ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল সুন্দরবনের সৌন্দর্য রয়েল বেঙ্গল টাইগার। সুন্দরবনের কালো হলুদের ডোরাকাটা বাঘ আজ অসহায় ও বিপণœ। প্রতিবছরই কমছে বাঘের সংখ্যা। আর এতে শংকিত বাঘ বিশেষজ্ঞরা।
সম্প্রতি সাতক্ষীরার শ্যামনগরের লোকালয়ে চলে আসে সুন্দরবনের একটি বাঘ। এতে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হয়, খাবারের অভাবে বাঘটি লোকালয়ে চলে এসেছে। পরে এলাকাবাসী জানতে পারে, বাঘটি আসলেই চলৎশক্তিহীন ও অসুস্থ। এরপর আর ওই বাঘের কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি।
শ্যামনগরের একাধিক বাওয়ালী ও জেলে, যাদের জীবিকার সন্ধান দিয়েছে সুন্দরবন, তাদের মধ্যে কৃপা মণ্ডল, যোগেন মণ্ডল (শরীরে বাঘের থাবার ক্ষতচিহ্ন আছে, বাঘের মুখে পড়েছেন তিনবার), আজান খাঁ, মধু খাঁসহ অনেক বাওয়ালি জানান, বনে হরিণ ও বাঘ শিকারিদের একাধিক সংঘবদ্ধ চক্র রয়েছে। যারা সুন্দরবনের চারটি রেঞ্জেই তৎপর। তবে শরণখোলা, সাতপাই ও সাতক্ষীরা রেঞ্জে এসব চোরাশিকারির বিচরণ অবাধ। এরা হরিণ শিকার করে মাংস ও চামড়া বিক্রি করলেও, এদের মূল লক্ষ্য বাঘ। পুরনো সব কৌশলের পাশাপাশি নতুন কৌশলও কাজে লাগান এসব বাঘ শিকারি। তারা বনের মধ্যে মাংসের সঙ্গে বিষ মিশিয়ে রাখেন। আর তা খেয়েই অসুস্থ হয়ে পড়ে বাঘ। তখন বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত বাঘটিকে চোখে চোখে রাখে ওই শিকারিরা। বাঘটি মারা গেলে, তার শরীর থেকে চামড়া ছাড়িয়ে বিক্রি করে। এক একটি চামড়া বিক্রি হয় ১৪ থেকে ২৫ লাখ টাকায়।
খুলনা বন বিভাগের কর্মকর্তা ফারুক হোসেন অবশ্য বলেছেন, ‘ব্যাপারটি জানা নেই। তবে বাঘের অসুখ-বিসুখ, খাদ্য সংকট, প্রজনন সমস্যার কথা জানি।’
বাঘ শিকারিরা অপ্রতিরোধ্য। এদের কাছে বনরক্ষীদের চেয়েও ভারি অস্ত্র রয়েছে। তারা অনেক ক্ষমতাধর। সরকারের উচ্চ পর্যায়েও তাদের যোগাযোগ আছে। ফলে আইন প্রয়োগকারী বাহিনীগুলোও তাদের ঘাটায় না। সুন্দরবনকে ঘিরে বনদস্যুদের আলাদা রাজনীতি রয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন স্থানীয় রাজনীতিক ও পরিবেশকর্মী আবুল হোসেন। তিনি জানান, বনে এত টাকার ছড়াছড়ি। এ অঞ্চলে বনদস্যুদের অনেকগুলো গ্রুপ রয়েছে। এর মধ্যে গাজী বাহিনী, কালু বাহিনী, গহর বাহিনী ও মোস্তাফিজুর বাহিনী ভয়ংকর। সরকার পরিবর্তন হলেও এরা টিকে থাকে দিনের পর দিন। কেউ ছুঁতে পারে না।
বাঘ আমাদের জাতীয় পশু। বন উজাড় হওয়া এবং নির্বিচারে বাঘ নিধনের ফলে প্রাণীটি আজ বিপণেœর তালিকায়। বাঘের বৈরী পরিবেশের জন্য নানামুখী কারণে মধ্যে রয়েছে, বাঘের খাবার কমে যাওয়া, প্রজনন এলাকা কমে যাওয়া, বন ধ্বংস এবং বনে শব্দ-উৎপাত। এ ছাড়া চোরা শিকারিদের দস্যুপনা ও পশুত্বের কাছেও হেরে যাচ্ছে সুন্দরবনের বাঘ।
বন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, ২০০১ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত শুধু পূর্ব সুন্দরবনেই মারা গেছে ১৬টি বাঘ। এর মধ্যে সাতটি মারা পড়েছে ঘূর্ণিঝড় সিডর ও স্থানীয় লোকজনের হাতে। ১৯৮০ থেকে ২০১১ সালের জুলাই পর্যন্ত সুন্দরবনে বিভিন্ন কারণে মারা গেছে ৬১টি বাঘ। বেসরকারি বিভিন্ন সূত্রের তথ্যমতে, শতাধিক বাঘ মারা গেছে। বাংলাদেশে বাঘের প্রকৃত সংখ্যা কত তার সঠিক তথ্য কারো কাছে নেই।
তবে ১৯৭৫ সালে ইউরোপীয় বাঘ বিশেষজ্ঞ হেন্ডরিস সুন্দরবনে প্রথম বন্যপ্রাণীর শুমারি করেছিলেন। সেই শুমারিতে জানা গিয়েছিল, সুন্দরবনে ৩৫০টি রয়েল বেঙ্গল টাইগার রয়েছে।
আর ১৯৮২ সালের জরিপে ৪২৫ এবং ১৯৮৪ সালের জরিপে ৪৩০-৪৫০টি বাঘের উপস্থিতির কথা বলা হয়েছিল। ১৯৯২ সালে বন বিভাগের পর্যবেক্ষণে বাঘের সংখ্যা কমে গেছে বলে জানানো হয়। এ পর্যবেক্ষণে বলা হয়, সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা ৩৫৯টি। ১৯৯৩ সালে নেপালের বন্যপ্রাণী বিশারদ ড. কেএম তামাং সুন্দরবনে আরেকটি শুমারি চালান। এ শুমারিতে বলা হয়, বাঘের সংখ্যা ৩৬২টি।
অন্যদিকে বাংলাদেশ ওয়াইল্ড লাইফ ট্রাস্টের মতে, সুন্দরবনের বাংলাদেশ অংশে বাঘ রয়েছে ৩০০ থেকে ৫০০টি। আর ভারতীয় অংশের সুন্দরবনে ৬৫ থেকে ৯৫টি বাঘ রয়েছে।
বাঘের সঠিক সংখ্যা নিরুপণের চেয়ে প্রাণীটির অস্তিত্ব রক্ষা আজ জরুরি হয়ে পড়েছে। বাঘ নিধন বন্ধে এখনই সরকারি উদ্যোগ নিতে হবে। রক্ষা করতে হবে বিপন্ন প্রজাতির এই প্রাণীটির অস্তিত্ব। না হলে আমাদের জাতীয় সম্পদ বাঘ অচিরেই বিলুপ্ত হয়ে যাবে।
No comments:
Post a Comment