Friday, August 10, 2012



পরকীয়ার ঘটনায় লক্ষীপুরে সালিশ বৈঠক :
প্রবাসীর স্ত্রীর সঙ্গে কিশোরের বিয়ে


এক প্রবাসীর স্ত্রীর সঙ্গে পনেরো বছরের পরকীয়ার ঘটনা জানাজানি হলে স্থানীয় ইউপি মেম্বার ও এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিরা সালিশ বৈঠকে ফতোয়া জারি করে প্রত্যেককে ৮০ দোররা মেরে বিয়ে দেয়া হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

ঘটনাটি ঘটেছে সোমবার সন্ধ্যায় ল²ীপুর সদর উপজেলার দিঘলী ইউনিয়নের রমাপুর গ্রামে।
ইউপি মেম্বার, গণ্যমান্য ব্যক্তি ও স্থানীয় সন্ত্রাসীরা এ সময় মেয়ের বাবাকে ভয়ভীতি দেখিয়ে প্রায় দেড় লাখ টাকা হাতিয়ে নেয় বলে অভিযোগ উঠেছে।

প্রত্যক্ষদর্শী ও এলাকাবাসী জানান, রমাপুর গ্রামের বেল­াল হোসেনের মেয়ে ফাতেমা বেগমের সঙ্গে এক বছর আগে তার খালাতো ভাই নেছার আহমেদের বিয়ে হয়। বিয়ের পর নেছার আহমেদ বিদেশ চলে যান। এর কিছুদিন পর ফাতেমা পাশের বাড়ির আব্দুল ওয়াদুদের কিশোর ছেলে মোরশেদের (১৫) সঙ্গে পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়ে।

এ ঘটনা জানাজানি হলে সোমবার সন্ধ্যায় স্থানীয় ইউপি সদস্য রাশেদের নেতৃত্বে মেয়ের বাড়িতে সালিশ বৈঠক বসে। সালিশ বৈঠকে ইউপি মেম্বার ও স্থানীয় সন্ত্রাসীদের হুমকিতে ফাতেমা আক্তার ও মোরশেদ আলম তাদের মধ্যে সম্পর্কের কথা ¯^ীকার করে।

ইউপি সদস্য রাশেদ ছাড়া আবুল কালাম ও মোহাম্মদ মানিক, তাজু, বেল­াল, জাবেদসহ আরো কয়েকজন স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি রমাপুর গ্রামের মসজিদের ইমাম মাওলানা আব্দুর রহমানকে সালিশ বৈঠকে ডেকে এনে অনৈতিক সম্পর্কের ফতোয়া জানতে চান।

এ সময় ওই ইমাম ফতোয়া দিতে অ¯^ীকার করলে ইউপি মেম্বার রাশেদ ফাতেমা ও মোরশেদকে জেনাকার আখ্যায়িত করে নিজেই ১০০ দোররা দেয়ার ফতোয়া জারি করেন।
পরে সালিশ বৈঠকে গ্রামবাসীর উপস্থিতিতে ইউপি সদস্য রাশেদ নিজেই ৫টি বেত নিয়ে এ দুজনকে ৮০টি দোররা করে মারেন।

শালিসে স্থানীয় কাজি ডেকে এনে ইমামকে দিয়ে ৩ লাখ টাকা দেনমোহরে কিশোর মোরশেদ ও প্রবাসীর স্ত্রী ফাতেমার বিয়ে পড়িয়ে দেন। এর আগে তিনি নেছার ও ফাতেমার বিয়েবিচ্ছেদের ব্যবস্থা করেন।

এ সময় ফাতেমার বাবা বেল­াল হোসেনকে ভয়ভীতি দেখিয়ে তাৎ¶ণিক ৪৫ হাজার টাকা ও পরে বিভিন্নভাবে আরো প্রায় এক লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়ে মেম্বার ও তার অনুগতরা ভাগ-বাটোয়ারা করে নেয় বলে ভুক্তভোগী পরিবার ও এলাকাবাসী অভিযোগ করেছে।

গতকাল সরেজমিন জানা গেছে, ফাতেমা বর্তমানে তার নতুন ¯^ামীর সঙ্গে শ্বশুরবাড়িতে রয়েছেন। অপরদিকে ফাতেমার বাবা-মা স্থানীয় সন্ত্রাসীদের ভয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। তাদের ঘর তালাবদ্ধ রয়েছে।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে ফাতেমা বলেন, ‘গতকাল সকালেও জাবেদ নামে এক সন্ত্রাসী আমাদের বাড়িতে গিয়ে বাবাকে ভয়ভীতি দেখিয়ে টাকা দাবি করে। এ কারণে বাবা তাকে ৫ হাজার টাকা দিতে বাধ্য হন। একই দিন বিকালে ও রাতে আরো অনেক সন্ত্রাসী আমাদের বাড়িতে গিয়ে টাকা চায়। এ কারণে রাতে বাবা-মা বাড়ি ছেড়ে এক আÍীয়ের বাড়িতে গিয়ে আÍগোপন করেছেন।’
কিশোর মোরশেদের মা আয়েশা বেগম সাংবাদিকদের বলেন, ‘এলাকার গণ্যমান্য লোকদের ভয়ে আমরা এ বিয়ে মেনে নিতে বাধ্য হয়েছি। আমার ছেলের বয়স কম। সে একজন দিনমজুর।’
ইউপি সদস্য রাশেদ বলেন, ‘ছেলে ও মেয়ের মধ্যে অবৈধ সম্পর্ক ছিল। তাই দোররা মেরে তাদের বিয়ে দেয়া হয়েছে। খরচ বরছের জন্য কিছু টাকা নেয়া হয়েছে। তবে তারা যত টাকা বলছে তত টাকা নয়।’

বরের বয়স প্রসঙ্গে তিনি জানান, জš§ নিবন্ধনে ছেলের বয়স কম লেখা হয়েছে। তবে তার বয়স ২২ বছর হবে। একই দিনে ওই মেয়ের আগের ¯^ামীকে তালাক দেয়া হয়েছে।
অপর সালিশদার তাজুল ইসলাম দোররা মারার কথা ¯^ীকার করে বলেন, ‘তাদের ইচ্ছানুযায়ী তাদের বিয়ে পড়ানো হয়েছে। যা করেছেন সবই মেম্বার করেছেন।’ তবে তিনি টাকা নেয়ার কথা অ¯^ীকার করেন।

স্থানীয় মসজিদের ইমাম মাওলানা আব্দুর রহমান বলেন, ‘আমাকে বিয়ে পড়ানোর কথা বলে নেয়া হয়। পরে মেম্বার আমার কাছে ফতোয়া জানতে চাইলে আমি ফতোয় দেয়া নিষিদ্ধ বলে মত দেই। তখন মেম্বার নিজেই ১০০ দোররা করে মারার ফতোয়া দিয়ে নিজেই আবার তা বা¯—বায়ন করেন। সালিশদারদের ছাপের মুখে আমি বিয়ে পড়াতে বাধ্য হই।’

এলাকার কাজী র“হুল আমিনের ছেলে সাছানুল বান্না টিপু বলেন, ‘ইউপি মেম্বার রাশেদ আমাকে ফোন নিয়ে বিয়ে রেজিস্ট্রি করতে বলেন। আমি তাদের কথামতো ৩ লাখ টাকা দেন মোহরে বিয়ের কাবিননামা লিপিবদ্ধ করি। তবে বরের বয়স কম হওয়ায় এখনো রেজিস্ট্রির কাজ শেষ করিনি। ছেলের দুটি জš§ নিবন্ধন সার্র্টিফিকেট পেয়েছি। একটি বয়স ১৫, অপরটিতে ১৭।’

ইউপি চেয়ারম্যান ইছমাইল হোসেন বলেন, ‘মেম্বার রাশেদ জানিয়েছে, অনৈতিক সম্পর্ক ধরা পড়ায় দুই পরিবারের সম্মতিতে তাদের বিয়ে দেয়া হয়েছে। এছাড়া আমি আর বি¯—ারিত আর কিছু জানি না।’

ল²ীপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা গোলাম ছরোয়ার বলেন, ‘এ বিষয়ে আমি কিছু জানা নেই। অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

ল²ীপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এস এম নজর“ল ইসলাম জানান, এ ব্যাপারে খোঁজ নিয়ে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

সৌজন্যে: দৈনিক মানবকণ্ঠ, ৯ আগস্ট ২০১২

No comments: