Monday, November 26, 2012

এক ড্রামে একই উপাদানে হরেক নামের প্রসাধনী

লেখক: আবুল খায়ের  |
একটি ড্রামে একই উপাদান দিয়ে তৈরি হতো প্রসাধনী। তারপর বিভিন্ন নামে বিভিন্ন মোড়কে বাজারজাত করা হতো প্রসাধনীগুলো। এভাবেই ত্বক ফর্সাকারী ক্রিম বলে বাজারে বিভিন্ন নামে বিভিন্ন ক্রিম ছেড়েছে বোটানিক এ্যারোমা। প্রসাধনীর নামে সাধারণ মানুষের সঙ্গে করতো প্রতারণা। সমপ্রতি মোবাইল কোর্ট কেরানীগঞ্জে বোটানিক এ্যারোমার কারখানায় অভিযান চালিয়ে প্রতারণার এমন চিত্র দেখে।
তাদের কোন কেমিস্ট নেই, নেই অভিজ্ঞ জনবল। আছে একদল প্রতারক। একটি ড্রামের মধ্যে আটা, ময়দা ও নানা ধরনের গুঁড়ার সঙ্গে মার্কারি, হাইড্রোকুইনন ও স্টেরয়েড জাতীয় দ্রব্য মেশানো হত। ড্রামভর্তি বিষাক্ত মিশ্রণে ব্যবহার করা হতো ভিন্ন সুগন্ধী। তারপর বিভিন্ন টিউব কিংবা কৌটায় তা ভরা হত। সঙ্গে সঙ্গে হয়ে যেতো হরেক নামের ক্রিম। ফেয়ারনেস ক্রিম, ব্লাক ডায়মন্ড ক্রিম, নাইট কুইন ক্রিম ও জেন্টস স্পট আউট ক্রিমসহ হরেক নামে বাজারজাত করা হতো এই ক্রিম। গ্রেফতারকৃত বোটানিক এ্যারোমার মালিক আসাদুজ্জামান লিটন  এই বিষাক্ত ক্রীম তৈরি, বাজারজাতকরণের এমন তথ্য জানিয়েছেন মোবাইল কোর্টকে।
এদিকে দেশের বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকরা জানিয়েছেন, শুধু বোটানিক এ্যারোমা নয়, বাজারে ‘ত্বক ফর্সাকারী’ ৯৯ ভাগ হারবাল প্রসাধনীতে মার্কারি, হাইড্রোকুইনন ও স্টেরয়েডসহ নানা রাসায়নিকের মিশ্রণ ব্যবহার হয়। আর এ কারণেই দেশে চামড়ায় ক্যান্সার আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা আশংকাজনক হারে বেড়েছে।
এদিকে মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর ক্রিমসহ বিভিন্ন নকল, ভেজাল ও মেয়াদোত্তীর্ণ প্রসাধনীর বিরুদ্ধে বিএসটিআই সোমবার অভিযান শুরু করেছে। গতকাল সোমবার দৈনিক ইত্তেফাকে ‘প্রসাধনীর আড়ালে প্রতারণা’ শীর্ষক সংবাদ প্রকাশ হওয়ার পর ভুক্তভোগী অনেক নারী-পুরুষ ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করছেন।
পুরান ঢাকার উর্মি নামে এক তরুণী বলেন, চার মাসের অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন তিনি। নিয়মিত ত্বকে ক্রিম ব্যবহার করতেন। হঠাত্ তার গর্ভপাত হয়। গাইনি বিশেষজ্ঞরা তাত্ক্ষণিক কোনো কারণ খুেঁজ পাননি। বিষাক্ত ক্রিমের কারণে তার গর্ভপাত হয় বলে পরে গাইনি চিকিত্সকরা তাকে জানিয়েছিলেন। তার মতো আর কোনো নারীর যাতে এ অবস্থা না হয় সেজন্য বিষাক্ত ক্রিম প্রস্তুতকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার জন্য সরকারের প্রতি আহবান জানান তিনি।
শ্রমিক থেকে কোটি কোটি টাকার মালিক লিটন
বোটানিক এ্যারোমার মালিক আসাদুজ্জামান লিটন দুই বছর আগেও ছিলেন একজন সাধারণ শ্রমিক। তার গ্রামের বাড়ি মাদারীপুরে। বাড়ির আশপাশের লোকজনের সঙ্গে আলাপ করে তার সম্পর্কে পাওয়া গেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। সেই লিটন প্রসাধনী প্রতারণা করে এখন কোটি কোটি টাকার মালিক। চড়েন কোটি টাকা দামের গাড়িতে। মাত্র দুই বছরেই ‘আঙ্গুল ফুলে কলা গাছ’ দশা হয়েছে তার। হয়েছেন ‘জিরো থেকে হিরো’।
মোবাইল কোর্টকে লিটন জানান, ১৫ টাকা দামের ক্রিম তিন হাজার টাকায় কখনো এর চেয়ে বেশি দামেও তিনি বিক্রি করতেন।
ইত্তেফাকের মাদারীপুর প্রতিনিধি জানান, মাদারীপুর জেলার সদর উপজেলার ঘটকচর গ্রামের মৃত তফেল মাতাব্বরের ছেলে আসাদুজ্জামান লিটন। তারা তিন ভাই। লিটন সবার ছোট। বাবা নয়াবাজার এলাকায় রং মিস্ত্রীর কাজ করতেন। লিটনের বড় ভাই এসকেন মাতাব্বর একজন ভ্যান চালক। দুই বছর আগেও এলাকায় ভ্যান চালাতেন তিনি। লিটনের বাবা চরম অর্থকষ্টে মারা যান।
মেঝো ভাই মোস্তফা মাতাব্বর ও লিটন ঢাকায় একটি কসমেটিক কারখানায় শ্রমিক ছিল। দুই বছর আগে দুই ভাই বোটানিক এ্যারোমা নামে বিষাক্ত ক্রিম উত্পাদন করে বাজারজাত শুরু করে। এক ড্রাম ভর্তি বিষাক্ত ক্রিম বিক্রি হয় কোটি টাকায়। খরচ হয় মাত্র কয়েক হাজার টাকা। দুই বছরে হাজার হাজার কোটি টাকার মালিক হয়েছে তারা। দুই বছরে গ্রামের বাড়িতে বিলাসবহুল ভবন দিয়েছেন তিনি। মাদারীপুর সদর উপজেলা, কোটালিপাড়া ও রাজৈর উপজেলায় ৫৬ একর, কেরানীগঞ্জ থেকে মাওয়া পর্যন্ত ৫শ বিঘা জমি এবং ঢাকায় রয়েছে আলিসান অফিস ও বাসা। দুই বছরে তার এতো পরিবর্তন দেখে এলাকাবাসী বলতো আলাদিনের চেরাগ পেয়েছে লিটন।
এলাকার কোনো অনুষ্ঠানে কিংবা ‘সমাজ কল্যাণ কর্মসূচিতে’ এক কোটি টাকার নিচে লিটন অনুদান দেয় না। আগামী ৫ ডিসেম্বর ঘটকচর উচ্চ বিদ্যালয়ের এক অনুষ্ঠানে লিটনের প্রধান অতিথি হিসাবে অংশগ্রহণ করার কথা। ওই অনুষ্ঠানে ঢাকা থেকে নামিদামি গায়কা-গায়িকা ও মডেল তারকাদের যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু গত শনিবার র্যাব ও মোবাইল কোর্ট বোটানিক এ্যারোমার কেরানীগঞ্জের কারখানায় অভিযান চালিয়ে আসাদুজ্জামান লিটন ও তার স্ত্রী ফেরদৌসী জামানসহ ১৪ জনকে আটক করে।
পকেট ভারী হয়েছে আরো অনেকের
একশ্রেণীর রাজনৈতিক নেতাকে মোটা অংকের মাসোহারা দিতেন লিটন। ঐসব নেতাকেও কোটিপতি বানিয়েছেন তিনি। বিএসটিআইয়ের অনুমোদন নিয়েই বোটানিক এ্যারোমা স্কিন ক্রিম উত্পাদন ও বাজারজাত করেছেন লিটন। ঘুষ দিয়ে বিএসটিআইয়ের কাছ থেকে এ সুযোগ নেন। এ কারণে বিষাক্ত প্রসাধনীটি গ্রামে গ্রামে ছড়িয়ে পড়ে।
লিটনের ইচ্ছা ছিল এমপি হওয়ার
লিটনের স্বপ্ন ছিল তিনি আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবেন। এজন্য এলাকায় প্রচুর টাকা ছড়াচ্ছিলেন। কিন্তু এক প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা লিটনকে বলেন, তোমার আগের অবস্থার কথা মনে করো। টাকা হলেই সবকিছু হওয়া যায় না। এরপর তিনি এমপি হওয়ার ইচ্ছা আপাতত ত্যাগ করেন। লিটনের এক ঘনিষ্ঠ আত্মীয় এ তথ্য জানান।
ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. আকরাম হোসেন বলেন, বেশকিছু প্রতিষ্ঠান ত্বক ফর্সাকারী ক্রিমের নামে মার্কারি, হাইড্রোকুইনন ও স্টেরয়েডসহ বিভিন্ন কেমিক্যাল সংমিশ্রণে বিষাক্ত ক্রিম তৈরি করে বাজারজাত করে আসছে। কামিয়ে নিচ্ছে কোটি টাকা। দেখার কেউ নেই। জাতিকে উপহার দিচ্ছে মরণব্যাধি। ওষুধ প্রশাসনের এক কর্মকর্তা বলেন, কসমেটিক্স নিয়ন্ত্রণে কোন আইন নেই। যার কারণে যার যা খুশি বিষাক্ত ক্রিমসহ হারবালের প্রসাধনী বাজারে ছাড়ছে।
http://new.ittefaq.com.bd/news/view/173391/2012-11-20/1

No comments: