Friday, August 24, 2012

সাংবাদিক দম্পতি হত্যা:এক ব্যক্তির পূর্ণাঙ্গ ডিএনএ-বৃত্তান্ত (প্রোফাইল) পাওয়া গেছে।


সাংবাদিক দম্পতি হত্যা

খুনের আলামত থেকে এক ব্যক্তির ডিএনএ শনাক্ত

কামরুল হাসান | তারিখ: ২৪-০৮-২০১২
  • সাগর-রুনির বাসা থেকে আলামত হিসেবে সংগ্রহ করা রক্তমাখা কাপড়, ছুরি এবং ছুরির বাঁট ডিএনএ পরীক্ষার জ� সাগর-রুনির বাসা থেকে আলামত হিসেবে সংগ্রহ করা রক্তমাখা কাপড়, ছুরি এবং ছুরির বাঁট ডিএনএ পরীক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানো হয়
    ছবি: সংগৃহীত



খুন হওয়ার সময় সাংবাদিক মেহেরুন রুনির পরনে যে গেঞ্জি (টি-শার্ট) ছিল, তা থেকে সংগৃহীত উপাদান পরীক্ষা করে এক ব্যক্তির পূর্ণাঙ্গ ডিএনএ-বৃত্তান্ত (প্রোফাইল) পাওয়া গেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটি পরীক্ষাগারে এই পরীক্ষা হয়েছে। এ তথ্য পেয়ে মামলার তদন্তকারী কর্তৃপক্ষ র‌্যাব সন্দেহ করছে, এটি খুনির ডিএনএ হতে পারে।
র‌্যাব জানায়, সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনির মৃতদেহ ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনাস্থল থেকে সংগ্রহ করা বিভিন্ন আলামত পরীক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের একটি রাসায়নিক ও একটি ডিএনএ পরীক্ষাগারে পাঠানো হয়। তবে রুনির সংশ্লিষ্ট আলামতগুলোর পরীক্ষা ইতিমধ্যে শেষ হয়েছে। সাগরের সংশ্লিষ্ট আলামতগুলোর পরীক্ষা এখনো শেষ হয়নি।
র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার এম সোহায়েল প্রথম আলোকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র থেকে রাসায়নিক ও একটি ডিএনএ পরীক্ষার ফলাফল আসার পর খুনিদের শনাক্ত করতে মাঠে নামবে র‌্যাব।
ডিএনএ (ডি অক্সিরাইবো নিউক্লিক এসিড) জীবদেহের গঠন ও ক্রিয়াকলাপ নির্দেশ করে। এটি জিনের একটি উপাদান। ডিএনএ পরীক্ষা সম্পর্কে ন্যাশনাল প্রোফাইলিং ডিএনএ ফরেনসিক ল্যাবরেটরির প্রধান শরীফ আখতারুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, মানুষের সব বৈশিষ্ট্য বহন করে ডিএনএ। হাতের ছাপ, চুল, কফ, থুতু, রক্তসহ শরীরের যেকোনো উপাদান থেকেই ডিএনএ পরীক্ষা করা যায়। এই ডিএনএ থেকে ব্যক্তিকে শনাক্ত করা সম্ভব।
র‌্যাবের কর্মকর্তারা জানান, ঘটনাস্থল থেকে সংগ্রহ করা আলামত পরীক্ষার পর তাঁরা মনে করছেন, পেশাদার খুনির হাতে এ দম্পতি খুন হতে পারেন। খুনের সময় সাগরের মতো রুনিকেও নির্যাতন করা হয়েছে। রুনির কপালে চাকুর গভীর আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। তাঁর মাথার চুলও কাটা পাওয়া গেছে। মৃতদেহের আশপাশে এসব চুল পড়ে ছিল। এ ছাড়া রুনির কাপড় ও হত্যাকাণ্ডে ব্যবহূত ছুরি-বঁটিতেও চুল লেগে ছিল।
তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, এসব নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য দুই দফায় যুক্তরাষ্ট্রের রাসায়নিক ও ডিএনএ পরীক্ষাগারে পাঠানো হয়। এরপর গত ১২ জুন প্রথম দফায় পাঠানো হয় হত্যাকাণ্ডে ব্যবহূত একটি ছুরি, ছুরির বাঁট, সাগরের মোজা, একটি কম্বল, সাগরের পরনের প্যান্ট, রুনির পরনের প্যান্ট ও অন্য কাপড়ের নমুনা। গত ১৭ জুলাই দ্বিতীয় দফায় পাঠানো হয় হত্যাকাণ্ডের সময় যে কাপড় দিয়ে সাগরের হাত ও পা বাঁধা হয়েছিল, সেই কাপড় এবং রুনির টি-শার্ট।
র‌্যাব কর্মকর্তারা জানান, যুক্তরাষ্ট্রের পরীক্ষাগার থেকে তাঁদের জানানো হয়েছে, বেশির ভাগ নমুনাতেই একাধিক ব্যক্তির ছাপ পাওয়া গেছে। এর মধ্যে রুনির টি-শার্ট থেকে একজনের পূর্ণাঙ্গ প্রোফাইল পাওয়া গেছে। ধারণা করা হচ্ছে, হত্যাকাণ্ডের সময় যে ধস্তাধস্তি হয়েছে, তাতেই রুনির টি-শার্টে ওই ব্যক্তির চুল ও হাতের ছাপ লেগে যায়। সাগরের হাত ও পা বাঁধা হয়েছিল যে কাপড় দিয়ে, তার নমুনা থেকে অন্য কারও ডিএনএ শনাক্ত করা সম্ভব হতে পারে।
কমান্ডার এম সোহায়েল প্রথম আলোকে বলেন, সেপ্টেম্বর মাসের মাঝামাঝি রাসায়নিক ও ডিএনএ পরীক্ষার পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন পাওয়া যেতে পারে। এর আগে সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করার কাজ শুরু হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র থেকে পাওয়া ডিএনএ প্রোফাইলের সঙ্গে মিলিয়েই অপরাধী শনাক্ত করার চেষ্টা করা হবে। তিনি আরও বলেন, প্রথম শ্রেণীর একজন কর্মকর্তাকে এ মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। আরও তিনজন কর্মকর্তাকে তদারকির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তাঁরা প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণও করছেন।
র‌্যাব সূত্র জানায়, এ মামলার প্রত্যক্ষদর্শী সাগর-রুনির সন্তান মেঘের কাছ থেকে মনোরোগ চিকিৎসকদের সহায়তা নিয়ে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে তিন দফা মেঘের সঙ্গে কথা বলা হয়েছে।
গত ১১ ফেব্রুয়ারি পশ্চিম রাজাবাজারের ভাড়া ফ্ল্যাট থেকে সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনির ক্ষতবিক্ষত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। ওই দিনই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন খুনিদের গ্রেপ্তারে ৪৮ ঘণ্টা সময় বেঁধে দিয়েছিলেন। এরপর পুলিশের মহাপরিদর্শক হাসান মাহমুদ খন্দকার ‘প্রণিধানযোগ্য অগ্রগতি’র কথা বলেন। কিন্তু এর পরও কোনো অগ্রগতি না হওয়ায় গত ১৮ এপ্রিল মামলার তদন্ত সংস্থা ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ আদালতে ব্যর্থতার দায় স্বীকার করে নেয়। এরপর উচ্চ আদালত র‌্যাবকে মামলার তদন্ত করার নির্দেশ দেন। তদন্তভার পাওয়ার পর গত ২৬ এপ্রিল ভিসেরা আলামতের জন্য দুজনের লাশ কবর থেকে উত্তোলন করা হয়। ভিসেরা পরীক্ষায় সাগর-রুনির শরীরে বিষক্রিয়ার কোনো আলামত মেলেনি।
তদন্ত শুরুর পর এখনো এ মামলায় কাউকে গ্রেপ্তার করা যায়নি। তবে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ এ ঘটনায় সন্দেহভাজন হিসেবে চারজনকে অন্য মামলায় গ্রেপ্তার করে। গোয়েন্দা পুলিশ তদন্ত পর্যায়ে ৪০ জনকে এবং র‌্যাব এখন পর্যন্ত ৯৫ জনকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে।
তদন্তের অগ্রগতির ব্যাপারে কোনো তথ্য জানেন কি না, জানতে চাইলে মেহেরুন রুনির ভাই নওশের আলম প্রথম আলোকে বলেন, ‘কী হচ্ছে, আমরা এর কিছুই জানি না। আমাদের কিছু বলাও হচ্ছে না।’

No comments: