রাজনীতি

কূটনীতির ভারসাম্যে খালেদাকে আমন্ত্রণ : রিপোর্ট আনন্দবাজার


ডেস্ক রিপোর্ট
বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম

ছয় বছর পর ভারত সফরে গেলেন খালেদা জিয়া।  বিরোধী দলীয় নেত্রী হিসেবে এটি তার প্রথম ভারত সফর। তিনি ২০০৬ সালে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ভারত সফর করেন। তাঁর এ সফর নিয়ে দু’দেশেই বেশ আলোড়ন ফেলেছে। সবাই ধারণা করছেন তা এ সফরে কি নয়াদিল্লির সঙ্গে বিএনপির যে বরফ সম্পর্ক তা গলবে কিনা?

খালেদা জিয়ার ভারত নিয়ে পশ্চিমবঙ্গ থেকে প্রকাশিত আনন্দবাজার পত্রিকা তাদের নয়াদিল্লি প্রতিনিধি জয়ন্ত ঘোষালের একটি বিশ্লেষণমূলক প্রতিবেদন ছেপেছে। রিপোর্টটি এখানে তুলে ধরা হল-  এ-ও এক পরিবর্তন!
বাংলাদেশ সংক্রান্ত বিদেশনীতিতে এক নিঃশব্দ রণকৌশলগত পরিবর্তন করল ভারত।
ভারতের আমন্ত্রণে রোববার সাত দিনের সফরে নয়াদিল্লি আসছেন বাংলাদেশের বিরোধী নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া। বিদেশ মন্ত্রক সূত্র বলছে, সচেতন ও সুপরিকল্পিত ভাবে এই সফরের আয়োজন করা হয়েছে। 

বাংলাদেশের নির্বাচন আসন্ন। শেখ হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিষ্ঠান বিরোধিতার হাওয়া বইছে। ফলে সেখানে যদি ক্ষমতার পালা বদল ঘটে, তার জন্য তৈরি থাকতে চাইছে ভারত। তারা এই বার্তাই দিতে চায় যে, ’৭১-র মুক্তিযুদ্ধের প্রতি সব রকম শ্রদ্ধা রাখলেও, বাংলাদেশের সঙ্গে

কূটনৈতিক সম্পর্ক শুধু সেই স্মৃতির আবেগ-তাড়িত নয়। খালেদাকে আমন্ত্রণ জানিয়ে ভারত বুঝিয়ে দিতে চাইছে, বাংলাদেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের সঙ্গে বিএনপি-র যে বিরোধই থাক না কেন, নিরপেক্ষ বন্ধু রাষ্ট্র হিসেবে দুই দলের সঙ্গেই সুসম্পর্ক বজায় রাখতে চায় তারা।

বিএনপি নেত্রীকে আমন্ত্রণের বিষয়টি হাসিনার সরকারকে আগাম জানিয়েও রেখেছে ভারত। দিল্লির তরফে ঢাকাকে বলা হয়েছে, দুই রাষ্ট্রের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে দু’দশের বিরোধী দলের আস্থা অর্জন করা জরুরি।

খালেদাকে আমন্ত্রণ করা সেই আস্থা অর্জনেরই প্রক্রিয়া। ভারত এ কথা বললেও এই সফর ঘিরে হাসিনা সরকারের একটা নেতিবাচক মনোভাব রয়েছে। ঘটনাচক্রে খালেদার সফরের সময় দিল্লিতে থাকছেন না বাংলাদেশের হাই কমিশনার তারিক করিম।

বিদেশ মন্ত্রক সূত্রে বলা হচ্ছে, কিছু দিন আগে বাংলাদেশের জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মহম্মদ এরশাদ ভারতে এসেছিলেন। তখনও হাসিনা সরকার এ রকমই মনোভাব দেখিয়েছিল। তবে তাদের বোঝানোর প্রক্রিয়া অব্যাহত।

ভারতের বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র শেখ আকবরউদ্দিন বলেন, “বেগম খালেদা জিয়ার এই সফর বাংলাদেশের বহু দলভিত্তিক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সঙ্গে ভারতের নিবিড় যোগাযোগের অধ্যায়। এই সফর দ্বিপাক্ষিক সমস্ত বিষয় নিয়ে আলোচনার সুযোগ করে দেবে। ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্ককে আরও ইতিবাচক গতি দেবে।”

কংগ্রেস বা বিজেপি, দিল্লিতে যে দলই ক্ষমতায় থাকুক না কেন, বাংলাদেশের সঙ্গে সব সময় সুসম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করে এসেছে। ২০০২ সালে কাঠমান্ডুর সার্ক সম্মেলনে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী অটলবিহারী বাজপেয়ীর সঙ্গে দেখা হয়েছিল বাংলাদেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার।

তখন সদ্য হাঁটু অপারেশন করিয়েছেন বাজপেয়ী। ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় জানতে পারলেন হাঁটুর সমস্যায় ভুগছেন খালেদাও। তাঁকে নিজের চিকিৎসকের ফোন নম্বর দিয়ে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেন বাজপেয়ী।

বিদেশ মন্ত্রক সূত্রে বলা হচ্ছে, ভারতের বিদেশনীতি ভারসাম্য রক্ষার পক্ষপাতী। অর্থাৎ, কোনও দেশের সরকারের পাশাপাশি সেখানকার বিরোধী দলকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়। পারভেজ মুশাররফ পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট থাকাকালীন তৎকালীন বিদেশমন্ত্রী প্রণব মুখোপাধ্যায় সে দেশের বিরোধী নেতা নওয়াজ শরিফের সঙ্গে বৈঠক করেছিলেন।

বাজপেয়ী আমেরিকা সফরে গিয়ে বিল ক্লিন্টনের পাশাপাশি জর্জ বুশের সঙ্গেও দেখা করতে চেয়েছিলেন। যদিও সময়াভাবে সেই সাক্ষাৎ হয়নি। আবার মায়ানমারে সু চি যখন গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য লড়াই করছেন, তখন তাঁকে সমর্থন করার জন্য ভারতকে অনুরোধ করে আমেরিকা। ভারত সু চি-র সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখলেও সে দেশের জুন্টা সরকারের সঙ্গে তিক্ততা বাড়াতে চায়নি।

শেখ হাসিনার সঙ্গে সুসম্পর্কের কারণে ভারতের প্রতি বিরূপ মনোভাব পোষণ করতে শুরু করেছিলেন খালেদা জিয়া। বিভিন্ন সময় সেই ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশও ঘটেছে। কিন্তু বেশ কিছু দিন ধরেই পুরানো কাসুন্দি ভুলে ভারত-বিরোধিতা লঘু করার একটা চেষ্টা খালেদার পক্ষ থেকে দেখা যাচ্ছিল বলে বিদেশ মন্ত্রক সূত্রের খবর।

বিশ্বায়ন এবং আর্থিক সংস্কারের যুগে ভারতের বিরোধিতা না করে তাদের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক পোক্ত করলে বাংলাদেশের জনমতে প্রভাব বেশি পড়বে বলেই মনে করছেন তিনি।

সদ্য পদত্যাগী বিদেশমন্ত্রী এস এম কৃষ্ণ যখন ঢাকায় গিয়ে খালেদার সঙ্গে বৈঠক করেন, তখনই বিএনপি মুখপাত্র বলেছিলেন যে তাঁরা ভারত-বিদ্বেষী নন। বরং ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক চান। বিএনপি চায় দু’দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও বৃদ্ধি পাক।

এবার ভারতের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কর্তাদের সঙ্গে আলোচনার সময় তিস্তা চুক্তি থেকে শুরু করে টিপাইমুখ বাঁধ, সীমান্তে বাংলাদেশিদের উপর হামলার মতো বিষয় তুলতে চলেছেন খালেদা। নয়াদিল্লিতে হাসিনার সঙ্গে মনমোহন সিংহের যে চুক্তি হয়েছিল, তার রূপায়ণের ব্যাপারেও সরব হবেন তিনি।

চিনের কমিউনিস্ট পার্টির আমন্ত্রণে গত ১৪ অক্টোবর খালেদা সে দেশে গিয়েছিলেন। নয়াদিল্লি যে আওয়ামি লিগের সঙ্গে শক্তিশালী বন্ধুত্বের চিরাচরিত নীতি থেকে খানিকটা সরে এসে বিএনপি’র সঙ্গেও আলোচনার পরিবেশ গড়ে তুলতে চায়, চিন ও পাকিস্তানের সঙ্গে খালেদার সুসম্পর্কও তার একটা বড় কারণ বলে মনে করা হচ্ছে। ভারত মনে করে বাংলাদেশ আয়তনে ছোট হলেও রণকৌশলগত দিক থেকে তার গুরুত্ব অনেক।

তাই ভারতের আমন্ত্রণ পেয়ে চীন সফর সেরে ফেরার এক সপ্তাহের মাথায় রবিবার সকাল সাড়ে ন’টায় ঢাকা থেকে জেট এয়ারের বিমানে দিল্লির উদ্দেশে রওনা দেবেন খালেদা। তাঁর সঙ্গে আসছেন বিএনপি’র স্থায়ী কমিটির সদস্য তারিকুল ইসলাম, ভাইস চেয়ারম্যান শমসের মবিন চৌধুরি, খালেদার উপদেষ্টা রিয়াজ রহমান, সাবিউদ্দিন আহমেদ, প্রেস সচিব মারুফ কামাল খান ও নির্বাহী কমিটির সদস্য খালেদা রব্বানি।

প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন এর আগে দু’বার ভারতে এসেছেন খালেদা। তবে বিরোধী নেত্রী হিসেবে এটাই তাঁর প্রথম সফর। গত দু’বারের মতো এ বারও নয়াদিল্লির তাজ হোটেলে রাষ্ট্রীয় অতিথি হিসেবে রাখা হচ্ছে তাঁকে।

রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায়, প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংহ, বিরোধী দলনেত্রী সুষমা স্বরাজের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন খালেদা। জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা শিবশঙ্কর মেনন, বিদেশসচিব রঞ্জন মাথাইয়ের সঙ্গেও তাঁর বৈঠকের কথা রয়েছে।
 
  --------------------------------------------------------------------------------------

বিরোধী দলীয় নেত্রীর ভারত সফরে কোনো গুরুত্ব নেই : দীপু মনি


জেলা প্রতিনিধি, বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
চাঁদপুর : বিরোধী দলীয় নেত্রী খালেদা জিয়ার ভারত সফর প্রসঙ্গে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপু মনি বলেছেন, তারা যখন ক্ষমতায় থাকেন তখন ভারতের তোষামোদী করেন, আর যখন বিরোধী দলে থাকেন তখন সর্বক্ষণ ভারতের বিরোধিতা করেন। মূলত ভারতের প্রতি বাংলাদেশের জনগণের যে দাবি, সে দাবি পূরণের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। তার এ সফরে কোনো গুরুত্ব আছে বলে আমি মনে করি না।
মন্ত্রী রোববার রাতে চাঁদপুর সফরে এসে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এসব কথা বলেন। এর আগে মন্ত্রী সদর উপজেলার রামপুর ইউনিয়নের বদরপুর প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ আয়োজিত ঈদপুনর্মিলনী ও মহিলা সমাবেশে অংশ নেন।

এসময় উপস্থিত ছিলেন, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব প্রিয়তোষ সাহা, জেলা প্রশাসক মো. ইসমাইর হোসেন, পুলিশ সুপার (ভারপ্রাপ্ত ) আমির জাফার, সদর উপজেলা নিবার্হী কর্মকর্তা শাহীনুর শাহীন খানসহ স্থানীয় আওয়ামী নেতারা।


--------------------------------------------------
ব্যারিষ্টার রফিক মিয়ারকে-শাহজাহান খান বললেন:

হারামজাদা তোমার চোখ তুলে নেবো


আনোয়ার হোসেন, ঢাকা, ২৩ অক্টোবর : এ যেন সিনেমার কোনো দৃশ্য ! চেয়ার থেকে উঠে মন্ত্রী মহোদয় তেড়ে গেলেন প্রতিপক্ষ দলের নেতার দিকে। বললেন, তোমার চোখ তুলে ফেলবো। তুমি আমাকে চেনো না। হারামজাদা কোথাকার। তোমাকে আজ জুতাপেটা করবো। অকস্মাৎ এই ঘটনায় অনুষ্ঠানের অন্যসব অতিথি-আলোচকরা কিংকর্তব্যবিমূঢ়। হতভম্ব হয়ে তারা তাকিয়ে তাকিয়ে কেবল দেখছিলেন শ্বাসরূদ্ধকর সেই দৃশ্য।
অবিশ্বাস্য এই ঘটনা ঘটেছে গত সোমবার মধ্যরাতে বেসরকারি টেলিভিশন আরটিভি আয়োজিত গোলটেবিল আলোচনায়। অনুষ্ঠানটি সরাসরি সম্প্রচার করা হচ্ছিল আরটিভিতে। তবে ভাষার ব্যবহার শালীনতার সীমা অতিক্রম করার পর্যায়ে কর্তৃপক্ষ তড়িঘড়ি সরাসরি সম্প্রচার বন্ধ করে দেয়। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, আরটিভির নিয়মিত মধ্যরাতের টক শো ‘ আওয়ার ডেমোক্রেসি’র স্লটেই সোমবার মধ্যরাতে কিছুটা বৃহৎ পরিসরে আয়োজন করা হয় ‘ ঈদ-পূজোয় নিরাপদে ঘরে ফেরা ’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনা। এটি অনুষ্ঠিত হয় তেজগাঁও শিল্প এলাকায় আরটিভির নবনির্মিত বহুমাত্রিক স্টুডিও হলে। এতে অতিথি হিসাবে অংশ নেন নৌ পরিবহন মন্ত্রী মো: শাহজাহান খান, বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী ব্যরিষ্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া, শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সভাপতি ও আওয়ামী লীগ দলীয় এমপি মো: ইসরাফিল আলম, আওয়ামী লীগের আরেক এমপি গোলাম মওলা রনি, বিএনপি দলীয় এমপি রাশেদা বেগম হিরা, নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলনের সভাপতি চিত্রনায়ক ইলিয়াস কাঞ্চন, জাতীয় পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি বাসুদেব ধর, র‌্যাবের পরিচালক কমান্ডার এম সোহায়েল, পরিবেশ আন্দোলনের নেতা স্থপতি ইকবাল হাবিব, সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক মনির হায়দার, সাংবাদিক জাকারিয়া কাজল এবং প্রবাসী সাংবাদিক নিশাদ দস্তগীর।
রাত সোয়া ১১টা থেকে আরটিভিতে সরাসরি সম্প্রচার শুরু হওয়ার পর যতদূর দেখা গেছে, আলোচনার এক পর্যায়ে বক্তব্য শুরু করেন নৌ পরিবহন মন্ত্রী মো: শাহজাহান খান। তিনি নৌপথের উন্নয়নে তাঁর সরকারের গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপের বয়ান দেন। বিশেষত, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের আওতায় নতুন নতুন জাহাজ ক্রয়, ড্রেজার ক্রয় ইত্যাদির বিবরণ তুলে ধরেন তিনি। এক পর্যায়ে তিনি বলেন, বিগত জোট সরকারের আমলে নৌপরিবহন খাতের কোনো উন্নয়ন হয়নি। তখন কেবল চাঁদাবাজি আর দুর্নীতি হয়েছে এই খাতে। তার এই বক্তব্যের তাৎক্ষনিক প্রতিবাদ জানিয়ে এ সময় বিএনপি নেতা ব্যরিষ্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া বলেন, আমাদের সময় দুর্নীতি আর চাঁদাবাজি হয়েছে, এখন কি এসব বন্ধ হয়ে গেছে ? এখন লোকজন আপানদেরকে চোর বলছে। এ সময় শাহজাহান খান কিছুটা উত্তেজিত হয়ে বলেন, আপনি চুপ করুন। আমার বলা শেষ হলে আপনি বলবেন। জবাবে রফিকুল ইসলাম মিয়া বলেন, এই অনুষ্ঠানে আমাকে দাওয়াত দেওয়ার সময় বলা হয়েছিল যে, কোনো রকম আক্রমনাত্বক বক্তব্য দেওয়া হবে না। কিন্তু এখন দেখছি শুধু আমাদের আমলের বদনাম করা হচ্ছে। এ পর্যায়ে উপস্থাপক বলেন, জনাব রফিকুল ইসলাম মিয়া আপনাকে বলার সুযোগ দেওয়া হবে, আপনি তখন বলবেন। কিন্তু তাতে কর্ণপাত না করে তিনি শাহজাহান খানের কথার পিঠে কথা বলে যাচ্ছিলেন। আর এতেই প্রচন্ড ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেন নৌপরিবহন মন্ত্রী। আপনি থেকে হঠাৎ তুমি সম্বোধন শুরু করেন তিনি। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ায় হঠাৎ বন্ধ করে দেওয়া হয় সরাসরি সম্প্রচার। কিন্তু তাতেও থামছিলেন না দুই নেতা। চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ান দু’জনেই। শাহজাহান খান হুংকার দিয়ে বলে উঠেন, হারামজাদা তুমি জান না একজন মন্ত্রীর সঙ্গে কিভাবে কথা বলতে হয়। তোমাকে আজ জুতাপেটা করবো। মন্ত্রীর এসব কথায় একেবারেই ভ্যাবাচ্যাক খেয়ে যান রফিকুল ইসলাম মিয়া। তিনি মাথা নিচু করে বেরিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন  স্টুডিও থেকে। এ সময় তার দিকে তেড়ে যান মন্ত্রী শাহজাহান খান। বলে উঠেন, রফিক তুমি শাহজাহান খানকে চেনো না। আজ এখন তোমার চোখ তুলে ফেলবো। মারামারি করতে চাইলে চলো ফিল্ডে নামি। এমন উত্তেজনাকর পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগ দলীয় এমপি ইসরাফিল আলমও নৌ মন্ত্রীর পক্ষ নিয়ে ব্যারিষ্টার রফিকুল ইসলাম মিয়াকে বকাঝকা করতে থাকেন। তবে বাকি সকলেই হতভম্ব হয়ে নিরবে দেখতে থাকেন সেই দৃশ্য। এমনকি অপর দুই এমপি গোলাম মওলা রনি এবং রাশেদা বেগম হিরাও নিজ নিজ আসনে বসেছিলেন চুপচাপ। এক পর্যায়ে রফিকুল ইসলাম মিয়া স্টুডিও থেকে বেরিয়ে যান। উঠেন দাঁড়ান ইলিয়াস কাঞ্চন, মনির হায়দার ও ইকবাল হাবিব। কিন্তু আরটিভির স্টাফদের অনুরোধে তারা আবার চেয়ারে বসেন। এ পর্যায়ে বিএনপি দলীয় সংসদ সদস্য রাশেদা বেগম হিরা চেয়ার থেকে উঠে বেরিয়ে যান। এ সময় আওয়ামী লীগের এমপি ইসরাফিল আলম তাকে উদ্দেশ্য করে বলেন, আপনি আবার কোথায় যাচ্ছেন ? জবাবে রাশেদা বেগম হিরা বলেন, আমি প্রচন্ড ভয় পেয়েছি। তাই আর বসতে চাচ্ছি না। পাল্টা প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়ে ইসরাফিল আলম বলেন, আপনাদের আবার ভয় আছে নাকি ? কিছুক্ষণ পর দেখা গেল, আরটিভির কর্মকর্তারা ব্যরিষ্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া ও রাশেদা বেগম হিরাকে আবার স্টুডিওতে ফিরিয়ে এনেছেন। তাদের অংশগ্রহণেই কয়েক মিনিট পর আবার শুরু হয় অনুষ্ঠানটি এবং সরাসরি সম্প্রচার করা হয় বাকি অংশ। শেষ অংশের আলোচনায় আর তেমন উত্তাপ-উত্তেজনা ছিল না। অবশ্য অনুষ্ঠান শেষে আরটিভি কর্মীদের অনুরোধে মন্ত্রী শাহজাহান খান স্টুডিও থেকে বের হওয়ার পথে হাত মেলান ব্যরিষ্টার রফিকুল ইসলাম মিয়ার সাথে।
এ বিষয়ে ঢাকা নিউজ এজেন্সির পক্ষ থেকে ব্যারিষ্টার রফিকুল ইসলাম মিয়ার বক্তব্য জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, আরটিভির পক্ষ থেকে আমন্ত্রণ জানিয়ে আমাকে বলা হয়েছিল যে, ওই অনুষ্ঠানে আসবেন যোগাযোগ মন্ত্রী ও রেলমন্ত্রী। নৌ মন্ত্রী শাহজাহান খান থাকবেন জানলে আমি যেতাম না। কারণ, তিনি সব সময়ই লেবার লিডারের মতো আচরণ করেন। তারপরও অনুষ্ঠানস্থলে গিয়ে তাকে দেখার পরও ভদ্রতার কারণে আমি শেষ পর্যন্ত ওই অনুষ্ঠানে অংশ নেই। আমাকে বলা হয়েছিল যে, কেবলমাত্র ঘরমুখো মানুষের নিরাপদ ভ্রমণ নিয়ে অনুষ্ঠানে কথা হবে। অন্যকোনো বিষয়ে কথা হবে না। কিন্তু মন্ত্রী শাহজাহান খান তার বক্তব্যের এক পর্যায়ে বলে বসলেন যে, পরিবহন সেক্টরে মির্জা আব্বাস ও গয়েশ্বর রায় চাঁদাবাজি করেছেন। এ সময় উপস্থাপকের অনুমতি নিয়েই আমি প্রশ্ন করেছি যে, চাঁদাবাজি তখন বেশি হয়েছে ? না এখন বেশি হচ্ছে ? এতেই একজন নিম্নমানের সন্ত্রাসীর মতো ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেন শাহজাহান খান। তুই-তোকারি থেকে শুরু করে কোনো অশ্রাব্য ভাষা উচ্চারণ  করতে তিনি বাদ রাখেননি। আমাকে বলা হয়েছে, হারমজাদা তুমি শাহজাহান খানকে চেনো না। তোমাকে আজ জুতাপেটা করে ছাড়বো। আমার চোখ তুলে নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে। ব্যারিষ্টার রফিক বলেন, শাহজাহান খানের এসব কথার জবাব দিলে আমাকে হয়তো সেখানে মেরেই ফেলতো। সে হয়তো হত্যার উদ্দেশ্য নিয়েই এসেছিল। তার কাছে সম্ভবত অস্ত্র ছিল এবং কোনো খুর-খারাবি করার উদ্দেশ্য নিয়ে পরিকল্পিতভাবেই তারা এই ঘটনা ঘটিয়েছে। কারণ, সংসদীয় কমিটির সভাপতি ইসরাফিল আলমও মন্ত্রীর পক্ষ নিয়ে আমাকে যা-তা বলেছে। আরেক এমপি রনি তো চেয়ারে বসে সেই দৃশ্য দেখেছে। কেউই মন্ত্রীকে থামাবার চেষ্টা করেনি। ব্যরিষ্টার রফিক মিয়া বলেন, এই ঘটনার পেছনে তাদের মূল উদ্দেশ্য হয়তো একটা অজুহাত দিয়ে টেলিভিশনের টক শো বন্ধের গ্রাউন্ড তৈরী করা। কারণ, বেশ কিছুদিন ধরেই সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের লোকেরা টক শো’র বিরূদ্ধে নানা রকম কথাবার্তা বলছেন।
এ বিষয়ে অনুষ্ঠানটির অন্যতম আলোচক সাংবাদিক মনির হায়দারের বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি বলেন, ওই ঘটনা নতুন করে আর কল্পনা করতে চাই না। এক কথায় এটি ছিল ভয়ংকর এক অভিজ্ঞতা। সিনেমার দৃশ্যেও এমনটি দেখা যায় না।

--------------------------------------------------------------------------------------------
 রাজনীতিতে পাল্টা হাওয়া উপেক্ষিত নেতাদের কদর বেড়েছে
রেজাউল করিম লাবলু ও মাহবুব হাসান: রাজনীতিতে উল্টো হাওয়া বইতে শুরু করেছে। ঈদের পর নতুন উদ্যমে মাঠে নামবে বিরোধী দল-এমন ঘোষণা দিয়েছেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোটকে সরকারবিরোধী আন্দোলনে চাঙ্গা করার নানা প্রয়াস চলছে। এমনকি নানা ঘটনায় বিএনপি থেকে ছিটকে পড়া নেতাদের দলে টানার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। অন্যদিকে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় মহাজোটও গা-ঝাড়া দিচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা দলে ‘উপেক্ষিত’ সিনিয়র নেতাদের নতুন করে গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনায় আনছেন। তোফায়েল আহমেদ মন্ত্রিত্ব ফিরিয়ে দিলেও আমির হোসেন আমু ও আবদুল জলিলকে মন্ত্রী করা হবে এমন আলোচনা উঠে আসছে জোরেশোরে।
মহাজোট আর ১৮ দলীয় জোটের বাইরে রাজনীতির অন্য মেরুকরণও শুরু হয়েছে। বিএনপি থেকে বেরিয়ে ব্যারিস্টার নাজমুল হুদা গড়েছেন নতুন রাজনৈতিক দল। ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরী ও ড. কামাল হোসেন আগামীকাল বিকেলে হোটেল রেডিসনে যৌথ ঘোষণা দিতে যাচ্ছেন। একটি জোট গঠনের পরিকল্পনা রয়েছে তাদের। সব মিলিয়ে আসন্ন শীত মৌসুমে রাজনীতির পালে নতুন হাওয়া লাগবে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও বিশিষ্টজনরা। আওয়ামীলীগ-বিএনপি বা মহাজোট-১৮ দলীয় জোট নেতাদের মাথায়ও রয়েছে বিষয়টি।
আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফ মনে করেন, রাজনীতি যত সক্রিয় হবে, ক্রিয়াশীল থাকবে ততই মঙ্গল। বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব মো. শাহজাহান বলেন, রাজনীতির প্রধান দুই ধারা আওয়ামী লীগ-বিএনপি সমঝোতায় না এলে বারবারই এসব মেরুকরণের চেষ্টা চলবে। মহাজোটের শরিক ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন মনে করেন, রাজনীতির নানা মেরুকরণ হবে এটিই স্বাভাবিক। তবে এটি সুষ্ঠু উপায়ে না হলে গণতন্ত্র বিপন্ন হতে পারে।
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. আকবর আলি খান এ বিষয়ে বলেন, রাজনীতি নিজেই একটা চলমান প্রক্রিয়া। প্রতিনিয়ত এটা ক্রিয়াশীল না থাকলে তৃতীয় পক্ষ সুযোগ নেয়। সামনে নির্বাচন, তাই রাজনীতি বিশেষ করে মাঠের রাজনীতি সরব হবে। রাজনীতির নতুন মেরুকরণ প্রসঙ্গে সাবেক সচিব বলেন, প্রধান দুটি রাজনৈতিক দলের বাইরে ছোট দলগুলো জোট করতে পারে। এটা দোষের কিছু নয়। তবে লাভ হবে বলে আমি মনে করছি না। প্রধান দুটি দলের বাইরে অন্য কারও ক্ষমতায় যাওয়ার মতো শক্তি ও সামর্থ্য নেই।
গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন ও বদরুদ্দোজা চৌধুরী আগামীকাল যে যৌথ ঘোষণা দিতে যাচ্ছেন, সে সম্পর্কে ড. কামালের বক্তব্যে কিছুটা আভাস পাওয়া গেছে। গত বুধবার ড. কামাল হোসেন বলেছেন, সমাজের বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষ ঐকমত্য হলে তৃতীয় ফ্রন্টের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তারা পেশাজীবীদের সঙ্গে এ ব্যাপারে মতবিনিময় করবেন। তৃতীয় জোট গঠন হলে তাতে ড. কামালের নেতৃত্বাধীন গণফোরাম, কাদের সিদ্দিকীর কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ, আ স ম রবের নেতৃত্বাধীন জাসদসহ আরও কয়েকটি দল থাকতে পারে বলে জানা গেছে।
এদিকে আওয়ামী লীগে সংস্কারপন্থী বলে পরিচিত এবং এক-এগারোর পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে বিভিন্ন কারণে দূরে চলে যাওয়া নেতাদের কাছে টানছেন দলীয় সভানেত্রী শেখ হাসিনা। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও সংগঠনকে শক্তিশালী করে ঢেলে সাজানোসহ সব দিক বিবেচনা করে রাজনীতিতে প্রাজ্ঞ নেতাদের কাছে টানা হচ্ছে।
জানা গেছে, প্রবীণ নেতা আমির হোসেন আমু, তোফায়েল আহমেদ, আবদুল জলিলকে সভাপতিমণ্ডলীতে ফিরিয়ে আনার মনোভাব প্রকাশ করেছেন দলের হাইকমান্ড। তারা এখন উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য। নতুন এই ধারা শুরু হয় সুরঞ্জিত সেনগুপ্তকে মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত করে। পরে তোফায়েল আহমেদকেও মন্ত্রী হওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়। কিন্তু তাতে তিনি রাজি হননি। অবশ্য জলিল, আমু এবং তোফায়েল আহমেদকে জাতীয় কমিটিতেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
জানা গেছে, তোফায়েল আহমেদ, আমির হোসেন আমু, আবদুল জলিলকে দলীয় সভানেত্রী সবুজ সঙ্কেত দিয়েছেন। তাদেরকে দলীয় কর্মকাণ্ড ও কর্মসূচিতে সক্রিয় হতে বলেছেন। যে কারণে তাদের এখন দলীয় ও দলের নীতিনির্ধারণী কর্মকাণ্ডে সরব উপস্থিতি। দলের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্যপদ থেকে ছিটকে পড়ার পর স্বদেশে থেকেও নিজেকে পরবাসী করে রাখেন তোফায়েল আহমেদ। কিন্তু গাজীপুর উপনির্বাচনে দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে সক্রিয় হয়ে ওঠেন তিনি। এছাড়াও কক্সবাজারের রামুতে বৌদ্ধবিহারে হামলার স্থান পরিদর্শন ও ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে সহায়তা প্রদানের সময় শেখ হাসিনার সফরসঙ্গী ছিলেন আমির হোসেন আমু ও তোফায়েল আহমেদ।
অন্যদিকে বিএনপি সূত্র জানায়, গত নির্বাচন-পরবর্তী অনুষ্ঠিত দলের জাতীয় কাউন্সিলের পর সংস্কারপন্থী নেতাদের অনেককেই দলে ফিরিয়ে নিয়েছে বিএনপি। তাদের অনেকেই এখন দলে প্রভাবশালী। আগামী ডিসেম্বরে আবার কাউন্সিল করবে বিএনপি। তখনও বাদপড়া নেতাদের কেউ কেউ দলে জায়গা পাবেন বলে জানা গেছে।
লিবারেল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি (এলডিপি) বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোটে যোগ দেওয়ার পরপরই এলডিপির নেত্রী অধ্যাপিকা জাহানারা বেগম যোগ দিয়েছেন নাজমুল হুদার নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট ফ্রন্টে (বিএনএফ)। এর বাইরে দুয়েকজন যারা বাদ পড়বেন বলে ভাবছেন তাদের কেউ কেউ আবার বিকল্পধারা বাংলাদেশ কিংবা বিএনপির প্রতিষ্ঠাকালীন স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার নাজমুল হুদার বিএনএফে যোগ দিয়ে নির্বাচনে অংশ নিতে পারেন-এমনও শোনা যাচ্ছে।
আসছে জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে শেষ বছরে পড়বে মহাজোট সরকার। সরকারের শেষ সময়ে জোট, মহাজোটে নতুন টান লাগবে। ঘর ভাঙবে, নতুন ঘর বাঁধা হবে-এমন সম্ভাবনাই দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

No comments: