Saturday, December 8, 2012

বস্ত্রখাতে ৩৫ লাখ শ্রমিক চরম বৈষম্যের শিকার

লাগামহীন বাসা ভাড়া কম মজুরি নিরাপত্তাহীনতাসহ বিভিন্ন সংকট
কামাল উদ্দিন সুমন : চরম বৈষম্যের শিকার হচ্ছে বস্ত্রখাতের প্রায় ৩৫ লাখ শ্রমিক। এদের নেই ভালো বেতন। নেই নিরাপত্তা। নিত্যপণ্যের লাগামহীন দামের কারণে শ্রমিকরা যে বেতন পায় তাতে জীবন যাত্রার ব্যয় বহন করতে গিয়ে হিমশিম খেতে হয়। এছাড়া বাসা ভাড়া কয়েকগুণ বৃদ্ধির কারণেও গার্মেন্টস শ্রমিকদের জীবন কাটে কষ্টে। আশুলিয়ার নিশ্চিন্তপুরের তাজরিন গার্মেন্টেস ভয়াবহ অগ্নিকান্ডে ১১১ জন শ্রমিকের প্রাণহানিসহ পুরো ঘটনার পর তৈরি পোশাক খাতটির দেখভালের দায় দায়িত্ব আসলে কার, সে প্রশ্নই নতুনভাবে উঠে এসেছে। একাধিক মন্ত্রণালয় এ খাতের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকলেও সুনির্দিষ্টভাবে কেউ যেন অভিভাবক নয়। একটি এপারেল বোর্ড গঠনের কথা থাকলেও তা বাস্তবে রূপ নেয়নি।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশ তৈরি পোশাক উৎপাদক ও রফতানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) আওতায় ৪ হাজার ৪৯৭টি কারখানা রয়েছে। এর মধ্যে চালু কারখানা দুই হাজার ৮৫৮টি। বাংলাদেশ নিট পোশাক প্রস্তুতকারক ও রফতানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) এক হাজার ৫০৭টি কারখানার মধ্যে চালু রয়েছে ৯৮০টি। এসব কারখানার কাজ করছে প্রায় ৩৫ লাখ শ্রমিক আর এসব শ্রমিকদের  ৮০ শতাংশ শ্রমিকই নারী।
সূত্র জানায় ২০১০ সালে পোশাক কারখানায় ন্যূনতম মজুরী ৩ হাজার টাকা করা হলেও গত ২ বছরে নিত্যপণ্যের মূল্য ৭০ ভাগ বৃদ্ধির ফলে ওই ৩ হাজার টাকার বেতন দিয়ে শ্রমিকদের কষ্ট করে চলতে হচ্ছে। জীবন যাত্রার ব্যয় বহনে হিমশিম খেতে গিয়ে প্রায় বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে গার্মেন্টস শ্রমিকরা। এছাড়া একদিকে বেতন বৈষম্য অন্য দিকে নিরাপত্তাহীনতার কারণে গার্মেন্টস শ্রমিকদের দিনকাটে অভাব অনটনে।
সূত্র জানায়, তৈরি পোশাক খাতের বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধার বিষয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গেই দেনদরবার করতে দেখা যায় এ খাতের উদ্যোক্তা-ব্যবসায়ীদের কিন্তু বাণিজ্য মন্ত্রণালয় পুরো গার্মেন্টস খাতের বিষয়টি তারা দেখে না বলে সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়। সূত্রটি আরো জানায়, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় দেখে শুধু বাণিজ্য কীভাবে বৃদ্ধি করা যায়।
আর পাট ও বস্ত্র মন্ত্রণালয় কার্যপ্রণালী বিধি (রুলস অব বিজনেস) অনুযায়ী,  তৈরি পোশাক খাতের সবকিছু বস্ত্র মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন থাকার কথা হলেও বাস্তবে তা চলছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের আওতায়।
অন্যদিকে গার্মেন্টস খাতের ৩৫ লাখ শ্রমিকের বিষয়টিতে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের  সম্পৃক্ততা থাকলেও পুরো খাত তাদের আওতায় না থাকায়  শ্রমিকদের কর্মপরিবেশ ও নিরাপত্তার বিষয়টি তদারক করতে পারছে না । এভাবে রশি টানাটানির কারণে এর ভুক্তভোগী হচ্ছে গার্মেন্টস শ্রমিকরা।
জানা গেছে, শ্রমিকদের বিভিন্ন সমস্যা নিরসনে ২০০৫ সালের ২৬ জুলাই বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ‘সোশ্যাল কমপ্লায়েন্স ফোরাম ফর আরএমজি' একটি ফোরাম গঠন করে। একই সনের ১১ এপ্রিল সাভারে নয়তলা ভবনবিশিষ্ট স্পেকট্রাম সোয়ের্টার ইন্ডাস্ট্রিজের ভবন ধসে ৬৪ জনের মৃত্যুর  তিন মাস পর এ ফোরাম গঠিত হয়। ২৫ সদস্যের এ ফোরামের চেয়ারপারসন বাণিজ্যমন্ত্রী ও কো- চেয়ারপারসন শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী। তৈরি পোশাকশিল্পের কর্মপরিবেশ, ত্রিপক্ষীয় চুক্তি ও শ্রমিক অধিকার বাস্তবায়ন, শ্রমিক অসন্তোষ নিরসনসহ তৈরি পোশাক রফতানি ক্ষেত্রে সমস্যা দূর করতে নীতিগত সহায়তা ও পরামর্শ দেওয়া এ ফোরামের কাজ। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে শুরু করে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় বিভাগ, দফতর, অধিদফতর, ইউএনডিপি, আইএলও, জিটিজেড, বিদেশি ক্রেতা ফোরাম, দেশি-বিদেশি এনজিও ও শ্রমিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা এ ফোরামের সদস্য। ৩ মাস পর পর এ ফোরামের সভা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে তা হয় না।
বাংলাদেশ টেক্সটাইল গার্মেন্ট শ্রমিক ফেডারেশন এর সভাপতি শ্রমিক নেতা মাহবুবুর রহমান ইসমাইল বলেন, আমরা সব সময়েই গার্মেন্টস শ্রমিকদের ন্যুনতম মজুরি ৫ হাজার টাকা করার দাবি জানিয়ে আসছি। আমাদের দাবির মুখে ২০১০ সালের জুলাই মাসে ১৬ শ টাকা হতে বেতন ৩ হাজার টাকা করা হয়। কিন্তু বর্তমান বাজারদরে এটা অমূলক। কারণ এখন ৩ হাজার টাকায় একজন শ্রমিকের জীবিকা নির্বাহ কঠিন। তার উপর পরিবারের বোঝা থাকলে তা রীতিমত অসাধ্য। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে দারিদ্র্যসীমা অতিক্রম করতে হলে একজন মানুষের দৈনিক ২ ডলার আয় প্রয়োজন। কিন্তু সরকার ও মালিক সংগঠনের সমঝোতার নামে সাজানো নাটকের মধ্য দিয়ে ৩ হাজার টাকা ন্যুনতম গার্মেন্টস শ্রমিকদের কাজ করতে বাধ্য করছে।
বিকেএমইএ'র একজন কর্মকর্তা জানান, সরকার কর্তৃক প্রদত্ত মজুরি কাঠামো অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানগুলোকে শ্রমিকদের বেতন দেওয়া হচ্ছে। কোন ফ্যাক্টরিতে সমস্যা দেখা দিয়ে বিকেএমআইএ'র কমপ্লায়েন্স কর্মকর্তারা গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ও সমঝোতা করছে। এদিকে সরকারের কাছে ইউনাইটেড গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের পক্ষ থেকে শ্রমিকদের ন্যুনতম বেতন কমপক্ষে ১০০ ডলার করার দাবি করেন তোলা হলেও তার বাস্তবায়ন হয়নি।

No comments: