Wednesday, December 19, 2012

বেশিরভাগ উপজেলায় এসি ল্যান্ড নেই

ফারাজী আজমল হোসেন ও সাইদুল ইসলাম
দেশের অর্ধেকেরও বেশি উপজেলায় সহকারী কমিশনার (ভূমি) বা এসি ল্যান্ডের পদ দীর্ঘদিন যাবত্ শূন্য পড়ে আছে। ভূমি সংস্কার ও ব্যবস্থাপনায় এ পদটি গুরুত্বপূর্ণ হলেও শূন্য পদগুলোতে নিয়োগ দেয়ার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কোন মাথাব্যথা নেই। ভূমি মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে ওই পদগুলোর বিপরীতে কর্মকর্তা পদায়নের জন্য বার বার তাগিদ দেয়া হলেও কোন সাড়া মেলেনি। এতে ভূমি সংক্রান্ত বিষয়ে জনদুর্ভোগ যেমন বাড়ছে তেমনি সরকারের ভূমি ব্যবস্থাপনাও ভেঙ্গে পড়েছে। এসি ল্যান্ডের শূন্যপদ পূরণে মন্ত্রণালয়ের সদিচ্ছা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন প্রশাসনের কর্মকর্তারা। সরকারের শেষ বছরে এসে এতগুলো এসি ল্যান্ডের পদ খালি হলেও পদগুলো পূরণে ভূমি মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগ যথেষ্ট নয় বলে জানান তারা।

ভূমি মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, সারাদেশে মোট ৪৮৬টি এসি ল্যান্ডের পদ রয়েছে। এর মধ্যে শূন্য পদের সংখ্যা ২৬৩টি। অর্থাত্ ২৬৩টি উপজেলাতেই এসি ল্যান্ড নেই। সম্প্রতি ভূমি মন্ত্রণালয় থেকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে এসি ল্যান্ডের শূন্য পদের জন্য যে চাহিদা পাঠানো হয়েছে তাতে দেখা যায়, ঢাকা বিভাগে ৬৬টি, চট্টগ্রাম বিভাগে ৪৫টি, রাজশাহী বিভাগে ৩২টি, খুলনা বিভাগে ৩৭টি, বরিশাল বিভাগে ২৮টি, রংপুর বিভাগে ৩৫টি এবং সিলেট বিভাগে ২০টি পদ খালি আছে। এসব পদ খালি থাকায় ভূমি সংক্রান্ত সেবা পেতে জনগণকে সীমাহীন দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।

ভূমি মন্ত্রী রেজাউল করিম হীরা ইত্তেফাককে বলেন, বিষয়টি এখন ভূমি মন্ত্রণালয়ে নেই। আমরা জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়কে আমাদের চাহিদা বার বার জানিয়েছি। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় কি করছে, তা তাদের কাছ থেকে জেনে নিন। এ বিষয়ে ভূমি সচিব মোখলেছুর রহমানের মতামত নিতে গেলে তিনি 'ব্যস্ত আছেন' বলে এড়িয়ে যান।

জানা গেছে, এসি ল্যান্ড সাধারণত সরকারি সম্পত্তির ব্যবস্থাপনা, অর্পিত, পরিত্যক্ত ও খাসজমি ব্যবস্থাপনার কাজের সাথে যুক্ত। সরকারি হাটবাজার, জলমহালও তারা ব্যবস্থাপনা করে থাকেন। সরকারি জমি দেয়ার ক্ষেত্রে তাদের ভূমিকা অগ্রগণ্য। কিন্তু যেসব থানায় এসি ল্যান্ড নেই, সেখানে থানা নির্বাহী অফিসার নিজের ইচ্ছেমতো কাজ করে থাকেন। ভূমি মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, যেসব উপজেলায় এসি ল্যান্ডের পদ খালি, সেখানে পার্শ্ববর্তী উপজেলার এসি ল্যান্ড এসে সপ্তাহে দুই থেকে তিনদিন দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া কোন কোন ক্ষেত্রে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাও এসি ল্যান্ডের দায়িত্ব পালন করেন। ভূমি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, এমনিতেই ভূমি অফিসে কাজের পাহাড় জমে রয়েছে। একজন এসি ল্যান্ডের পক্ষে দুই বা তিন উপজেলায় এসি ল্যান্ডের দায়িত্ব পালন করা অনেক সময় দুরূহ হয়ে পড়ে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকেও প্রশাসনিকসহ নানা কাজে ব্যস্ত থাকতে হয়। এছাড়া কোন কোন সময় ভূমি সংক্রান্ত কাজ উপজেলা নির্বাহী অফিসারের পক্ষে বুঝে ওঠা সম্ভব হয়ে ওঠে না।

ভূমি মন্ত্রণালয় থেকে অতি সম্প্রতি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো চিঠিতে বলা হয়েছে, বর্তমান প্রেক্ষাপটে দেশের ভূমি সংস্কার ও ভূমির সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার প্রয়োজনীয়তা অনেক বেশি। ভূমি ও রাজস্ব প্রশাসনের বিষয়ে জনগণ এখন সরাসরি স্থানীয় উপজেলা ও জেলা অফিসে আবেদন-নিবেদন করেন। এছাড়া সুষ্ঠু, স্বচ্ছ ভূমি ব্যবস্থাপনার লক্ষ্যে ভূমি সংক্রান্ত রেকর্ড কম্পিউটারাইজড করার স্বল্পমেয়াদি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। এছাড়া সামগ্রিক ভূমি ডিজিটালাইজেশনের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্পও গ্রহণ করা হয়েছে। এসব কাজের সাথে এসি ল্যান্ডরা সরাসরি যুক্ত। বর্তমানে এসি ল্যান্ডের ২৬৩টি পদ শূন্য থাকায় সরকারের ঘোষিত ডিজিটালাইজেশন কার্যক্রমসহ ভূমি ও রাজস্ব প্রশাসনের কাজ বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশংকা দেখা দিয়েছে।

ভূমি মন্ত্রণালয়ের ওই চিঠিতে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলা হয়, এসি ল্যান্ডের পদগুলো খালি থাকায় মাঠ পর্যায়ে রাজস্ব প্রশাসনের কাজে গতিশীলতা আনা যাচ্ছে না। জেলা প্রশাসক ও বিভাগীয় কমিশনাররা শূন্য পদ পূরণের জন্য বার বার তাগাদা দিয়ে আসছেন বলেও চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে। এদিকে শুধু এসি ল্যান্ড নয়, ভূমি মন্ত্রণালয়ের অধীন সকল ভূমি হুকুম দখল কর্মকর্তা-এলএও এবং রেভিনিউ ডেপুটি কালেক্টরের বা আরডিসি পদ শূন্য রয়েছে। জেলা প্রশাসকরা স্থানীয়ভাবে সমন্বয়ের মাধ্যমে এসব পদের কাজ কোনভাবে চালিয়ে নিচ্ছেন। এসব পদে জনবল নিয়োগের জন্যও ভূমি মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়কে চিঠি দেয়া হয়েছে। ভূমি মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পণ আইন-২০১১ বাস্তবায়নে কাজ করার জন্য রেভিনিউ ডেপুটি কালেক্টরকে অর্পিত সম্পত্তি অবমুক্তি সংক্রান্ত জেলা কমিটিতে সদস্য সচিব করা হয়েছে। কোন জেলায় ভূমি হুকুম দখল কর্মকর্তা না থাকায় সরকারি বিভিন্ন বিভাগের ভূমি হুকুম দখল সংক্রান্ত কাজ বিঘ্নিত হচ্ছে। এর ফলে ভূমি ও রাজস্ব প্রশাসনের কাজ বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশংকা দেখা দিয়েছে। এদিকে শুধু মন্ত্রণালয় নয়, ভূমি প্রশাসনের মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তা পদ খালি থাকার বিষয়টি নিয়ে ভূমি মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিও উদ্বিগ্ন। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত কমিটির বৈঠকে ভূমি মন্ত্রণালয়ের মাঠ পর্যায়ে সকল শূন্য পদে জনবল নিয়োগের তাগিদ দেয়া হয়েছে। কমিটির একজন সদস্য ইত্তেফাককে বলেন, মাঠ পর্যায়ে জনবল না থাকায় ভূমি সংক্রান্ত কাজে জনগণের হয়রানি বাড়ছে। এলাকায় গিয়ে প্রতিনিয়ত আমাদেরকে জনগণের দুঃখ-কষ্টের কথা শুনতে হচ্ছে। আমরা এ বিষয়ে সোচ্চার হলেও ভূমি মন্ত্রণালয় নীরব। তারা শুধু জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে চিঠি লিখে খালাস।

এদিকে, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সাথে সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, শিগগিরই এসি ল্যান্ড পদে জনবল নিয়োগ দেয়া সম্ভব হবে না। কারণ মাঠ প্রশাসন থেকে নির্দিষ্ট হারের চেয়ে বেশি কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দেয়া হয়েছে। এতে মাঠ প্রশাসনে জনবল কমে গেছে। ওই কর্মকর্তা জানান, ভূমি মন্ত্রণালয়ের চিঠি পেলেও এখন এ বিষয়ে কিছু করার নেই। কারণ আমাদের হাতে লোক থাকলেই তো আমরা পদায়ন করতে পারবো। বিভিন্ন উপজেলায় এসি ল্যান্ড না থাকায় জনদুর্ভোগ যেমন বাড়ছে, সাথে সাথে সরকারের রাজস্ব আয়ের ওপর এর বিরূপ প্রভাব পড়ছে। সাধারণ মানুষের ভূমি সংক্রান্ত বিভিন্ন ধরনের আবেদন-নিবেদন দীর্ঘদিন ধরে জমা পড়ে আছে। এসব আবেদনের সাথে সরকারের রাজস্বের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। ভূমি সংক্রান্ত মোকাদ্দমাগুলো নিষ্পত্তি না হবার কারণে সরকার এসব রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
http://ittefaq.com.bd/index.php?ref=MjBfMTJfMTlfMTJfMV8xXzFfNDc4Mg==

No comments: