দেশের মাত্র ৮৫ জনের কাছে রয়েছে ১ লাখ
৫ হাজার কোটি টাকার সম্পদ
আমাদের দেশে এ রকম মানুষের সংখ্যা একেবারেই কম নয়, যারা অর্থনৈতিক বিকাশের
মধ্যে নীতি খোঁজেন। বাস্তবত, বাংলাদেশ এখন অস্বস্তিকর অবস্থার মধ্যে
রয়েছে। একদিকে বৈশ্বিক বিচারে মোট দেশজ উত্পাদন (জিডিপি) বাড়ছে গর্ব করার
মতো হারে; অন্যদিকে মুুষ্টিমেয় কিছু মানুষের হাতে চলে যাচ্ছে দেশের সম্পদ।
আল্ট্রা ওয়েলথ রিপোর্ট ২০১২-১৩ বলছে, বাংলাদেশে মাত্র ৮৫ জনের হাতে রয়েছে ১
হাজার ৩০০ কোটি ডলার বা প্রায় ১ লাখ ৫ হাজার কোটি টাকার সম্পদ। অর্থাত্
মাত্র ৮৫ জন ব্যক্তির কাছে বাংলাদেশের মোট জিডিপির ১২ শতাংশের বেশি সম্পদ
রয়েছে। অন্যভাবে দেখলে চলতি বছর বাজেটের প্রায় অর্ধেকের বেশি বা সমমানের
সম্পদ রয়েছে এ ব্যক্তিদের কাছে।
গত মঙ্গলবার সারা বিশ্বে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করে সিঙ্গাপুরভিত্তিক ওয়েলথ
এক্স নামে একটি গবেষণাধর্মী প্রতিষ্ঠান। বিশ্বে যাদের কাছে বিপুল পরিমাণ
নগদ অর্থ, সম্পত্তি, চিত্রকর্ম ও প্রত্নতত্ত্ব, নিজস্ব উড়োজাহাজ, সামুদ্রিক
জাহাজ, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শেয়ার বা মালিকানা, দামি গাড়ি-বাড়ি, ফ্ল্যাট
আছে, তাদের দেশভিত্তিক সংখ্যা ও সম্পদের পরিমাণ প্রকাশ করে প্রতিষ্ঠানটি।
বিশ্বের সব দেশের বিত্তবানদের সম্পদের ওপর পরিচালিত তথ্যের ভিত্তিতে এ
প্রতিবেদন তৈরি হয়। এ ক্ষেত্রে
শুধু বৈধ বা প্রকাশিত সম্পদকে হিসাবে
নেয়া হয়।
তথ্যটি জানার পর বণিক বার্তার পক্ষ থেকে একটি অনুসন্ধান চালানো হয়। দেশের
বাণিজ্যিক ব্যাংক, ব্যবসায়ী, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও
অর্থনীতিবিদদের কাছে এ ধরনের তথ্যের সত্যতা সম্পর্কে জানতে চাওয়া হয়।
অধিকাংশই এ তথ্যের মধ্যে বস্তুনিষ্ঠতা রয়েছে বলে স্বীকার করেন।
বণিক বার্তা এসব সূত্রের ওপর ভিত্তি করে দেশের অতিধনী ৫০ জনের একটি
প্রাথমিক তালিকা প্রস্তুত করলেও নানা বিষয় বিবেচনা করে কারোরই নাম প্রকাশ
করছে না। শুধু এ-সম্পর্কিত পর্যালোচনাই তুলে ধরা হচ্ছে।
অর্থনীতিবিদ ড. আহসান মনসুর বলেন, আপাতদৃষ্টিতে ধনীদের নিয়ে এ প্রতিবেদন
গ্রহণযোগ্য। তবে বাংলাদেশের সংস্কৃতিতে সম্পদ গোপন, কর ফাঁকি, কমিশন ভোগ,
দালালিসহ নানা উপায়ে উপার্জিত সম্পদ গোপন করার প্রবণতা আছে। এটা প্রতিফলিত
হলে ভালো হতো।
এ প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, ৮৫ জনের কাছে মোট জিডিপির ১০ শতাংশের বেশি
সম্পদ থাকার খারাপ-ভালো দুটো দিকই আছে। পুঁজিবাদ বিষয়টাই এমন। এখানে
দুর্নীতি-রাজনৈতিক প্রভাবের মধ্য দিয়ে সম্পদ অর্জনকারী আছেন আবার উদ্ভাবনী
শক্তিসম্পন্ন উদ্যোক্তাদের পরিশ্রম ও স্বপ্নও আছে। সারা দুনিয়ায় ধনীরা
সম্পদ কমিয়ে দেখানোর চেষ্টা করেন। এটা স্বাভাবিক প্রবণতা। কিন্তু
বাংলাদেশের আর্থসামাজিক বাস্তবতায় অল্প কিছু মানুষের কাছে ১৩ বিলিয়ন ডলারের
বেশি সম্পদ আছে বলে সাধারণের ধারণা। এটাকে উড়িয়ে দেয়ার কোনো উপায় নেই।
কারা অতিধনী বলে বিবেচিত? এ প্রশ্নের উত্তরে সিঙ্গাপুরের সংশ্লিষ্ট
সংস্থার গবেষকরা বলেছেন, ন্যূনতম ৩০ মিলিয়ন ডলার বা ২৫০ কোটি টাকা ও এর
ওপরে অর্থ-সম্পদের মালিকদেরই ধনী হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। এ ধনীদের খুঁজে
বের করার ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানটি বিশ্বের সেরা ১০ বেসরকারি ব্যাংকের ৮টির
কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করেছে। এর পাশাপাশি বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় শিক্ষা ও
গবেষণা প্রতিষ্ঠান, অলাভজনক প্রতিষ্ঠান এবং বিলাসবহুল ব্র্যান্ড
প্রস্তুতকারক— এমন প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতা নেয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে তথ্য
হিসেবে বিত্তশালীদের সম্পদ, আয়, প্যাশন, দান ও অনুদানের আগ্রহের জায়গা,
সমাজ-রাষ্ট্রের বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্টতা, রাজনীতি, পরামর্শক, পরিবার
তাদের পছন্দ-অপছন্দের মতো গোপনীয় এবং খুঁটিনাটি বিষয় বিবেচনা করা হয়েছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান গোলাম হোসেন এ বিষয়ে বলেন, ধনী
কে, এর ন্যূনতম ভিত্তি কী, কত লোক সত্যিকার অর্থে ধনী, তার কোনো হিসাব নেই।
কেউ কিছু জানেও না। আবার যারা নিয়মিত কর দেন, তারা যে সবকিছু ঠিকঠাক
নিয়মমাফিক দেন, এমন ভাবারও কোনো কারণ নেই। এর পরও একটা বিষয় ঠিক, ধনীদের
সংখ্যা বাড়ছে এবং মুষ্টিমেয় কিছু লোকের কাছে হাজার হাজার কোটি টাকার সম্পদও
পুঞ্জীভূত হচ্ছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দেশের শীর্ষ এক ব্যাংক কর্মকর্তা জানান, এটি শুধু
দেশের অভ্যন্তরে সম্পদের উপস্থিতির কথা বিবেচনা করা হয়, তাহলে ঠিক আছে।
কিন্তু অনেক বিত্তশালী বাংলাদেশীর বিদেশে সম্পদ রয়েছে। গত কয়েক বছরে
যুক্তরাষ্ট্র-কানাডা-মালেশিয়ায় অনেক ব্যবসায়ী নাগরিকত্ব নিয়েছেন বলেও তিনি
দাবি করেন। ফলে দেশের অতিধনীদের সম্পদের পরিমাণ ১ হাজার ৩০০ কোটি ডলার নয়,
আরও বেশি হতে পারে বলে তার অনুমান।
ব্র্যাক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন,
‘বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতি ও বিভিন্ন সূচকের দিকে তাকালে দেখা যায়, ধনী
মানুষ ও তাদের সম্পদের পরিমাণ ক্রমেই বাড়ছে। আমি মনে করি, ধনী লোকের
সংখ্যা ও তাদের সম্পদ বাড়ছে, যার প্রতিফলনও সমাজ-রাষ্ট্রে
স্পষ্ট প্রতীয়মান।’
সরকারি ও বেসরকারি তথ্য বলছে, হাজার কোটি টাকার ওপরে ব্যবসায়িক আয়তন আছে,
এমন উদ্যোক্তার সংখ্যা নিতান্ত ছোট নয়। এদের মধ্যে কারও কারও ব্যবসায়িক
আয়তন ৫-১০ হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত। এদের মধ্যে
কেউবা শুরু করেছেন তামাক ব্যবসা দিয়ে আবার কেউ ওষুধ বা গার্মেন্ট। তবে আদি
ব্যবসা না ছেড়েই তারা গড়ে তুলেছেন স্টিল মিল, সিমেন্ট কারখানা, চায়ের
বাগান, ডেইরি শিল্পসহ আরও অনেক প্রতিষ্ঠান।
এ বিষয়ে সামিট গ্রুপের চেয়ারম্যান আজিজ খান বলেন, ‘দুনিয়ায় ন্যূনতম ১
বিলিয়ন ডলারের কম সম্পদ কারও থাকলে তাকে ধনী বলা হয় না। বিল গেটস, ওয়ারেন
বাফেটরা শত বিলিয়ন ডলারের মালিক। পাশের দেশ ভারতেই অন্তত ১৩ জন ব্যবসায়ী
আছেন, যাদের প্রত্যেকের ব্যক্তিগত সম্পদের পরিমাণ ১৩ বিলিয়ন ডলার বা তারও
বেশি আর ৮৫ জনের কাছে ১৩ বিলিয়ন ডলার। এটা কোনো সম্পদ হলো? সম্পদ নেই বলে
বিনিয়োগ করতে পারি না আমরা। এ কারণেই মনে হচ্ছে, মুষ্টিমেয় কিছু লোকের কাছে
অনেক সম্পদ।’
http://bonikbarta.com/?view=details&pub_no=189&menu_id=1&news_id=24013&news_type_id=1
No comments:
Post a Comment