সব টাকাই ফেরত দেবেন তানভীর!
সোনালী ব্যাংক থেকে লোপাট করা সব টাকা ফেরত দেবেন বলে অঙ্গীকার করেছেন হলমার্কের এমডি তানভীর মাহমুদ। অর্থ আত্মসাৎ মামলায় গ্রেফতারের পর দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) রিমান্ডে সব টাকা ফেরত দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। এ যেন ঠেলার নাম বাবাজি। তানভীর প্রথমে লোপাট করা টাকার জামানত নিশ্চিত করার কাজ শুরু করেছেন। এ ক্ষেত্রে সোনালী ব্যাংককে ঝুঁকিমুক্ত করার পর সব টাকা ফেরত দেওয়ার কাজ শুরু করবেন। গত ২ সেপ্টেম্বর দুদকের জিজ্ঞাসাবাদ শেষে তানভীর সাংবাদিকদের
বলেছিলেন, 'সরকারের টাকা আমি পাই টু পাই ফেরত দিব।' এবার দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) রিমান্ডে এসে টাকা ফেরত দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তিনি। এ লক্ষ্যে আত্মসাৎ করা ২,৬৮৬ কোটি ১৪ লাখ টাকার বিপরীতে জমিসহ অন্যান্য সম্পদের দলিল বন্ধক রাখতে শুরু করেছেন তানভীর মাহমুদ। ইতিমধ্যে বন্ধক হিসেবে ৭০ একর জমির দলিল হস্তান্তর করা হয়েছে। বন্ধক হিসেবে গ্রহণের জন্য আরও ১৬-১৭ একর জমির দলিল পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখছেন সোনালী ব্যাংকের আইনজীবীরা। আগামী ১৫-২০ দিনের মধ্যে সমুদয় টাকার বিপরীতে সোনালী ব্যাংকে জামানত নিশ্চিত করবেন তিনি।
সূত্র জানায়, দুদকের রিমান্ডে তানভীর আত্মসাৎকৃত টাকার জামানত হিসেবে জমি, শিল্প-কারখানা, বাড়ি, গাড়ি, মেশিনারিজসহ প্রয়োজনে ৫ হাজার গরু বন্ধক রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। জামানত নিশ্চিত করতে তানভীরের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী দুদক সর্বাত্মকভাবে সহায়তা করছে সোনালী ব্যাংককে। জামানত দেওয়ার জন্য তানভীর দুদককে বলে দিচ্ছেন, তার কোন জমির দলিল কোথায় কার কাছে রেখেছেন। দুদককে দেওয়া এসব তথ্য অনুযায়ী জামানত গ্রহণ করতে শুরু করেছে সোনালী ব্যাংক।
সোনালী ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, আত্মসাৎ করা টাকার বিপরীতে প্রথমে ৬০ একর জমির দলিল জামানত হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে। এরপর জামানত হিসেবে গ্রহণ করা হয় সাড়ে ১০ একর জমির দলিল। আরও ১৬-১৭ একর জমির দলিল জামানতের জন্য পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখা হচ্ছে। এ ছাড়া হলমার্ক কর্তৃক পোশাক রফতানির বিপরীতে বিদেশ থেকে আসা ৪৭ কোটি টাকা গ্রহণ করেছে সোনালী ব্যাংক। রফতানির বিপরীতে শিগগির আরও ৭-৮ কোটি পাওয়া যাবে। ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও প্রদীপ কুমার দত্ত সমকালকে বলেছেন, ওই টাকা আদায়ের জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
এর আগে টাকা ফেরত দেওয়ার জন্য ২০ বছর সময় চেয়ে গত ৩০ সেপ্টেম্বর সোনালী ব্যাংক কর্তৃপক্ষের কাছে চিঠি দিয়েছেন তানভীর মাহমুদ।
ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, পুরো টাকার জামানত নিশ্চিত করার পর হলমার্ক সম্পর্কিত সব লেনদেন, হিসাব-নিকাশ, দাবি-দাওয়া ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে পেশ করা হবে। পরিচালনা পর্ষদ থেকে বিষয়টি জানানো হবে বাংলাদেশ ব্যাংককে। চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে হলমার্কের ফাইলটি পাঠানো হবে অর্থ মন্ত্রণালয়ে।
সূত্র জানায়, দুদক তানভীরের দখলে ৬-৭ হাজার কোটি টাকার সম্পদের হিসাব পেয়েছে। এর মধ্যে ২,৬৫০ কোটি টাকার জমি আছে তার নামে। ঢাকার মিরপুর এলাকায় রয়েছে ৫-৬টি বাড়ি, চালু ও নির্মাণাধীন ৭০টি গার্মেন্ট, ৮৬টি দামি গাড়ি, ৫ হাজার গরুসহ বিভিন্ন ধরনের সম্পদ রয়েছে তার নামে।
ব্যাংকিং খাতের সর্ববৃহৎ জালিয়াতির ঘটনায় হলমার্ক গ্রুপের এমডি তানভীর মাহমুদ, তার স্ত্রী ও গ্রুপের চেয়ারম্যান জেসমিন ইসলাম, সোনালী ব্যাংকের সাবেক এমডি হুমায়ুন কবির ও সোনালী ব্যাংকের রূপসী বাংলা হোটেল শাখার ডিজিএম একেএম আজিজুর রহমানসহ ২৭ জনকে আসামি করে গত ৪ অক্টোবর ১১টি মামলা করেছে দুদক। হলমার্ক কর্তৃক আত্মসাৎকৃত মোট ২,৬৮৬ কোটি ১৪ লাখ টাকার মধ্যে প্রথমে ১ হাজার ৫৬৮ কোটি (ফান্ডেড) টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ওইসব মামলা করা হয়। এ মামলায় হলমার্কের এমডি তানভীর মাহমুদ, চেয়ারম্যান জেসমিন ইসলামসহ ৪ আসামির রিমান্ড চলছে। এরপর নন ফান্ডেড ১ হাজার ১১৮ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ অনুসন্ধান করে হলমার্কের বিরুদ্ধে আরও মামলা করা হবে।
http://www.samakal.com.bd/details.php?news=13&action=main&option=single&news_id=301748&pub_no=1207
----------------------------------------------------------------
বিদেশ ঘোরেন দীপু মনি
এটা গত মাসের, অর্থাৎ সেপ্টেম্বরের হিসাব। পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনি সব মিলিয়ে সেপ্টেম্বরের ১৯ দিন দেশের বাইরে কাটিয়েছেন। নিয়মিত বিরতিতে তাঁর এভাবে বিদেশে যাওয়াটা নতুন নয়। ২০০৯ সালে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম বছরে তিনি বিদেশ সফর করেন ৩৪ বার। পরের দুই বছর সে সংখ্যা যথাক্রমে ৩৭ ও ৪৪-এ গিয়ে দাঁড়ায়। আর চলতি বছরের প্রথম ১০ মাসে তিনি বিদেশে গেছেন ৩৪ বার। দায়িত্ব নেওয়ার পর গত ৪৬ মাসে দীপু মনি ১৪৯ বার বিদেশে গেছেন। দেশের বাইরে থেকেছেন ৪৫২ দিন। সফরসূচি থেকে এ তথ্য পাওয়া গেছে।
দীপু মনির খসড়া সফরসূচি অনুযায়ী, নভেম্বরে চারটি সফরে দুই সপ্তাহ বিদেশে থাকার কথা রয়েছে।
সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী, একজন মন্ত্রীর বিদেশ সফরের সময় নির্দিষ্ট হারে হাতখরচ, দৈনিক ভাতা, ট্রানজিট ভাতা, টার্মিনাল ভাতা, আপ্যায়ন ভাতা, প্রতিনিধিদলের দলনেতা হিসেবে আনুষঙ্গিক ভাতা, বিমানবন্দর কর ও বিমানভাড়া বরাদ্দ দেওয়া হয়। পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ২০০৯ সালের বিদেশ সফরের খরচ-সংক্রান্ত কিছু কাগজ ঘেঁটে দেখা যায়, ১৩টি সফরের ১০টি পৃথক বরাদ্দপত্রে দীপু মনির জন্য মোট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ৬৬ লাখ ৭৮ হাজার ৮৫ টাকা। এর মধ্যে বিমানভাড়া বাবদ দেওয়া হয়েছে ৪৮ লাখ ৮৩ হাজার ৯৯০ টাকা।
দেশ-বিদেশের কূটনৈতিক সূত্রগুলো মনে করে, দীপু মনির সফরগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক হচ্ছে সেমিনার কিংবা আলোচনা অনুষ্ঠানকেন্দ্রিক। দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করা, দেশের স্বার্থ সুরক্ষা কিংবা কূটনৈতিক দর-কষাকষিতে এসব সফর ভূমিকা রেখেছে, এমনটা বলার সুযোগ নেই। রাষ্ট্রের বিপুল অর্থ ব্যয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ঘন ঘন বিদেশ সফরের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে।
তবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী তা মনে করেন না। গতকাল শুক্রবার সকালে তাঁর দপ্তরে প্রথম আলোকে তিনি বলেন, ‘আমি যে সফরগুলোতে গিয়েছি, তা দেশের প্রয়োজনেই। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যে সাফল্য, তা আমার সফরের যৌক্তিকতা প্রমাণ করে।’
পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সফর উপলক্ষে মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তিগুলো পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, এ সফরগুলোর মধ্যে তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সফরসঙ্গী হয়েছেন ৩৯ বার। দ্বিপক্ষীয় সফরে গেছেন ১৫ বার। অবশিষ্ট ৯৫টি সফর হচ্ছে বহুপক্ষীয়, অর্থাৎ আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ফোরামের বৈঠকের আলোচনায় অংশ নেওয়ার জন্য।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী তাঁর ১৪৯ বারের বিদেশ সফরে এশিয়া, ইউরোপ, উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকা, ওশেনিয়া এবং আফ্রিকা মহাদেশের ৬৩টি দেশে গেছেন। এর মধ্যে ১০ বার, অর্থাৎ সবচেয়ে বেশি সফর করেছেন যুক্তরাজ্য।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিগত বিএনপি-জামায়াত সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোরশেদ খান দীপু মনির তুলনায় বেশ কমই বিদেশে গেছেন। পাঁচ বছর দায়িত্ব পালনকালে তিনি বিদেশে গেছেন ৬০ বারের মতো। অবশ্য তখন এই মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন রিয়াজ রহমান। ফলে কিছু সম্মেলন ও সভায় প্রতিমন্ত্রী, সংশ্লিষ্ট বিভাগের মহাপরিচালক, রাষ্ট্রদূত এবং হাইকমিশনাররা প্রতিনিধিত্ব করেছেন।
না গেলেই নয়! পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ১৪৯ বার বিদেশ সফরের মধ্যে ৯৫টি সফরে গেছেন বহুপক্ষীয়, অর্থাৎ আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ফোরামের বৈঠকে অংশ নিতে। সার্ক, জোটনিরপেক্ষ আন্দোলন ও কমনওয়েলথের মতো গুরুত্বপূর্ণ ফোরামে যোগ দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। কিন্তু এর বাইরে নিয়মিতভাবে অন্য বৈঠকে যোগদান নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
বিগত আওয়ামী লীগ ও বিএনপি সরকারের আমলে দায়িত্ব পালন করেছেন, এমন দুজন সাবেক পররাষ্ট্রসচিব নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, গত আড়াই বছরে এসব বৈঠকে অংশ নিয়ে বাংলাদেশ কী অর্জন করেছে, সেটি এক বিরাট প্রশ্ন। বিশেষ করে নিরস্ত্রীকরণ, সভ্যতার ক্রমবিবর্তন, মানবাধিকার, গণতন্ত্র ইত্যাদি নানা বিষয়ে আয়োজিত অনেক আলোচনায় যোগ দিতে তিনি বেশ কিছু সফরে গেছেন। অথচ এসব সফরে রাষ্ট্রদূত কিংবা জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের পাঠালেই চলত।
ঢাকায় কর্মরত কূটনীতিকেরা জানিয়েছেন, গত বছরের নভেম্বরে জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুনকে নৈশভোজে আমন্ত্রণ জানিয়ে অনুষ্ঠানের মাঝপথে তাঁর ভারতযাত্রার বিষয়টি অনেকেরই নজর এড়ায়নি। সামুদ্রিক সম্পদবিষয়ক মন্ত্রী পর্যায়ের এক বৈঠকে যোগ দিতে তিনি গত বছরের ১৪ নভেম্বর রাতে বেঙ্গালুরুর উদ্দেশে ঢাকা ছাড়েন। অথচ ওই সভায় স্বাগতিক ভারতের প্রতিনিধিত্ব করেছেন ভারতেরই পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী।
প্রশ্নবিদ্ধ অর্জন! সাবেক ও বর্তমান কূটনীতিকদের মতে, নিয়মিত বিরতিতে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বিদেশ সফর চোখে লাগছে। কারণ, এ সফরগুলোর বেশির ভাগই বিষয়ভিত্তিক সভা কিংবা বহুপক্ষীয় সভা। এসব অনেক ফোরামের সিদ্ধান্তের গুরুত্ব নিয়ে সংশয় রয়েছে। আবার অনেক ফোরাম ততটা তাৎপর্যপূর্ণ নয় বাংলাদেশের জন্য। কাজেই এসব সফরে গিয়ে তিনি যেসব আলোচনায় অংশ নিয়েছেন, তাতে দেশের ভূমিকা কিংবা গুরুত্ব কতটা বেড়েছে, সেটি প্রশ্নবিদ্ধ। তা ছাড়া তিনি যেসব সফরে গেছেন, সেগুলোতে সব সময় মন্ত্রীকে যেতেই হবে, এমনটা নয়। মন্ত্রীর পরিবর্তে সহজেই এতে ওই দেশে কর্মরত রাষ্ট্রদূত কিংবা জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের পাঠানো যেত।
নতুন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম বছরে বিভিন্ন ফোরামে নিয়মিত অংশ নেওয়ার মাধ্যমে নিজেকে পরিচিত করা এবং অন্যদের সঙ্গে যোগাযোগ গড়ে তোলা, এটাই মুখ্য উদ্দেশ্য। প্রথম বছরে ৩৪ বার বিদেশ সফরের এমন একটি ব্যাখ্যা দীপু মনি দিতে পারেন বলে কূটনীতিকেরা মনে করেন। কিন্তু এরপর ঘন ঘন বিদেশ যাওয়ার সংস্কৃতিকে নিয়মিত করে ফেলার যুক্তিটা কী! কারণ, বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে বিভিন্ন দেশ ও সংস্থার, বিশেষ করে পশ্চিমাদের দূরত্ব হয়েছে। আর এ মতপার্থক্য দূর করতে কার্যকর কোনো ভূমিকা রাখতে পারেননি পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
জানতে চাইলে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা এম হাফিজউদ্দীন খান প্রথম আলোকে বলেন, ‘পররাষ্ট্রমন্ত্রী কেন, পৃথিবীর কোনো দেশের প্রধানমন্ত্রী এত ঘন ঘন বিদেশ সফর করেছেন বলে তো শুনিনি! আমাদের দেশে এমন কী সমস্যা তৈরি হলো কিংবা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে প্রভাব সৃষ্টির এমন কোনো ক্ষমতা কি আমরা অর্জন করেছি, যে জন্য তাঁকে বারবার বিদেশে যেতে হবে। তা ছাড়া বিদেশ থেকে উল্লেখযোগ্য তেমন কোনো বিনিয়োগও তো আসেনি।
ভারত ও পাকিস্তানের কূটনীতিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিদেশে কোনো বৈঠকে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে নিজ দেশের স্বার্থ ও প্রভাবের বিষয়টি বিবেচনায় থাকে দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের। আর প্রতিমন্ত্রী থাকায় ভারত ও পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বিদেশ সফরে সমন্বয় থাকে। এ ছাড়া মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে গুরুত্ব বিবেচনা করে কখনো কখনো জ্যেষ্ঠ কূটনীতিকদের প্রতিনিধি হিসেবে পাঠায় ভারত ও পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
মামা-মামির নির্যাতনে প্রাণ গেল কিশোর কালামের
এমদাদুল হক খান:
পৃথিবীর আলো যখন দেখল তখনই হারায় মা সাজেদা বেগমকে। বাবা তাকে ফেলে যায় খালা রোকেয়া বেগমের কাছে। ৫ বছর বয়সে খবর পায়, তার বাবাও মারা গেছে। পরে খালা রোকেয়া ও খালু দুলাল মিয়া তাকে পিতৃ-মাতৃস্নেহে লালন-পালন করছিলেন। এভাবেই কেটে যায় ১৬টি বছর। কয়েক মাস আগে মামা মনির হোসেন তাকে চাকরি দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে নিয়ে যান সাভারে। সেখানে তাকে গৃহকর্মীর কাজ দেওয়া হয়। কাজ পছন্দ না হওয়ায় আবার চলে যায় খালা-খালুর কাছে। কিন্তু মামা মনির তাকে আবার বুঝিয়ে নিয়ে যান। এবার চলে তার ওপর অমানুষিক নির্যাতন। এক পর্যায়ে মামা-মামির হাতেই প্রাণ দিল হতভাগা কিশোর কালাম (১৬)।
হাসপাতাল সূত্র জানায়, গত বৃহস্পতিবার দুপুর ৩টার দিকে কালামকে মুমূর্ষু অবস্থায় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে আসেন মামা মনির হোসেন। এ সময় তিনি হাসপাতাল পুলিশ ও চিকিত্সকদের জানান, সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে বরিশালগামী একটি লঞ্চে উঠতে গিয়ে দুই লঞ্চের মাঝে চাপা পড়ে কালাম আহত হয়েছে। তিনি স্ত্রী সাজিদা বেগমকে লঞ্চে উঠিয়ে দিতে গিয়ে দেখেন আহত অবস্থায় সে পড়ে আছে। আশপাশের লোকজন কেউ তাকে বাঁচাতে এগিয়ে না আসায় তিনি নিজেই তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যান। মনির নিজেকে আবুল হোসেন বলে পরিচয় দেন। তার কথায় সন্দেহ হয় হাসপাতালে দায়িত্বরত ক্যাম্প পুলিশের। এক পর্যায়ে তাকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করলে মনির পুলিশকে লোমহর্ষক হত্যাকাণ্ডের বর্ণনা দেন। পরে তাকে শাহবাগ থানা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়। শাহবাগ থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) আবু জাফর জানান, আটকের পর মনির পুলিশকে জানান, ‘কথা না শোনায় ও কাজ না করায় বৃহস্পতিবার তিনি নিজে, তার স্ত্রী শিউলি বেগম, ছোট ভাই মান্নান ও শ্যালক স্বপন তাকে লাঠি দিয়ে পিটিয়ে আহত করেন। পরে কালামকে মুমূর্ষু অবস্থায় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিত্সক মৃত ঘোষণার পর তিনি নাম-পরিচয় গোপন করে পালানোর চিন্তা করেছিলেন। এসআই জাফর আরও জানান, বিষয়টি সাভার থানা পুলিশকে অবহিত করা হয়েছে। শুক্রবার ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল মর্গে লাশের ময়নাতদন্ত শেষে লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
কালামের খালাত ভাই লিটন হোসেন জানান, কালামের গ্রামের বাড়ি বরিশালের মুলাদিতে। ছোটবেলায় মা-বাবা মারা যাওয়ায় তার বাবা-মায়ের কাছেই মানুষ হয়েছে কালাম। খালাত ভাই হলেও লিটনের সব ভাই-বোন কালামকে আপন ভাইয়ের মতোই দেখতেন। কিন্তু মামা মনির হোসেন কালামের ভবিষ্যত্ গড়ার কথা বলে তাদের কাছ থেকে নিয়ে এভাবে হত্যা করবেন তা ভাবতে পারেননি। তিনি জানান, ময়নাতদন্ত শেষে শুক্রবার সন্ধ্যায় কালামের লাশ আজিমপুর কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে। সাভার থানার ডিউটি অফিসার জানান, এ ঘটনায় থানায় এখনও কোনো মামলা হয়নি। তবে শাহবাগ থানায় আটক মনির হোসেনকে নিতে সাভার থানার একটি টিম ঢাকায় এসেছে। ঘটনার সঙ্গে জড়িত অন্যরা পালিয়ে গেছে। মামলা হলেই তাদের গ্রেফতারে অভিযান চালানো হবে।
---------------------------------------------
পথে পথে চাঁদাবাজি
ঢাকা মহানগর পুলিশের মুখপাত্র ও গোয়েন্দা পুলিশের (দক্ষিণ) উপ-কমিশনার মনিরুল ইসলাম জানান, গরুর হাটে সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজি ঠেকাতে পুলিশ আগের চেয়ে আরও বেশি তত্পর থাকবে। একই সঙ্গে জাল টাকা ঠেকাতেও পুলিশের গোয়েন্দা নজরদারি থাকবে। তিনি বলেন, প্রতিবারের মতো এবারও হাট শুরুর আগেই চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী তত্পরতা ঠেকাতে ব্যবসায়ীদের নিয়ে যৌথ বৈঠক করা হয়েছে। এতসব আয়োজনের মধ্যে এবার পশুর হাট শুরু হওয়ার আগেই সক্রিয় হয়ে উঠেছে চাঁদাবাজ, ছিনতাইকারী, অজ্ঞান পার্টি ও সন্ত্রাসী চক্র। পথে চাঁদার টাকা গুনতে হচ্ছে ব্যবসায়ীদের। আরিফুল ইসলাম নামের এক গরু ব্যবসায়ী জানান, সাতক্ষীরা থেকে গাবতলীর পশুর হাটে এক ট্রাক গরু নিয়ে আসতে অন্তত ৮ থেকে ১০ জায়গায় চাঁদা দিতে হয়। গরু ট্রাকে লোড করার সময় স্থানীয় শ্রমিক ইউনিয়ন ও সরকারদলীয় নেতাকর্মীদের মোটা অঙ্কের চাঁদা দিতে হয়। এরপর শুরু হয় ঘাটে ঘাটে পুলিশের চাঁদাবাজি। হাইওয়ে পুলিশ ও জেলা পুলিশ মিলে ট্রাক থামিয়ে মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবি করে। তা না হলে ভারতীয় চোরাই গরু বলে ট্রাকসহ মালামাল জব্দ করার হুমকি দেয়। আরিচা ঘাটে ফেরিতে ট্রাক তুলতে দিতে হয় আরেক দফা চাঁদা। তা না হলে ঘাটে ফেরির সিরিয়ালই পাওয়া যায় না। আরিচা থেকে গাবতলী পর্যন্ত পুলিশ সার্জেন্ট আর টহল পুলিশকে খুশি করতে না পারলে ট্রাক আটকে রাখে।
সূত্র জানায়, রাজধানীর পশুর হাটে মূলত চাঁদাবাজ, অজ্ঞান পার্টি ও জাল টাকার ব্যবসায়ীরা সক্রিয় থাকে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে স্থানীয় সরকারদলীয় নেতাকর্মীরা চাঁদাবাজির সঙ্গে যুক্ত থাকে। অজ্ঞান পার্টির সদস্যরা ব্যবসায়ী ও ক্রেতাকে টার্গেট করে। ব্যবসায়ীদের অনুসরণ করে ও পশু কেনার আগে দালাল সেজে ক্রেতার সঙ্গে খাতির করার চেষ্টা করে অজ্ঞান পার্টির সদস্যরা। পরে সুযোগ বুঝে অচেতন করে সর্বস্ব লুটে নেয়। আর জাল টাকার কারবারিরা ক্রেতা ও বিক্রেতা সেজে পশুর হাটে জাল টাকা ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানান, অজ্ঞান পার্টির চক্রগুলোকে চিহ্নিত করে গ্রেফতার অভিযান চালানো হচ্ছে। এরই মধ্যে জাল টাকার কারবারিদের বড় একটি চক্রকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তাদের কাছ থেকে উদ্ধার করা জাল টাকা রাজধানীর পশুর হাটে ছড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা ছিল বলে গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানতে পেরেছেন।
অন্যদিকে ব্যবসায়ী সূত্রে জানা যায়, কয়েকদিন আগে ধামরাইয়ের বাথুলি এলাকায় জিলা ও নিলু নামের দুই গরু ব্যবসায়ীকে হাত-পা-চোখ বেঁধে ১ লাখ ৬৫ হাজার টাকা লুটে নেয় একটি সংঘবদ্ধ ছিনতাইকারী চক্র। এরপর তাদের ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের গোলড়া এলাকায় ফেলে দেওয়া হয়। এ ঘটনার পর থেকেই গরু ব্যবসায়ীদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। গরু ব্যবসায়ী নিলু জানান, গত মঙ্গলবার তারা ধামরাই থানার বাথুলি হাটে গরু বিক্রি করে ১ লাখ ৬৫ হাজার টাকা নিয়ে একটি বাসে ওঠেন। বাসটি কিছুদূর যাওয়ার পর ১০ থেকে ১২ জনের যাত্রীবেশী ছিনতাইকারী চক্র অস্ত্রের মুখে তাদের জিম্মি করে। পরে তাদের দুজনের হাত-পা, মুখ-চোখ বেঁধে সঙ্গে থাকা টাকা কেড়ে নেয়। এরপর তাদের মারধর করে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের গোলড়া এলাকায় ফেলে যায়। সারা রাত তারা সড়কের পাশে পড়ে থাকেন।
মানিকগঞ্জ গরু ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক আতাব আলী জানান, কোরবানির পশু বিক্রি শুরু হওয়ার আগেই তাদের দুই ব্যবসায়ীর কাছ থেকে দুর্বৃত্তরা দেড় লাখ টাকা ছিনিয়ে নিয়েছে। এছাড়া রাস্তাঘাটে পুলিশ ও মাস্তানদের চাঁদা দিচ্ছে হচ্ছে। এতে করে তারা চরম হতাশার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। গরু নিয়ে দূরের কোনো হাটে যেতে সাহস পাচ্ছেন না। তিনি সংশ্লিষ্ট প্রশাসনকে তাদের নিরাপত্তা দেওয়ার আহ্বান জানান।
ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করেছেন, একদিকে রাজধানীর পশুর হাটে ছিনতাইকারী-অজ্ঞান পার্টি চক্র সক্রিয় থাকে, অন্যদিকে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে পশু পরিবহন করতে গিয়ে ঘাটে ঘাটে চাঁদাবাজির শিকার হতে হয়। এরই মধ্যে কোরবানির হাটে পশু বহন করতে গিয়ে একাধিক ব্যবসায়ী চাঁদাবাজির শিকার হয়েছেন। একদিকে যেমন সন্ত্রাসী-চাঁদাবাজদের খপ্পরে পড়তে হয়, অন্যদিকে পথে পথে উত্পাত করে হাইওয়ে ও জেলা পুলিশ এবং ট্রাফিক সার্জেন্ট। মোটা অঙ্কের ঈদ বকশিশের বিনিময়ে এদের হাত থেকে রেহাই পেতে হয়। তা না হলে তারা ভারতীয় পশু কিংবা যানবাহনের কাগজপত্র দেখার নামে আটকিয়ে রাখে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে রাখার বদলে ব্যবসায়ীরা উেকাচ দিতে বাধ্য হন।
পুলিশের মিরপুর বিভাগের উপ-কমিশনার ইমতিয়াজ আহমেদ জানান, মূলত ঈদের এক সপ্তাহ আগে থেকে গরু কেনাবেচার নিরাপত্তায় কাজ করবে পুলিশ। কোরবানির পশুর হাটের নিরাপত্তা নিয়ে ইতোমধ্যে একটি খসড়া নীতিমালা তৈরি করা হয়েছে। এ নীতিমালা অনুযায়ী ব্যবসায়ী ও ক্রেতাদের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা দেওয়া হবে।
http://www.somewhereinblog.net/blog/mahamanob/29703059
No comments:
Post a Comment