Wednesday, 14 November 2012 11:51:48 PM
৭১-এর গোপন দলিল
ঢাকা, ১৫ নভেম্বর: ১৯৭১। মহান স্বাধীনতা সংগ্রামের বছর। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান
সরকারের স্বরাষ্ট্র (রাজনৈতিক) মন্ত্রণালয় থেকে প্রতি মাসে গোপন প্রতিবেদন
পাঠানো হত পশ্চিম পাকিস্তানে কেন্দ্রীয় সরকারের দপ্তরে। মাসের প্রথমার্ধে
একটি ও দ্বিতীয়ার্ধে আরেকটি। এম. এম. হক, এম. এম. কাজিম প্রমুখ তৎকালীন
স্বরাষ্ট্র সচিব স্বাক্ষরিত এসব গোপন প্রতিবেদনে তুলে ধরা হত পূর্ব
পাকিস্তান পরিস্থিতি।
এতে লিপিবদ্ধ হয়েছে এমন সব অজানা বিষয় যা বাংলাদেশের প্রামাণিক ইতিহাসে মুক্তিযুদ্ধকালীন ঘটনাপ্রবাহের এক অমূল্য দলিল।
১৯৭১ সালের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর মাস পর্যন্ত সময়ের ধারাবাহিক বিবরণ
এতে পাওয়া যাচ্ছে, তবে জানুয়ারির প্রথমার্ধের কয়েকটি ও নভেম্বরের
দ্বিতীয়ার্ধের পৃষ্ঠাগুলো নেই। অন্যদিকে মার্চ মাসের কোনও বিবরণ পাওয়া
যায়নি। খুব সম্ভবত ওই মাসে প্রতিবেদন তৈরি করা হয়নি।
কালের মহাফেজখানা থেকে দুষ্প্রাপ্য এই গোপন দলিল উদ্ধার করে এনেছেন ঢাকা টাইমস সম্পাদক আরিফুর রহমান। তার সহযোগিতায় এ দলিল ইংরেজি থেকে বাংলায় ভাষান্তর করেছেন প্রমিত হোসেন।
পূর্ব পাকিস্তান সরকার
স্বরাষ্ট্র (রাজনৈতিক) মন্ত্রণালয়
সেকশন ১
পূর্ব পাকিস্তানের পরিস্থিতি সম্পর্কে ১৯৭১ সালের জানুয়ারি মাসের দ্বিতীয়ার্ধের পাক্ষিক গোপন প্রতিবেদন
১-রাজনৈতিক
সম্প্রতি টাঙ্গাইলে ঈস্ট পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টি
(মার্ক্সিস্ট-লেনিনিস্ট)-এর একটি লিফলেট গোপনে প্রচার করা হয়েছে
পার্টিকর্মীদের মধ্যে। বাংলা ভাষায় মূদ্রিত ওই লিফলেটের শিরোনামে রয়েছে
‘কৃষক শ্রমিকের গণতান্ত্রিক সরকার কায়েমের জন্য কৃষকদের সংগ্রামে ঝাঁপাইয়া
পড়ুন শ্রেণীশত্রু খতমের লাল আগুন গ্রামে গ্রামে ছড়াইয়া দিন’। জোতদার,
মজুদদার ও অন্যান্য শ্রেণীশত্রু উৎখাতের মাধ্যমে ‘সার্বভৌম গণতান্ত্রিক
পূর্ব বাংলা’ প্রতিষ্ঠার জন্য কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র ও সর্বসাধারণের প্রতি
সশস্ত্র সংগ্রামের আহ্বান জানান হয়েছে লিফলেটে। এতে শেখ মুজিবুর রহমান,
নুরুল আমীন ও অন্যদের সমালোচনা করে তাদের আমেরিকার চর বলে আখ্যায়িত করা
হয়েছে এবং বলা হয়েছে যদি পূর্বোক্ত ব্যক্তি ক্ষমতায় আসেন ও দেশের
প্রধানমন্ত্রী হন তাহলে পুঁজিবাদীদের স্বার্থরক্ষায় কৃষক-শ্রমিকের বিপ্লবী
আন্দোলন নস্যাতের চেষ্টা করবেন।
২. কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ ইউনিট অফ ইপিসিপি (এমএল)-এর নামে প্রচারিত ও
‘ছাত্র যুবকদের প্রতি পার্টির আহ্বান’ শিরোনামযুক্ত আরেকটি লিফলেট
সম্প্রতি কুমিল্লায় বিশ্বস্ত পার্টিকর্মীদের মধ্যে গোপনে বিলি করা হয়েছে।
এই লিফলেটে শ্রেণীশত্রু নির্মূল ও কৃষক বিপ্লবের মাধ্যমে ‘জন গণতান্ত্রিক
পূর্ব বাংলা’ প্রতিষ্ঠার জন্য কৃষক-শ্রমিকদের মধ্যে মিশে যাওয়ার ও মাওয়ের
শিক্ষায় অনুপ্রাণিত হওয়ার আহ্বান জানান হয়েছে ছাত্র-যুবাদের প্রতি।
৩. সম্প্রতি ঢাকার টঙ্গী শিল্প এলাকার শ্রমিকদের মধ্যে বিলি করা ঢাকা
ডিস্ট্রিক্ট ইপিসিপি (এমএল)-এর বাংলায় মূদ্রিত গোপন লিফলেট পাওয়া গেছে। এতে
শ্রমিক শ্রেণীর মুক্তির জন্য গেরিলা যুদ্ধকৌশলের মাধ্যমে সশস্ত্র বিপ্লব
সংগঠন এবং ট্রেড ইউনিয়নের আবরনে কর্মরত পুঁজিবাদীদের চরদের দ্বারা
বিভ্রান্ত না হওয়ার আহ্বান জানান হয়েছে।
৪. সম্প্রতি সন্তোষে (টাঙ্গাইল জেলা) পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টির
সদস্যদের গোপন বৈঠক (১১) অনুষ্ঠিত হয়েছে। এ বৈঠকে স্বাধীন পূর্ব বাংলার
দাবিতে আন্দোলন শুরু করার জন্য পিবিসিপি, সিসিসিআর, ইপিসিপি (এমএল) ও
পিবিএসএফের সম্মিলনে একটা ঐক্যবদ্ধ ফ্রন্ট গঠনের সম্ভাব্যতা নিয়ে আলোচনা
করা হয়। এছাড়া মওলানা ভাসানীর স্বাধীন পূর্ব পাকিস্তান আন্দোলনের প্রতি
সমর্থন সম্প্রসারণ ও এর প্রকৃতি নির্ধারণ করতে উল্লিখিত দলগুলোর
প্রতিনিধিদের যৌথ বৈঠকের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
৫. জানা গেছে, পুঁজিবাদ, সাম্রাজ্যবাদ ও সামন্তবাদ উচ্ছেদ করে
সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে প্রগতিশীল চিন্তাধারার মানুষদের সমন্বয়ে
একটি নতুন দল গড়ার উদ্যোগ নিচ্ছেন হাজী মো. দানেশ।
৬. একটি গোপন সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, আওয়ামী লীগ ৬ দফা কর্মসূচির ভিত্তিতে
খশড়া সংবিধান চূড়ান্ত করে ফেলেছে। এতে সংবিধান অনুমোদনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠ
এবং খশড়া সংশোধনের জন্য দুই-তৃতীয়াংশ মত গ্রহণের বিধান রাখা হয়েছে।
৭. দেশের ভবিষ্যৎ সংবিধান নিয়ে শেখ মুজিবুর রহমান পিপিপি প্রধান জেড. এ.
ভুট্টোর সঙ্গে ঢাকায় ২৭-১-৭১ থেকে ২৯-১-৭১ তারিখ পর্যন্ত আলোচনা করেছেন।
পিপিপি প্রধান তার দলের কয়েকজন সদস্যকে নিয়ে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে ২৭-১-৭১
তারিখে ঢাকায় আসেন। ৩০-১-৭১ তারিখে জেড. এ. ভুট্টো ঢাকায় হোটেল
ইন্টারকন্টিনেন্টালে সংবাদ সম্মেলন করেন। সেখানে তিনি বলেন, শেখ মুজিবুর
রহমানের সঙ্গে তার আলোচনা ব্যর্থও হয়নি বা সফলও হয়নি, তবে এতে কয়েকটি
গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আরও আলোচনার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। জেড. এ. ভুট্টো দলের
সদস্যদের নিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানের উদ্দেশে ৩১-১-৭১ তারিখে ঢাকা ছেড়েছেন।
৮. অত্যাবশ্যকীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি এবং ঘূর্ণীঝড়-কবলিত মানুষদের মধ্যে
পর্যাপ্ত ত্রাণ বিতরণে সরকারের ব্যর্থতার প্রতিবাদে জেইউআই ঢাকার আউটার
স্টেডিয়ামে ১৭-১-৭১ তারিখে এক জনসভা করেছে (২০০০)। পীর মুহসেনুদ্দীন ওরফে
দুদু মিঞা এতে সভাপতিত্ব করেন। তিনি হুশিয়ার করে বলেছেন, এক মাসের মধ্যে
দুর্গতদের জন্য খাদ্য, বস্ত্র ও আশ্রয়ের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না করা হলে এমন
গণ-অভ্যুত্থান ঘটবে যা নিয়ন্ত্রণ করা সরকারের পক্ষে সম্ভব নাও হতে পারে।
৯. জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের অবশিষ্ট আসনগুলোর নির্বাচন ১৭-১-৭১ তারিখে
প্রদেশে শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠিত হয়েছে। জাতীয় পরিষদের নয়টি আসনের সবকটিই
পেয়েছে আওয়ামী লীগ। প্রাদেশিক পরিষদের একুশটি আসনের মধ্যে আওয়ামী লীগ
পেয়েছে কুড়িটি আসন।
২-যুব ও ছাত্র বিষয়ক
১০. ২০-১-৬৯ তারিখের গণ-অভ্যুত্থানে নিহত আসাদুজ্জামানের স্মরণে ২০-১-৭১
তারিখে প্রদেশজুড়ে হরতাল, জনসভা, মিছিল ইত্যাদির মাধ্যমে ‘আসাদ দিবস’ পালন
করেছে পিবিসিইউ, পিবিবিসিইউ এবং ইপিএসইউ(পিআর)। এ উপলক্ষ্যে আয়োজিত বিভিন্ন
জনসভায় যেসব স্লোগান দেওয়া হয় সেগুলো হচ্ছে : ‘মুক্তি যদি পেতে চাও,
হাতিয়ার তুলে নাও,’ ‘সৈনিক খতম কর-গণবাহিনী গঠন কর,’ ‘স্বাধীন সার্বভৌম
জনগণতন্ত্র কায়েম কর,’ ‘জ্বালিয়ে দাও, পুড়িয়ে দাও’ ইত্যাদি।
১১. জনসভা, মিছিল এবং ১১-দফাসহ অন্যান্য দাবি আদায়ের সংগ্রাম অব্যাহত
রাখার অঙ্গীকারের মধ্য দিয়ে ঢাকা ও প্রদেশের অন্যান্য স্থানে ২৪-১-৭১
তারিখে ‘গণ-অভ্যুত্থান দিবস’ পালন করেছে ইপিএসএল, ইপিএসইউ(পিআর), পিবিসিইউ
এবং বিসিএল।
১২. সভা, মিছিল, পোস্টারিং ইত্যাদির মধ্য দিয়ে ইপিএসএল, ইপিএসইউ(পিআর) ও
বিসিএলের সঙ্গে যুক্ত ছাত্ররা ঢাকা ও প্রদেশের অন্যান্য স্থানে ১৭-১-৭১
তারিখ থেকে ‘১১-দফা দাবি সপ্তাহ’ পালন করেছে। এ সময় তারা ১১-দফা দাবি
আদায়ের লক্ষ্যে সংগ্রামে স্থির থাকার প্রত্যয় পুনর্ব্যক্ত করেছে।
১৩. ঢাকায় ১৮-১-৭০ তারিখে জেআইয়ের জনসভায় সংঘটিত ঘটনায় যারা প্রাণ
হারিয়েছে তাদের স্মরণে ১৮-১-৭১ তারিখে ঢাকা ও অন্য কয়েকটি স্থানে সভা,
মিছিল ইত্যাদির মধ্য দিয়ে ‘শহীদ দিবস’ পালন করেছে ইসলামী ছাত্র সংঘ ও
জামায়াত-এ-তোলাবায়ে-আরাবিয়া।
১৪. ইপিএসএলের নেতৃত্বের মধ্যে অনৈক্যের একটি আভাস লক্ষ্য করা গেছে।
সংখ্যাগরিষ্ঠের সমর্থন দলের সভাপতি নূরে আলম সিদ্দিকীর প্রতি, অন্যদের
সমর্থন পাচ্ছেন আ. স. ম. আবদুর রব (ইপিএসএল/ভি.পি., ডিইউসিএসইউ)।
১৫. ৩ দিনব্যাপী বার্ষিক সারা পাকিস্তান আইসিএস সম্মেলন ২৯-১-৭১ তারিখে
ঢাকায় অনুষ্ঠিত হয়েছে। অন্যান্য বিষয় ছাড়াও এতে সর্বস্তরে বাংলা ভাষা চালু,
মাদ্রাসা শিক্ষার অবস্থান পুনর্নির্ধারণ এবং বিশ্ববিদ্যালয় অর্ডিন্যান্স
রদ করার দাবি জানান হয়। ২৬-১-৭১ তারিখে ঢাকায় অনুষ্ঠিত ঈস্ট পাকিস্তান
আইসিএসের ওয়ার্কিং কমিটির ৩ দিনের বৈঠকেও অনুরূপ দাবি উত্থাপন করা হয়েছিল।
১৬. পাকিস্তান জেটিএ’র ২ দিনের বার্ষিক সম্মেলন ২৫-১-৭১ তারিখ থেকে শুরু
হয়। এ সম্মেলনেও মাদ্রাসা শিক্ষার অবস্থান পুনর্নির্ধারণের দাবি উত্থাপন
করা হয় এবং দেশের সংবিধানে ইসলামি আদর্শের প্রতিফলন না ঘটালে দল আন্দোলন
শুরু করবে বলে দৃঢ় প্রত্যয় ঘোষণা করা হয়।
৩-সাম্প্রদায়িক পরিস্থিতি
১৭. প্রদেশব্যাপী সাম্প্রদায়িক পরিস্থিতি শান্তিপূর্ণ রয়েছে।
৪-শ্রমিক পরিস্থিতি
১৮. ঢাকার হাজারিবাগ ট্যানারি ও টঙ্গী শিল্প এলাকার কয়েকটি কল-কারখানার
শ্রমিকরা ২০-১-৭১ তারিখে ‘আসাদ দিবস’ পালন করেছে। এদিন তারা হরতাল, সভা ও
মিছিল করেছে। কুমিল্লার ময়নামতি টেক্সটাইল মিলস ও চিস্তি টেক্সটাইল মিলসের
শ্রমিকরাও এদিন হরতাল করে।
১৯. ‘গণ-অভ্যুত্থান দিবস’ পালন উপলক্ষে ঢাকার টঙ্গীতে ২৪-১-৭১ তারিখে
শ্রমিকসভার আয়োজন করে পিবিএসএফ। এ সভায় তারা মৃত আসাদুজ্জামান ও অন্যদের
স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে এবং ‘স্বাধীন গণতান্ত্রিক সার্বভৌম পূর্ব
বাংলা’ প্রতিষ্ঠার জন্য গণ-আন্দোলন শুরু করার শপথ নেয়।
২০. ঘূর্ণীঝড়ের কারণে আগাম বেতনের দাবিতে পাহাড়তলি (চট্টগ্রাম জেলা)
রেলওয়ে ওয়ার্কশপের তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারিদের ৬-১-৭১ থেকে শুরু
হওয়া হরতাল সৈয়দপুর রেলওয়ে ওয়ার্কশপেও (রংপুর জেলা) ছড়িয়ে পড়েছে। তারা
১১-দফা দাবিতে চাপ প্রয়োগের জন্য ১৮-১-৭১ থেকে হরতাল শুরু করেছে। ঈশ্বরদী
(পাবনা জেলা) রেলওয়ে লোকো-শেডের চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারিরাও ২৮-১-৭১ তারিখ
সকাল থেকে ২৯-১-৭১ পর্যন্ত কর্মবিরতি পালন করেছে।
৫-আইন-শৃঙ্খলা
২১. প্রদেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি সাধারণভাবে সন্তোষজনক রয়েছে।
২২. বিভাগওয়ারি ডাকাতির পরিসংখ্যান-
বিভাগ চলমান পাক্ষিক সমীক্ষণ গত বছরের হিসাব
ঢাকা ৩৬ ৬
চট্টগ্রাম ১১ ৪
খুলনা ১৭ ৪
রাজশাহী ২৬ ৫
মোট= ৯০ ১৯
৬-অর্থনীতি, চাষাবাদের জমি, জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতি
২৩. সামগ্রিকভাবে জনগণের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি অসন্তোষজনক রয়েছে।
কর্মসংস্থান পরিস্থিতি খারাপ। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম বাড়ার প্রবণতা
অব্যাহত রয়েছে।
২৪. এ পক্ষকালে ধান-চালের দামে ঊর্ধ্বগতির প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। প্রদেশে
মোটা চালের গড় মূল্য প্রতি মন ৩৪.২৭ টাকা, যা আগের পক্ষকালে ছিল ২৪.১০
টাকা। মোটা চালের সর্বোচ্চ মূল্য ছিল ঢাকায় প্রতি মন ৪০.০০ টাকা আর
সর্বনিম্ন বান্দরবানে ২৬.০০ টাকা।
২৫. চিনি, লবণ, চা ও মশলার সরবরাহ সন্তোষজনক রয়েছে। সব ধরনের মশলার দাম চড়া।
২৬. সামগ্রিকভাবে জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতি সন্তোষজনক। কলেরা সম্পর্কে কিছু বিক্ষিপ্ত খবর পাওয়া গেছে।
৭-বিবিধ
২৭. বোমা ও পটকা
(ক) হাটহাজারি থানার (চট্টগ্রাম জেলা) নাজিরহাট রেল স্টেশনে ১৮-১-৭১
তারিখে একটা বোমা বিস্ফোরণ ঘটে। স্থানীয় জনতা অভিযুক্ত এক ব্যক্তিকে আটক
করে, সে বরিশাল বি.এম. কলেজের ছাত্র ও পূর্ব বাংলার শ্রমিক আন্দোলন নামক
দলের সঙ্গে যুক্ত বলে জানা গেছে। আরও জানা গেছে, সে একটি ব্যাগে তিনটি বোমা
ও দলের কিছু প্রচারপত্র নিয়ে যাচ্ছিল ফটিকছড়ি থানা এলাকায়। দুর্ঘটনাক্রমে
একটি বোমা ব্যাগ থেকে পড়ে গিয়ে বিস্ফোরিত হয় এবং এতে সে আহত হয়। এ ঘটনায়
মামলা হয়েছে এবং বিষয়টির তদন্ত চলছে।
(খ) ১৯-১-৭১ তারিখ বিকালে ঢাকার মিরপুর থানার ওসি একটি ধানক্ষেত থেকে
কিছু পটকার অংশ উদ্ধার করেছেন। এ ব্যাপারে মিরপুর ১০ নম্বর সেকশনের স্টাফ
কোয়ার্টার্সের শাহাবুদ্দীন নামে একজনকে আটক করা হয়েছে (সে স্থানীয় নয়)।
বিষয়টি তদন্ত করা হচ্ছে।
(গ) ২৪-১-৭১ তারিখ সকাল ১০টার দিকে পাইকগাছা থানার (খুলনা জেলা) কপিলমণি
বাজারে একটি পটকার বিস্ফোরণ ঘটলে আমির আলী নামে কপিলমণি কলেজের এক কেরাণী
আহত হন, তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। স্থানীয় হাসপাতাল ও কলেজের
ব্যবস্থাপনা নিয়ে দুই পক্ষের শত্রুতা থেকে এ ঘটনা ঘটেছে বলে জানা গেছে।
(ঘ) ২৫-১-৭১ তারিখ রাত ১১টার দিকে কতিপয় অজ্ঞাত দুষ্কৃতি ফরিদপুর সরকারি
রাজেন্দ্র কলেজের পশ্চিম দেয়ালে বিস্ফোরক বস্তু ছুঁড়ে মারে। এতে বিস্ফোরণ
ঘটলেও কোনও ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। এ ঘটনায় মামলা হয়েছে।
২৮. জানা গেছে, ঢাকাস্থ জাতীয় ত্রাণ ও পুনর্বাসনের কেন্দ্রীয় কমিটির
নির্দেশে এএল, সিএমএল, পিএনসি এবং এনএপি(পিআর) দলের অংশগ্রহণে একটি
সর্বদলীয় বৈঠক সম্প্রতি পটুয়াখালীতে অনুষ্ঠিত হয়েছে। এতে এ দলগুলোর
প্রতিনিধিদের নিয়ে ‘জন ত্রাণ ও পুনর্বাসন কমিটি, পটুয়াখালী জেলা’ নামে একটি
কমিটি গঠন করা হয়। বৈঠকে যেসব দাবিতে প্রস্তাব গৃহীত হয় সেগুলোর মধ্যে
রয়েছে-দুর্গত এলাকায় অন্তত এক বছর ত্রাণ সরবরাহ, ওয়াপদা বাঁধের বাইরে
বসবাসকারীদের বাঁধের ভিতরে পুনর্বাসন এবং কর মওকুফের মাধ্যমে লবণ উৎপাদনে
পর্যাপ্ত সুযোগসুবিধা প্রদান।
২৯. ঢাকার বায়তুল মোকাররমে ১৯-১-৭১ তারিখে পূর্ব পাকিস্তান মহিলা পরিষদের
এক সভা (২০০) অনুষ্ঠিত হয়েছে। এতে সভাপতিত্ব করেন পূর্ব পাকিস্তান মহিলা
পরিষদের সভাপতি বেগম সুফিয়া কামাল। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি
রোধ ও জননিরাপত্তা বিশেষ করে নগরীতে নারীদের চলাচলে নিরাপত্তা নিশ্চিত
করতে ব্যর্থ হওয়ায় সরকারের সমালোচনা করে এ সভায় বক্তব্য দেওয়া হয়। যেসব
দাবিতে এ সভায় প্রস্তাব গৃহীত হয় সেগুলোর মধ্যে রয়েছে- নিত্যপ্রয়োজনীয়
পণ্যের মূল্য হ্রাসে অবিলম্বে পদক্ষেপ গ্রহণ, ১৫ দিনের মধ্যে এসব পণ্যের
মূল্য নির্ধারণ ও খাদ্যে ভেজাল প্রতিরোধ। এতে ব্যর্থ হলে কঠোর আন্দোলনের
হুমকি দেওয়া হয়েছে। সভা শেষে অংশগ্রহণকারীরা (২০০) মিছিল করে গভর্নরের
বাসভবনের গেট পর্যন্ত যায়, সেখানে বিক্ষোভ প্রদর্শনের পর মিছিল
শান্তিপূর্ণভাবে অন্তর্হিত হয়।
ঢাকা
ফেব্রুয়ারি ৯, ১৯৭১
এম. এম. হক
সচিব
পূর্ব পাকিস্তান সরকার
স্বরাষ্ট্র দপ্তর
http://www.dhakatimes24.com/index.php?view=details&data=Mobile&news_type_id=1&menu_id=23&news_id=16190
বিপন্ন রয়েল বেঙ্গল টাইগার
শেষ হলো লেবুজা-আমেনাদের গলগ্রহের দিন
-----------------------------------------------------------------------------------
স্যান্ডি-আইলা-নার্গিস-রেশমিদের গল্প
ইসমাইল হোসেন, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট
বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
ঢাকা:
ঘূর্ণিঝড়ের নামকরণ নিয়ে কৌতুহল সবারই। শুরুতে কঠিন কঠিন নামকরণ হলেও
বর্তমানে সহজ নামে ডাকা হয় ঘূর্ণিঝড়দের। আর মজার ব্যাপার হচ্ছে নামগুলোর
বেশির ভাগই মেয়েদের নামে। ঘূর্ণিঝড়ের ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে দ্রুত জানাজানি
হওয়ার জন্যই এ সহজ নামের ব্যবহার।
ঘূর্ণিঝড়
ঘূর্ণিঝড় হল ক্রান্তীয় অঞ্চলের সমুদ্রে সৃষ্ট বৃষ্টি, বজ্র ও প্রচণ্ড ঘূর্ণি বাতাস সম্বলিত আবহাওয়ার একটি নিম্নচাপ প্রক্রিয়া। যা নিরক্ষীয় অঞ্চলে উৎপন্ন তাপকে মেরু অঞ্চলের দিকে প্রবাহিত করে। এ ধরণের ঝড়ো বাতাস প্রবল বেগে ঘুরতে ঘুরতে ছুটে চলে বলে এর নাম হয়েছে ঘূর্ণিঝড়। ঘূর্ণিঝড়ের ঘূর্ণন উত্তর গোলার্ধে ঘড়ির কাঁটার বিপরীত দিকে এবং দক্ষিণ গোলার্ধে ঘড়ির কাঁটার দিকে।
ঘূর্ণিঝড় উপকূলে আঘাত হানলে যদিও দুর্যোগের সৃষ্টি হয়, কিন্তু এটি আবহাওয়ার একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া, যা পৃথিবীতে তাপের ভারসাম্য রক্ষা করে। গড়ে পৃথিবীতে প্রতি বছর প্রায় ৮০টি ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টি হয়। এর অধিকাংশই সমুদ্রে মিলিয়ে যায়, কিন্তু যে অল্প সংখ্যক উপকূলে আঘাত হানে তা অনেক সময় ভয়াবহ রূপ নেয়।
ঘূর্ণিঝড়ের কারণ
ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টির কৌশল সম্পূর্ণরূপে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ না থাকলেও এটি সৃষ্টির জন্য কিছু প্রভাবক কাজ করে।
সমুদ্রের তাপমাত্রা: ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টির জন্য সমুদ্রের পানির তাপমাত্রা কমপক্ষে ২৬-২৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস থাকা আবশ্যক এবং একটি নির্দিষ্ট গভীরতা (কমপক্ষে ৫০ মিটার) পর্যন্ত এ তাপমাত্রা থাকতে হয়। এজন্য সাধারণত কর্কট ও মকর ক্রান্তিরেখার কাছাকাছি সমুদ্রগুলোতে গ্রীষ্মকালে বা গ্রীষ্মের শেষে ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টি হয়।
নিরক্ষরেখা থেকে দূরত্ব: নিরক্ষীয় অঞ্চলে গ্রীষ্মকালে পৃথিবীপৃষ্ঠ উত্তপ্ত হয়ে গেলে উষ্ণ ও আর্দ্র বায়ু হালকা হয়ে উপরে উঠে যায়। এ শূন্যস্থান পূরণের জন্য মেরু অঞ্চল থেকে শীতল বায়ু উত্তর গোলার্ধে দক্ষিণে নিরক্ষরেখার দিকে এবং দক্ষিণ গোলার্ধে উত্তর দিকে প্রবাহিত হয়।
কিন্তু পৃথিবীর ঘূর্ণনের প্রভাবে সৃষ্ট করিওলিস শক্তির কারণে এ বায়ু সোজাসুজি প্রবাহিত না হয়ে উত্তর গোলার্ধে ডান দিকে এবং দক্ষিণ গোলার্ধে বাম দিকে বেঁকে যায়। এ জন্য উত্তর গোলার্ধে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড় ঘড়ির কাঁটার বিপরীত দিকে এবং দক্ষিণ গোলার্ধে ঘড়ির কাঁটার দিকে ঘুরতে থাকে। নিরক্ষরেখার উপর এ শক্তির প্রভাব শূন্য। কাজেই, এ অঞ্চলের তাপমাত্রা ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টির অনুকূলে থাকলেও করিওলিস শক্তি ন্যূনতম থাকায়, নিরক্ষরেখার ০-৫ ডিগ্রির মধ্যে কোনো ঘূর্ণিঝড় হতে দেখা যায় না। সাধারণত, নিরক্ষরেখার ১০-৩০ ডিগ্রির মধ্যে ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টি হয়।
বায়ুমণ্ডলের আর্দ্রতা: বায়ুমণ্ডলের নিম্ন ও মধ্যস্তরে অধিক আর্দ্রতা ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।
বিক্ষুব্ধ পরিস্থিতি: ঘূর্ণিঝড় স্বতস্ফুর্তভাবে সৃষ্টি হতে পারে না। সমুদ্রে আগে থেকে বিরাজমান বিক্ষুব্ধ কোনো পরিস্থিতি সৃষ্টি থাকলে, ঘূর্ণিঝড় সাধারণত সেটাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে। এছাড়া, পশ্চিমমুখী নিম্ন বায়ুচাপসম্পন্ন পূবালী স্রোত, আবহাওয়ায় উচ্চতার সঙ্গে সঙ্গে বায়ুর গতি ও দিকের স্বল্প পরিবর্তন এবং দ্রুত শীতলীকরণের ফলে নির্গত তাপ ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টির জন্য সহায়ক।
নামকরণ
অতীতে ঝড়ের নামকরণ অক্ষাংশ-দ্রাঘিমাংশের উপর ভিত্তি করে করা হলেও বিভিন্ন অভিজ্ঞতায় দেখে গেছে, জটিল তাত্ত্বিক এসব নামের চেয়ে সংক্ষিপ্ত, সুনির্দিষ্ট নামকরণ লিখিত বা মৌখিক যেকোনো যোগাযোগে অধিকতর সহজ এবং দ্রুততর। এটি আরো গুরুত্বপূর্ণ কারণ, একটি ঝড়ের তথ্য হাজার হাজার স্টেশন, সমুদ্র উপকূল এবং জলযানের মধ্যে আদান-প্রদান হয়ে থাকে।
এছাড়া একই সময়ে একাধিক ঝড় সৃষ্টি হলে, বিভ্রান্তি এড়ানোর জন্য সহজে মনে রাখা যায় এবং পার্থক্য করা যায় এমন নাম দরকার। অক্ষাংশ-দ্রাঘিমাংশ নামকরণের উপর ভিত্তি করা ঝড়ের পূর্বাভাস থেকে অনেক সময় বিভ্রান্তি হওয়ার শঙ্কা থেকে যেত। ফলে পূর্বাভাস ভুল শুনে যে ঝড়টি অনেক দূরে চলে গেছে, সে হয়তো ভয়ঙ্কর ফণা তুলে ধেয়ে চলে এসেছে একেবারে কাছে, তা নিয়ে বিভ্রান্তি থাকতো।
শত শত বছর ধরে পশ্চিম ভারতীয় দ্বীপপুঞ্জের ঝড়গুলোর নাম হতো সন্তানদের নামে। যেমন- সান্তা আনা, স্যান ফেলিপ (প্রথম), স্যান ফেলিপ (দ্বিতীয়)। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ঝড়কে ছেলেদের নাম দেওয়া হত। এখন অবশ্য সব ঝড়কে স্থানীয় সাধারণ নাম দ্বারা, যা সংস্কৃতিগত দিক থেকে স্পর্শকাতর নয়, সে সব নামে চিহ্নিত করা হয়।
ঘূর্ণিঝড়ের উৎপত্তিস্থল অনুযায়ী গ্রীষ্মমণ্ডলীয় সমুদ্র অঞ্চলকে ৭টি বেসিনে ভাগ করা হয়েছে। এগুলো হলো, উত্তর ভারতীয় মহাসাগর, দক্ষিণ-পশ্চিম ভারতীয় মহাসাগর, উত্তর আটলান্টিক মহাসগর, উত্তর-পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগর, দক্ষিণ-পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগর, দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগর এবং অস্ট্রেলীয় অঞ্চল।
বেসিনে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড়গুলোর বৈশিষ্ট্য এক হলেও সাধারণভাবে ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে যেসব ঘূর্ণিঝড় হয়, তাদের ডাকা হয় সাইক্লোন নামে। ইংরেজ সাহেব প্রাক্তন জাহাজি হেনরি পিডিংটন কলকাতায় চাকরি করার সময় এ অঞ্চলের ঝড়ের দানবাকৃতি দেখে গ্রিক শব্দ ‘কাইক্লোস’ থেকে (যার একটা অর্থ সাপের কুণ্ডলী) সাইক্লোন নাম প্রস্তাব করেন। ১৮৪৮ সালে নাবিকদের জন্য তার লেখা সেইলার্স হর্ন বুক ফর দ্য ল অব স্টর্মস-এ যা প্রথম প্রকাশিত হয়েছে।
আটলান্টিক মহাসাগরীয় এলাকার ঘূর্ণিঝড়গুলোকে বলা হয় হারিকেন। সাধারণত একটু শক্তিশালী ঝড়কেই (বাতাসের গতিবেগ ঘণ্টায় ৭৪ মাইলের বেশি) হারিকেন নামে ডাকা হয়, যার নামকরণ করা হয়েছে এ অঞ্চলের আদি অধিবাসী মায়াদের ঝড়বৃষ্টির দেবতা ‘হুরাকানের’ নামে।
আটলান্টিক এলাকায় হারিকেনের শক্তিমাত্রা অনুযায়ী এগুলোকে ক্যাটাগরি-১, ক্যাটাগরি-২ এভাবে ৫ ভাগে ভাগ করা হয়। সাধারণত ক্যাটাগরি-৩ বা তার ঊর্ধ্বমাত্রার হারিকেনকে (বাতাসের গতিবেগ ঘণ্টায় ১১০ মাইলের বেশি) খুবই শক্তিশালী গণ্য করা হয়।
প্রকৌশলী হার্বাট সাফির ও বিজ্ঞানী রবার্ট সিম্পসন যৌথভাবে ঘূর্ণিঝড়ের শক্তিমত্তা নির্ণয়ের এ পদ্ধতি আবিষ্কার করেছিলেন বলে একে ‘সাফির-সিম্পসন স্কেল’ বলা হয়।
অন্যদিকে প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকার ঘূর্ণিঝড়কে বলা হয় ‘টাইফুন’। চীনা ভাষায় এর কাছাকাছি শব্দ taaifung বা tai feng, যার অর্থ ‘শক্তিশালী বায়ু’। এছাড়া আরবীয়রাও গ্রিক মিথলজির বায়ুদৈত্য tuphon থেকে ঝড়ের নামকরণ করেছিল ‘তুফান’। যা বাংলাতেও ব্যবহার হয়। আরবদের কাছ থেকে এ শব্দ এক সময় ইংরেজদের কাছে যায় এবং শেলির প্রমিথিউস আনবাউন্ড বইতে ১৮১৯ সালে প্রথম ‘typhoon’ বানানটি ব্যবহৃত হয়।
আগে বিচ্ছিন্নভাবে নির্দিষ্ট কোনো ঝড়ের নামকরণ করা হলেও সাম্প্রতিককালে প্রতিটি ঝড়কে চিহ্নিত করতে আলাদাভাবে নামকরণ করা হয়। ঘূর্ণিঝড়ের উৎপত্তির যে বেসিনগুলো রয়েছে, প্রতিটি বেসিনে ঝড়ের পূর্বাভাস দেওয়ার জন্য আলাদা কর্তৃপক্ষ রয়েছে। তারাই পূর্ব থেকে ঝড়ের এ নামকরণ করে থাকেন।
যেমন, উত্তর আটলান্টিক বেসিনে পূর্বাভাসের দায়িত্বে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল হারিকেন সেন্টার। এখানে উৎপন্ন হারিকেনের নাম তারাই দিয়ে থাকে। কাজের সুবিধার জন্য তারা নামকরণের একটি তালিকা আগেই বানিয়ে নিয়েছেন। যেটা বর্ণানুক্রমিকভাবে অনুসরণ করা হয়। অর্থাৎ বছরের প্রথম হারিকেনটির নাম হবে ‘A’ দিয়ে, যেমন: অ্যান্ড্রু। দ্বিতীয়টি হবে ‘B’ দিয়ে, যেমন: বার্থা। এ রকম ছয় বছরের জন্য তালিকা আগেই বাছাই করা হয়ে থাকে। সেখান থেকে নামগুলো পর্যায়ক্রমিকভাবে দেওয়া হয়। এভাবে ১০১০ সালের তালিকা ব্যবহার হবে ২০১৬ সালে।
তবে কোনো ঘূর্ণিঝড় যদি ব্যাপক ক্ষতিসাধন করে, তবে সেটা আর তালিকায় পরবর্তী সময়ে ব্যবহার করা হয় না। ২০০৫ সালে হারিকেন ক্যাটরিনা বিপুল ক্ষয়ক্ষতির কারণে বিখ্যাত হয়ে যাওয়ায় এটি নামকরণের তালিকা থেকে বাদ পড়ে।
আগে নারীদের নামে হারিকেনের নামকরণ করা হলেও ১৯৭৯ সাল থেকে প্রথম পুরুষের নাম অন্তর্ভুক্ত হয় এবং বর্তমান তালিকায় সমানভাবে পর্যায়ক্রমে মহিলা ও পুরুষের নাম রয়েছে।
ঘূর্ণিঝড়ের নামকরণ করে বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা’র আঞ্চলিক কমিটি। উত্তর ভারত মহাসাগরীয় এলাকায় পূর্বাভাসের দায়িত্বে আছে ভারতীয় আবহাওয়া বিভাগ। বাংলাদেশ, মায়ানমার, ভারত, পাকিস্তান, মালদ্বীপ, শ্রী লংকা, মায়ানমার এবং ওমান বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার একটি প্যানেলের (WMO/ESCAP) সদস্য।
২০০০ সালে এই প্যানেল প্রথম প্রস্তাব করে এ অঞ্চলের ঘূর্ণিঝড়ের নামকরণ করার জন্য। এ জন্য প্রতিটি দেশ থেকে ১০টি করে নাম জমা দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। যেহেতু বিভিন্ন দেশ তাদের বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী নাম দিয়েছে, তাই এখানকার ঝড়ের নামে কোনো বর্ণানুক্রম বা সামঞ্জস্য নেই। কোনো ঝড়ের নাম অগ্নি, আবার কোনোটার নাম নার্গিস। ২০০৪ সালে ভারতীয় আবহাওয়া বিভাগ এ অঞ্চলে প্রথম যে ঘূর্ণিঝড়টির নামকরণ করেছিল, তার নাম ছিল অনিল।
একটি নির্দিষ্ট সময়কালে সৃষ্ট সম্ভাব্য সব ঝড়ের জন্য সদস্য রাষ্ট্রগুলো পূর্বেই নাম প্রস্তাব করে রাখে। একেকটি ঝড় বাস্তবে সৃষ্টি হলে, তালিকা থেকে পর্যায়ক্রমে নাম নির্বাচন করা হয়। ঝড় যেহেতু মৃত্যু ও ধ্বংসের সঙ্গে জড়িত, তাই কোনো নাম পুনরাবৃত্তি করা হয় না।
এমিয়া অঞ্চলে সাম্প্রতিক কয়েকটি ঝড় ও তার নামকরণকারী দেশ হচ্ছে: সিডর (ওমান), নার্গিস (পাকিস্তান), রেশমি (শ্রী লংকা), খাই-মুক (থাইল্যাণ্ড), নিশা (বাংলাদেশ), বিজলি (ভারত), আইলা (মালদ্বীপ)।
স্যান্ডি
মৌসুমী বায়ুর ফলে সৃষ্ট স্রোতের কারণে ২২ অক্টোবর পশ্চিম ক্যারিবিয়ান সাগরে ঘূর্ণি স্যান্ডির উৎপত্তি। এটি আটলান্টিক অঞ্চলের ঘূর্ণিঝড় মৌসুমের ১৮তম ঘূর্ণিঝড়। জন্মের ৬ ঘণ্টার মধ্যেই বায়ূর গতিবেগ বেড়ে দানবীয় শক্তি লাভ করে স্যান্ডি। ২৪ অক্টোবর হারিকেনে রূপ নিয়ে কিছু সময় পরই জ্যামাইকার উপকূলে আঘাত হানে। জামাইকার ওপর দিয়ে এটি ক্রমাগত উত্তরে অগ্রসর হয়ে আবার জলরাশির উপর দিয়ে প্রবাহিত হতে শুরু করে এবং কিউবার মাটিতে দ্বিতীয় আঘাতটি হানে।
২৫ অক্টোবর এটি দ্বিতীয় ক্যাটাগরির হারিকেনে পরিণত হয়। ২৬ অক্টোবর স্যান্ডি বাহামা দ্বীপপুঞ্জের ওপর আছড়ে পড়ে। ২৭ অক্টোবর ভোরে এটি কিছুটা দুর্বল হয়ে হারিকেন থেকে মৌসুমি ঝড়ে রূপ নিলেও কয়েক ঘণ্টা পরই এর শক্তিবৃদ্ধি পায় এবং এটি ক্যাটাগরি ১ হারিকেনে পরিণত হয়।
সোমবার যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ব উপকূলে ক্যাটাগরি ১ উত্তর-ক্রান্তিয় ঝড় হিসেবে আঘাত হানে। এক সপ্তাহের সফরে স্যান্ডি তোলপাড় করেছে যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ব উপকূল।
নিলম
বুধবার বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড়ের নাম ছিল ‘নিলম’। এ নিলম ছিল পাকিস্তানের প্রস্তাবিত নাম।
ঘূর্ণিঝড়
ঘূর্ণিঝড় হল ক্রান্তীয় অঞ্চলের সমুদ্রে সৃষ্ট বৃষ্টি, বজ্র ও প্রচণ্ড ঘূর্ণি বাতাস সম্বলিত আবহাওয়ার একটি নিম্নচাপ প্রক্রিয়া। যা নিরক্ষীয় অঞ্চলে উৎপন্ন তাপকে মেরু অঞ্চলের দিকে প্রবাহিত করে। এ ধরণের ঝড়ো বাতাস প্রবল বেগে ঘুরতে ঘুরতে ছুটে চলে বলে এর নাম হয়েছে ঘূর্ণিঝড়। ঘূর্ণিঝড়ের ঘূর্ণন উত্তর গোলার্ধে ঘড়ির কাঁটার বিপরীত দিকে এবং দক্ষিণ গোলার্ধে ঘড়ির কাঁটার দিকে।
ঘূর্ণিঝড় উপকূলে আঘাত হানলে যদিও দুর্যোগের সৃষ্টি হয়, কিন্তু এটি আবহাওয়ার একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া, যা পৃথিবীতে তাপের ভারসাম্য রক্ষা করে। গড়ে পৃথিবীতে প্রতি বছর প্রায় ৮০টি ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টি হয়। এর অধিকাংশই সমুদ্রে মিলিয়ে যায়, কিন্তু যে অল্প সংখ্যক উপকূলে আঘাত হানে তা অনেক সময় ভয়াবহ রূপ নেয়।
ঘূর্ণিঝড়ের কারণ
ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টির কৌশল সম্পূর্ণরূপে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ না থাকলেও এটি সৃষ্টির জন্য কিছু প্রভাবক কাজ করে।
সমুদ্রের তাপমাত্রা: ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টির জন্য সমুদ্রের পানির তাপমাত্রা কমপক্ষে ২৬-২৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস থাকা আবশ্যক এবং একটি নির্দিষ্ট গভীরতা (কমপক্ষে ৫০ মিটার) পর্যন্ত এ তাপমাত্রা থাকতে হয়। এজন্য সাধারণত কর্কট ও মকর ক্রান্তিরেখার কাছাকাছি সমুদ্রগুলোতে গ্রীষ্মকালে বা গ্রীষ্মের শেষে ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টি হয়।
নিরক্ষরেখা থেকে দূরত্ব: নিরক্ষীয় অঞ্চলে গ্রীষ্মকালে পৃথিবীপৃষ্ঠ উত্তপ্ত হয়ে গেলে উষ্ণ ও আর্দ্র বায়ু হালকা হয়ে উপরে উঠে যায়। এ শূন্যস্থান পূরণের জন্য মেরু অঞ্চল থেকে শীতল বায়ু উত্তর গোলার্ধে দক্ষিণে নিরক্ষরেখার দিকে এবং দক্ষিণ গোলার্ধে উত্তর দিকে প্রবাহিত হয়।
কিন্তু পৃথিবীর ঘূর্ণনের প্রভাবে সৃষ্ট করিওলিস শক্তির কারণে এ বায়ু সোজাসুজি প্রবাহিত না হয়ে উত্তর গোলার্ধে ডান দিকে এবং দক্ষিণ গোলার্ধে বাম দিকে বেঁকে যায়। এ জন্য উত্তর গোলার্ধে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড় ঘড়ির কাঁটার বিপরীত দিকে এবং দক্ষিণ গোলার্ধে ঘড়ির কাঁটার দিকে ঘুরতে থাকে। নিরক্ষরেখার উপর এ শক্তির প্রভাব শূন্য। কাজেই, এ অঞ্চলের তাপমাত্রা ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টির অনুকূলে থাকলেও করিওলিস শক্তি ন্যূনতম থাকায়, নিরক্ষরেখার ০-৫ ডিগ্রির মধ্যে কোনো ঘূর্ণিঝড় হতে দেখা যায় না। সাধারণত, নিরক্ষরেখার ১০-৩০ ডিগ্রির মধ্যে ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টি হয়।
বায়ুমণ্ডলের আর্দ্রতা: বায়ুমণ্ডলের নিম্ন ও মধ্যস্তরে অধিক আর্দ্রতা ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।
বিক্ষুব্ধ পরিস্থিতি: ঘূর্ণিঝড় স্বতস্ফুর্তভাবে সৃষ্টি হতে পারে না। সমুদ্রে আগে থেকে বিরাজমান বিক্ষুব্ধ কোনো পরিস্থিতি সৃষ্টি থাকলে, ঘূর্ণিঝড় সাধারণত সেটাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে। এছাড়া, পশ্চিমমুখী নিম্ন বায়ুচাপসম্পন্ন পূবালী স্রোত, আবহাওয়ায় উচ্চতার সঙ্গে সঙ্গে বায়ুর গতি ও দিকের স্বল্প পরিবর্তন এবং দ্রুত শীতলীকরণের ফলে নির্গত তাপ ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টির জন্য সহায়ক।
নামকরণ
অতীতে ঝড়ের নামকরণ অক্ষাংশ-দ্রাঘিমাংশের উপর ভিত্তি করে করা হলেও বিভিন্ন অভিজ্ঞতায় দেখে গেছে, জটিল তাত্ত্বিক এসব নামের চেয়ে সংক্ষিপ্ত, সুনির্দিষ্ট নামকরণ লিখিত বা মৌখিক যেকোনো যোগাযোগে অধিকতর সহজ এবং দ্রুততর। এটি আরো গুরুত্বপূর্ণ কারণ, একটি ঝড়ের তথ্য হাজার হাজার স্টেশন, সমুদ্র উপকূল এবং জলযানের মধ্যে আদান-প্রদান হয়ে থাকে।
এছাড়া একই সময়ে একাধিক ঝড় সৃষ্টি হলে, বিভ্রান্তি এড়ানোর জন্য সহজে মনে রাখা যায় এবং পার্থক্য করা যায় এমন নাম দরকার। অক্ষাংশ-দ্রাঘিমাংশ নামকরণের উপর ভিত্তি করা ঝড়ের পূর্বাভাস থেকে অনেক সময় বিভ্রান্তি হওয়ার শঙ্কা থেকে যেত। ফলে পূর্বাভাস ভুল শুনে যে ঝড়টি অনেক দূরে চলে গেছে, সে হয়তো ভয়ঙ্কর ফণা তুলে ধেয়ে চলে এসেছে একেবারে কাছে, তা নিয়ে বিভ্রান্তি থাকতো।
শত শত বছর ধরে পশ্চিম ভারতীয় দ্বীপপুঞ্জের ঝড়গুলোর নাম হতো সন্তানদের নামে। যেমন- সান্তা আনা, স্যান ফেলিপ (প্রথম), স্যান ফেলিপ (দ্বিতীয়)। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ঝড়কে ছেলেদের নাম দেওয়া হত। এখন অবশ্য সব ঝড়কে স্থানীয় সাধারণ নাম দ্বারা, যা সংস্কৃতিগত দিক থেকে স্পর্শকাতর নয়, সে সব নামে চিহ্নিত করা হয়।
ঘূর্ণিঝড়ের উৎপত্তিস্থল অনুযায়ী গ্রীষ্মমণ্ডলীয় সমুদ্র অঞ্চলকে ৭টি বেসিনে ভাগ করা হয়েছে। এগুলো হলো, উত্তর ভারতীয় মহাসাগর, দক্ষিণ-পশ্চিম ভারতীয় মহাসাগর, উত্তর আটলান্টিক মহাসগর, উত্তর-পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগর, দক্ষিণ-পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগর, দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগর এবং অস্ট্রেলীয় অঞ্চল।
বেসিনে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড়গুলোর বৈশিষ্ট্য এক হলেও সাধারণভাবে ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে যেসব ঘূর্ণিঝড় হয়, তাদের ডাকা হয় সাইক্লোন নামে। ইংরেজ সাহেব প্রাক্তন জাহাজি হেনরি পিডিংটন কলকাতায় চাকরি করার সময় এ অঞ্চলের ঝড়ের দানবাকৃতি দেখে গ্রিক শব্দ ‘কাইক্লোস’ থেকে (যার একটা অর্থ সাপের কুণ্ডলী) সাইক্লোন নাম প্রস্তাব করেন। ১৮৪৮ সালে নাবিকদের জন্য তার লেখা সেইলার্স হর্ন বুক ফর দ্য ল অব স্টর্মস-এ যা প্রথম প্রকাশিত হয়েছে।
আটলান্টিক মহাসাগরীয় এলাকার ঘূর্ণিঝড়গুলোকে বলা হয় হারিকেন। সাধারণত একটু শক্তিশালী ঝড়কেই (বাতাসের গতিবেগ ঘণ্টায় ৭৪ মাইলের বেশি) হারিকেন নামে ডাকা হয়, যার নামকরণ করা হয়েছে এ অঞ্চলের আদি অধিবাসী মায়াদের ঝড়বৃষ্টির দেবতা ‘হুরাকানের’ নামে।
আটলান্টিক এলাকায় হারিকেনের শক্তিমাত্রা অনুযায়ী এগুলোকে ক্যাটাগরি-১, ক্যাটাগরি-২ এভাবে ৫ ভাগে ভাগ করা হয়। সাধারণত ক্যাটাগরি-৩ বা তার ঊর্ধ্বমাত্রার হারিকেনকে (বাতাসের গতিবেগ ঘণ্টায় ১১০ মাইলের বেশি) খুবই শক্তিশালী গণ্য করা হয়।
প্রকৌশলী হার্বাট সাফির ও বিজ্ঞানী রবার্ট সিম্পসন যৌথভাবে ঘূর্ণিঝড়ের শক্তিমত্তা নির্ণয়ের এ পদ্ধতি আবিষ্কার করেছিলেন বলে একে ‘সাফির-সিম্পসন স্কেল’ বলা হয়।
অন্যদিকে প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকার ঘূর্ণিঝড়কে বলা হয় ‘টাইফুন’। চীনা ভাষায় এর কাছাকাছি শব্দ taaifung বা tai feng, যার অর্থ ‘শক্তিশালী বায়ু’। এছাড়া আরবীয়রাও গ্রিক মিথলজির বায়ুদৈত্য tuphon থেকে ঝড়ের নামকরণ করেছিল ‘তুফান’। যা বাংলাতেও ব্যবহার হয়। আরবদের কাছ থেকে এ শব্দ এক সময় ইংরেজদের কাছে যায় এবং শেলির প্রমিথিউস আনবাউন্ড বইতে ১৮১৯ সালে প্রথম ‘typhoon’ বানানটি ব্যবহৃত হয়।
আগে বিচ্ছিন্নভাবে নির্দিষ্ট কোনো ঝড়ের নামকরণ করা হলেও সাম্প্রতিককালে প্রতিটি ঝড়কে চিহ্নিত করতে আলাদাভাবে নামকরণ করা হয়। ঘূর্ণিঝড়ের উৎপত্তির যে বেসিনগুলো রয়েছে, প্রতিটি বেসিনে ঝড়ের পূর্বাভাস দেওয়ার জন্য আলাদা কর্তৃপক্ষ রয়েছে। তারাই পূর্ব থেকে ঝড়ের এ নামকরণ করে থাকেন।
যেমন, উত্তর আটলান্টিক বেসিনে পূর্বাভাসের দায়িত্বে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল হারিকেন সেন্টার। এখানে উৎপন্ন হারিকেনের নাম তারাই দিয়ে থাকে। কাজের সুবিধার জন্য তারা নামকরণের একটি তালিকা আগেই বানিয়ে নিয়েছেন। যেটা বর্ণানুক্রমিকভাবে অনুসরণ করা হয়। অর্থাৎ বছরের প্রথম হারিকেনটির নাম হবে ‘A’ দিয়ে, যেমন: অ্যান্ড্রু। দ্বিতীয়টি হবে ‘B’ দিয়ে, যেমন: বার্থা। এ রকম ছয় বছরের জন্য তালিকা আগেই বাছাই করা হয়ে থাকে। সেখান থেকে নামগুলো পর্যায়ক্রমিকভাবে দেওয়া হয়। এভাবে ১০১০ সালের তালিকা ব্যবহার হবে ২০১৬ সালে।
তবে কোনো ঘূর্ণিঝড় যদি ব্যাপক ক্ষতিসাধন করে, তবে সেটা আর তালিকায় পরবর্তী সময়ে ব্যবহার করা হয় না। ২০০৫ সালে হারিকেন ক্যাটরিনা বিপুল ক্ষয়ক্ষতির কারণে বিখ্যাত হয়ে যাওয়ায় এটি নামকরণের তালিকা থেকে বাদ পড়ে।
আগে নারীদের নামে হারিকেনের নামকরণ করা হলেও ১৯৭৯ সাল থেকে প্রথম পুরুষের নাম অন্তর্ভুক্ত হয় এবং বর্তমান তালিকায় সমানভাবে পর্যায়ক্রমে মহিলা ও পুরুষের নাম রয়েছে।
ঘূর্ণিঝড়ের নামকরণ করে বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা’র আঞ্চলিক কমিটি। উত্তর ভারত মহাসাগরীয় এলাকায় পূর্বাভাসের দায়িত্বে আছে ভারতীয় আবহাওয়া বিভাগ। বাংলাদেশ, মায়ানমার, ভারত, পাকিস্তান, মালদ্বীপ, শ্রী লংকা, মায়ানমার এবং ওমান বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার একটি প্যানেলের (WMO/ESCAP) সদস্য।
২০০০ সালে এই প্যানেল প্রথম প্রস্তাব করে এ অঞ্চলের ঘূর্ণিঝড়ের নামকরণ করার জন্য। এ জন্য প্রতিটি দেশ থেকে ১০টি করে নাম জমা দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। যেহেতু বিভিন্ন দেশ তাদের বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী নাম দিয়েছে, তাই এখানকার ঝড়ের নামে কোনো বর্ণানুক্রম বা সামঞ্জস্য নেই। কোনো ঝড়ের নাম অগ্নি, আবার কোনোটার নাম নার্গিস। ২০০৪ সালে ভারতীয় আবহাওয়া বিভাগ এ অঞ্চলে প্রথম যে ঘূর্ণিঝড়টির নামকরণ করেছিল, তার নাম ছিল অনিল।
একটি নির্দিষ্ট সময়কালে সৃষ্ট সম্ভাব্য সব ঝড়ের জন্য সদস্য রাষ্ট্রগুলো পূর্বেই নাম প্রস্তাব করে রাখে। একেকটি ঝড় বাস্তবে সৃষ্টি হলে, তালিকা থেকে পর্যায়ক্রমে নাম নির্বাচন করা হয়। ঝড় যেহেতু মৃত্যু ও ধ্বংসের সঙ্গে জড়িত, তাই কোনো নাম পুনরাবৃত্তি করা হয় না।
এমিয়া অঞ্চলে সাম্প্রতিক কয়েকটি ঝড় ও তার নামকরণকারী দেশ হচ্ছে: সিডর (ওমান), নার্গিস (পাকিস্তান), রেশমি (শ্রী লংকা), খাই-মুক (থাইল্যাণ্ড), নিশা (বাংলাদেশ), বিজলি (ভারত), আইলা (মালদ্বীপ)।
স্যান্ডি
মৌসুমী বায়ুর ফলে সৃষ্ট স্রোতের কারণে ২২ অক্টোবর পশ্চিম ক্যারিবিয়ান সাগরে ঘূর্ণি স্যান্ডির উৎপত্তি। এটি আটলান্টিক অঞ্চলের ঘূর্ণিঝড় মৌসুমের ১৮তম ঘূর্ণিঝড়। জন্মের ৬ ঘণ্টার মধ্যেই বায়ূর গতিবেগ বেড়ে দানবীয় শক্তি লাভ করে স্যান্ডি। ২৪ অক্টোবর হারিকেনে রূপ নিয়ে কিছু সময় পরই জ্যামাইকার উপকূলে আঘাত হানে। জামাইকার ওপর দিয়ে এটি ক্রমাগত উত্তরে অগ্রসর হয়ে আবার জলরাশির উপর দিয়ে প্রবাহিত হতে শুরু করে এবং কিউবার মাটিতে দ্বিতীয় আঘাতটি হানে।
২৫ অক্টোবর এটি দ্বিতীয় ক্যাটাগরির হারিকেনে পরিণত হয়। ২৬ অক্টোবর স্যান্ডি বাহামা দ্বীপপুঞ্জের ওপর আছড়ে পড়ে। ২৭ অক্টোবর ভোরে এটি কিছুটা দুর্বল হয়ে হারিকেন থেকে মৌসুমি ঝড়ে রূপ নিলেও কয়েক ঘণ্টা পরই এর শক্তিবৃদ্ধি পায় এবং এটি ক্যাটাগরি ১ হারিকেনে পরিণত হয়।
সোমবার যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ব উপকূলে ক্যাটাগরি ১ উত্তর-ক্রান্তিয় ঝড় হিসেবে আঘাত হানে। এক সপ্তাহের সফরে স্যান্ডি তোলপাড় করেছে যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ব উপকূল।
নিলম
বুধবার বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড়ের নাম ছিল ‘নিলম’। এ নিলম ছিল পাকিস্তানের প্রস্তাবিত নাম।
No comments:
Post a Comment