Friday, August 10, 2012

রেলের টিকিট পাওয়া আর না পাওয়ার চিত্র

রেলের টিকিট পাওয়া আর না পাওয়ার চিত্র





 প্রতিবেদনটি লিখেছেন রতন বালো:

ঈদে ট্রেন, বাস ও লঞ্চের টিকিটের জন্য হাহাকার পরে গেছে। যেকোন পরিবহনে অগ্রিম টিকিট পাওয়া মানে সোনার হরিণ হাতে পাওয়া।

গতকাল রেলস্টেশন, বাস ও লঞ্চ টার্মিনালে দেখা গেছে টিকিটের জন্য হাজার হাজার মানুষের লাইন। ঘরমুখো মানুষ টার্মিনাল থেকে টার্মিনালে ছোটাছুটি করছে টিকিটের জন্য। তাদের ল¶্য, প্রিয়জনের সঙ্গে ঈদ করা। সড়ক পথের বেহাল অবস্থার কারণে ট্রেনের ওপর চাপ বেড়েছে। প্রতিদিন কমলাপুর রেল স্টেশনের ১৮টি কাউন্টার থেকে ৩৫ হাজার টিকিট বিক্রি হয়। কিন্তু লাইনে দাঁড়ায় ৭০ হাজার লোক। বাকি ৩৫ হাজার মানুষকে টিকিট না পেয়ে ফিরে যেতে হচ্ছে।

টিকিট না পাওয়া লোকরা বাধ্য হয়ে ট্রেনের ছাদে, গেটে ঝুলে বাড়ি ফেরার চেষ্টা করছেন। 



 ছবি: রুপম ভট্ট্যাচার্য্য


ফলে ঘরমুখো মানুষ পড়ছেন ভোগাšি—তে। তার ওপর রয়েছে পথের বিড়ম্বনা। বিভিন্ন স্থানে সড়কের বেহাল অবস্থা, পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া, মাওয়া-কাউরাকান্দি-চরজানাজাত নৌর“টে ফেরি সংকট, ঢাকা-ময়মনসিংহ সড়কে গাজীপুরের মাওনায় যানজট, যাত্রাবাড়ী-কাঁচপুর সড়কে খানা-খন্দসহ নানা ভোগাšি—। এর মধ্যেও তারা প্রিয়জনের সান্নিধ্যে ঈদ করতে রাজধানী ছাড়ছেন।
গতকাল কমলাপুর রেলস্টেশন, সায়েদাবাদ, গাবতলী, সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল ঘুরে এবং বেসরকারি সংগঠন সিটিজেন রাইটস্ মুভমেন্টের দেয়া তথ্যে এসব চিত্র পাওয়া গেছে।
রেলওয়ের মহাপরিচালক মো. আবু তাহের বলেন, ‘চাহিদার তুলনায় আসন অপ্রতুল। প্রতিদিন প্রায় ৩৫ হাজার টিকিট বিক্রি হচ্ছে। টিকিট পেতে কাউন্টারের সামনে দাঁড়াচ্ছে প্রায় ৭০ হাজার লোক। প্রত্যেকে ৪টি করে টিকিট কাটলে প্রায় ৯ হাজার লোকের মধ্যেই সব টিকিট শেষ হয়ে যাচ্ছে।’
তিনি আরো বলেন, ‘যাত্রীসেবা বাড়াতে এবারো ১৫০টি অতিরিক্ত কোচ, ১০টি ইঞ্জিন ও ১৪টি বিশেষ ট্রেন প্রস্তুত রাখা হয়েছে।’



রেলওয়ে ঢাকা বিভাগীয় কর্মকর্তা সরদার শাহাদাত আলী বলেন, ‘ঈদের অগ্রিম টিকিট ১৮টি কাউন্টার থেকে দেয়া হচ্ছে। অগ্রিম টিকিটের চাহিদা সাধারণ সময়ের চেয়ে বেড়েছে কয়েক গুণ। প্রত্যেকে গড়ে চারটি করে টিকিট নিচ্ছেন। ফলে টিকিট শেষ হচ্ছে দ্র“ত। যারা টিকিট পাচ্ছেন না তারা ¯^াভাবিকভাবেই ¶ুব্ধ হচ্ছেন।’




বুধবার সকাল ৯টায় ১৭ আগস্টের অগ্রিম টিকিট বিক্রি শুর“ হয়। ১৮টি কাউন্টারের সামনে হাজার হাজার লোক। সারি সারি লাইন স্টেশন চত্বর পার হয়ে রা¯—ায় গিয়ে পড়ে। সাপের মতো আঁকাবাঁকা লাইন।
ঈদের আগে ট্রেনের টিকিট পাওয়া যেন সোনার হরিণ হাতে পাওয়ার মতো ব্যাপার! টিকিট সংগ্রহের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপে¶া করছে ঘরমুখী মানুষ। কিন্তু ১৮-১৯ ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও আসন পাওয়া যাবে কি-না এ নিশ্চয়তাও দিতে পারছে না কেউ।
গত দু’দিন ধরে দেখা যাচ্ছে টিকিট ছাড়ার ২-৩ ঘণ্টার মধ্যেই কাউন্টার থেকে ও মাইকিং করে বলা হচ্ছে টিকিট নেই। তাতে হতাশ হয়ে ফিরছেন বেশির ভাগ লোকজন।


এদিকে বাস মালিক কর্তৃপ¶ বলেছে, কেউ নির্ধারিত ভাড়ার অতিরিক্ত আদায় করলে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। কিন্তু তার বা¯—বায়ন নেই বলে অভিযোগ করেছেন যাত্রীরা। সরকারের ঢিলেঢালা প্রস্তুতি এবং সারাদেশে সড়কের বেহাল অবস্থার কারণে ঈদের আগে তীব্র যানবাহন সংকট দেখা দেবে। 

 ছবি: রুপম ভট্ট্যাচার্য্য


বাস মালিক কর্তৃপ¶ বলেছেন, রা¯—াঘাটের অবস্থা খারাপ হওয়ার কারণে সব কোম্পানিই নির্ধারিত ট্রিপের চেয়ে কম ট্রিপের টিকিট ছেড়েছে। ঈদের আগে রা¯—াঘাটের অবস্থা কিছু ভালো হলে ট্রিপের সংখ্যা বাড়ানো হতে পারে। তবে এ সম্ভাবনা খুবই কম।

এদিকে লঞ্চের অগ্রিম টিকিট বিক্রি শুর“ হওয়ার আগেই প্রায় শেষ। প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণীর টিকিট পাওয়া যেন সোনার হরিণ পাওয়া। বাসের টিকিটের জন্যও ছোটাছুটি করছেন যাত্রীরা। বিভিন্ন পরিবহন মালিকরা বলেছেন, সারাদেশে বেহাল সড়ক ব্যবস্থার কারণে ঈদ উপল¶ে বিশেষ বাস দেয়া হবে না। ফলে এবার ঈদে যাত্রীদের দুর্ভোগ বাড়বে বলে তাদের অভিমত।
সদরঘাটের লঞ্চকর্মীরা দাবি করেছেন, অধিকাংশ লঞ্চের কেবিনের অগ্রিম টিকিট বিক্রি হয়ে গেছে। অথচ কেবিনের অগ্রিম টিকিট বিক্রি শুর“ করার কথা আগামী ১৪ আগস্ট থেকে। কিন্তু বা¯—বে টিকিট বিক্রির কোনো আলামত দেখা যায়নি। এদিকে যাত্রীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়েরও অভিযোগ পাওয়া গেছে। ঢাকা থেকে ঝালকাঠিগামী এমভি টিপু লঞ্চের ভাড়া সিঙ্গেল কেবিন ৬শ’ আর ডাবলের জন্য ১১শ’ টাকা নেয়া হচ্ছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক লঞ্চের এক মালিক জানান, সরকারি হিসাব অনুযায়ী চার্টে ডেকের ভাড়া দেয়া আছে ২০৪ টাকা। এর চারগুণ বেশি ভাড়া নিতে বলা হয়েছে কেবিন থেকে।
ঢাকা-বরিশালগামী পারাবত-৭ লঞ্চের বুকিং ক্লার্ক নজর“ল ইসলাম জানান, আসলে টিকিট বিক্রি শুর“ হয়েছে। যাত্রী বেশি হওয়ায় ঈদের টিকিট শেষ হয়ে গেছে বলা হচ্ছে। এ সময় রহিম নামে এক যাত্রী অভিযোগ করে বলেন, ‘দু’দিন ধরে ঘুরছি, কোনো টিকিট পাইনি। ঢাকা-বরিশাল-ঝালকাঠিগামী এমভি টিপুর কর্মী মো. জাকির জানান, মন্ত্রী, সচিব কোটা, মালিকপ¶ের কোটা, ডিসির কোটা ও বিআইডবি­উটিএ অফিসারদের কোটা বাদ দিলে পাবলিকের জন্য টিকেট থাকে না। আমরা কী করব।
গতকাল দুপুর আড়াইটায় কল্যাণপুরে দূরপাল­া টিকিট কাউন্টারগুলোতে গিয়ে দেখা গেছে, টিকিটের সন্ধানে ঘুরছেন শত শত ঘরমুখো মানুষ। কাউন্টার থেকে তাদের জানিয়ে দেয়া হচ্ছে, টিকিট নেই। মালিকপ¶ টিকিট আছে দাবি করলেও কাউন্টার থেকে বলা হচ্ছে, শেষ হয়ে গেছে। এমন অবস্থায় বাসে বাড়ি ফেরা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে যাত্রীদের। কল্যাণপুরে আগমনী এক্সপ্রেসের কাউন্টারে গিয়ে রংপুরের টিকিট খুঁজছেন ইমরান হোসেন। তার দরকার ১৯ আগস্টের টিকিট। কাউন্টার থেকে জানিয়ে দেয়া হয়েছে, টিকিট নেই। 


ইমরান হোসেন জানান, ৭ আগস্ট ব্য¯—তার কারণে টিকিট নিতে আসতে পারেননি। এখন পড়েছেন ঝামেলায়। চেষ্টা করছেন টিকিট পাওয়ার। তার বক্তব্য, একশ’ টাকা বেশি দিতে রাজি, টিকিট পেলেই হয়। তিনি জানান, তিনি আগমনী, এসআর ট্রাভেলস, হানিফ এন্টারপ্রাইজ, শ্যামলী পরিবহন কাউন্টারে ঘুরেও টিকিট পাননি। টাকা বেশি দিয়ে টিকিট পাওয়া গেছে হানিফ এন্টারপ্রাইজের কাউন্টারে। 


গাবতলী টার্মিনাল সূত্র জানায়, এবার অনেক পরিবহন অগ্রিম টিকিট বিক্রি করছে না। অবশ্য ছোট পরিবহন কোম্পানিগুলো অগ্রিম টিকিট বিক্রি করছে। রা¯—ার অবস্থা দেখে ঈদের দু’তিন দিন আগে আসা যাত্রীদের (রানিং) কাছে টিকিট বিক্রি করা হবে। 


বাংলাদেশ অভ্যš—রীণ নৌ-চলাচল (যাপ) সংস্থা বা লঞ্চ মালিক সমিতির সহ-সভাপতি শাহাব উদ্দিন মিলন জানিয়েছেন, চাহিদার তুলনায় লঞ্চের সংখ্যা অনেক কম। নির্ধারিত সময়ের আগেই লঞ্চের কেবিন শেষ হয়ে গেছে। তিনি আরো জানান, যারা লঞ্চের কেবিনের জন্য আবেদন করেছিলেন তাদের দেয়া হয়েছে।
নৌপরিবহন সচিব আবদুল মান্নান হাওলাদার জানিয়েছেন, যে কোনো দুর্ঘটনা রোধে এ বছর সরকারের প¶ থেকে কঠোর নজরদারি করা হবে। তিনি জানান, কোনোভাবেই লঞ্চের ছাদে যাত্রী বহন করতে দেয়া হবে না। কেউ নির্ধারিত ভাড়ার অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করলে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে।

সৌজন্যে: দৈনিক মানবকণ্ঠ, ৯ আগস্ট ২০১২

No comments: