Saturday, December 29, 2012

টেলিটকে কোটি কোটি টাকার দুর্নীতি


সজল জাহিদ/নাহিদ তন্ময়
রাষ্ট্রায়ত্ত মোবাইল অপারেটর টেলিটকে কোটি কোটি টাকার দুর্নীতি অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। সরকারের অডিট অধিদফতরের এক নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত সাত বছরে টেলিটকে প্রায় ৬০০ কোটি টাকার অনিয়ম চিহ্নিত করা হয়েছে। এ অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন টেলিটকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুজিবুর রহমান। তিনি সমকালকে বলেছেন, একটি চক্র তাদের বিরুদ্ধে লেগেছে। কাগজপত্রে আছে, কিন্তু বাস্তবে টেলিটকের ভাণ্ডারে কোটি কোটি টাকার সিমকার্ড এবং স্ক্র্যাচকার্ডের কোনো হদিস নেই। টেলিটকের লেজার এবং অন্যান্য হিসাবে মজুদ দুই ধাপে ৩১ কোটি টাকার বিভিন্ন মূল্যমানের স্ক্র্যাচকার্ড এবং ক্যাশকার্ড ঘাটতি রয়েছে। একইভাবে ৪৩ হাজার ২৭১টি সিমকার্ডের মজুদ ঘাটতির ফলে কোম্পানি ও সরকারের রাজস্ব ক্ষতির পরিমাণ আরও ৩ কোটি ৮৯ লাখ ৪৪ হাজার ৪৯ টাকা। এ বিষয়ে টেলিটকের সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা নেই।
টেলিটকের জন্মের পর থেকে ২০১০-১১ অর্থবছর পর্যন্ত সাত বছরের অডিট প্রতিবেদনে পাওয়া গেছে এ তথ্য। টেলিটকের একমাত্র অডিটও এটি। প্রি-পেইড সিমকে পোস্টপেইডে রূপান্তর করে রাজস্ব ফাঁকি দেওয়া, বাজারদরের চেয়ে অতিরিক্ত মূল্যে সিমকার্ড কেনা, ভিওআইপির অবৈধ কার্যক্রমে ফ্রি আইএসডি কল করতে দেওয়াসহ কোম্পানির ক্ষতির কয়েক ডজন কারণ উল্লেখ করা
হয়েছে প্রতিবেদনে। সব মিলে প্রায় ৬০০ কোটি টাকার অনিয়ম চিহ্নিত হয়েছে।
এর আগে সমকালে রিপোর্ট করা হয়েছে এমন অন্তত কয়েকটি অনিয়ম এবং দুর্নীতিও অডিটে ধরা পড়েছে। কোম্পানির বোর্ড চেয়ারম্যানের নামে অযাচিত ও নিয়মবহির্ভূতভাবে ১ কোটি ৯৭ লাখ টাকায় গাড়ি কেনাসহ ইচ্ছামাফিক যাকে খুশি তাকে বিভিন্ন কাজ দেওয়ার মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা লোপাটের হিসাব তুলে ধরা হয়েছে অডিট প্রতিবেদনে। সাত বছরের এই বিশেষ অডিট সম্পন্ন হয়েছে চলতি বছরের ৪ মার্চ থেকে ১৭ মের মধ্যে। সরাসরি দুর্নীতি হয়েছে এমন খাতের তালিকায় বিলিং সিস্টেম বাইপাস করে আইএসডি কল করতে দেওয়া এবং সিম ও স্ক্র্যাচকার্ডের গরমিল উল্লেখযোগ্য।
তবে অডিট প্রতিবেদন সম্পর্কে টেলিটকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুজিবুর রহমান সমকালকে বলেন, অডিটের প্রাথমিক রিপোর্টে অনেক কিছু দেখানো হলেও চূড়ান্ত রিপোর্টে এর কিছুই থাকবে না। একই সঙ্গে এগুলোকে টেলিটকের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র উল্লেখ করে তিনি বলেন, রাষ্ট্রায়ত্ত ল্যান্ডফোন অপারেটর বিটিসিএল যেভাবে লুটপাটের মাধ্যমে ধ্বংস করা হয়েছে, একইভাবে এখানেও একটি চক্র তাদের কার্যক্রমের বিরুদ্ধে লেগেছে। চক্রটি অডিট দলকে দিয়ে নানা রকম অভিযোগ করাচ্ছে।
অডিট প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মজুদ হিসাবে এক ধাপে ২১ কোটি ৩২ লাখ ৫৯ হাজার ৬৩০ টাকা মূল্যমানের স্ক্র্যাচকার্ড এবং ক্যাশকার্ড ঘাটতি রয়েছে। টেলিটক বলেছে, সব কাস্টমার কেয়ারের বিক্রয়ের হিসাব নিলে সঠিক তথ্য পাওয়া যাবে। তবে অডিট দল তাদের এই বক্তব্য গ্রহণ করেনি। তারা বলেছেন, মার্কেটিং শাখা কেন্দ্রীয়ভাবে স্ক্র্যাচকার্ড এবং ক্যাশকার্ডের ক্রয়-বিক্রয় হিসাব, বিভিন্ন বিক্রয় কেন্দ্রে ইস্যু এবং মজুদ হিসাব সংরক্ষণ করে। সে অনুযায়ী বছর শেষে কেন্দ্রীয় মজুদ হিসাবে বিভিন্ন বিক্রয় কেন্দ্রসহ মোট মজুদ দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার প্রত্যয়নসহ মজুদ হিসাব সংরক্ষণ করা হয়নি। এ ক্ষেত্রে অডিট দলের সুপারিশ হলো, কেন্দ্রীয় মজুদ ঘাটতি হিসাবে আপত্তিকৃত ২১ কোটি ৩২ লাখ টাকা মূল্যের স্ক্র্যাচকার্ড এবং ক্যাশকার্ডের বিক্রয় কেন্দ্রভিত্তিক বাস্তব যাচাই প্রতিবেদন আবশ্যক। অন্যথায় আপত্তিকৃত টাকা সংশ্লিষ্ট দায়ী ব্যক্তিদের কাছ থেকে আদায় করতে হবে।
এদিকে ২০০৫ সালের অপর একটি হিসাবে দেখানো হয়েছে ৯ কোটি ৮৭ লাখ টাকার গরমিল। সেখানে বলা হয়েছে, ওই বছরের ৮ ডিসেম্বর ভেরিফিকেশনের সময় প্রতিটি ৩শ' টাকা মূল্যের ৩ হাজার ২৯২টি স্ক্র্যাচকার্ড কম পাওয়া যায়। তখন ৯ কোটি ৮৭ লাখ ৬শ' টাকার ক্ষতি হলেও এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত দায়ীদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
অন্যদিকে টেলিটকের একটি পক্ষ বলছে, তখন গণনায় ভুল হওয়ার কারণে কিছু সমস্যা হয়েছিল। বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ বিষয়ে বলেছেন, ওই সময়ের ভ্রান্তি সম্পর্কে তার কোনো ধারণা নেই। ফলে এ বিষয়ে তিনি কিছুই বলতে পারবেন না।
অপরদিকে ২০১১ সালের ৩০ জুন সিমকার্ডের মজুদ হিসাবে ৪৩ হাজার ২৭১টি সিমকার্ড কম পায় অডিট দল। যার সম্পূরক শুল্ক ও ভ্যাট বাবদ সরকারের সরাসরি ৩ কোটি ৪৬ লাখ ১৬ হাজার ৯৪৯ টাকা ক্ষতি হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে টেলিটক বলেছে, নির্দিষ্ট ওই তারিখে তাদের লেজার অনুসারে কোনো পার্থক্য নেই।
টেলিটকের হিসাবে ওই তারিখে ২ লাখ ৩৫ হাজার ৮৫৫টি সিম থাকলেও বাস্তবে পাওয়া গেছে ১ লাখ ৯২ হাজার ৫৮৪টি। এখানেও টেলিটকের বক্তব্য, ২৬টি কাস্টমার কেয়ার ও বিক্রয় সিমের হিসাব নিলে মোট সংখ্যার সঙ্গে মিল পাওয়া যায়। অডিট দল বলেছে, সিম যেখানেই থাকুক না কেন, তার হিসাব লেজারে থাকবে। তাছাড়া লেজার এবং কাস্টমার কেয়ারগুলোর তথ্য মেলে না। ফলে এসব তথ্য কেবল বিভ্রান্তি বাড়ায়। তারা বলেন, টেলিটকের বক্তব্য অনুসারে ঢাকা অফিসের মজুদ ১ লাখ ৯২ হাজার ৫৮৪টি। অপরদিকে তারাই যে হিসাব দিয়েছে তাতে মার্কেটিং ডিপার্টমেন্টসহ ঢাকার ৬টি বিক্রয় কেন্দ্র ও কাস্টমার কেয়ার ইউনিটে মজুদ আছে ১ লাখ ৪১ হাজার ৮৩৭টি সিম। জবাব অনুযায়ী ঢাকা অফিসের মজুদ ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়ায় ৫০ হাজার ৭৪৭টিতে।
অডিট প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ওই একই দিন আরেক জায়গায় মজুদ দেখানো হয়েছে ২ লাখ ২৪ হাজার ৭৪২টি সিম। সেখানে ঘাটতি উল্লেখ করা হয়েছে ১১ হাজার ১১৩টি সিম। এগুলো কার্ড করপোরেট সিম, আন্তর্জাতিক মোবাইল ফেয়ারসহ বিভিন্ন স্থানে বিতরণ দেখানো হয়েছে। আবার বিতরণের ক্ষেত্রে কোনো প্রমাণ রাখা হয়নি। অডিটের সুপারিশে বলা হয়েছে, ঘাটতি পড়া ৪৩ হাজার ২৭১টি সিমের বিক্রয়মূল্য বাবদ ৩ কোটি ৪৬ লাখ ১৬ হাজার ৯৪৯ টাকা হিসাবে জমা হওয়া আবশ্যক।
এসব বিষয়ে মুজিবুর রহমান বলেন, তারা হিসাব মিলিয়ে দেখিয়েছেন। এখানে কোনো ঘাপলা নেই বলেও দাবি করেন তিনি। মন্ত্রণালয়কেও বিষয়টি জানানো হয়েছে। মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে ত্রিপক্ষীয় ব্যবস্থা নেওয়ার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করবে বলেও জানান তিনি।
অডিট রিপোর্ট অনুযায়ী, শুরু থেকেই বিভিন্ন সময় বিপুল পরিমাণ প্রি-পেইড ও পোস্ট পেইড সিম রিপ্লেস করে অবৈধ ভিওআইপির সুযোগ করে দেওয়ায় কোম্পানির বিপুল রাজস্ব ক্ষতি হয়। ২০১০ সালের আগস্ট থেকে অক্টোবরের মধ্যে কুমিল্লা অঞ্চলের মেসার্স আলী অ্যান্ড সন্স ডিলার এবং তার অধীন মহোদজনপুরের রিটেইলার সাইফুল আলমের (নিবু) উপহার ক্লথ স্টোর বিপুল সংখ্যক প্রি পেইড ও পোস্ট পেইড সিম রিপ্লেস করে। যেগুলো পরে ভিওআইপির অবৈধ কাজে ফ্রি আইএসডি কল করে কোম্পানির ৪ কোটি ১২ লাখ ৫৪ হাজার ৭৯৫ টাকার রাজস্ব ক্ষতি হয়। ওই বছরই বিটিআরসি বিষয়টি টেলিককে জানালে তদন্তের পর তদন্ত হলেও কোনো ব্যবস্থা তারা নেয়নি।
এ বিষয়ে টেলিটক বলেছে, বিলিং সিস্টেমের ত্রুটির কারণে ক্ষতি হয়নি, তাই এই সিস্টেমের সঙ্গে সম্পর্কিত কাউকে দোষী সাব্যস্ত করা নিতান্তই অমূলক। তারা বলেছেন, টেলিটকের সিম রিপ্লেস প্রক্রিয়ায় যে নম্বরগুলোর মাধ্যমে বিশাল রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে তাদের কোনোটাই বিলিং সিস্টেমে পোস্ট পেইড নম্বর হিসেবে অন্তর্ভুক্ত ছিল না। এ ক্ষেত্রে তারা প্রযুক্তি সরবরাহকারী কোম্পানিকে দায়ী করেন।
অডিটে দেখানো হয়েছে, ২০০৬-০৭ অর্থবছরে দরপত্র আহ্বান না করেই সোয়া ৪ লাখ সিম কেনা হয়। দুটি কোম্পানির কাছ থেকে কেনা প্রতিটি সিমের বাজারদর ৬১ টাকা হলেও কেনা হয় ১৭৮ টাকা ২১ পয়সা দরে। এখানে টেলিটকের তিন কোটি ৮০ লাখ ৯৩ হাজার ২৫০ টাকার ক্ষতি হয়।
শুরুর দিকে টেলিটকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ব্যবহারের জন্য ৭৪৫টি হ্যান্ডসেট আমদানি করা হয়। ২০০৫ সালের ৩১ ডিসেম্বরের আর্থিক হিসাব অনুযায়ী প্রতিটি হ্যান্ডসেটের দাম ২৮ হাজার টাকা। হ্যান্ডসেটগুলোর ৬২০টি বিতরণ করা হলেও বাকি ১২৫টি হ্যান্ডসেটের কোনো হিসাব পাওয়া যাচ্ছে না।
অপারেটরটির দুই সহকারী ব্যবস্থাপক এসএম তারেক ও হাসিবুর রহমান ডিলারদের সঙ্গে যোগসাজশে বিল জেনারেটের মাধ্যমে ১৪শ' প্রি পেইড সিমকে পোস্ট পেইডে রূপান্তর করে। ২০১০ ডিসেম্বর থেকে ২০১১ মে পর্যন্ত বিল জেনারেটিংয়ের মাধ্যমে ক্ষতি হয় ১৫ কোটি ৩৫ লাখ ৫৭ হাজার ২৮৪ টাকা। অথচ ওই দুই কর্মকর্তা গ্রাহকপ্রতি ৩শ' টাকা করে নিয়ে এই সুবিধা করে দেন। পরে তারেক ৩ কোটি ১১ লাখ এবং হাসিবুর ১ কোটি ২৫ লাখ টাকা আত্মসাৎ করেন বলে উল্লেখ করা হয়। ঘটনাটি উদ্ঘাটিত হলে তারেক ৩৫ লাখ এবং হাসিবুর ৩০ লাখ টাকা ফেরতও দেন। বর্তমানে বিষয়টি দুর্নীতি দমন কমিশন তদন্ত করছে। তখন এ বিষয়ে সমকাল রিপোর্ট করলেও কর্তৃপক্ষ তা স্বীকার করেনি।
গ্রাহকের কাছ থেকে আদায় করলেও টেলিটক কর্তৃপক্ষ দুটি অর্থবছরের ১৭৪ কোটি টাকার বেশি সরকারি কোষাগারে জমা করেনি। এর মধ্যে ২০১০-১১ অর্থবছরের বাকি থাকা ১৬২ কোটি ৫৬ লাখ ৩৫ হাজার ২৯৪ টাকার কিছুটা জমা করা হলেও ২০০৬-০৭ অর্থবছরে আদায় করা ১২ কোটি ১২ লাখ ৩৭ হাজার ৬৪৭ টাকা ভ্যাটের কিছুই তারা জমা করেনি। আবার টেলিটক বোর্ডের চেয়ারম্যানের জন্য ৬৭ লাখ টাকার গাড়ি বদলে অযাচিতভাবে কেনা ১ কোটি ৯০ লাখ ৭৫ হাজার টাকায় কেনা পাজেরো জিএলএস বিষয়েও আপত্তি ওঠে। এই গাড়িটি কেনার জন্য প্রাক্কলিত ব্যয় ছিল ১০ লাখ ৭৫ হাজার টাকা। পরে সেটি বাড়িয়ে নেওয়া হয়।
উলি্লখিত কারণ ছাড়াও জনবল নিয়োগ, ঠিকাদারি নিয়োগ, ডিলার নিয়োগ, গ্যাসচালিত গাড়িতে তেলের বিল করা, কাস্টমার কেয়ার সেন্টারের জন্য বাড়ি ভাড়াসহ বিভিন্ন খাতে কোটি কোটি টাকার দুর্নীতি ও অনিয়মের তথ্য বের করেছে অডিট দল।
তবে টেলিটক এমডি বলেছেন, মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে প্রাথমিকভাবে উপস্থাপন করা এসব মিথ্যা তথ্য বাতিল করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। 
http://www.samakal.com.bd/details.php?news=13&action=main&option=single&news_id=317192&pub_no=1272

No comments: