Sunday, August 26, 2012

স্বাস্থ্য খাতে মাথাপিছু ন্যূনতম ব্যয়ও করছে না বাংলাদেশ

   বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিবেদন  

                 http://www.prothom-alo.com/detail/date/2012-08-26/news/283959

শিশির মোড়ল:
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ন্যূনতম স্বাস্থ্যসেবার জন্য মাথাপিছু সর্বনিম্ন যে ব্যয় নির্ধারণ করেছে, বাংলাদেশের মানুষ তার অর্ধেকও ব্যয় করতে পারে না। মাথাপিছু ব্যয়ের ক্ষেত্রে সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে শুধু পাকিস্তান ছাড়া অন্য সব দেশের অবস্থা বাংলাদেশের চেয়ে ভালো। ‘বিশ্ব স্বাস্থ্য পরিসংখ্যান ২০১২’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এ তথ্য দেওয়া হয়েছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এ মাসে সুইজারল্যান্ডের জেনেভা থেকে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ন্যূনতম স্বাস্থ্যসেবার জন্য মাথাপিছু কমপক্ষে ৪৪ মার্কিন ডলার ব্যয় করা উচিত। এক ডলার ৮২ টাকা হিসেবে তা তিন হাজার ৬০৮ টাকায় দাঁড়ায়। কিন্তু বাংলাদেশে বর্তমানে স্বাস্থ্য খাতে মাথাপিছু বার্ষিক ব্যয় মাত্র ২১ ডলার বা এক হাজার ৭২২ টাকা।
স্বাস্থ্যসেবার জন্য আন্তর্জাতিক অর্থায়ন বিষয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গঠিত একটি উচ্চপর্যায়ের টাস্কফোর্স কিছু জরুরি স্বাস্থ্যসেবার জন্য প্রতিটি নাগরিকের জন্য ন্যূনতম ৪৪ ডলার ব্যয়ের সুপারিশ করে। এই অত্যাবশ্যকীয় সেবার মধ্যে রয়েছে মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্য, যক্ষ্মা, ম্যালেরিয়া, এইচআইভির চিকিৎসা এবং অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধ কর্মকাণ্ড। 
       তারিখ: ২৬-০৮-২০১২
সালের পরিস্থিতি তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়, আন্তর্জাতিক সহায়তা যথেষ্ট পরিমাণে বৃদ্ধির পরও ২৯টি দেশ সর্বনিম্ন কাঙ্ক্ষিত ব্যয়ের চেয়ে কম খরচ করেছে। এই পরিস্থিতিতে সবাইকে সীমিত অত্যাবশ্যকীয় স্বাস্থ্যসেবাও দেওয়া সম্ভব নয়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী, সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে স্বাস্থ্য খাতে মাথাপিছু ব্যয় সবচেয়ে বেশি মালদ্বীপে, ৩৫৫ ডলার। ৯১ ডলার খরচ করে এরপরের অবস্থানে আছে ভুটান। তবে দেশ দুটির জনসংখ্যাও তুলনামূলকভাবে অনেক কম। মাথাপিছু ব্যয় সবচেয়ে কম পাকিস্তানে, মাত্র ২০ ডলার। ভারত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত সর্বনিম্ন ব্যয়সীমার সমান, অর্থাৎ ৪৪ ডলার ব্যয় করছে। শ্রীলঙ্কা ও নেপাল ব্যয় করছে যথাক্রমে ৬৫ ও ২৪ ডলার। পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও নেপালের চেয়ে বেশি ব্যয় করছে আফগানিস্তান। দীর্ঘদিনের যুদ্ধ-উপদ্রুত এই দেশটির স্বাস্থ্য খাতে মাথাপিছু গড় ব্যয় ৩৪ ডলার।

প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, স্বাস্থ্য খাতে সরকারি ব্যয় কমছে। ২০০০ সালে স্বাস্থ্য খাতের মোট ব্যয়ের ৩৯ শতাংশ বহন করত সরকার। ২০০৯ সালে তা কমে ৩৩ শতাংশে নেমে আসে।
পরিণতি ভালো হবে না: স্বাস্থ্যসেবায় ন্যূনতম খরচ করতে না পারার পরিণতি ভালো হবে না বলে অভিমত দিয়েছেন বিশিষ্ট চিকিৎসক ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক সহ-উপাচার্য অধ্যাপক রশীদ-ই-মাহবুব। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, ‘প্রয়োজনের সময় চিকিৎসাসেবা না পাওয়ার অর্থ শারীরিক সুস্থতা ফিরে না পাওয়া। যারা কায়িক শ্রমে জীবিকা নির্বাহ করে, তাদের জন্য এটা খুব খারাপ হবে। এতে তাদের দারিদ্র্য তীব্র হয়।’
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিবেদনের বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, মাথাপিছু স্বাস্থ্য ব্যয় ২০০৭ সালে ছিল ১৬ ডলার। এখন ২১ ডলার। সরকার ইতিমধ্যে স্বাস্থ্য খাতে জনবল বাড়িয়েছে, কমিউনিটি ক্লিনিক চালু করেছে। এতে সেবার পরিসরও বেড়েছে। তবে পদ্মা সেতু ও জ্বালানি খাতে গুরুত্ব দেওয়ায় স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দের কিছু কমতি হচ্ছে।

সরকারি প্রতিবেদন: এদিকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জনস্বাস্থ্য খাতে সরকারের বরাদ্দ দিন দিন কমছে। স্বাস্থ্য খাতে অর্থায়ন বিষয়ে ২০১০ সালে মন্ত্রণালয়ের হেলথ ইকোনমিকস ইউনিটের প্রকাশ করা ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, স্বাস্থ্য খাতে মূল খরচটা মানুষ নিজে করে। ২০০৭ সালের হিসাব অনুযায়ী স্বাস্থ্যব্যয়ের ৬৪ শতাংশই যায় লোকের নিজের পকেট থেকে। ১৯৯৭ সালে এর হার ছিল ৫৭ শতাংশ। অর্থাৎ স্বাস্থ্য খাতে দেশবাসীর নিজস্ব ব্যয় বাড়ছে। স্বাস্থ্য খাতে অর্থায়নের দ্বিতীয় বৃহত্তম উৎস সরকার। ২০০৭ সালে মোট ব্যয়ের ২৬ শতাংশ এসেছিল সরকারি খাত থেকে। অথচ ১৯৯৭ সালেও সরকারি ব্যয় ছিল ৩৬ শতাংশ।
সরকারি ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের জনস্বাস্থ্য কর্মসূচিতে অর্থব্যয়ের পরিমাণ ১৯৯০-এর দশক থেকে কমে আসছে। ১৯৯৭ সালে স্বাস্থ্য খাতের মোট ব্যয়ের ৯ দশমিক ৭ শতাংশ খরচ হয়েছিল জনস্বাস্থ্য খাতে। ২০০১ সালে তা কমে হয় ৫ দশমিক ১ শতাংশ। ২০০৭ সালে আরও কমে নেমে আসে মাত্র ২ দশমিক ৭ শতাংশে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্বাস্থ্য খাতে সবচেয়ে বেশি খরচ হয় ওষুধ ও চিকিৎসা-সরঞ্জাম কেনার দোকানে। ব্যয়ের ৪৩ শতাংশই চলে যায় এই খাতে। হাসপাতালে খরচ হয় ২৭ শতাংশ। প্রতিবেদনের ভাষ্য, হাসপাতাল বাবদ ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে মূলত ব্যক্তিমালিকানাধীন হাসপাতালে যাওয়ার কারণে। বিগত দশকগুলোতে দেশে ব্যক্তিমালিকানাধীন হাসপাতালের সংখ্যা ব্যাপকভাবে বেড়েছে। আর সরকারি হাসপাতালের তুলনায় বেসরকারি হাসপাতালে খরচ বেড়েছে অনেক বেশি গতিতে। ১৯৯৭ সালে ব্যক্তিমালিকানাধীন হাসপাতালে খরচের পরিমাণ ছিল ২২০ কোটি টাকা। ২০০৭ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় দুই হাজার ৩৪০ কোটি টাকায়।

এ প্রসঙ্গে রশীদ-ই-মাহবুব বলেন, ‘জনস্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ কমে যাওয়া খুবই দুঃখজনক। এর অর্থ হলো, রোগ প্রতিরোধ ও সচেতনতামূলক কর্মকাণ্ড গুরুত্ব হারাচ্ছে। সরকার বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে হাসপাতাল নির্মাণ ও কেনাকাটার ওপর।’

No comments: