবিক জীবনযাত্রা চরমভাবে বিঘিœত হয়েছে। মানুষের পাশাপাশি পশুপাখি পর্যš— কাতর হয়ে পড়ে।
জয়পুরহাট : শীতজনিত কারণে জয়পুরহাটে আরও একজনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে এ পর্যš— জয়পুরহাটে শীতজনিত কারণে মৃতের সংখ্যা দাঁড়াল ৩-এ। বৃহস্পতিবার রাতে জয়পরহাট রেলস্টেশনে আনুমানিক ৮০ বছরের বেশি বয়সের অজ্ঞাতনামা এক বৃদ্ধের মৃত্যু হয়েছে। একটি পুরনো ক¤^ল গায়ে দিয়ে ওই বৃদ্ধ রাতে প­্যাটফরমে শুয়ে ছিলেন। শুক্রবার সকালে তার মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়। এদিকে টানা এক সপ্তাহের কুয়াশা ও কনকনে তীব্র শীতে জয়পুরহাটের জনজীবন প্রায় বিপর্য¯— হয়ে পড়েছে।
http://jugantor.us/2012/12/29/news0194.htm

শীত ও ঘন কুয়াশায় জবুথবু দেশ :

পৌষেই এবার কনকনে শীত

নিজস্ব প্রতিবেদক | তারিখ: ২৯-১২-২০১২
রাজধানীতে গতকাল সূর্যের দেখা মেলেনি। কনকনে ঠান্ডা ও হিমেল হাওয়া ছিল দিনভর। তীব্র শীতে একটু উত্ত রাজধানীতে গতকাল সূর্যের দেখা মেলেনি। কনকনে ঠান্ডা ও হিমেল হাওয়া ছিল দিনভর। তীব্র শীতে একটু উত্তাপ দিতে সন্তানকে স্নেহের চাদরে জড়িয়ে রাখেন এক মা। ছবিটি ঢাকা চিড়িয়াখানা থেকে তোলা
সাজিদ হোসেন
পৌষ মাসের মাঝামাঝিতেই এবার জেঁকে বসেছে কনকনে শীত। হাড় কাঁপানো শীতে কষ্ট বেড়েছে শহর ও গ্রামের গরিব মানুষের। সঙ্গে ঘন কুয়াশার কারণে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। স্থল ও নৌপথে চলাচল ব্যাহত হচ্ছে।
দেশের বিভিন্ন স্থানে শৈত্যপ্রবাহ শুরু হয়েছে। গতকাল শুক্রবার দেশের বেশির ভাগ এলাকাতেই সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নেমে আসে। ঘন কুয়াশার সঙ্গে প্রায় ১০ কিলোমিটার বেগে বাতাসও বয়ে গেছে। গতকাল রাজধানী ঢাকায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ১০ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা এ বছরে এ পর্যন্ত সর্বনিম্ন তাপমাত্রা। গতকাল দেশে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল যশোরে, ৭ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আবহাওয়া অধিদপ্তরের দেওয়া আজ শনিবারের পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, তাপমাত্রা আরও কমে ৬ থেকে ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নেমে আসতে পারে।
শীতজনিত রোগে কুড়িগ্রামে তিনজন ও কিশোরগঞ্জে দুজন মারা গেছে। ঘন কুয়াশার কারণে পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া এবং মাওয়া-কাওড়াকান্দি নৌপথে ফেরি চলাচল আট থেকে নয় ঘণ্টা বন্ধ থাকছে। মহাসড়কে যানবাহনকে দিনেও হেডলাইট জ্বালিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে। এ কারণে মহাসড়কে সৃষ্টি হচ্ছে যানজট। ফলে প্রয়োজনে যাঁরা বাইরে বেরিয়েছেন, তাঁদের পোহাতে হয়েছে কুয়াশার জন্য ভোগান্তি।
আবহাওয়া অধিদপ্তর বলছে, সারা দেশের ওপর দিয়ে মাঝারি থেকে তীব্র শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে। পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, আজ তাপমাত্রা আরও কমে যেতে পারে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ শামসুদ্দিন আহমেদ গতকাল প্রথম আলোকে জানান, আগামী তিন-চার দিন এই শৈত্যপ্রবাহ অব্যাহত থাকতে পারে। তাপমাত্রা আরও কমে শীত আরও বাড়তে পারে। তিনি আরও জানান, জানুয়ারি পর্যন্ত শীতের এই তীব্রতা কিছুটা বিরতি দিয়ে অব্যাহত থাকবে।
নিজস্ব প্রতিবেদক, কুড়িগ্রাম জানান, কুড়িগ্রামে শীতজনিত অসুস্থতায় গতকাল ভোরে সদর হাসপাতালে এক দিন বয়সী একটি শিশু এবং জয় নামের নয় মাসের আরেক শিশু মারা গেছে। এ ছাড়া সকালে সদর উপজেলার সন্ন্যাসী গ্রামে কেতকেতু (৫২) নামের এক ব্যক্তি মারা যান। এ নিয়ে জেলায় চলতি শীত মৌসুমে মৃতের সংখ্যা দাঁড়াল ২৮ জনে। এর মধ্যে ১৯ জনই শিশু।
জেলা সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা নজরুল ইসলাম জানান, শীতজনিত রোগে এখনো অর্ধশত শিশু এই হাসপাতালে ভর্তি রয়েছে।
নিজস্ব প্রতিবেদক, কিশোরগঞ্জ জানান, জেলার অষ্টগ্রাম উপজেলার কাস্তল ইউনিয়নের ব্রাহ্মপাড়া গ্রামের মোজার মিয়া (৬০) গতকাল হাওরে কাজ করার সময় শীতজনিত কারণে মারা যান। গত বৃহস্পতিবার হাওর থেকে বাড়ি ফেরার পথে শীতজনিত অসুস্থতায় মারা যান সদর ইউনিয়নের হাবিলিপাড়া গ্রামের শফি মিয়া।
কাস্তল ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান মো. সাইফুল ইসলাম জানান, শীতজনিত কারণে গত দুই দিনে বাদশালা গ্রামে কমপক্ষে ৫০টি গরু-ছাগল মারা গেছে।
শীতে প্রায় ২০০ একর জমির ইরি-বোরো ধানের বীজতলা নষ্ট হতে চলেছে। সবজি চাষেও মারাত্মক প্রভাব পড়ছে।
কটিয়াদী প্রতিনিধি জানান, গত কয়েক দিনের তীব্র শীত ও ঘন কুয়াশায় উপজেলার জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। বৃদ্ধ ও শিশুরা সর্দি, কাশি, জ্বর ও নিউমোনিয়ার মতো শীতজনিত রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন।
কটিয়াদী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসক সৈয়দ মঞ্জুরুল হক জানান, প্রতিদিনই শীতজনিত রোগে আক্রান্ত অনেকে হাসপাতালে আসছে।
http://www.prothom-alo.com/detail/date/2012-12-29/news/317028
 
নিজস্ব প্রতিবেদক : রাজধানীসহ সারাদেশে প্রচণ্ড শীতে জনজীবন বিপন্ন হয়ে পড়েছে। আবহাওয়া অধিদফতর জানিয়েছে, দেশে শৈত্যপ্রবাহ আরো কয়েকদিন স্থায়ী হতে পারে। জানুয়ারি মাসে সারাদেশে তিনটি মাঝারি ও দুটি তীব্র শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলেও জানায় অধিদফতর। এদিকে ঘন কুয়াশার কারণে গতকাল শুক্রবার রাত সাড়ে ১০টার পর মাওয়া-কাওড়াকান্দি রুটে ফেরিসহ নৌ-যান চলাচল বন্ধ রয়েছে।
প্রচণ্ড শীতের কারণে বাড়ছে ডায়রিয়া, নিউমোনিয়া, শ্বাসকষ্টসহ শীতজনিত রোগীর সংখ্যা। এদের বেশির ভাগই শিশু ও বৃদ্ধ। গত এক সপ্তাহে শীতজনিত রোগে পিরোজপুর, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, পাবনা, সাতক্ষীরা, মাদারীপুরসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বেশ কয়েকজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।
গত বছরের তুলনায় এবার শীতের তীব্রতা বেশি। কয়েক দিন ধরেই রাতে বৃষ্টির মতো কুয়াশা পড়ছে। সকাল থেকেই ঘন কুয়াশার কারণে রাজধানীতে দৃষ্টিসীমা ৫০ থেকে ১০০ মিটারের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। দুপুরের আগে সূর্যের দেখা পাওয়া যাচ্ছে না। প্রচণ্ড শীতের কারণে অনেক অঞ্চলের ক্ষেত-খামারের কাজ বন্ধ হয়ে গেছে। আর হেডলাইট জ্বালিয়ে রাস্তায় যানবাহন চলাচল করছে।
হঠাৎ করে ঠাণ্ডার পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় খেটে খাওয়া ও বস্তিবাসীরা অবর্ণনীয় দুর্ভোগের সম্মুখীন হচ্ছে। সবচেয়ে বেশি কষ্টে দিনাতিপাত করছে চরাঞ্চলের মানুষগুলো। দেশের বিভিন্ন এলাকায় সরকারিভাবে শীতবস্ত্র বরাদ্দ দেয়া হলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় কম। কুয়াশার কারণে বিভিন্ন এলাকার নৌ ও ফেরি চলাচলসহ সড়ক যোগাযোগও ব্যাহত হচ্ছে।
আবহাওয়া অধিদফতর জানায়, গত বৃহস্পতিবার থেকে দেশের রাজশাহী, রংপুর, খুলনা, বরিশাল ও সিলেট বিভাগে মৃদু থেকে মাঝারি শৈত্যপ্রবাহ বইছে। এ পাঁচ বিভাগের ওপর বয়ে যাওয়া মৃদু থেকে মাঝারি শৈত্যপ্রবাহ আরো কয়েক দিন থাকবে বলে আভাস দিয়েছে আবহাওয়া অধিদফতর। গতকাল রাজধানীর সর্বনিু তাপমাত্রা ছিল ১০.৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা স্বাভাবিকের থেকে পাঁচ ডিগ্রি কম। চট্টগ্রামের সর্বনিু তাপমাত্রা ছিল ১২, বরিশাল ৮.৮, কক্সবাজার ১১, খুলনা ৯.৫, রাজশাহী ১১.২, সিলেট ১১.৬ এবং দিনাজপুরে ৮.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
এ দিকে পৌষের মাঝামাঝিতে শীতের তীব্রতা উত্তর ও মধ্যাঞ্চল থেকে দক্ষিণাঞ্চলে বেড়েছে। আর পশ্চিমাঞ্চল, উত্তরাঞ্চল ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে বইছে মৃদু শৈত্যপ্রবাহ।
হিমালয়-দার্জিলিংয়ের কাছে হওয়ায় দেশের উত্তরের জেলাগুলোতে গত দুই সপ্তাহ ধরে শীত জেঁকে বসেছে। ঘন কুয়াশার সঙ্গে বইছে হিমেল হাওয়া। নামছে তাপমাত্রা। গত দুই সপ্তাহে সূর্যের দেখা পায়নি রংপুর বিভাগের মানুষ। একই অবস্থা রাজশাহী বিভাগেরও। গত সপ্তাহ থেকে শীতের তীব্রতা বাড়ছে। কনকনে ঠাণ্ডায় দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের মানুষও কাবু হয়ে পড়েছে।
মুন্সীগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, ঘন কুয়াশার কারণে গতকাল রাত সাড়ে ১০টার পর থেকে মাওয়া-কাওড়াকান্দি নৌ-রুটে ফেরিসহ নৌ-যান চলাচল বন্ধ রয়েছে। মাঝ পদ্মায় শতাধিক যানবাহন ও অসংখ্য যাত্রী নিয়ে আটকা পড়েছে ৬টি ফেরি। এরই একটি ফেরিতে আছেন খুলনা সিটি কর্পোরেশনের মেয়র তালুকদার আব্দুল খালেক। তিনি খুলনা থেকে ঢাকা যাচ্ছিলেন। এ ছাড়া মাওয়া থেকে ছেড়ে আসা এমভি খাজা নামের একটি লঞ্চ ২০০ যাত্রী নিয়ে পদ্মায় আটকে আছে।
পিরোজপুর প্রতিনিধি জানান, টানা কয়েক দিনের শৈত্যপ্রবাহ ও ঘন কুয়াশায় পিরোজপুর জেলার জনজীবন স্থবির হয়ে পড়েছে। আর শীতজনিত রোগে আক্রান্ত হয়ে গতকাল শুক্রবার চারজনের মৃত্যু হয়েছে। এদের মধ্যে ৯ বছরের এক শিশু রয়েছে, অন্যরা বৃদ্ধ।
কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি জানান, জেলায় শীতজনিত রোগে গতকাল দু’জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে হাসপাতালে একদিন বয়সী এক নবজাতক ও অন্যজন বৃদ্ধ। চলতি মাসে শুধু কুড়িগ্রাম সদর হাসপাতালে শীতজনিত রোগে ২২ জন শিশুসহ ২৫ জন মারা গেছে।
গাইবান্ধা প্রতিনিধি জানান, কনকনে হিমেল হাওয়া এবং ঘন কুয়াশার কারণে গাইবান্ধার স্বাভাবিক জীবনযাত্রা বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। গত দুই সপ্তাহ ধরে জেলার কোথাও সূর্যের মুখ দেখা যায়নি। এ দিকে শীতজনিত কারণে গত বৃহস্পতিবার রাতে সদর উপজেলায় মহির উদ্দিন (৮০) নামে একজনের মৃত্যু হয়েছে। এ ছাড়া গত ২৪ ঘণ্টায় চিকিৎসার জন্য জেলার বিভিন্ন হাসপাতালে ৩৪ জন শিশু ভর্তি হয়েছে। তাদের বেশির ভাগই ডায়রিয়া ও নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত। এ ছাড়া চরাঞ্চল, বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধসহ নদী তীরবর্তী এলাকার ২ লক্ষাধিক দুস্থ ও ছিন্নমূল মানুষ এ কনকনে শীতে গরম কাপড়ের সংকটে পড়েছে। অন্যবারের মতো এখন পর্যন্ত বেসরকারি সংগঠনগুলো শীতবস্ত্র নিয়ে তেমনভাবে মাঠে নামেনি। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে কম্বল বিতরণ করা হলেও তা চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল।
ঝালকাঠি প্রতিনিধি জানান, বিপর্যস্ত দেশ ॥ কুয়াশা ও শীতচলতি শীত মৌসুমের মধ্যে গতকাল সবচেয়ে বেশি শীত অনুভূত হয়েছে। প্রচণ্ড শীতে রাজাপুর উপজেলার বলারজোর গ্রামে রাবেয়া খাতুন নামে এক বৃদ্ধা মারা গেছেন। আর জেলার প্রতিবন্ধী গ্রাম হিসেবে পরিচিত পালট ও বড়ইয়ায় তীব্র শীতে ১২ প্রতিবন্ধী অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। http://manobkantha.com/details_news.php?id=100427&&%20page_id=%205
 
 বিপর্যস্ত দেশ ॥ কুয়াশা ও শীত
বিপর্যস্ত দেশ ॥ কুয়াশা ও শীত ঘন কুয়াশা ও কনকনে শীতে সারাদেশ বিপর্যস্ত। মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। শীতজনিত কারণে মৃত্যু ও নানা ব্যাধিতে আক্রান্তের সংখ্যাও বেড়েই চলেছে। শুক্রবারও নতুন করে ৫ জনের মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। এ নিয়ে চলতি মৌসুমে শীতজনিত কারণে মৃতের সংখ্যা ৭২ জনে দাঁড়িয়েছে বলে জানা গেছে। শৈত্যপ্রবাহ আরও ৫ দিন থাকতে পারে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া অফিস। ঘন কুয়াশায় জল ও সড়ক পথে যান চলাচল চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে। সূর্যের মুখ দেখছে না দেশবাসী। এতে সাময়িকভাবে বন্ধ থাকছে ধানের চাতালগুলো। বেড়ে যেতে পারে চালের দাম। ঘন কুয়াশার কারণে বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ১২টা থেকে শুক্রবার সকাল সোয়া ১০টা পর্যন্ত মাওয়া-কাওড়াকান্দি নৌরুটে পৌনে ১০ ঘণ্টা ফেরি চলাচল বন্ধ ছিল। ওই ঘাটে দেখা দেয় বিশাল যানজট। চরম দুর্ভোগে পড়েন যাত্রীরা। বোরো চাষের জন্য তৈরি বীজতলার চারা কোল্ড ইনজুরিতে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা করছেন কৃষকরা।
আবহাওয়া অধিদফতর জানায়, উপ-মহাদেশীয় উচ্চচাপের বর্ধিতাংশ পশ্চিমবঙ্গ এবং তৎসংলগ্ন বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাংশ পর্যন্ত বিস্তৃত রয়েছে। দক্ষিণ বঙ্গোপসাগরে মৌসুমী লঘুচাপ অবস্থান করছে। শুক্রবার দেশের অধিকাংশ স্টেশনের সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন তাপমাত্রা হ্রাস পায়। এ দিন সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ঢাকায় যথাক্রমে ২০.৫ ও ১০.৭ ডিগ্রী সেলসিয়াস, ময়মনসিংহে ১৯.১ ও ৯.৫ ডিগ্রী, মাদারীপুরে ১৮.৪ ও ৮.৮ ডিগ্রী, শ্রীমঙ্গলে ১৮.২ ও ৯.০ ডিগ্রী, রংপুরে ১৬.৮ ও ৯.৩ ডিগ্রী, দিনাজপুরে ১৬.৩ ও ৮.৫ ডিগ্রী, সৈয়দপুরে ১৬.২ ও ৮.৫ ডিগ্রী, খুলনায় ১৮.৫ ও ৯.৫ ডিগ্রী, মংলায় ১৮.২ ও ৯.৮ ডিগ্রী, সাতক্ষীরায় ১৪.৪ ও ৮.৭ ডিগ্রী, যশোরে ২০.২ ও ৭.৮ ডিগ্রী, চুয়াডাঙ্গায় ১৯.৬ ও ৯.০ ডিগ্রী, বরিশালে ২০.০ ও ৮.৮ ডিগ্রী, পটুয়াখালীতে ১৭.০ ও ৯.৫ ডিগ্রী, খেপুপাড়ায় ১৯.৫ ও ৯.০ ডিগ্রী এবং ভোলায় ২০.০ ও ৯.৯ ডিগ্রী সেলসিয়াস রেকর্ড হয়।
শুক্রবারও রাজধানীর আকাশ ঢাকা ছিল কুয়াশায়। দেখা যায়নি সূর্যের মুখ। দিনভর বইতে থাকে ঠা-া বাতাস। নগরবাসীর পা থেকে মাথা পর্যন্ত ঢাকা ছিল গরম কাপড়ে। তীব্র শীতে অনেকেই কাঁপতে থাকে। ফ্যাশন করে হাল্কা কাপড় পরার সুযোগ পায়নি কেউ। গরম সোয়েটার বা জ্যাকেট পরার পরও অনেক মহিলা চাদর ব্যবহার করতে বাধ্য হয়েছেন। শাহবাগ মোড়ে জাতীয় জাদুঘরের বিপরীত পাশে হাতে-পায়ে মোজা লাগিয়ে চা বিক্রি করছেন মোঃ মকবুল। হাতে মোজা দেয়ার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, হাত খোলা রাখাটা কঠিন হয়ে পড়েছে। চায়ের কাপগুলো ধোয়ার প্রয়োজন হলে হাতের মোজা খুলে নিই। তাছাড়া শীতের কারণে ক্রেতার সংখ্যাও কমেছে। খুব তাড়াতাড়ি দোকান বন্ধ করে চলে যাব বলে তিনি জানান। একটি গেঞ্জি, একটি ফুলহাতা শার্ট ও একটি সোয়েটারের পাশাপাশি একটি চাদর গায়ে দিয়েছেন শাহবাগ মোড় ফুটপাথের গরম কাপড় বিক্রেতা বেলাল হোসেন। তিনি বলেন, সারাদিন এক জায়গায় দাঁড়িয়ে বা বসে আছি। আর সারাদিন ধরেই তীব্র শীত অনুভূত হচ্ছে। পাশাপাশি বয়ে যায় ঠা-া বাতাস। প্রথমে গেঞ্জি, শার্ট ও চাদর পরেছিলাম। শীতের তীব্রতা সহ্য করতে না পেরে দোকানের একটি গরম কাপড় পরে নিলাম বলে জানান বেলাল হোসেন। শুধু বেলাল হোসেন নন, বৃহস্পতিবারের শীতের তীব্রতা অনেক নগরবাসীকেই দুইয়ের অধিক গরম কাপড় ব্যবহার করতে বাধ্য করে। শুক্রবারও গরম কাপড় বিক্রেতাদের আনন্দের সীমা ছিল না। সাধারণ মানুষের দুর্ভোগে মাথা ব্যথা নেই তাদের। শীতার্ত মানুষ শীতের তীব্রতা কমে যেতে দোয়া চাইলেও, গরম কাপড় বিক্রেতারাও এখানে নির্দয়ের পরিচয় দিচ্ছেন। তারা শীতের আরও বেশি তীব্রতা কামনা করছেন। ঢাকা কলেজের বিপরীত পাশের মার্কেট ও ফুটপাথে গরম কাপড় বিক্রি জমে ওঠে। সব ধরনের গরম কাপড় চড়া দামে বিক্রি হয়। হিড়িক পড়ে গরম কাপড় কেনার। ফুটপাথে শিশুদের ৩০ টাকার হাত মোজা বিক্রি হয় ৪৫ টাকায়। প্রতিটি সাধারণ গরম টুপি বিক্রি হয় ৫০ টাকায়। কয়েকদিন আগেও ওই টুপির দাম ছিল ৩০ থেকে ৩৫ টাকা। প্রতিটি কম্বল দেড় শ’ থেকে ২শ’ টাকা বেশি দামে বিক্রি হয়। ফুটপাথের গরম কাপড় বিক্রেতা হেলাল মিয়া জানান, এভাবে ক’দিন চলতে থাকলে ৮০ ভাগ গরম কাপড় বিক্রি হয়ে যাবে। এতে সন্তোষজনক লাভ থাকবে বলে তিনি মনে করছেন। ফার্মগেট, গুলিস্তান, কৃষি মার্কেটসহ নগরীর অধিকাংশ এলাকাতেই এই চিত্র দেখা গেছে। সরকারী ও বেসরকারী উদ্যোগে শীতবস্ত্র বিতরণ শুরু হলেও তা পর্যাপ্ত নয় বলে জানা গেছে। শুক্রবার তাপমাত্রা হ্রাস পাওয়ায় রাজধানীতেও দিনভর তীব্র শীত অনুভূত হয়। অতি প্রয়োজন ছাড়া লোকজন ঘর থেকে বের হচ্ছে না। আর সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গেই মফস্বল এলাকার দোকানপাট বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।
রাজধানীতে বেড়েছে শীতজনিত রোগে আক্রান্তের সংখ্যা। সর্দি-কাশি-জ্বর, নিউমোনিয়া, ব্রংকাইটিস রোগে আক্রান্ত হচ্ছে মানুষ। শিশু ও বয়স্করাই বেশি আক্রান্ত হচ্ছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিন বিভাগের ডিন অধ্যাপক ডা. এবিএম আব্দুল্লাহ জনকণ্ঠকে জানান, শীতজনিত রোগে আক্রান্ত রোগীর আগমন তিনগুণ বেড়েছে। রোগীরা হাঁপানি, ব্রঙ্কাইটিস ও নিউমোনিয়া, সাধারণ সর্দি জ্বর, সাইনোসাইটিস (প্রচ- মাথাব্যথা), রাইনাইটিসে (নাক দিয়ে অনরবত পানিপড়া) আক্রান্ত হচ্ছে। আর ঠা-ায় শরীরের তাপমাত্রা মারাত্মক কমে গিয়ে আক্রান্ত হচ্ছে হাইপোথারমিয়ায়। বয়স্কদের বাতজনিত সমস্যা বেড়ে গেছে। পর্যাপ্ত গরম কাপড় ব্যবহারের পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, শরীর গরম রাখার পাশাপাশি বাসাবাড়িগুলোও গরম রাখতে হবে। সহনীয় মাত্রার গরম পানি পান করা উচিত। গোসল করার সময়ও গরম পানি ব্যবহার করার পরামর্শ দিয়েছেন অধ্যাপক ডা. এবিএম আব্দুল্লাহ।
রাজধানীর মতো দেশের অন্য সব স্থানও তীব্র শীতের কবলে পড়েছে। ঘন কুয়াশায় জল ও সড়ক পথে যান চলাচল চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে। অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অনানুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ থাকছে।
স্টাফ রিপোর্টার কুড়িগ্রাম থেকে জানান, কুড়িগ্রামে শীতজনিত রোগে আরও দু’জনের মৃত্যু হয়েছে। শুক্রবার ভোরে কুড়িগ্রাম সদর হাসপাতালে একদিন বয়সী এক শিশু, জয় (৯ মাস) নামে দু’ শিশুর মৃত্যু হয়। এছাড়া সকালে সদর উপজেলার হলোখানা ইউনিয়নের সন্ন্যাসী গ্রামের কেতকেতু (৫২) নামে এক বৃদ্ধ মারা গেছে। এ নিয়ে জেলায় চলতি শীত মৌসুমে শীতজনিত রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃতের সংখ্যা দাঁড়াল ২৮ জনে। এর মধ্যে শিশুর সংখ্যা ১৯। কনকনে শীত আর হিমেল হাওয়ায় স্থবির হয়ে আছে জনজীবন। শুক্রবার সকাল ১১টা পর্যন্ত শহরের অধিকাংশ দোকানপাট বন্ধ ছিল। কুড়িগ্রাম সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিক্যাল অফিসার ডা. নজরুল ইসলাম জানান, শুক্রবার ভোরে এই হাসপাতালে এক নবজাতক ও জয় (৯মাস) নামে শিশুর মৃত্যু হয়েছে। শীতজনিত বিভিন্ন রোগে প্রায় অর্ধশত শিশু এই হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে। প্রচ- শীতে হিমালয় পাদদেশীয় এ অঞ্চলের জনজীবনে চরম দুর্ভোগ নেমে এসেছে। কুড়িগ্রামের ধরলা, ব্রহ্মপুত্র তিস্তা, দুধকুমোরসহ ১৬টি নদ-নদীর ৪শ’ ৫টি চর-দ্বীপচরের ও বাঁধের পাড়ের প্রায় ১০ লাখ দুস্থ গরিব শ্রেণীর বস্ত্রহীন মানুষ দুঃসহ পরিস্থিতি মোকাবেলা করছে। টানা ১০দিন ধরে শৈত্যপ্রবাহে মানুষের দুর্গতি আরও চরমে উঠেছে। সরকার কুড়িগ্রাম জেলার শীতার্ত মানুষের সহায়তায় তিন দফায় ১৭ হাজার ৬৮৮টি কম্বল বরাদ্দ দিয়েছে। এসব কম্বল ইতোমধ্যে ৭২টি ইউনিয়ন ও ৩টি পৌর এলাকায় বিতরণ করা হয়েছে। এছাড়া জেলা প্রশাসক জরুরী ভিত্তিতে আরও ২০ হাজার কম্বল চেয়ে ঢাকায় ফ্যাক্স বার্তা পাঠিয়েছেন বলে জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক হাবিবুর রহমান। কৃষি বিভাগের উপ-পরিচালক প্রদীপ কুমার ম-ল জানান, তীব্র শীতে আগাম জাতের আলু ও ধানের চারায় কোল্ড ইনজুরি রোগ দেখা দিয়েছে। কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে কৃষকদের বীজতলায় সম্পূরক সেচ ও ওষুধ স্প্রে করার পরামর্শ দেয়া হচ্ছে।
স্টাফ রিপোর্টর মুন্সীগঞ্জ থেকে জানান, ঘন কুয়াশার কারণে মাওয়া-কাওড়াকান্দি নৌরুটে পৌনে ১০ ঘণ্টা ফেরি চলাচল বন্ধ ছিল। বৃহস্পতিাবরা রাত সাড়ে ১২টা থেকে শুক্রবার সকাল সোয়া ১০টা পর্যন্ত এ নৌরুটে ফেরি চলাচল না করায় মাওয়া ও কাওড়াকান্দি ঘাটে দেখা দেয় বিশাল যানজট। এ সময় মাঝপদ্মায় ৭টি ফেরিতে প্রায় দুই হাজার যাত্রী কনকনে শীতে চরম বিড়ম্বনায় পড়ে। বিআইডব্লিটিসির সহকারী ব্যবস্থাপক চন্দ্র শেখর জানান, বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে পদ্মা অববাহিকায় ঘনকুয়াশা নেমে এলে নৌরুট দৃষ্টিহীন হয়ে পড়ে। কুয়াশার চাঁদর এতটাই ঘন ছিল যে, বয়া বাতি এমনকি নৌপথের স্বল্প দূরত্বের কোন কিছুই চোখে পড়ছিল না। তাই দুর্ঘটনা এড়াতে বাধ্য হয়েই রাত সাড়ে ১২টা থেকে নৌ চলাচল বন্ধ রাখা হয়। এ সময় মাঝপদ্মায় যাত্রী ও পরিবহন নিয়ে নোঙর ফেলে ৭টি ফেরি। রো রো ফেরি বীর শ্রেষ্ঠ রুহুল আমিন, ফেরি কাকলী, কেতকী, রানীগঞ্জ, রায়পুরা ও থোবাল নামের ৭টি ফেরি এদিকে ঘনকুয়াশার করণে পদ্মা, মেঘনা ও ধলেশ্বরী নদীতে চলাচলকারী অন্য নৌযানগুলোও নোঙ্গর করে। কনকনে শীতে ঘন কুয়াশার কারণে এই অঞ্চলে উৎপাদিত কৃষিপণ্য বাজারজাত ব্যাহত ছাড়াও ব্যবসা-বাণিজ্য ও এখানকার অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। গত ৯ ডিসেম্বর থেকে এ পর্যন্ত ১২৫ ঘণ্টা এই রুটে ফেরি সার্ভিস বন্ধ থাকে।
নিজস্ব সংবাদদাতা গফরগাঁও থেকে জানান, প্রচ- হাড়কাঁপানো শীতে ময়মনসিংহের গফরগাঁওয়ে এ পর্যন্ত ২ জনের মৃত্যু খবর পাওয়া গেছে। এছাড়া বহু শিশু শীতের ঠা-াজনিত রোগে আক্রান্ত হয়ে গফরগাঁও স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি হয়েছে। জানা যায়,উপজেলার নামা শিলাসী গ্রামের উসমান আলী শেখ (৮০), অজ্ঞাত এক মহিলা (৫০) শীতে মারা গেছে। অজ্ঞাত এই মহিলার লাশ গত বৃহস্পতিবার বিকেল থেকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের বারান্দায় পড়ে আছে। এদিকে প্রচ- ঠা-ায় ও ঘন কুয়াশার কারণে বোরো বীজতলাসহ বিভিন্ন ফসলের ক্ষতি হচ্ছে বলে কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে।
স্টাফ রিপোর্টার যশোর অফিস থেকে জানান, হাড়কাঁপানো শীত পড়ছে যশোর অঞ্চলে। সেই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলছে শৈত্যপ্রবাহ। এ অবস্থায় কনকনে শীত ও ঠা-া বাতাসে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে।
গত কয়েক দিন ধরে যশোর অঞ্চলে চলছে শৈত্যপ্রবাহ। প্রতিদিনই কমছে তাপমাত্রা। এ তাপমাত্রার সঙ্গে বাতাসের আর্দ্রতার পরিমাণ বেশি থাকায় শীত অনুভূত হচ্ছে খুব বেশি। ঘন কুয়াশার কারণে দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত সূর্যের দেখা মেলেনি। প্রচ- ঠা-ায় জরুরী প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকে বের হচ্ছে না মানুষ। এ অবস্থায় বেশি সমস্যায় পড়েছে শিশুরা। ঠা-াজনিত নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে তারা।
নিজস্ব সংবাদদাতা গৌরনদী থেকে জানান, বরিশালের আগৈলঝাড়া উপজেলার আস্কর গ্রামে বৃহস্পতিবার রাতে শৈত্যপ্রবাহে সুখ রঞ্জন বাড়ৈ (৬৫) মারা গেছে। এর আগে শৈত্যপ্রবাহের কারণে বৃহস্পতিবার সকালে পয়সারহাট বন্দরের কাঁচামাল ব্যবসায়ী ও উপজেলার পূর্ব সুজনকাঠী গ্রামের জেন্নাত আলী মোল্লার মৃত্যু হয়েছে। ওই উপজেলায় এ পর্যন্ত শৈত্যপ্রবাহে ২ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। ঠা-ার কারণে শিশুরা নিউমোনিয়াসহ শীতজনিত রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। গড়ে প্রতিদিন আগৈলঝাড়া উপজেলা হাসপাতালে ২০ রোগী ঠা-াজনিত রোগে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাসেবা নিচ্ছে বলে জরুরী বিভাগে কর্মরত ডা. মোকলেছুর রহমান জানিয়েছেন।
স্টাফ রিপোর্টার খুলনা অফিস থেকে জানান, কনকনে শীত ও ঠা-ায় খুলনার জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। ঠা-াজনিত রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। বোরো ধানের বীজতলা কোল্ড ইনজুরিতে পড়েছে। সারা দেশের ন্যায় খুলনা অঞ্চলে গত কয়েকদিন ধরে শীত ও ঠা-া বাড়তে শুরু করেছে। শুক্রবার সবচেয়ে বেশি ঠা-া অনুভূত হয়। এ দিন বিকেল ৩টা নাগাদ রোদের দেখা মিললেও তাতে তেমন উষ্ণতা ছিল না। এদিকে কনকনে শীত ও ঠা-ায় মানুষের স্বাভাবিক কাজকর্ম ও চলাফেরা ব্যাহত হয়। তীব্র শীতের কারণে শুক্রবার ছুটির দিনেও ফুটপাথসহ শহরের বিভিন্ন দোকানে শীতবস্ত্র বিক্রির হিড়িক পড়ে। সারাদিনে চলে শীতবস্ত্র বিকিকিনি। আবার অনেকে আগুন জ্বালিয়ে উষ্ণতা গ্রহণের চেষ্টা করে। এদিকে শীত ও ঠা-া ক্রমশ বৃদ্ধি পেতে থাকায় খুলনা অঞ্চলে বোরো চাষের জন্য তৈরি বীজতলার চারা কোল্ড ইনজুরিতে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

টেলিটকে কোটি কোটি টাকার দুর্নীতি


সজল জাহিদ/নাহিদ তন্ময়
রাষ্ট্রায়ত্ত মোবাইল অপারেটর টেলিটকে কোটি কোটি টাকার দুর্নীতি অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। সরকারের অডিট অধিদফতরের এক নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত সাত বছরে টেলিটকে প্রায় ৬০০ কোটি টাকার অনিয়ম চিহ্নিত করা হয়েছে। এ অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন টেলিটকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুজিবুর রহমান। তিনি সমকালকে বলেছেন, একটি চক্র তাদের বিরুদ্ধে লেগেছে। কাগজপত্রে আছে, কিন্তু বাস্তবে টেলিটকের ভাণ্ডারে কোটি কোটি টাকার সিমকার্ড এবং স্ক্র্যাচকার্ডের কোনো হদিস নেই। টেলিটকের লেজার এবং অন্যান্য হিসাবে মজুদ দুই ধাপে ৩১ কোটি টাকার বিভিন্ন মূল্যমানের স্ক্র্যাচকার্ড এবং ক্যাশকার্ড ঘাটতি রয়েছে। একইভাবে ৪৩ হাজার ২৭১টি সিমকার্ডের মজুদ ঘাটতির ফলে কোম্পানি ও সরকারের রাজস্ব ক্ষতির পরিমাণ আরও ৩ কোটি ৮৯ লাখ ৪৪ হাজার ৪৯ টাকা। এ বিষয়ে টেলিটকের সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা নেই।
টেলিটকের জন্মের পর থেকে ২০১০-১১ অর্থবছর পর্যন্ত সাত বছরের অডিট প্রতিবেদনে পাওয়া গেছে এ তথ্য। টেলিটকের একমাত্র অডিটও এটি। প্রি-পেইড সিমকে পোস্টপেইডে রূপান্তর করে রাজস্ব ফাঁকি দেওয়া, বাজারদরের চেয়ে অতিরিক্ত মূল্যে সিমকার্ড কেনা, ভিওআইপির অবৈধ কার্যক্রমে ফ্রি আইএসডি কল করতে দেওয়াসহ কোম্পানির ক্ষতির কয়েক ডজন কারণ উল্লেখ করা
হয়েছে প্রতিবেদনে। সব মিলে প্রায় ৬০০ কোটি টাকার অনিয়ম চিহ্নিত হয়েছে।
এর আগে সমকালে রিপোর্ট করা হয়েছে এমন অন্তত কয়েকটি অনিয়ম এবং দুর্নীতিও অডিটে ধরা পড়েছে। কোম্পানির বোর্ড চেয়ারম্যানের নামে অযাচিত ও নিয়মবহির্ভূতভাবে ১ কোটি ৯৭ লাখ টাকায় গাড়ি কেনাসহ ইচ্ছামাফিক যাকে খুশি তাকে বিভিন্ন কাজ দেওয়ার মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা লোপাটের হিসাব তুলে ধরা হয়েছে অডিট প্রতিবেদনে। সাত বছরের এই বিশেষ অডিট সম্পন্ন হয়েছে চলতি বছরের ৪ মার্চ থেকে ১৭ মের মধ্যে। সরাসরি দুর্নীতি হয়েছে এমন খাতের তালিকায় বিলিং সিস্টেম বাইপাস করে আইএসডি কল করতে দেওয়া এবং সিম ও স্ক্র্যাচকার্ডের গরমিল উল্লেখযোগ্য।
তবে অডিট প্রতিবেদন সম্পর্কে টেলিটকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুজিবুর রহমান সমকালকে বলেন, অডিটের প্রাথমিক রিপোর্টে অনেক কিছু দেখানো হলেও চূড়ান্ত রিপোর্টে এর কিছুই থাকবে না। একই সঙ্গে এগুলোকে টেলিটকের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র উল্লেখ করে তিনি বলেন, রাষ্ট্রায়ত্ত ল্যান্ডফোন অপারেটর বিটিসিএল যেভাবে লুটপাটের মাধ্যমে ধ্বংস করা হয়েছে, একইভাবে এখানেও একটি চক্র তাদের কার্যক্রমের বিরুদ্ধে লেগেছে। চক্রটি অডিট দলকে দিয়ে নানা রকম অভিযোগ করাচ্ছে।
অডিট প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মজুদ হিসাবে এক ধাপে ২১ কোটি ৩২ লাখ ৫৯ হাজার ৬৩০ টাকা মূল্যমানের স্ক্র্যাচকার্ড এবং ক্যাশকার্ড ঘাটতি রয়েছে। টেলিটক বলেছে, সব কাস্টমার কেয়ারের বিক্রয়ের হিসাব নিলে সঠিক তথ্য পাওয়া যাবে। তবে অডিট দল তাদের এই বক্তব্য গ্রহণ করেনি। তারা বলেছেন, মার্কেটিং শাখা কেন্দ্রীয়ভাবে স্ক্র্যাচকার্ড এবং ক্যাশকার্ডের ক্রয়-বিক্রয় হিসাব, বিভিন্ন বিক্রয় কেন্দ্রে ইস্যু এবং মজুদ হিসাব সংরক্ষণ করে। সে অনুযায়ী বছর শেষে কেন্দ্রীয় মজুদ হিসাবে বিভিন্ন বিক্রয় কেন্দ্রসহ মোট মজুদ দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার প্রত্যয়নসহ মজুদ হিসাব সংরক্ষণ করা হয়নি। এ ক্ষেত্রে অডিট দলের সুপারিশ হলো, কেন্দ্রীয় মজুদ ঘাটতি হিসাবে আপত্তিকৃত ২১ কোটি ৩২ লাখ টাকা মূল্যের স্ক্র্যাচকার্ড এবং ক্যাশকার্ডের বিক্রয় কেন্দ্রভিত্তিক বাস্তব যাচাই প্রতিবেদন আবশ্যক। অন্যথায় আপত্তিকৃত টাকা সংশ্লিষ্ট দায়ী ব্যক্তিদের কাছ থেকে আদায় করতে হবে।
এদিকে ২০০৫ সালের অপর একটি হিসাবে দেখানো হয়েছে ৯ কোটি ৮৭ লাখ টাকার গরমিল। সেখানে বলা হয়েছে, ওই বছরের ৮ ডিসেম্বর ভেরিফিকেশনের সময় প্রতিটি ৩শ' টাকা মূল্যের ৩ হাজার ২৯২টি স্ক্র্যাচকার্ড কম পাওয়া যায়। তখন ৯ কোটি ৮৭ লাখ ৬শ' টাকার ক্ষতি হলেও এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত দায়ীদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
অন্যদিকে টেলিটকের একটি পক্ষ বলছে, তখন গণনায় ভুল হওয়ার কারণে কিছু সমস্যা হয়েছিল। বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ বিষয়ে বলেছেন, ওই সময়ের ভ্রান্তি সম্পর্কে তার কোনো ধারণা নেই। ফলে এ বিষয়ে তিনি কিছুই বলতে পারবেন না।
অপরদিকে ২০১১ সালের ৩০ জুন সিমকার্ডের মজুদ হিসাবে ৪৩ হাজার ২৭১টি সিমকার্ড কম পায় অডিট দল। যার সম্পূরক শুল্ক ও ভ্যাট বাবদ সরকারের সরাসরি ৩ কোটি ৪৬ লাখ ১৬ হাজার ৯৪৯ টাকা ক্ষতি হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে টেলিটক বলেছে, নির্দিষ্ট ওই তারিখে তাদের লেজার অনুসারে কোনো পার্থক্য নেই।
টেলিটকের হিসাবে ওই তারিখে ২ লাখ ৩৫ হাজার ৮৫৫টি সিম থাকলেও বাস্তবে পাওয়া গেছে ১ লাখ ৯২ হাজার ৫৮৪টি। এখানেও টেলিটকের বক্তব্য, ২৬টি কাস্টমার কেয়ার ও বিক্রয় সিমের হিসাব নিলে মোট সংখ্যার সঙ্গে মিল পাওয়া যায়। অডিট দল বলেছে, সিম যেখানেই থাকুক না কেন, তার হিসাব লেজারে থাকবে। তাছাড়া লেজার এবং কাস্টমার কেয়ারগুলোর তথ্য মেলে না। ফলে এসব তথ্য কেবল বিভ্রান্তি বাড়ায়। তারা বলেন, টেলিটকের বক্তব্য অনুসারে ঢাকা অফিসের মজুদ ১ লাখ ৯২ হাজার ৫৮৪টি। অপরদিকে তারাই যে হিসাব দিয়েছে তাতে মার্কেটিং ডিপার্টমেন্টসহ ঢাকার ৬টি বিক্রয় কেন্দ্র ও কাস্টমার কেয়ার ইউনিটে মজুদ আছে ১ লাখ ৪১ হাজার ৮৩৭টি সিম। জবাব অনুযায়ী ঢাকা অফিসের মজুদ ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়ায় ৫০ হাজার ৭৪৭টিতে।
অডিট প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ওই একই দিন আরেক জায়গায় মজুদ দেখানো হয়েছে ২ লাখ ২৪ হাজার ৭৪২টি সিম। সেখানে ঘাটতি উল্লেখ করা হয়েছে ১১ হাজার ১১৩টি সিম। এগুলো কার্ড করপোরেট সিম, আন্তর্জাতিক মোবাইল ফেয়ারসহ বিভিন্ন স্থানে বিতরণ দেখানো হয়েছে। আবার বিতরণের ক্ষেত্রে কোনো প্রমাণ রাখা হয়নি। অডিটের সুপারিশে বলা হয়েছে, ঘাটতি পড়া ৪৩ হাজার ২৭১টি সিমের বিক্রয়মূল্য বাবদ ৩ কোটি ৪৬ লাখ ১৬ হাজার ৯৪৯ টাকা হিসাবে জমা হওয়া আবশ্যক।
এসব বিষয়ে মুজিবুর রহমান বলেন, তারা হিসাব মিলিয়ে দেখিয়েছেন। এখানে কোনো ঘাপলা নেই বলেও দাবি করেন তিনি। মন্ত্রণালয়কেও বিষয়টি জানানো হয়েছে। মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে ত্রিপক্ষীয় ব্যবস্থা নেওয়ার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করবে বলেও জানান তিনি।
অডিট রিপোর্ট অনুযায়ী, শুরু থেকেই বিভিন্ন সময় বিপুল পরিমাণ প্রি-পেইড ও পোস্ট পেইড সিম রিপ্লেস করে অবৈধ ভিওআইপির সুযোগ করে দেওয়ায় কোম্পানির বিপুল রাজস্ব ক্ষতি হয়। ২০১০ সালের আগস্ট থেকে অক্টোবরের মধ্যে কুমিল্লা অঞ্চলের মেসার্স আলী অ্যান্ড সন্স ডিলার এবং তার অধীন মহোদজনপুরের রিটেইলার সাইফুল আলমের (নিবু) উপহার ক্লথ স্টোর বিপুল সংখ্যক প্রি পেইড ও পোস্ট পেইড সিম রিপ্লেস করে। যেগুলো পরে ভিওআইপির অবৈধ কাজে ফ্রি আইএসডি কল করে কোম্পানির ৪ কোটি ১২ লাখ ৫৪ হাজার ৭৯৫ টাকার রাজস্ব ক্ষতি হয়। ওই বছরই বিটিআরসি বিষয়টি টেলিককে জানালে তদন্তের পর তদন্ত হলেও কোনো ব্যবস্থা তারা নেয়নি।
এ বিষয়ে টেলিটক বলেছে, বিলিং সিস্টেমের ত্রুটির কারণে ক্ষতি হয়নি, তাই এই সিস্টেমের সঙ্গে সম্পর্কিত কাউকে দোষী সাব্যস্ত করা নিতান্তই অমূলক। তারা বলেছেন, টেলিটকের সিম রিপ্লেস প্রক্রিয়ায় যে নম্বরগুলোর মাধ্যমে বিশাল রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে তাদের কোনোটাই বিলিং সিস্টেমে পোস্ট পেইড নম্বর হিসেবে অন্তর্ভুক্ত ছিল না। এ ক্ষেত্রে তারা প্রযুক্তি সরবরাহকারী কোম্পানিকে দায়ী করেন।
অডিটে দেখানো হয়েছে, ২০০৬-০৭ অর্থবছরে দরপত্র আহ্বান না করেই সোয়া ৪ লাখ সিম কেনা হয়। দুটি কোম্পানির কাছ থেকে কেনা প্রতিটি সিমের বাজারদর ৬১ টাকা হলেও কেনা হয় ১৭৮ টাকা ২১ পয়সা দরে। এখানে টেলিটকের তিন কোটি ৮০ লাখ ৯৩ হাজার ২৫০ টাকার ক্ষতি হয়।
শুরুর দিকে টেলিটকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ব্যবহারের জন্য ৭৪৫টি হ্যান্ডসেট আমদানি করা হয়। ২০০৫ সালের ৩১ ডিসেম্বরের আর্থিক হিসাব অনুযায়ী প্রতিটি হ্যান্ডসেটের দাম ২৮ হাজার টাকা। হ্যান্ডসেটগুলোর ৬২০টি বিতরণ করা হলেও বাকি ১২৫টি হ্যান্ডসেটের কোনো হিসাব পাওয়া যাচ্ছে না।
অপারেটরটির দুই সহকারী ব্যবস্থাপক এসএম তারেক ও হাসিবুর রহমান ডিলারদের সঙ্গে যোগসাজশে বিল জেনারেটের মাধ্যমে ১৪শ' প্রি পেইড সিমকে পোস্ট পেইডে রূপান্তর করে। ২০১০ ডিসেম্বর থেকে ২০১১ মে পর্যন্ত বিল জেনারেটিংয়ের মাধ্যমে ক্ষতি হয় ১৫ কোটি ৩৫ লাখ ৫৭ হাজার ২৮৪ টাকা। অথচ ওই দুই কর্মকর্তা গ্রাহকপ্রতি ৩শ' টাকা করে নিয়ে এই সুবিধা করে দেন। পরে তারেক ৩ কোটি ১১ লাখ এবং হাসিবুর ১ কোটি ২৫ লাখ টাকা আত্মসাৎ করেন বলে উল্লেখ করা হয়। ঘটনাটি উদ্ঘাটিত হলে তারেক ৩৫ লাখ এবং হাসিবুর ৩০ লাখ টাকা ফেরতও দেন। বর্তমানে বিষয়টি দুর্নীতি দমন কমিশন তদন্ত করছে। তখন এ বিষয়ে সমকাল রিপোর্ট করলেও কর্তৃপক্ষ তা স্বীকার করেনি।
গ্রাহকের কাছ থেকে আদায় করলেও টেলিটক কর্তৃপক্ষ দুটি অর্থবছরের ১৭৪ কোটি টাকার বেশি সরকারি কোষাগারে জমা করেনি। এর মধ্যে ২০১০-১১ অর্থবছরের বাকি থাকা ১৬২ কোটি ৫৬ লাখ ৩৫ হাজার ২৯৪ টাকার কিছুটা জমা করা হলেও ২০০৬-০৭ অর্থবছরে আদায় করা ১২ কোটি ১২ লাখ ৩৭ হাজার ৬৪৭ টাকা ভ্যাটের কিছুই তারা জমা করেনি। আবার টেলিটক বোর্ডের চেয়ারম্যানের জন্য ৬৭ লাখ টাকার গাড়ি বদলে অযাচিতভাবে কেনা ১ কোটি ৯০ লাখ ৭৫ হাজার টাকায় কেনা পাজেরো জিএলএস বিষয়েও আপত্তি ওঠে। এই গাড়িটি কেনার জন্য প্রাক্কলিত ব্যয় ছিল ১০ লাখ ৭৫ হাজার টাকা। পরে সেটি বাড়িয়ে নেওয়া হয়।
উলি্লখিত কারণ ছাড়াও জনবল নিয়োগ, ঠিকাদারি নিয়োগ, ডিলার নিয়োগ, গ্যাসচালিত গাড়িতে তেলের বিল করা, কাস্টমার কেয়ার সেন্টারের জন্য বাড়ি ভাড়াসহ বিভিন্ন খাতে কোটি কোটি টাকার দুর্নীতি ও অনিয়মের তথ্য বের করেছে অডিট দল।
তবে টেলিটক এমডি বলেছেন, মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে প্রাথমিকভাবে উপস্থাপন করা এসব মিথ্যা তথ্য বাতিল করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। 
http://www.samakal.com.bd/details.php?news=13&action=main&option=single&news_id=317192&pub_no=1272

Friday, December 28, 2012

২০১২ : দশ আলোচিত ব্যক্তি

হুসাইন আজাদ, নিউজরুম এডিটর
ঢাকা: বিদায়ের শেষ লগ্নে পৌঁছে গেছে ২০১২। শুরু হয়ে গেছে বছরটির চাওয়া-পাওয়ার হিসাব মেলানোর পালা। তারই অংশ হিসেবে প্রতিবারের মতো এবারও ২০১২ সালে গণমাধ্যমের সবচেয়ে আলোচিত ব্যক্তিদের তালিকা তৈরি করেছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদ সংস্থা সিএনএন। 
এজন্য বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী ২০ গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বকে প্রাথমিকভাবে নির্বাচিত করে অনলাইনে ভোট আহবান করা হয়।

প্রাথমিক তালিকার ২০ জনের মধ্যে বিশ্বের প্রভাবশালী মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার নাম থাকলেও শেষ ভোটে বাদ পড়ে যান তিনি। আরও বাদ পড়েন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন, ইয়াহুর প্রধান নির্বাহী মারিসা মায়ার, অ্যাপলের টিম কুক, ফেসবুকের মার্ক জুকারবার্গের মতো ব্যক্তিরাও।

সিএনএনের ভোটে চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত শীর্ষ দশ গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বের তালিকা বাংলানিউজের পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো:

১. বাশার আল আসাদ: ২০১০ সালের শেষদিকে শুরু হওয়া আরব দেশগুলোর বিপ্লবের আঁচ গত বছর সিরিয়াতেও এসে পড়ে। সরকারবিরোধীরা প্রাথমিকভাবে দেশটির প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদকে ক্ষমতা ছাড়ার আহবান জানায়। কিন্তু আসাদ ক্ষমতা ছাড়তে অস্বীকৃতি জানালে বিদ্রোহীরা সশস্ত্র আন্দোলন শুরু করে।
২০১১ সালের মার্চে শুরু হওয়া সরকার বিরোধী আন্দোলনে এ পর্যন্ত ৪০ হাজার সিরিয়ান নাগরিক নিহত হলেও এখনও নিজ অবস্থানে অটল আসাদ। জাতিসংঘসহ বিভিন্ন দেশ আসাদকে সমঝোতা প্রস্তাব দিলেও তা বরাবরই নাকচ করে দিয়েছেন তিনি।

২. মোহাম্মদ মুরসি: আরব বিপ্লবের জের ধরে চলতি বছরের জুনে মিশরের প্রথম গণতান্ত্রিক প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হন মোহাম্মদ মুরসি। কিন্তু ক্ষমতা গ্রহণের ৬ মাসের মধ্যেই বিরোধী শিবির তার প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ করে। নভেম্বরে একটি অধ্যাদেশ জারিকে কেন্দ্র করে এখন পর্যন্ত সহিংসতা অব্যাহত রয়েছে দেশটিতে। সম্প্রতি পার্লামেন্টের ক্ষমতা বাড়াতে সংবিধান সংশোধন করে গণভোটের ডাক দেন প্রেসিডেন্ট। ইসলামপন্থীরা জয়ী হলেও প্রেসিডেন্ট মুরসির এই উদ্যোগে সন্তুষ্ট নয় মিশরের ধর্মনিরপেক্ষ বিরোধী শিবির।

৩. বো জিলাই: দক্ষিণ-পশ্চিম চীনের চংকিং রাজ্যের রাজনৈতিক নেতা বো জিলাই। ব্রিটিশ ব্যবসায়ী নেইল হেইউডকে হত্যার জন্য তার স্ত্রী জু কাইলাইকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। ঐ কেলেঙ্কারিতে জড়িয়ে পড়েন জিলাইও।
সম্প্রতি চীনের কমিউনিস্ট পার্টির সম্মেলনে ৯ সদস্যের পলিটব্যুরো সদস্যদের একজন নির্বাচিত হলেও রাজনৈতিক কেলেঙ্কারির কারণে দল থেকেই বহিস্কৃত হয়ে যান তিনি।

৪. শি জিনপিং: চলতি বছর অনুষ্ঠিত সম্মেলনে আগামী এক দশকের জন্য চীনের ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টির প্রধান হিসেবে নির্বাচিত হন শি জিনপিং। চীনের সদ্যবিদায়ী প্রেসিডেন্ট হু জিনতাওয়ের স্থলাভিষিক্ত হন দলটির প্রভাবশালী এই নেতা। আগামী চার বছরের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক শক্তিকে হারানোর যে চ্যালেঞ্জ চীন নিয়েছে, তাতে এই নবনির্বাচিত নেতা যথেষ্ট ভূমিকা রাখতে পারবেন বলে আশা করা হচ্ছে।

৫. জোশেফ কোনি: উগান্ডাসহ মধ্য আফ্রিকার পলাতক যুদ্ধবাজ সেনাপতি জোশেফ কোনি। দু’দশক ধরে এসব অঞ্চলের ভয়ংকর সন্ত্রাসী হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আসছেন তিনি। যুক্তরাষ্ট্রের একটি সংস্থা এই গেরিলা সেনাপতির উপর ‘কোনি ২০১২’ নামে একটি প্রামাণ্য চিত্র নির্মাণ করে। আশ্চর্য হলেও সত্য, প্রামাণ্যচিত্রটি এ বছরের মার্চে ইউটিউবে ছাড়া হলে মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যেই সাত কোটি ৪০ লাখ বার প্রদর্শিত হয়।

৬. মালালা ইউসুফজাই: নারী শিক্ষার প্রচারণা চালাতে গিয়ে অক্টোবরে তালেবানদের গুলিতে মারাত্মক আহত হয় ১৫ বছর বয়সী পাকিস্তানের মানবাধিকারকর্মী কিশোরী মালালা ইউসুফজাই।
বর্তমানে যুক্তরাজ্যের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন এই মানবাধিকারকর্মীকে দেখতে হাসপাতালে গিয়েছেন স্বয়ং পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আসিফ আলী জারদারি।
এরপর মালালার নিজ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির নামকরণ করা হয় ‘মালালা পাবলিক হাইস্কুল’। জাতিসংঘ তাদের নারী শিক্ষা প্রচারণা সংস্থার নাম ‘আমি মালালা’ রেখে প্রচারণা শুরু করে।

৭. সাই : ‘গ্যাংনাম স্টাইল’ গানের গায়ক দক্ষিণ কোরিয়ার র‌্যাপ সঙ্গীতশিল্পী সাই। ৩৪ বছর বয়সী এই গায়কের গানটি ইউটিউবের সবচেয়ে বেশিবার দেখা ভিডিও। এবং এটাই একমাত্র ভিডিও, যেটি ইউটিউবে ১শ’ কোটি বার দেখার মাইলফলক ছুঁয়েছে।
গানে সাই’র অশ্বারোহীদের মতো কিম্ভূত নাচুনি স্টাইল সবার মধ্যেই একধরনের আবেশ তৈরি করে। যার ফলে সাই’র স্টাইলে নাচতে চেষ্টা করে অনেকে। এই চেষ্টার তালিকায় আছেন জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুন থেকে শুরু করে চীনা চিত্রশিল্পী আই ওয়েইয়ের মতো ব্যক্তিরাও!

৮. ফ্রান্সেসকো শেটিনো : অভিজাত সমুদ্র  জাহাজ ‘কোস্টা কনকর্ডিয়া’র ক্যাপ্টেন ফ্রান্সেসকো শেটিনো।
এ বছরের জানুয়ারিতে সমুদ্রে যাত্রাপথে এক দুর্ঘটনায় জাহাজটির ৩২ জন যাত্রী নিহত হয়। অভিযোগ রয়েছে, ৩ হাজার ২শ’ যাত্রী ও ১ হাজার নাবিকের ঐ জাহাজটি ইতালির গিগলো দ্বীপের কাছে একটি বরফের পাথরে ধাক্কা খাওয়ার পরও টা কূলে নোঙর করা হয়নি। পরে জাহাজ চালনায় অসাবধানতা ও অবহেলার কারণ দেখিয়ে নরহত্যার অভিযোগ আনা হয় শেটিনোর বিরুদ্ধে।

৯. অ্যালান অলিভিয়েরা : ব্রাজিলের দৌঁড়বিদ অ্যালান অলিভিয়েরা ২০১২ সালের লন্ডন অলিম্পিকে বিস্ময়করভাবে ২০০ মিটার দৌঁড়ে স্বর্ণ জেতেন। দক্ষিণ আফ্রিকার বিস্ময় বালক অস্চার পিস্টোরিয়াসকে পরাজিত করে তিনি ঐ সম্মাননা জেতেন। এ কীর্তির জন্য ‘ব্লেড রানার’ অ্যাখ্যা পান অ্যালান।

১০. অংসান সুকি : মিয়ামারের গণতন্ত্রপন্থী নেত্রী অংসান সুকি। শান্তিতে নোবেলজয়ী এই নেত্রী চলতি বছর দীর্ঘ গৃহবন্দিত্ব থেকে মুক্তি পান। কয়েক মাস আগে মিয়ানমার পার্লামেন্টের উপ-নির্বাচনে নিজের আসনে জয়ী হন তিনি। ১৫ বছর পর নিজের গৃহ থেকে বন্দী দশা কাটিয়ে ওঠা সুকি সম্প্রতি লন্ডন, ওয়াশিংটন ও নরওয়ে সফর করেন। নোবেল জয়ের ২১ বছর পর নরওয়েতে গিয়ে পুরস্কার জয়ের অভিব্যক্তি প্রকাশ করেন তিনি।
http://www.banglanews24.com/detailsnews.php?nssl=7f5d6d8aec8787c36e857bb3cd655599&nttl=28122012161761

অভিভাবকহীন ডিসিসি :

ফয়েজ উল্লাহ ভূঁইয়া:
নাগরিকসেবা বৃদ্ধির কথা বলে ঢাকা সিটি করপোরেশনকে (ডিসিসি) দু’ভাগে বিভক্ত করা হয়েছিল ২০১১ সালের ১ ডিসেম্বর। তারপর ১৩ মাসে এই বিভক্তি নগরবাসীর জন্য দুর্ভোগেরই কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পুরো সময়ই অভিভাবকহীন সংস্থাটি। তিন মাসের মধ্যে নির্বাচন  হওয়ার কথা ছিল। তা এখনো হয়নি। কবে সেই নির্বাচন হবে তা-ও কেউ জানে না।
তিন মাস পরপর প্রশাসক আসছেন, আর বিদায় নিচ্ছেন। নতুন অর্গানোগ্রাম না হওয়ায় জনবল বিভাজন সম্পন্ন হয়নি। ফলে এক অংশে অতিরিক্ত জনবল অন্য অংশে চলছে সঙ্কট। এক অংশে আর্থিক সঙ্কট অন্য অংশে কর্মকর্তাদের আলাদা অফিস নেই। কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নিজেদের মতো করে অফিস করছেন। তদারকি আর জবাবদিহিতার অভাবে সর্বত্র অনিয়ম-দুনীর্তির বিস্তার ঘটেছে। রাস্তাঘাটের সংস্কার, মশক নিয়ন্ত্রণ, বর্জ্য অপসারণ কাজ চলছে নামমাত্র। নাগরিক সনদ, জন্ম সনদ, ওয়ারিশান সনদ, মৃত্যু সনদ নিতে গিয়েও হয়রানির শিকার হচ্ছেন নগরবাসী। জনপ্রতিনিধি না থাকায় স্থানীয় বাসিন্দারা তাদের দুর্ভোগের ব্যাপারে অভিযোগ করারও সুযোগও পাচ্ছেন না। এ ছাড়া উন্নয়ন প্রকল্পগুলোও চলছে ঢিমেতালে। ফাইওভার নির্মাণসহ অন্যান্য বড় কোনো প্রকল্পই নির্ধারিত সময়ে শেষ হচ্ছে না।
ভেঙে পড়েছে নাগরিকসেবা : মেয়র ও কাউন্সিলর না থাকায় এক বছরে ডিসিসির নাগরিকসেবা ভেঙে পড়েছে। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির অনুপস্থিতিতে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। জনগণের দুর্ভোগ নিয়ে মাথা ঘামানোর লোকÑ ওয়ার্ড কাউন্সিলররাও নেই। ফলে রাস্তাঘাট ভেঙে যাওয়া, স্যুয়ারেজ লাইন উপচে পড়া, পানি, বিদ্যুৎ, গ্যাস সঙ্কট, মশা, আবর্জনার সমস্যাসহ স্থানীয় সমস্যাগুলো যেন দেখার কেউ নেই। কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ভালো জায়গায় পোস্টিং বিশেষ করে উত্তর ডিসিসিতে বদলির তদবিরেই ব্যস্ত থেকেছেন পুরো বছর। আবার অনেক কর্মকর্তা অফিসে আসা যাওয়া এবং না পারলে নয়Ñ এমন ফাইলে স্বাক্ষর করা ছাড়া আর কিছুই করেননি। উভয় অংশে গুরুত্বপূর্ণ অনেক পদ খালি থাকার কারণে অনেক ক্ষেত্রে কাজ প্রায় বন্ধ হয়ে আছে।
আবর্জনা অপসারণকাজে ভাটা : আবর্জনা অপসারণকাজে আগের তুলানায় ভাটা পড়েছে। মূল সড়কের বড় আবর্জনার জায়গাগুলো নিয়মিত পরিষ্কার করা হলেও ভেতরে অনেক জায়গা থেকে আবর্জনা সরানো হচ্ছে না। পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা অনেক এলাকায় শুক্র ও শনিবার আবর্জনা সরাতে যাচ্ছে না। পথেঘাটে ছড়িয়ে ছিটিয়ে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে এসব আবর্জনা। ডিসিসির নিয়ন্ত্রণাধীন ড্রেনগুলোতে হাত পড়েনি দীর্ঘ দিন। ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই রাজধানীর রাস্তায় জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। একটু ভারী বৃষ্টি হলে কোনো রাস্তা দিয়ে হাঁটার কোনো সুযোগ ছিল না। রাস্তা কাটার পর দীর্ঘ দিন কার্পেটিং ছাড়াই পড়ে থাকছে।
জন্ম সনদ নিতে হয়রানি : জন্ম-মৃত্যু সনদ, ট্রেড লাইসেন্স গ্রহণ ও নবায়ন, ওয়ারিশান সার্টিফিকেট নিতে গিয়ে নানা হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের ‘বকশিশ’ না দিলে ফাইল পড়ে থাকছে। নানা কাগজপত্র লাগবে জানিয়ে আবেদন ফেরত দেয়া হচ্ছে। ওয়ার্ড কাউন্সিলরের সার্টিফিকেট গ্রহণ করলে আর কোনো কাগজপত্র লাগত না। এখন তার পরিবর্তে অনেক ধরনের কাগজপত্র চেয়ে হয়রানি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া  গেছে।
ভেজালবিরোধী অভিযান : ভেজাল খাদ্যের বিরুদ্ধে আগে নিয়মিত অভিযান হতো এবং ভেজাল পাওয়া গেলে মামলা হতো। এখন অভিযান পরিচালিত হলেও অধিকাংশ মামলা পড়ে আছে। বিশেষ করে নতুন অর্গানোগ্রামে দক্ষিণের কেন্দ্রীয় ফুড অ্যান্ড স্যানিটেশন বিভাগ বিলুপ্ত করার প্রস্তাব থাকায় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মামলাগুলো নিয়ে আর তেমন মাথা ঘামাচ্ছেন না বলে জানা গেছে। অভিন্ন সিটি করপোরেশনের সময় দায়ের করা কয়েক হাজার মামলা পড়ে আছে। এ ছাড়া ফুটপাথে হকার, নির্মাণসামগ্রী ও ব্যবসায়িক মালামাল মুক্ত রাখা, অবৈধ বিলবোর্ড উচ্ছেদ, পার্ক ও ডিসিসির রাস্তাঘাটের আশপাশ অবৈধ দখলমুক্ত রাখা, বেওয়ারিশ কুকুর নিধন, হালাল ও স্বাস্থ্যকর গোশত নিশ্চিত করার লক্ষ্যে জবাইখানায় তদারকির মতো কাজগুলোা প্রায় বন্ধ হয়ে আছে।
মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম নামমাত্র : মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম অনেকটাই লোক দেখানো কার্যক্রমে পরিণত হয়েছে। প্রাকৃতিক নিয়মে মশা জন্ম নিচ্ছে, আর প্রাকৃতিক কারণেই আবার কমে যাচ্ছে। মাঝে চলছে ডিসিসির কিছু লোক দেখানো তৎপতরতা। আর বছরান্তে ১৫ থেকে ১৮ কোটি টাকা খরচ দেখানো এটা নিয়মে পরিণত হয়েছে। মেয়র কাউন্সিলর না থাকায় এ নিয়ে উচ্চবাচ্য করারও কেউ নেই। মশা নিয়ন্ত্রণে প্রতিদিন প্রতি ওয়ার্ডে সকাল-বিকেল ওষুধ ছিটানো, ডোবা-নালা পরিষ্কার করার  কথা বলছেন ডিসিসির কর্মকর্তারা। বাস্তবে কিছু ভিআইপি এলাকায় বিকেলে ফগিং করা ছাড়া তেমন কোনো কাজই  হচ্ছে না। বর্ষার অজুহাতে গত এক বছর ডোবা-জলাশয়ের কচুরিপানা পরিষ্কার করা হয়নি। সম্প্রতি সেই কাজ আবার শুরু হয়েছে বলে দাবি করা হলেও বাস্তবে সেটা চোখে পড়ছে না। এ ছাড়া উড়ন্ত মশার ওষুধ ছিটিয়ে কোনো লাভ হয় নাÑ এই অজুহাতে এই ওষধ ছিটানো উভয় অংশেই বন্ধ আছে।
মুখ থুবড়ে পড়েছে উন্নয়নকাজ : রাজধানী ঢাকার উন্নয়নকাজ মুখ থুবড়ে পড়েছে। ডিসিসিকে দু’ভাগের পাশাপাশি নির্বাচিত মেয়র-কাউন্সিলরদের পদের বিলুপ্তির পর উন্নয়নকাজ গতি হারিয়েছে। বিশেষ করে রাস্তাঘাট সংস্কার, ফাইওভার নির্মাণ, কার পার্কিং ভবন নির্মাণ, ফুটপাথ ও মিডিয়ান উন্নয়ন, বিউটিফিকেশন, পার্ক উন্নয়নের কাজ প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে।  সরকারের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে ফাইওভার নির্মাণের ব্যাপারে বছরের শেষার্ধে জোর দেয়া হলেও কোনো কাজই নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে শেষ হচ্ছে না।
রাস্তাঘাট উন্নয়ন : ২০১১ সালে হাতে নেয়া তিনটি প্রকল্পের কাজ শুরু হয়েছিল ঢিমেতালে। বিগত বছরগুলোতে ডিসিসির স্বল্প বরাদ্দ, অনিয়মসহ নানা জটিলতায় কিছু কিছু সড়কের কাজ না হওয়ার কারণে ভাঙাচোরা রাস্তার তালিকা দীর্ঘ হয়েছে। বিশেষ করে সমাপ্য বছরে বৃষ্টিপাত বেশি হওয়ায় মূল সড়ক থেকে শুরু করে গলিপথ পর্যন্ত সব ধরনের রাস্তাই ভেঙেচুরে খানাখন্দে পরিণত হয়। কিছু রাস্তায় ইট-সুড়কি ফেলে চলাচল উপযোগী রাখার চেষ্টা করা হলেও তা তেমন কাজে আসেনি। ২০১১ সালের অক্টোবরে ডিসিসির উদ্যোগে রাজধানীর অধিকতর ভাঙাচোরা রাস্তার মেরামতের জন্য একটি কর্মপরিকল্পনা নেয়া হয়। ৩৮২টি ছোট বড় রাস্তা সংস্কারের জন্য চিহ্নিত করা হয়। ডিসিসির নিজস্ব বাজেট থেকে ২৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে এসব কাজ সংস্কার করার কথা। সেই কাজ এই বছরও সামান্যই বাস্তবায়ন হয়েছে। বিশেষ করে বাজেট স্বল্পতার কারণে অধিকাংশ রাস্তায় হাত দিতে পারেনি ডিসিসির উভয় অংশ। আম্ব্রেলা প্রজেক্টের আওতায় ২৬৬ কোটি টাকায় ৭৯টি সড়কের মেরামত  একনেকে অনুমোদিন ১৭৩ কোটি টাকার সংস্কারকাজের  অগ্রগতিও সামান্য। এসব কাজ কত দূর অগ্রসর হয়েছে তার সঠিক পরিসংখ্যানও পাওয়া যায়নি ডিসিসিতে।
ফাইওভার : ডিসিসির উদ্যোগে নির্মাণাধীন একমাত্র ফাইওভার গুলিস্তান-যাত্রাবাড়ী ফাইওভারের কাজের গতি হঠাৎ কমে যায় বছরের প্রথম দিকে। পরে আবার কাজের  গতি বাড়লেও এটির কাজ নির্দিষ্ট সময়ে সম্পন্ন হওয়া নিয়ে শঙ্কা রয়েছে। আগামী ২৬ মার্চ এটি উদ্বোধন করার কথা রয়েছে। তবে এ পর্যন্ত কাজ শেষ হয়েছে মাত্র ৬৮ শতাংশ। এ ছাড়া রাজধানীতে আরো দু’টি ফাইওভারে নির্মাণকাজ চলছে। এগুলোর একটি রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ এবং একটি সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ নির্মাণ করছে। ২০১০ সালের মাঝামাঝি কাজ শুরুর পর দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলছিল কুড়িল বিশ্বরোড ফাইওভারের কাজ। এই বছর সেটি কাজের গতি হারায়। এখনো কাজের প্রায় ৪০ শতাংশ বাকি রয়ে গেছে। এটি চলতি ডিসেম্বরে উদ্বোধন করার কথা ছিল। তবে এয়ারপোর্ট রোড-মিরপুর ফাইওভারের কাজ জানুয়ারিতে উদ্বোধন করার কথা জানিয়েছেন যোগাযোগমন্ত্রী। যদি এই ফাইওভারের কাজও এখনো মিরপুর অংশে অনেক বাকি রয়ে গেছে। এসব ফাইওভার নির্মাণজনিত কারণে বছরজুড়েই যানজট লেগেছিল। বিশেষ করে যাত্রাবাড়ী-সায়েদাবাদ এলাকায় বর্ষা মওসুমে কাদা-পানিতে নগরবাসীকে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে। তবে গত এক বছরে নগরীতে কয়েকটি ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণ হয়েছে এবং কয়েকটির কাজ চলমান রয়েছে।
লাগামহীন বাড়িভাড়া : রাজধানীতে বাড়িভাড়া বৃদ্ধি এখন ভাড়াটিয়াদের জন্য এক মূর্তিমান আতঙ্কের বিষয়ে পরিণত হয়েছে। ২২ বছর আগে পাস হওয়া একটি ত্রুটিপূর্ণ আইন থাকলেও সেটির প্রয়োগ না থাকায় বাড়িভাড়া বৃদ্ধি এখন বাড়িওয়ালাদের খেয়ালি বিষয়ে পরিণত হয়েছে। আইনটি প্রয়োগ করার দায়িত্ব কার সেটিও এখনো কেউ জানে না। ফলে ইচ্ছে মতো যখন তখন যেকোনো অঙ্কের বাড়িভাড়া বৃদ্ধি এখন রাজধানীতে সাধারণ ঘটনায় পরিণত হয়েছে। সাম্প্রতিককালে বাড়িভাড়া বৃদ্ধি রোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়ার জন্য বিভিন্ন মহল থেকে দাবি উঠলেও ডিসিরি পক্ষ থেকে এ ব্যাপারে কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি।
সেবা নয় দুর্ভোগই বাড়িয়েছে বিভক্তি : নাগরিকসহ প্রায় সর্বস্তরের মানুষের মতামত উপেক্ষা করে  বর্তমান সরকার রাতারাতি ডিসিসিকে ভাগ করে গত বছরের ১ ডিসেম্বর। কিন্তু আজ পর্যন্ত সংস্থা দু’টির পৃথক অর্গানোগ্রাম (জনবল কাঠামো) হয়নি। ১৩ মাস কোনো অর্গানোগ্রাম ছাড়াই চলছে ডিসিসি। দক্ষিণের জন্য বিশাল নগর ভবনকে কার্যালয় করা হলেও উত্তরে গুলশানে দ্বিতল মেয়র হাউজকে কার্যালয় বানানো হয়েছে। সেখানে একই কক্ষে যুগ্ম সচিব পদমর্যাদার তিন কর্মকর্তা-প্রধান প্রকৌশলী, প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ও প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মর্তার অফিস বসাতে হয়েছে। আর টিনচালা তৈরি করে খুপরি বানিয়ে অন্যান্য কর্মকর্তাকে বসানো হয়েছে।
এ দিকে মাত্র তিন মাসের জন্য নিয়োগপ্রাপ্ত প্রশাসকেরা বড় কোনো সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন না।  ভাগের কারণে অর্থনৈতিক বৈষম্য সৃষ্টি হওয়ায় দণি সিটি করপোরেশন আর্থিক সঙ্কটে রয়েছে। কারণ দক্ষিণে ওয়ার্ড বেশি রাখা হলেও হোল্ডিং ট্যাক্স বাবদ আয় কম। ফলে নিয়মিত ব্যয় মেটাতেও হিমশিম খেতে হচ্ছে। যে অর্গানোগ্রামে সংস্থা দু’টি চলার কথা সেই অর্গানোগ্রামও এখনো চূড়ান্ত অনুমোদন হয়নি।
ডিসিসি ভাগের পর কর্মকর্তাদের মধ্যে  চলেছে বদলি ও ভালো জায়গায় পোস্টিংয়ের জন্য জোর তদবির। নিয়োগের ক্ষেত্রে চলছে আর্থিক লেনদেন ও দলীয়করণের অভিযোগ।
বিভক্তির কারণে জোন পর্যায়েও দায়সারা কাজ হচ্ছে। কেউই চাপ অনুভব করছে না। বার্থ সার্টিফিকেট, ওয়ারিশান সার্টিফিকেট, ট্রেড লাইসেন্সসহ সব কাজের ক্ষেত্রেই  টাকা ছাড়া ফাইল নড়ছে না। টেন্ডারেরর ক্ষেত্রে জেঁকে বসেছে সিন্ডিকেট। প্রশাসকেরা অস্থায়ী হওয়ার কারণে বড় কোনো সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন না। উত্তর নগর ভবনের অফিস মহাখালী বাসস্ট্যান্ড-সংলগ্ন নির্মাণাধীন কাঁচাবাজারে স্থানান্তরের চিন্তা করা হয়। কিন্তু এখন সেই চিন্তাও বাদ পড়েছে।
নির্বাচন কবে কেউ জানে না : গত বছরের ২৯ নভেম্বর আইন পাসের পর ১ ডিসেম্বর থেকে ডিসিসির বিভক্তি কার্যকর হওয়ার পর তিন মাসের মধ্যে নির্বাচন করার কথা ছিল। কিন্তু সেটা সম্ভব না হওয়ায় গত ২৮ ফেব্রুয়ারি প্রশাসকের মেয়াদ আরো তিন মাস বৃদ্ধি অর্থাৎ মোট ছয় মাস করা হয় আইন সংশোধন করে। চলতি মে মাসের মধ্যে নির্বাচন করার কথা ছিল। সেই লক্ষ্যে ৯ এপ্রিল নির্বাচনের তফসিলও ঘোষণা করা হয়েছিল। হঠাৎ এক আইনজীবীর রিটের পরিপ্রেক্ষিতে নির্বাচন স্থগিত করে দেয়া হয়। এখন তিন মাস পরপর প্রশাসক বদলি হচ্ছে। ক্রমেই সরকারের মেয়াদ শেষ হয়ে আসায় ডিসিসি নির্বাচন নিয়ে অনিশ্চয়তা বেড়েই চলেছে। ফলে ঢাকা সিটি করপোরেশনকে আরো কত মাস বা বছর অভিভাবকহীন থাকতে হবে সেটি কেউ বলতে পারছে না। সর্বশেষ ২০০২ সালের এপ্রিলে ডিসিসির নির্বাচন হয়েছিল। ওই নির্বাচনে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের মেয়াদ ২০০৭ সালে উত্তীর্ণ হলেও এর পর এখন পর্যন্ত আর কোনো নির্বাচন হয়নি। বিভক্তির আগ পর্যন্ত মেয়াদ উত্তীর্ণ মেয়র-কাউন্সিলরেরা দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন ।