রতন টাটা বিশ্বব্যাপী পরিচিত এবং আলোকিত একজন সফল ব্যবসায়ীর নাম। অক্লান্ত পরিশ্রম, অসাধারণ মেধা, সততা ও নিষ্ঠায় নিজেকে বিশ্বের অন্যতম শিল্পোদ্যোক্তা হিসেবে নিজেকে পরিচিত করেছেন তিনি।
ভারতের ব্যবসা- বাণিজ্যের বিভিন্ন ক্ষেত্রে তার রয়েছে অসামান্য অবদান ও স্বীকৃতি।
ব্যবসায়ীরা একটি দেশের সমাজ পরিবর্তন করে দেশকে তুলে ধরতে পারেন বিশ্ব দরবারে। যেমন ভারতীয় পণ্যকে বিশ্ববাসীর কাছে পরিচিত করেছেন রতন টাটা।
দীর্ঘ ও বর্ণাঢ্য কর্মজীবন শেষে আগামীকাল ২৮ ডিসেম্বর অবসর নিতে যাচ্ছেন রতন টাটা। রতন টাটার অবসর নিঃসন্দেহে বড় খবর। কারণ গত দুই দশক ধরে ভারতের কর্পোরেট সাম্রাজ্যের মুকুটহীন রাজা হয়ে দেশটির ব্যবসা ও অর্থনীতির ওপর বিরাট ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছেন রতন টাটা।
বরাবরই নতুন বছরে টাটা গ্রুপের সাথে জড়িত সবাইকে শুভেচ্ছা জানান রতন টাটা। কিন্তু এবার আর তা হচ্ছে না। ২৮ ডিসেম্বর শুক্রবার ভারতীয় এ শিল্পপতির ৭৫তম জন্মদিন। অবসরের জন্য এ দিনটিই বেছে নিয়েছেন তিনি।
১৯৯১ থেকে ২০১২ দীর্ঘ ২১ বছর টানা টাটা সাম্রাজ্য সামলে অবসরে যাচ্ছেন রতন টাটা। বয়স ৭৫ ছুঁলেই যে তিনি নিয়ম মেনে টাটা গোষ্ঠীর চেয়ারম্যানের পদ থেকে সরে দাঁড়াবেন, সেই ইঙ্গিত আগেই দিয়েছিলেন এই বিনয়ী মানুষটি।
সময় ও নদীর স্রোত কারো জন্য অপেক্ষা করে না। ব্যবসা জগতে অনন্য প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে তাই অবসর নিতে যাচ্ছেন রতন টাটা। কিন্তু সে বিদায়ে তিনি তো বটেই, অতৃপ্ত থেকে গেল গোটা টাটা পরিবার আর মধ্যবিত্ত সমাজ। আর কেউ না হোক টাটা সাম্রাজ্যের মানুষ আর মধ্যবিত্তরা সবাই মহান এই ব্যবসায়ী ব্যক্তিত্বকে মিস করবে। ন্যানোর মতো মধ্যবিত্তের জন্য ভাবেন কতজন ব্যবসায়ী?
শুরুর কথা: ১৮৬৮ সালে একটি বেসরকারি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান হিসেবে টাটা গ্রুপের পথ চলা শুরু। মাত্র ২১ হাজার রুপি পুঁজি নিয়ে কোম্পানিটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তত্কালীন ব্যবসায়ী ও জনসেবক জামশেদ নওশেরাওজি টাটা।
প্রতিষ্ঠানটি মূলত দুটি ভাগে তাদের ব্যবসা পরিচালনা করছে— একটি হলো টাটা সন্স, অন্যটি টাটা ইন্ডাস্ট্রিজ। টাটা গ্রুপ মোট আট ধরনের ব্যবসা পরিচালনা করে । এগুলো হচ্ছে— তথ্যপ্রযুক্তি ও যোগাযোগ, প্রকৌশলী পণ্য ও সেবা, পণ্যদ্রব্য, জ্বালানি, ভোগ্যপণ্য, কেমিক্যাল এবং আন্তর্জাতিক কার্যক্রম। এ সাতটি ব্যবসায়িক খাতে টাটা গ্রুপের ১০০টি কোম্পানি রয়েছে। বিশ্বব্যাপী প্রতিষ্ঠানটির মোট কর্মচারীর সংখ্যা ৪ লাখ ২৫ হাজার।
রতন টাটা আমেরিকার কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থাপত্য শিল্প নিয়ে পড়ার পাঠ শেষ করে টাটা ইন্ডাস্ট্রিজে ১৯৬২ সালে যোগ দেন। মেধাবী এই ব্যবসায়ীর জন্ম ১৯৩৭ সালে ভারতের মুম্বাইয়ে। ১৯৯১ সালে তিনি গ্রুপের চেয়ারম্যান হন।
কোনো সফল মানুষ সম্পর্কে বলতে গেলে একপর্যায়ে আমরা বলি, ‘তারপর আর তাকে পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি...’ রতন টাটার ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। তিনি শুধু সামনে এগিয়ে গেছেন। শীর্ষ পদে প্রায় দুই দশকের এ যাত্রায় শতাব্দী প্রাচীন টাটা গোষ্ঠীকে বিশ্বের দরবারে শক্তিশালী ব্র্যান্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছেন তিনি।
আমজনতার জন্য এক লাখ টাকার ন্যানো বাজারে আনাই সম্ভবত তার সব থেকে বেশি চর্চিত পদক্ষেপ। এছাড়া জীবনে তার রয়েছে আরো অসংখ্য মাইলফলক।
এগিয়ে যাবার গল্প:
নেতৃত্বের গুণ রতন টাটার জন্মগত। যে দায়িত্বই তিনি নিয়েছেন, কেবল সাফল্যই মিলেছে। স্বাধীনতা-উত্তর ভারতে ইতিহাসের পাতায় নাম খচিত রয়েছে রতন টাটার নাম। অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন, ধারে-ভারে কে আসবে তাঁর উচ্চতায়?
লোহা ও স্টিল কোম্পানি এবং হাইড্রো-ইলেকট্রিক পাওয়ার জেনারেটিং ইউনিটের পাশাপাশি টাটার বিভিন্ন প্রকল্পের সাহায্যে ভারতে আধুনিক শিল্পের ভিত্তি স্থাপিত হয়। ১৮৬০ সালে জামসেদ টাটা প্রতিষ্ঠিত টাটা গ্রুপ বিভিন্ন হাত ঘুরে রতন টাটার হাতে পড়ে ১৯৯১ সালে। দীর্ঘদিন নেতৃত্ব দিয়ে টাটা গ্রুপকে একটি বৈশ্বিক জায়ান্ট প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত করেছেন রতন টাটা। তার নেতৃত্বে টাটা এখন শতাধিক কোম্পানির একটি গ্রুপে পরিণত হয়েছে। এ ছাড়া পশ্চিমা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান কেনার মধ্য দিয়ে সারা বিশ্বের নজরে এসেছেন সফল এ ব্যবসায়ী।
লবণ ব্যবসা থেকে শুরু করে সফটওয়্যার পর্যন্ত— সব ব্যবসায়ই সুনাম অক্ষুণ্ন রেখেছেন তিনি। তার অবদানের কারণেই ভারতের সর্ববৃহৎ গ্রুপে পরিণত হয় টাটা। গত দুই দশকে তিনি কোম্পানির ব্যবসাকে এমন প্রসারিত করেন যে, ২০১১-১২ সালে মোট রাজস্ব বেড়ে দাঁড়ায় ১০ হাজার কোটি ডলারেরও বেশি।
ভারতের গোটা শেয়ারবাজারের ৭ শতাংশ টাটা শিল্পগোষ্ঠীর দখলে। ভারতের কর্পোরেট ট্যাক্সের ৩ শতাংশ এবং যাবতীয় আবগারি শুল্কের ৫ শতাংশ এই গোষ্ঠী যোগায়। আবাসন ব্যবসা থেকে শুরু করে এয়ারকন্ডিশনিং, হোটেল শিল্প, গাড়ি শিল্প, ফোন শিল্প, খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ, বিমা, ঘড়ি, পাদুকা এমনি অসংখ্য শিল্প ও ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত।
তবে তাদের অন্যতম মাইলফলক হলো ২০০৬-এ ১ হাজার ২০০ কোটি ডলারে ইস্পাত বহুজাতিক কোরাসকে অধিগ্রহণ। এছাড়া ২০০৮-এ ২৩০ কোটি ডলারে ব্রিটিশ গাড়ি প্রস্তুতকারী বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান জাগুয়ার-ল্যান্ড রোভারের মালিকানা অর্জনও তার আর একটি অনন্য কীর্তি। এছাড়া টাটা গ্রুপের টিসিএসকে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে ভারতের অন্যতম বৃহত্তম তথ্য প্রযুক্তি সংস্থা হিসেবে।
বিদেশে ভারতীয় হোটেল ব্যবসার সম্প্রসারণে রয়েছে টাটার উল্লেখযোগ্য ভূমিকা।
টাটা টি’র ব্যবসাও ঢেলে সাজানো হয়েছে। রতন টাটার সময়েই দেশে ব্যবসা বাড়ানোর পাশাপাশি ব্র্যান্ড হিসেবে আন্তর্জাতিক মঞ্চেও প্রচারের আলোয় এসেছে টাটা গোষ্ঠী।
এই সময়ে গোষ্ঠীর ব্যবসা বেড়েছে প্রায় ১২ গুণ। আবার বর্তমানে গোষ্ঠীর আয়ের ৬৫ শতাংশই আসছে বিদেশের মাটি থেকে।দায়িত্ব গ্রহণের পর রতন টাটা নিজ কৌশলে গড়ে তোলেন টাটা গ্রুপের এ বিশাল সাম্রাজ্য।
প্রথমেই প্রতিষ্ঠানের জন্য অলাভজনক টেক্সটাইল ও বেশ কিছু নন-কোর ব্যবসা বিক্রির সিদ্ধান্ত নেন তিনি। এর মধ্যে এসিসি ও টমকো উল্লেখযোগ্য। রতন টাটার দ্বিতীয় কাজটি ছিল আর বেশি গুরুত্বপূর্ণ ও চ্যালেঞ্জিং। টাটাকে কেন্দ্রীয় ব্র্যান্ডিং পর্যায়ে আনতে একটি নিয়মতান্ত্রিক নেটওয়ার্কের সাহায্যে এর সব কোম্পানিকে কেন্দ্রীয়ভাবে নিয়ন্ত্রণের সিদ্ধান্ত নেন তিনি। এ কারণে বর্তমান বিশ্ববাজারে সমৃদ্ধশালী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে দক্ষ ব্যবস্থাপনা ও স্থিতিশীল প্রতিষ্ঠান হিসেবে এটির বিশেষ সুখ্যাতি রয়েছে।
দীর্ঘ কর্মজীবনে রতনা টাটা লাভ করেছেন অসংখ্য স্বীকৃতি।ব্যবসায়িক সাফল্যের স্বীকৃতিও পেয়েছেন ঢের। বিশ্বের বিভিন্ন নামি বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মানিক ডক্টরেট থেকে শুরু করে ২০০০ সালে ভারতের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা পদ্মভূষণ। ২০০৮ সালে পান পদ্ম বিভূষণ। রকফেলার ফাউন্ডেশনের আজীবন সম্মাননাও পান তিনি।
ভারতের শীর্ষ বণিক সমিতি অ্যাসোচ্যামের সাম্প্রতিক এক জরিপে ১০ হাজার কোটি ডলারের টাটা গ্রুপকে ভারতের সেরা আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের স্বীকৃতি দেয়া হয়।
প্রকৃত অবসর নেবেন না তিনি:
অবসর গ্রহণের কথা সংবাদ মাধ্যমকে জানানোর সময় রতন টাটা বলেন, ‘আমি এ গ্রুপের কল্যাণে নিজের জীবন উত্সর্গ করেছি।”
অবসর গ্রহণের পর চ্যারিটেবল ট্রাস্টের প্রধান হিসেবে থাকার পরিকল্পনা করেছেন টাটা। এ ট্রাস্টের দুই তৃতীয়াংশের মালিক টাটা সন্স। এ ছাড়া বিশ্বের সবচেয়ে সস্তা গাড়ি ন্যানো পুনরায় চালু করতে তিনি ভূমিকা রাখতে আগ্রহী।
চলতি বছরের শুরুতে এ বিষয়ের টাটা শেয়ারমালিকদের উদ্দেশে বলেছিলেন, ‘আপনারা চান বা না চান আমাকে প্রতিনিয়ত আপনাদের দেখতে হবে।’
অনেকের ধারণা, অবসর নিয়েও প্রকৃত অবসর নেবেন না তিনি। পর্দার আড়ালে থেকে কাজ করে যাবেন প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নে।
আধুনিক করপোরেট জগতের নায়কদের প্রস্থান নিয়ে ১৯৮৮ সালে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জেফরি সোনেনফেল্ড রচনা করেন ‘দ্য হিরোজ ফেয়ারওয়েল: হোয়াট হ্যাপেন্ডস হোয়েন সিইও রিটায়ার্ড’।
সোনেনফেল্ড নিজ নিজ শিল্প-প্রতিষ্ঠানে কীর্তিমান নেতাদের চার ধরনের প্রস্থান নিয়ে বইটি রচনা করেন। এ বইয়ে তিনি উল্লেখ করেন, জর্জ ওয়াশিংটন ও মহাত্মা গান্ধী যদি বৃহৎ একটি জাতির জনক হয়ে থাকে, তবে টম ওয়াটসন (আইবিএম), এডউইন ল্যান্ড (পোলারেইড) ও আলফ্রেড পি স্যালনের (জেনারেল মোটরস) মতো নেতারা জন্ম দেন বিশ্বখ্যাত প্রতিষ্ঠানগুলোর।
তবে রতন টাটার প্রস্থানও যে এসব প্রখ্যাত কীর্তিমানদের মতই স্মরণীয় হয়ে থাকবে সে কথাই বলাবাহুল্য।
http://www.banglanews24.com/detailsnews.php?nssl=ab0d6b3220b01788b1d4e6591f060e55&nttl=20121227064025161584
No comments:
Post a Comment