Wednesday, December 5, 2012

রাজধানীর এক সাজানো বাগান

এম এ বাবর:
দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর বহুল আলোচিত স্বপ্নের হাতিরঝিল-বেগুনবাড়ী প্রকল্পটি উন্মুক্ত হচ্ছে ১৫ ডিসেম্বর। নগর গবেষকদের মতে, দৃষ্টিনন্দন এ প্রকল্পটি উন্মুক্ত হলে নগরীর একাংশের ক্রমবর্ধমান যানজট কমবে। আর একই সঙ্গে এটি হবে নাগরিকদের অবকাশ যাপন কেন্দ্র।
গৃহায়ন ও গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী আবদুল মান্নান খান বলেছেন, ‘কাজের সন্তোষজনক অগ্রগতি হয়েছে। পুরো প্রকল্পটির সৌন্দর্য হবে প্যারিসের মতো নান্দনিক। আগামী ১৫ ডিসেম্বরই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা হাতিরঝিল প্রকল্পটি উদ্বোধন করবেন। এদিনই এটি জনসাধারণের জন্য খুলে দেয়া হবে। আর সেদিন সেখানে সারারাত আনন্দ উল্লাসের মধ্য দিয়ে এক নয়নাভিরাম ও অভূতপূর্ব দৃশ্যের অবতারণা হবে।’
এদিকে প্রকল্প এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, এখনো অনেক কাজ চলমান রয়েছে। এ ব্যাপারে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) ও প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সেনাবাহিনীর ১৬ ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন ব্যাটালিয়নের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, পুরোদমে কাজ এগিয়ে চলছে। ১৪ ডিসেম্বরের মধ্যে প্রায় সব কাজ সম্পন্ন হয়ে যাবে। কিছু কাজ প্রক্রিয়াধীন থাকলেও উদ্বোধনের পরে দ্রুত সে কাজগুলো সম্পন্ন করা হবে। হাতিরঝিল-বেগুনবাড়ী এলাকার পরিবেশ দূষণরোধ, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, ড্রেনেজ-স্যুয়ারেজ ব্যবস্থা, খাল ও এলাকা অবৈধ দখল থেকে রক্ষাসহ নগরীর যানজট নিরসন এবং নাগরিকদের অবকাশ যাপনের ক্ষেত্র তৈরির উদ্দেশ্য নিয়ে ১৯৯৯ সালে প্রকল্পটি তৈরির সিদ্ধান্ত হয়। তৎকালীন সরকার (আওয়ামী লীগ) অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ৫৪২ কোটি টাকা ব্যয়ে পান্থপথ-রামপুরা সংযোগ সড়ক হিসেবে এ প্রকল্প হাতে নেয়। ওই সময় হাতিরঝিলের জলাধার ও খাল ভরাট করে এ প্রকল্প বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত হলেও সরকারের মেয়াদ শেষ হওয়ায় তখন প্রকল্পের কাজ শুরু হয়নি। এরপর ২০০১ সালে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর ঢাকা ওয়াসার আপত্তির কারণে হাতিরঝিলের খাল ভরাট করে রাস্তা নির্মাণের পরিকল্পনা বাতিল করা হয়। পরে ২০০৭ সালে তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ১ হাজার ৯৭১ কোটি টাকা ব্যয়ে আবার প্রকল্পের কাজ শুরু করে। কিন্তু প্রকল্পের বেশির ভাগ জমিই ব্যক্তি মালিকানাধীন হওয়ায় ভূমি অধিগ্রহণ কেন্দ্র করে রাজউকের বিরুদ্ধে ৭৬টি মামলা হয়। এদিকে ব্যক্তিমালিকানাধীন ১৩৯ একর জমির মালিকদের ৪৮৮ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণও দেয়া হয়। অন্যদিকে অধিকাংশ জমির মালিক দাবি করেন বাজার মূল্যের চেয়ে জমির মূল্য অনেক কম দেয়া হয়েছে। ফলে অনেক মামলা নিষ্পত্তি না হয়ে ঝুলে পড়ে। সর্বশেষ ২০০৭ সালের জুলাইয়ে ‘হাতিরঝিল এলাকার সমন্বিত উন্নয়ন ও পান্থপথ-প্রগতি সরণি সংযোগ সড়ক’ নামে প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ শুরু হয়।
পুরো প্রকল্পটিতে থাকছে প্রায় ১০ কিলোমিটার নতুন সড়ক, রামপুরা ব্রিজের দুপাশে দুটি ‘ইউ’ লুপ, সড়কের চারদিকে ওয়াকওয়ে, লেক, ওয়াটার ট্যাক্সি, লেক পারাপারের জন্য থাকছে দৃষ্টিনন্দন সেতু, পয়ঃনিষ্কাশনের জন্য ড্রেন, পান্থপথ ক্রসিংয়ে ২৫০ মিটার দৈর্ঘ্য ওভারপাস, চারপাশে সবুজ গাছ, প্রকল্পটির বিভিন্ন স্থানে প্রায় পাঁচটি মসজিদ, গাড়ি পার্কিং স্পেস। এছাড়াও লেকের পাশেই তৈরি হবে অত্যাধুনিক ফ্ল্যাট। সব মিলিয়ে এ প্রকল্পে রয়েছে প্রায় ৩০০ একর জমি। প্রকল্পটি খুলে দেয়া হলে বাড্ডা, রামপুরা, গুলশান এলাকার সঙ্গে ধানমণ্ডি, মোহাম্মদপুর, কলাবাগান এলাকার যোগাযোগ অনেক সহজ হবে। পাশাপাশি কারওয়ানবাজার, মৌচাক, মালিবাগ, বাড্ডা, মগবাজার ও গুলশান এলাকার যানজট কমে যাবে।
নগর গবেষক অধ্যাপক নজরুল ইসলাম বলেন, ‘ঢাকা এখন গ্লোবাল কানেকটেড সিটি। এ নগরী বিশ্বনগরী হতে যাচ্ছে। তাই নগরীর জন্য যেমন মহাপরিকল্পনা দরকার, তেমনি দরকার নগরবাসীর বসবাসের জন্য ভালো পরিবেশের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। হাতিরঝিল প্রকল্পটি নগরবাসীর প্রাণের সঞ্চার জোগাবে। একই সঙ্গে মুক্ত পরিবেশে প্রাণখুলে নিশ্বাস নিতে পারবে। আর নগরীর একাংশের যানজট কমবে।’
নগর পরিকল্পনাবিদ স্থপতি ইকবাল হাবিব বলেন, ‘এ প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হওয়ায় নগরীর বিশাল একটি খাল দখলদারদের হাত থেকে রক্ষা পেল। তবে সবার আগে এ খালের ময়লা পানি পরিশোধন কেন্দ্রটি করতে হবে। পানিতে দুর্গন্ধ থাকলে এখানে যা কিছুই দৃষ্টিনন্দন করা হোক না কেন পুরো পরিকল্পনাই ব্যর্থ হবে।’
প্রকল্প পরিচালক প্রকৌশলী (রাজউক) এ এস এম রায়হানুল ফেরদৌস বলেন, ‘দ্রুত সময়ে কাজ শেষ করার জন্য পুরোদমে কাজ চলছে। কিন্তু প্রথম দিকে মামলা সংক্রান্ত জটিলতা আর প্রকল্প পরিকল্পনায় ব্যাপক পরিবর্তনের কারণে সময় একটু বেশি লাগছে। তবে থেকে যাওয়া বাকি কাজগুলো উদ্বোধনের পর দ্রুত শেষ করা হবে। আর পুরো কাজ শেষ হলে এটি হবে রাজধানীবাসীর চিত্তবিনোদনের হৃৎপিণ্ড।’

http://www.manobkantha.com/archive_details.php?id=96354&&%20page_id=%206&issue_date=%202012-12-04

No comments: