Sunday, November 18, 2012

ডিসিসির সেবার মান নিয়ে নগরবাসীর ক্ষোভ

এম এ বাবর:
নাগরিক সেবার মান বাড়ানোর অজুহাতে ঢাকা সিটি কর্পোরেশন (ডিসিসি) বিভক্ত করেছে সরকার। কিন্তু বিভাজিত ডিসিসির সেবা গ্রহীতাদের পদে পদে হয়রানি হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। আর জনদুর্ভোগে অতিষ্ঠ নগরবাসীর ডিসিসির প্রতি ক্ষোভ বাড়ছেই।
জনপ্রতিনিধিহীন ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের উন্নয়ন ও সেবার নামে চলছে কোটি কোটি টাকা লুটপাট। কর্তৃপক্ষ নগরবাসীর নানা সুযোগ-সুবিধা বাড়ার দাবি করলেও নাগরিক সেবামূলক কর্মকাণ্ডে বাস্তবে তেমন কোনো অগ্রগতি নেই।
এদিকে নগরীর ভাঙাচোরা রাস্তাঘাট, যত্রতত্র ময়লা-আবর্জনার স্তূপ, জলাবদ্ধতা ও মশার উপদ্রবসহ নানামুখী সমস্যা ও দুর্ভোগে অতিষ্ঠ নগরবাসীর ঘাড়ে চেপে বসেছে নতুন-নতুন সমস্যা। নাগরিক সনদ, জন্ম নিবন্ধন সনদ, মৃত্যু সনদ, ট্রেড লাইসেন্স করতে গিয়ে পদে পদে হয়রানি হচ্ছেন সেবা প্রত্যাশীরা। আর উত্তর-দক্ষিণের ঠেলাঠেলিতে রিকশার নম্বর নবায়ন করতে গিয়ে বিপাকে পড়ছেন রিকশা মালিকরা। সেবার মান না বাড়িয়ে হঠাৎ করে নগরীর বাড়ি-ঘরের হোল্ডিং ট্যাক্স বাড়ানোর প্রভাব পড়েছে রাজধানীর ভাড়াটিয়াদের কাঁধে।
অন্যদিকে দু’সিটি কর্পোরেশনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে রয়েছে সমন্বয়হীনতা। প্রেষণে নিয়োজিত সরকারি আমলাদের কার্যক্রমে ডিসিসির নিজস্ব কর্মকর্তাদের মধ্যে চরম অসন্তোষ বিরাজ করছে। অভিযোগ রয়েছে প্রেষণে নিয়োগ পাওয়া এসব কর্মকর্তা নগরীর উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের দিকে দৃষ্টি না দিয়ে খেয়ালখুশি মতো চলছেন।
আগে কাউন্সিলরদের কাছ থেকে নগরবাসী ১৭ ধরনের সনদপত্র গ্রহণ করত। এখন সে সনদ দেয়ার দায়িত্বে রয়েছেন আমলারা। বর্তমানে ১৭ ধরনের সনদের মধ্যে নগরবাসী ৫-৬টি সনদ পেয়ে থাকেন। আর নানা অজুহাতে বাকিগুলো তারা দিতে চান না। এলাকার সালিশ, বিচার, প্রাকৃতিক দুর্যোগসহ নানাবিধ সমস্যার সমাধানের কেউ নেই।
এদিকে নাগরিক সেবার মান নিয়ে সেবা প্রত্যাশীদের রয়েছে নানা ধরনের অভিযোগ। ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনে (ডিএনসিসি) মায়ের মৃত সনদ নিতে এসে হয়রানির শিকার হয়েছেন মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা আবিদ রেজা সাইদ। গত ১৩ নভেম্বর এ প্রতিবেদককে তিনি বলেন, ‘প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সব জমা দিয়েছি গত বুধবার (৭ নভেম্বর)। কিন্তু নানা অজুহাতে আমাকে পাঁচদিন যাবত ঘোরানো হচ্ছে।’ এক পর্যায়ে এ প্রতিবেদকের উপস্থিতিতে প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তাকে বিষয়টি অবহিত করা হলে মাত্র পাঁচ মিনিটেই আবিদ রেজা তার মায়ের মৃত্যু সনদ পেয়ে যান। একই সঙ্গে ওই দিন কাগজপত্র জমা দিয়েই তার চাচার মৃত্যু সনদও পেয়ে যান ৩০ মিনিটেই। 
নদ্দা এলাকার বাসিন্দা সাজিয়া বেগম সাতদিন ঘুরেও সন্তানের জন্ম সনদ নিতে পারেননি। তিনি বলেন, ‘ডাক্তার সার্টিফিকেট নিয়ে অঞ্চল অফিসে যেতে বলা হয় আমাকে। অঞ্চল অফিসে গেলে বলে নগর অফিসের অনুমোদন না আনলে সার্টিফিকেট দেয়া যাবে না। এভাবে আমাকে দিনের পর দিন ঘুরাচ্ছে।’
এমন অভিযোগ রয়েছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের (ডিএসসিসি) সেবা প্রত্যাশীদেরও।  
ব্যবসায়ী সামছুর রহমান বলেন, ‘দোকানের ট্রেড লাইসেন্সের জন্য প্রায় এক মাস আগে ফি জমা দেয়ার পরেও লাইসেন্স নিতে পারিনি। পরে দালাল ধইরা দুই হাজার টাকা দিয়া ৬ দিনে লাইসেন্স পাইছি।’
অন্যদিকে নগরীর বেশিরভাগ রাস্তাই ভাঙাচোরা। একটু বৃষ্টিতে রাস্তায় হাঁটু পানি জমে যায়। রাস্তার খানাখন্দে জমে থাকা ময়লা পানির মধ্যে রিকশা সিএনজি উল্টে যায়। এতে দুর্ঘটনাও ঘটে। অনেক সময় ময়লা-আবর্জনায় শ্রীহীন থাকে প্রধান সড়ক থেকে অলিগলি পর্যন্ত। দিন-রাত মশার কামড়ে অতিষ্ঠ থাকে নগরবাসী। প্রধান সড়কগুলোতে সড়কবাতি থাকলেও অনেক এলাকার বেশিরভাগ রাস্তায় সড়কবাতি অকেজো।
কূটনৈতিকপাড়া হিসেবে খ্যাত গুলশান-১, গুলশান-২, বারিধারা এলাকার বেশিরভাগ গুরুত্বপূর্ণ রাস্তাসহ এলাকার অলিগলি এবং নিকেতনের একাংশ, নাবিস্কো থেকে মেরুল বাড্ডা সংযোগ রাস্তার পুরো অংশই ভাঙাচোরা ও খানাখন্দে ভরা। ওয়্যারলেস থেকে মহাখালী কাঁচাবাজার এবং কলেরা হাসপাতাল থেকে নিকেতন যাওয়ার রাস্তাটিরও একই অবস্থা।
সরেজমিনে দেখা গেছে, গুলশান-১ চত্বর থেকে গুলশান-২, তেজগাঁও ও মহাখালী অভিমুখের রাস্তার ফুটপাত খানাখন্দে ভরা এবং চলাচলের অনুপযোগী। মহাখালী দক্ষিণপাড়া এলাকার রাস্তা বলতে অসংখ্য খানাখন্দে ভরা কয়েকটি অপরিসর আঁকাবাঁকা গলি। সিটি কর্পোরেশনের ডাস্টবিন না থাকায় রাস্তার পাশেই সবসময় ময়লা-আবর্জনার স্তূপ থাকে। একই ধরনের সীমাহীন দুর্ভোগ পোহাতে হয় রাজধানীর যাত্রাবাড়ি, খিলগাঁও, তেজগাঁও, রামপুরা, মিরপুর, পল্লবী, উত্তরা, পুরাণ ঢাকার বেগমগঞ্জ লেন, ঝিলপাড়, বানিয়ানগর, আরএম দাস লেন, ঋষিকেশ লেন ও জাস্টিস লাল মোহন দাস লেন এলাকার।
এদিকে গত ৫ নভেম্বর ডিসিসির সেবার মান নিয়ে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের এক সভায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন স্থানীয় সরকার সচিব আবু আলম মোহাম্মদ শহীদ খান। সূত্র জানায়, ওই সভায় ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক শাহজাহন আলী মোল্লা ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক জিল্লার রহমানকে তলব করা হয়। স্থানীয় সরকার সচিব ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসকদের কাছে জানতে চান, ‘সেবার মান কি কারণে খারাপ হচ্ছে? নাগরিক সেবা বৃদ্ধি করা না গেলে দুটি সিটি কর্পোরেশন করে কি লাভ হলো?’
এর আগে গত জুলাই মাসে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানকও ডিসিসির সেবার মান নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। গণমাধ্যমে প্রকাশিত নগরীর বিভিন্ন রাস্তাঘাটের বেহাল দশার সংবাদ দেখে তিনি ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের তৎকালীন প্রশাসক খলিলুর রহমান ও ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের তৎকালীন প্রশাসক খোরশেদ আলম চৌধুরীকে মন্ত্রণালয়ে তলব করেন। সেবার মান নিয়ে কোনো ধরনের আপস হবে না বলে দুই প্রশাসককে তখন তিনি হুঁশিয়ার করেছিলেন।
এ বিষয়ে স্থানীয় সচিব আবু আলম মোহাম্মদ শহীদ খান বলেন, নাগরিক সেবার মান উন্নয়নে দ্রুত জনবল নিয়োগ, রাজধানীর ভাঙাচোরা ও বেহাল সড়কগুলো দ্রুত সংস্কারের প্রশাসকদের তাগিদ  দেয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বিকল সড়ক বাতি ঠিক করা, মশা নিধন এবং রাজধানীর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা আরো আধুনিকায়নে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশও দেয়া হয়। এছাড়া সেবার মান নিশ্চিত করতে দু’সিটি কর্পোরেশনের কর্মকর্তাদের কিছু নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। একই সঙ্গে তাদের যেসব সমস্যা রয়েছে মন্ত্রণালয় থেকে  দ্রুত তা সমাধানের আশ্বাস দেয়া হয়েছে।
http://manobkantha.com/details_news.php?id=93720&&+page_id=+6

No comments: