Wednesday, December 26, 2012

কে নেবে সংলাপের উদ্যোগ?

খোন্দকার কাওছার হোসেন : আগামী জাতীয় নির্বাচনের সময় যতোই এগিয়ে আসছে এ নিয়ে রাজনৈতিক সমঝোতার দাবি ততোই জোরালো হচ্ছে। সরকার ও বিরোধী উভয় পক্ষকে সংলাপে বসে সমাধানের রাস্তা খোঁজার দাবি এখন খোদ সরকারি দল থেকেই উচ্চারিত হচ্ছে। বিরোধী দল, সুশীল সমাজ এমনকি ক‚টনীতিকদের পক্ষ থেকে এ দাবি আরো আগেই করা হয়েছিল। কিন্তু সরকারি দলের পক্ষ থেকে তেমন সাড়া না পাওয়ায় তা অসাড় দাবিতে পরিণত হয়েছিল।

সাম্প্রতিক সময়ে সরকারি দলের কয়েকজন নেতা, সুশীল সমাজ ও প্রভাবশালী একটি রাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূতের বক্তব্যে সমঝোতার জন্য ‘সংলাপ এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র’ বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

সরকারের মেয়াদ যতো দ্রুত শেষ হচ্ছে, ততো দ্রুতই বেগবান হচ্ছে বিরোধী দলের আন্দোলন। পাশাপাশি এ আন্দোলন ঠেকাতে মাঠে নামছে সরকারি দল ও তাদের সমর্থকরা। এ কারণে আগামী দিনে রাজনৈতিক অঙ্গন হবে আরো উত্তপ্ত।

বিষয়টি আঁচ করতে পেরেই সংলাপে বসে সমাধানের পথ খুঁজতে আহŸান বিশেষজ্ঞদের। কিন্ত বিড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধবে কে? কে নেবে উদ্যোগ। কার ডাকে সারা দেবে উভয় পক্ষÑ এ প্রশ্নটিও উঠে এসেছে।

যদিও মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যান মজিনা ইতোমধ্যেই সংলাপের উদ্যোগ নিয়েছিলেন কিন্ত তখন তা সফল হয়নি। যেমনটা সফল হয়নি আব্দুল জলিল ও আব্দুল মান্নান ভুঁইয়ার মধ্যে অনুষ্ঠিত সংলাপ। কিংবা স্যার নিনিয়ানের উদ্যোগ। এ কারণে সংলাপ নিয়ে এক ধরনের আস্থাহীনতাও রয়েছে রাজনৈতিক বোদ্ধাদের।

কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। পেক্ষাপট পাল্টেছে। সংলাপ ছাড়া পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের আর কোনো পথ আপাতত দেখছেন না বোদ্ধারা। তবে এবার সংলাপ হওয়া উচিত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়ার মধ্যে। দলের অন্য কোনো পর্যায়ের নেতারা বসলে সংলাপ বরাবরের মতো ব্যর্থ হবে এ আশঙ্কা তাদের।

এ পরিস্থিতিতে দুনেত্রীকে সংলাপে বসাতে বাধ্য করার জন্য বিভিন্ন কৌশল ও বর্ণনা করছেন কেউ কেউ।

বর্ষীয়ান সাংবাদিক এ বি এম মূসা বলেন, সাধারণ মানুষ যতো¶ণ চাপ না দেবেন ততো¶ণ সংলাপ হবে না। সংলাপের জন্য জনমত তৈরি করে এ দুনেত্রীকে চাপ দিতে হবে। নাগরিক ঐক্যের আহŸায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, দুনেত্রীতে সংলাপে বসতে হবে। অথবা তাদের বর্জন করতে হবে।

প্রবীণ আইনজীবী ব্যারিস্টার রফিক-উল হক বলেন, বিএনপি বলছে তত্ত¡াবধায়ক সরকার। আওয়ামী লীগ বলছে নির্বাচনের সময় অন্তর্র্বর্তীকালীন সরকার থাকবে। কিন্তু এই দুই সরকারের রূপরেখাটা কী, সেটা নিয়ে কোনো দলই স্পষ্ট করে কিছু বলছে না। কিন্তু সাধারণ মানুষ হিসেবে আমরা তাদের প্রস্তাবিত সরকারের রূপরেখা সম্পর্কে জানতে চাই। সে জন্য যে কোনো উপায়ে দুই নেত্রীকে সংলাপে বসাতে হবে। প্রয়োজনে এমন জনমত বা পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যাতে তারা বসতে বাধ্য হন।

আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য এডভোকেট ইউসুফ হোসেন হুমায়ুন বলেন, সংলাপের ব্যাপারে আমাদের আশাবাদী হতেই হবে। না হলে কী হবে তা কল্পনাও করতে পারবেন না। এই উদ্যোগ একদিন আসতে হবে। এর জন্য জনমত তৈরি করতে হবে। তার মতে রাষ্ট্রপতি বা স্পিকারও এই উদ্যোগ নিতে পারেন।

ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যান ডব্লিউ মজিনা বলেন, প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের ওপর বাংলাদেশের রাজনীতির ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে। সামনে নির্বাচনের বছর। এজন্য এখনই প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোকে সংলাপে বসাতে হবে। আর সংলাপের মাধ্যমেই রাজনৈতিক সমস্যার সমাধান হতে পারে।

আমাদের অর্থনীতি পত্রিকার সম্পাদক নাঈমুল ইসলাম খান বলেন, দুই নেত্রীকে সংলাপে বসানোর দাবিতে বিশিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়ে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে অবস্থান কর্মসূচি পালন করা যেতে পারে।

রাজনীতিক, সাংবাদিক, সুশীল সমাজ এমনকি প্রভাবশালী দেশের ক‚টনীতিকদের এমন অবস্থানের কারণে দুনেত্রীর সংলাপ এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র বলে মনে করেন রাজনীতি সংশ্লিষ্টরা।

কিন্ত আগামী নির্বাচন পরিচালনায় বিএনপির মত অনুযায়ী নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত¡াবধায়ক সরকার না আওয়ামী লীগের মতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এ নিয়ে দুনেত্রী সমঝোতায় আসতে পারবেন কিনা এ নিয়েও আশঙ্কা রয়েছে। কেননা দলে তাদের পরামর্শদাতা বা উপদেষ্টারা যদি গোঁ ধরেন তবে আগের সংলাপের মতো তাদের সংলাপের ভাগ্যও অনিশ্চয়তার পথেই হাঁটবে।

যেমনটা বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, রাজনীতির গতিপথ অনিশ্চিত। দেশের সব মানুষই এ ব্যাপারে উদ্বিগ্ন। আর এটা সৃষ্টি হয়েছে আগামী নির্বাচনকে কেন্দ্র করে। গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় নির্বাচন যখন অনিশ্চিত হয়ে পড়ে তখন রাজনীতিতেও অস্থিরতা সৃষ্টি হয়। তবে সংবিধানে ছোট্ট একটা সংশোধনী এনে একমাত্র তত্ত¡াবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ফিরিয়ে এনে সহজেই এই সমাধান সম্ভব।

ড. খন্দকার মোশাররফের এ বক্তব্যের জবাবে আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য তোফায়েল আহমেদ বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনেও নির্বাচন কমিশনকে শক্তিশালী করে অবাধ এবং নিরপে¶ নির্বাচন সম্ভব।

সিনিয়র দুনেতা এ পরস্পর বিরোধী অবস্থানে অনড় থাকলে সর্বোচ্চ নেতৃত্বের সংলাপও যে ব্যর্থ হতে পারে সে সংশয়ও রয়েছে সংলাপ আয়োজনের প্রস্তাবকারীদের। অবশ্য বহুল আলোচিত সাবেক মন্ত্রী ব্যারিস্টার নাজমুল হুদাও চুপ করে বসে নেই। নির্বাচনকালীন সরকার সম্পর্কে তিনি নিজ¯^ রূপরেখা তৈরি করেছেন। তাতে বলা হয়েছে, সংসদ ভেঙে যাওয়ার পরবর্তী সাত দিনের মধ্যে দুই নেত্রী মতৈক্যের ভিত্তিতে নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন করবেন এবং ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন হবে। সংসদের মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়ার ৯০ দিন আগে প্রধানমন্ত্রী বিরোধীদলীয় নেতাকে সংলাপে বসার আহŸান জানাবেন।

প্রধান রাজনৈতিক দলের সিনিয়র নেতৃবৃন্দ, সাংবাদিক, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি ও ক‚টনীতিকদের এ আহŸানে দুনেত্রী চুপ করে থাকতে পারবেন না। সাড়া দিয়ে অচিরেই তারা সংলাপে অংশ নেবেন এমন আশাবাদ সংশ্লিষ্টদের।
http://www.bhorerkagoj.net/new/blog/2012/12/24/90906.php

No comments: