লাশ
কাটা হয় গরু কাটার ছোরা ও হাতুড়ি দিয়ে যুগ যুগ ধরে; ফরেনসিক চিকিত্সকরা
পড়তে আসছেন না। নেই কোন সুযোগ-সুবিধা; অভিজ্ঞ চিকিত্সকের তীব্র সংকট।
সারাদেশে একজন অধ্যাপক...
আবুল খায়ের
দেশে
ময়না তদন্ত অর্থাত্ লাশ কাটার ব্যবস্থাপনা চরমভাবে অবহেলিত। যুগ যুগ ধরে এ
অব্যবস্থাপনা চলে আসছে। মৃত্যুর পর লাশটি যত্ন করে রাখার ব্যবস্থা নেই
মর্গে। অসম্মান ও অব্যবস্থাপনায় রাখা হয় লাশ। বেশিরভাগ লাশ কাটার পর
জরাজীর্ণ, ময়লা-আবর্জনার সাথে একাকার হয়ে যায়। খোদ রাজধানীর সরকারি একটি
মেডিক্যাল কলেজ মর্গের এ করুণ অবস্থা। সেটা হলো স্যার সলিমুল্লাহ
মেডিক্যাল কলেজ। সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজে ফরেনসিক বিভাগ থাকলেও মর্গ
নেই। সেখানে ছাত্রছাত্রীদের দুরবস্থায় পড়তে হয়। লাশ কাটার আধুনিক কোন
যন্ত্রপাতি নেই। গরুর চামড়া কাটার ভোঁতা ছোরা ও হাতুড়ি দিয়ে ডোম
একপ্রকার যুদ্ধ করে লাশ কাটছেন প্রতিদিন। দেশের সরকারি
কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সুযোগ সুবিধা বাড়ছে। বেশিরভাগ খাতে আধুনিক
ব্যবস্থাপনা হয়েছে। ক্যাডার সার্ভিসের কর্মকর্তাদের সুযোগ-সুবিধা বেড়েছে।
মন্ত্রী, এমপি ও সচিবরা দামি গাড়ি এবং সরকারি সুন্দর বাড়িতে বসবাস করছেন।
এগুলো রক্ষণাবেক্ষণে প্রতি বছর সরকারি খাতে কোটি কোটি টাকা ব্যয় হচ্ছে।
সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে চুনকাম মেরামতসহ বিভিন্নভাবে কোটি কোটি টাকা
লোপাট হচ্ছে। অথচ মর্গের কোন উন্নয়ন হচ্ছে না।
ঘটনা দুর্ঘটনা কিংবা অস্বাভাবিক মৃত্যুর শিকার ভিক্ষুক থেকে নামিদামী শিল্পপতিসহ সকল শ্রেণির ব্যক্তির লাশ অব্যবস্থাপনায় জরাজীর্ণ লাশ কাটার কক্ষে নেয়া হয়। লাশের ওপর চলে ময়না তদন্তের নামে এক ধরনের নির্যাতন। মর্গে মন্ত্রী, এমপি, শীর্ষ কর্মকর্তাসহ সকল পেশার লোকজন প্রায়ই যাচ্ছেন নিহত স্বজনদের লাশ দেখতে। কিন্তু তারা একবারও ভাবেননি যে, কমপক্ষে লাশ কাটার ঘরটি যেন সুন্দর ও আধুনিক পরিবেশের হয়। এ দেশে একমাত্র ময়না তদন্ত ব্যবস্থাপনার এক চুল পরিমাণ উন্নতি হয়নি। বরং অবনতি ঘটছে। এমন তথ্য জানিয়েছেন ময়না তদন্তকারী চিকিত্সকরা। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ ও স্যার সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজ মর্গে গিয়ে এই অব্যবস্থাপনার চিত্র দেখা যায়। তবে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে লাশ কাটার ঘর কিছুটা উন্নত। সামান্য বৃষ্টি হলেই সামনে জমে হাঁটু পানি। এছাড়া দেশের সকল লাশ কাটার ঘর জরাজীর্ণ এবং গোয়ালঘরের চেয়েও খারাপ অবস্থা বলে ডোমরা জানিয়েছেন। শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় লাশ না রাখলে গরমে লাশ গলে যায়। গলিত লাশের ময়না তদন্ত করে সঠিক মৃত্যুর কারণ নির্ণয় করা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সম্ভব হয় না। শুধু ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ মর্গ ব্যতীত আর কোন মর্গে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা নেই। একজন চিকিত্সক বলেছেন, যেখানে লাশ কাটার ঘর নেই, আলো নেই, বাতি নেই সেখানে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা আশা করা যায় না।
ময়না তদন্তকারী ১০ জন চিকিত্সক ইত্তেফাকের এ প্রতিনিধিকে বলেন, ভিক্ষুকরাও একটা নিয়মনীতি মেনে চলে, কিন্তু ময়না তদন্ত ব্যবস্থাপনায় তাও নেই। এ পেশায় জড়িত চিকিত্সকদের মরা মানুষের ডাক্তার বলা হয়। তাদের কোন প্রাইভেট প্র্যাকটিস নেই। এসব ডাক্তারের কাছে রোগীরা যেতে চান না। সরকারি ছুটির দিনেও প্রায় দুই থেকে তিনবার মর্গে ময়না তদন্ত করতে আসতে হয়। নেই কোন যানবাহন এবং নিজের টাকা যাতায়াতে ব্যয় করতে হয়। ময়না তদন্ত আইনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। প্রতিটি মামলায় ময়না তদন্তকারী চিকিত্সককে আদালতে হাজিরা দিতে যেতে হয়। টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া পর্যন্ত আদালতে হাজিরা থাকে ঐসব চিকিত্সকের। নেই কোন আর্থিক সুবিধা এবং নিরাপত্তার ব্যবস্থা। আদালতে সাক্ষী দিতে গেলে কারো পক্ষে যায়, আবার কারো বিরুদ্ধে। এসব কারণে বর্তমানে ফরেনসিক বিষয়ে ডাক্তাররা পড়তে নিরুত্সাহিত হচ্ছেন।
মেডিকো লিগ্যাল সোসাইটি অব বাংলাদেশের মহাসচিব ডা. সোহেল মাহমুদ বলেন, সরকারি মেডিক্যাল কলেজ ফরেনসিক বিভাগগুলোতে ৩২ জন অধ্যাপক পদে মাত্র একজন অধ্যাপক। তিনি হচ্ছেন স্যার সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজ ফরেনসিক বিভাগের অধ্যাপক ডা. প্রণব কুমার চক্রবর্তী। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজসহ আর কোন মেডিক্যাল কলেজে অধ্যাপক নেই। সহকারী অধ্যাপকরা বিভাগীয় প্রধান কিংবা অধ্যাপকের পদে দায়িত্ব পালন করছেন। এ অব্যবস্থাপনা চলতে থাকলে ফরেনসিক বিষয়ে ভবিষ্যতে কোন বিশেষজ্ঞ পাওয়া যাবে না। অব্যবস্থাপনার মধ্যে জটিল ময়না তদন্ত নিয়ে সমস্যা সৃষ্টি হয়। লাশ কাটার নেই আধুনিক যন্ত্রপাতি। বিশ্বের যেকোন দেশে একটি লাশ ময়না তদন্ত করলে ঐ চিকিত্সকের জন্য নির্ধারিত টাকা বরাদ্দ রয়েছে। এছাড়া রয়েছে যানবাহন ও নিরাপত্তাসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা। মর্গগুলোতে বিলাসবহুল অত্যাধুনিক ব্যবস্থাপনা রয়েছে। লাশ রাখার ও আনা-নেয়ার শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা রয়েছে। ন্যায়বিচারের স্বার্থে এ ব্যবস্থাপনা সবচেয়ে গুরুত্ব দেয়া হয়। মর্গে প্যাথলজি, ডিএনএ ল্যাবসহ বিভিন্ন ধরনের আধুনিক পরীক্ষার ব্যবস্থা বিদেশে রয়েছে। এদেশে লাশ কাটার টেবিল পর্যন্ত নেই বলে উক্ত চিকিত্সক জানান।
ডোমরা বলেন, তাদের কারো পাঁচ পুরুষ পর্যন্ত লাশ কেটে গেছেন। ঐ ছোরা দিয়ে লাশ কেটে আসছেন এখনও। টেবিল নেই। মেঝেতে ফেলে শক্তি প্রয়োগ করে ভোঁতা ছোরা ও হাতুড়ি দিয়ে লাশ কেটে আসছেন তারা। ঢাকার বাইরে মেডিক্যাল কলেজগুলোর মর্গের অবস্থা আরও করুণ। জেলা পর্যায়ে লাশ কাটার ঘরে অনেক জায়গা নেই। ভাঙ্গা, জরাজীর্ণ ডাস্টবিনের পাশে কোনরকমে মাটিতে রেখে লাশ কাটা হচ্ছে বছরের পর বছর। দেখার কেউ নেই। সে চিত্র ইত্তেফাকের প্রতিনিধিরা জানিয়েছেন। ইতিমধ্যে মন্ত্রী পরিষদ বৈঠকে স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডা. আ ফ ম রুহুল হক ময়না তদন্তের অব্যবস্থাপনার চিত্র তুলে ধরে দ্রুত এর প্রতিকার চেয়েছেন। অন্যথায় ফরেনসিক বিষয়ে কোন ডাক্তার পাওয়া যাবে না বলে তিনি সতর্ক করেছেন। গতকাল শুক্রবার স্বাস্থ্যমন্ত্রী ইত্তেফাককে বলেন, ন্যায়বিচারের স্বার্থে দ্রুত ময়না তদন্ত ব্যবস্থাপনা উন্নয়নে জরুরি পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে।
চট্টগ্রাম মেডিক্যালে ময়না তদন্ত রিপোর্টে দীর্ঘসূত্রতা : মুহাম্মদ নিজাম উদ্দিন, চট্টগ্রাম অফিস: চট্টগ্রাম মেডিক্যালে ফরেনসিক বিভাগের অধীনে একটি আধুনিক মর্গ চালু হলেও দীর্ঘ সময়েও ময়না তদন্তের জন্য স্বয়ংসম্পূর্ণ ল্যাবরেটরী নির্মিত হয়নি। বাড়েনি পর্যাপ্ত জনবল ও চিকিত্সকদের বাড়তি সুযোগ-সুবিধা। নিজস্ব ল্যাবরেটরী না থাকায় মেডিক্যাল কলেজের প্যাথলজি, রেডিওলজি বিভাগ ও পুলিশের ল্যাবে পরীক্ষা করতে হচ্ছে। এতে লাশের ময়না তদন্তের রিপোর্ট নিয়ে বিলম্ব ও হয়রানির অভিযোগ পাওয়া গেছে। ফরেনসিক বিভাগ জানায়, মর্গে লাশ রাখার ৩টি ফ্রিজের মধ্যে একটি দীর্ঘদিন ধরে নষ্ট। বাকি দু'টি ফ্রিজে ২০টি লাশ রাখা যায়। মর্গের ফ্রিজে লাশ রাখতে হলে প্রতিটি লাশের জন্য দৈনিক ১ হাজার টাকা ভাড়া দিতে হয়। লাশের সুরতহাল করার জন্য একজন মাত্র লোক রয়েছে। অথচ প্রতিদিন কমপক্ষে ৫/৬টি লাশের সুরতহাল করতে হয়। যা একজন লোকের পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। যন্ত্রপাতি নেই। শুধু ভবন নির্মাণ হয়েছে।
ফরেনসিক বিভাগ জানায়, জনবলের ৭টি পদের মধ্যে ৬ জন চিকিত্সক কর্মরত রয়েছেন। এসব চিকিত্সককে মেডিক্যাল কলেজে শ্রেণি কার্যক্রমের পাশাপাশি ময়না তদন্ত রিপোর্টের কাজও করতে হচ্ছে। অতিরিক্ত কাজের জন্য কোন ওভারটাইম দেয়া হয় না। আবার বিভিন্ন মামলায় চিকিত্সকদের আদালতে সাক্ষী দিতে যেতে হয়। এজন্য কোন যাতায়াত ভাতা দেয়া হয় না। এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজের ফরেনসিক বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. সৈয়দ মোহাম্মদ কাসেম ইত্তেফাককে বলেন, 'ফরেনসিক বিভাগে চিকিত্সকের আরো অন্তত ১০টি পদ সৃষ্টি করা প্রয়োজন। চিকিত্সকদের সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো প্রয়োজন। মর্গকে স্বয়ংসম্পূর্ণ করতে একটি অত্যাধুনিক ল্যাবরেটরী স্থাপন অত্যন্ত জরুরি।'
বরিশালে ফরেনসিক বিভাগের ভবন এক বছর ধরে অব্যবহূত : লিটন বাশার, বরিশাল অফিস:কোন ডোম নেই শেরেবাংলা মেডিক্যাল কলেজে। জেলার ১৩টি থানা থেকে গড়ে প্রতি মাসে ২৫ থেকে ৩০টি লাশ আসে ময়না তদন্তের জন্য। এসব লাশের কাটা-ছেঁড়া করেন চুক্তি ভিত্তিক নিয়োগ দেয়া ৩ ঝাড়ুদার। লাশ কাটার জন্য অধিকাংশ ক্ষেত্রেই খরচ বহন করতে হয় লাশ নিয়ে আসা পরিবারের সদস্যদের। চিকিত্সক, সরঞ্জামাদি ও জনবল সংকটের কারণে যখন পুরনো লাশ কাটা ঘর ও ফরেকসিক বিভাগ পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়েছে তখন কোটি টাকা ব্যয়ে নবনির্মিত ভবনের কার্যক্রম অনিশ্চয়তায় পড়েছে।
১৯৮৪ সালে এ মেডিক্যাল কলেজে ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগ (মর্গ ও মৃতদেহ সংরক্ষণ কক্ষ) চালু করা হয়। শুরু থেকেই মর্গে লাশ কাটার জন্য ডোম পদটি তত্কালীন এডহক কমিটি বাতিল করে বলে দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তা জানান। বর্তমানে ঝাড়ুদার বাবুল, সিবু, বসন্ত ও বিজয় ডোম হিসেবে লাশ কাটার কাজ করছেন। ৩ জনের মধ্যে বিজয় সুইপার পদে সরকারি বেতন পান। বাকি দুজন মৃতব্যক্তির স্বজনদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে কাজ করেন। মাঝে মধ্যে বেওয়ারিশ লাশ এলে পুুলিশের পকেট থেকে সামান্য বকশিস দেয়া হয় এ দুজনকে। তা না হলে লাশ পড়ে থাকে সেই লাশকাটা ঘরের মধ্যেই। চিকিত্সক, যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জামাদির অভাবে নতুন ভবন চালু করা সম্ভব হচ্ছে না বলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়। ফরেনসিক বিভাগের অধ্যাপকের পদ শূন্য। সহযোগী অধ্যাপক পদ শূন্য, সহকারী অধ্যাপক ও প্রভাষকের ৩টি করে পদের বিপরীতে আছেন মাত্র একজন করে। বাকি সকল পদই শূন্য হয়ে আছে দীর্ঘদিন ধরে।
ফরেনসিক বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. আখতারুজ্জামান জানান, প্রয়োজনীয় চাহিদাপত্র প্রায় এক বছর পূর্বে পাঠানো হলেও বরাদ্দ পাওয়া যায়নি। এছাড়াও ডোম সংকটের কারণেই কাজে বিঘ্ন সৃষ্টি হচ্ছে।
রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজের শুধু নেই আর নেই :আনিসুজ্জামান, স্টাফ রিপোর্টার, রাজশাহী অফিস:রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজের (রামেক) ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগে শুধু নেই আর নেই। অভিজ্ঞ বিশেষজ্ঞ চিকিত্সক নেই। পর্যাপ্ত আধুনিক যন্ত্রপাতি নেই। চিকিত্সকদের অতিরিক্ত পারিশ্রমিক নেই। লাশ অক্ষত রাখার ডিপ ফ্রিজ নেই। এমনকি লাশকাটার ডোম পর্যন্ত নেই।
জানা গেছে, রামেক ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগ চলছে কার্যত একজন সহকারী অধ্যাপক দিয়ে। দুইজন অভিজ্ঞ ও বিশেষজ্ঞ সহকারী অধ্যাপক ডা. এমদাদুর রহমান ও ডা. মনসুর রহমান ২০১১ সালে অবসরে যাবার পর গুরুত্বপূর্ণ বিভাগটিতে লাশের ময়না তদন্তসহ শিক্ষা ও পরীক্ষার কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। রামেক ফরেনসিক বিভাগে ময়না তদন্তের জন্য লাশকাটার কাজ করেন রনি ও সনি ডোম। তারা কেউই কর্তৃপক্ষের নিয়োগকৃত নয়। বলা যায়, স্বেচ্ছায় চাকরি। তাদের বাবা অবিনাশ স্বেচ্ছায় কাজ করতে করতে মারা গেছেন।
সিলেট ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ মর্গের অবস্থা বেহাল :সিলেট অফিস:দীর্ঘদিন থেকে সিলেট ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের অবস্থা করুণ। গত দুবছর আগে নতুন একটি বহুতল ভবন তৈরি হলেও সেটিতে কোন কার্যক্রম চালু করা যাচ্ছে না। বর্তমানে এ বিভাগে প্রয়োজনীয় লোকবলের অভাব রয়েছে। যেখানে ২ জন ডোম থাকার কথা সেখানে একজনও নেই। কাজ চলে ৪র্থ শ্রেণির কর্মচারীদের সাহায্যে। অধ্যাপক, সহযোগী অধ্যাপক, লেকচারার সংকট লেগেই রয়েছে। নানা সমস্যা সংকট আর হতাশার মধ্য দিয়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে এই গুরুত্বপূর্ণ বিভাগটি।
সরেজমিন পরিদর্শনকালে দেখা যায় এ বিভাগের ময়না তদন্তের কক্ষটিতে ভৌতিক অবস্থা বিরাজ করছে। সেই কবে যে কংক্রিট দিয়ে একটি টেবিল তৈরি করা হয়েছিল লাশকাটার জন্য। লাশকাটার টেবিলটি এ যুগে যে কত অচল তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। বিভাগীয় শহরে সিলেট ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের ময়না তদন্ত কক্ষে একটি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত যন্ত্র নেই তা অনেকেই ভাবতে পারেন না। প্রায় সময় লাশ রাখতে হয় ওসমানী হাসপাতালে অথবা ডায়বেটিস বিভাগের মর্চুয়ারিতে।
সমস্যা জর্জরিত রংপুর মেডিক্যাল কলেজ ফরেনসিক বিভাগ :রংপুর থেকে ওয়াদুদ আলী:নানা সমস্যায় জর্জরিত রংপুর মেডিক্যাল কলেজ ফরেনসিক বিভাগ। পাশাপাশি চলছে লাশ নিয়ে বাণিজ্য। ফরেনসিক বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. মোস্তাক রহিম স্বপন ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ড্যাব) কেন্দ্রীয় কোষাধ্যক্ষের পদে থাকায় তিনি প্রায় সময় ঢাকায় অবস্থান করেন। সপ্তাহে একদিন তিনি রংপুরে এসে দায়িত্ব পালন করেন। ফরেনসিক বিভাগে ১ জন সহকারী অধ্যাপক ও ১ জন প্রভাষকের পদ শূন্য রয়েছে।
এদিকে রংপুর মেডিক্যাল কলেজের ৪র্থ শ্রেণির এক নেতার নেতৃত্বে ৪ সদস্যের এমএলএসএস কর্মচারীর সিন্ডিকেট চিকিত্সকদের সহযোগিতায় ফরেনসিক বিভাগের অধীন লাশকাটা ঘরে দীর্ঘদিন ধরে লাশ নিয়ে বাণিজ্য করে আসছে। লাশকাটার জন্য সেখানে নেই পর্যাপ্ত যন্ত্রপাতি। পর্যাপ্ত আলো ও প্রয়োজনীয় রাসায়নিক দ্রব্যের অভাব রয়েছে। নেই মৃতদেহ কাটার জন্য কোন ব্লেড। চেয়ার-টেবিলসহ অন্যান্য আসবাবপত্রও নেই। ড্রেনেজ ব্যবস্থা না থাকায় সেখানকার পরিবেশ অস্বাস্থ্যকর হয়ে উঠেছে। লাশের ময়না তদন্ত করার জন্য ডোমের প্রয়োজন থাকলেও কোন ডোম নেই।
এ ব্যাপারে ফরেনসিক বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. মোস্তাক রহিম স্বপনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, ঢাকায় থাকলেও রংপুরের দায়িত্ব পালনে তার কোন অসুবিধা হচ্ছে না। সপ্তাহে তিনি ১ দিন রংপুরে আসেন বলে জানান।
ঘটনা দুর্ঘটনা কিংবা অস্বাভাবিক মৃত্যুর শিকার ভিক্ষুক থেকে নামিদামী শিল্পপতিসহ সকল শ্রেণির ব্যক্তির লাশ অব্যবস্থাপনায় জরাজীর্ণ লাশ কাটার কক্ষে নেয়া হয়। লাশের ওপর চলে ময়না তদন্তের নামে এক ধরনের নির্যাতন। মর্গে মন্ত্রী, এমপি, শীর্ষ কর্মকর্তাসহ সকল পেশার লোকজন প্রায়ই যাচ্ছেন নিহত স্বজনদের লাশ দেখতে। কিন্তু তারা একবারও ভাবেননি যে, কমপক্ষে লাশ কাটার ঘরটি যেন সুন্দর ও আধুনিক পরিবেশের হয়। এ দেশে একমাত্র ময়না তদন্ত ব্যবস্থাপনার এক চুল পরিমাণ উন্নতি হয়নি। বরং অবনতি ঘটছে। এমন তথ্য জানিয়েছেন ময়না তদন্তকারী চিকিত্সকরা। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ ও স্যার সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজ মর্গে গিয়ে এই অব্যবস্থাপনার চিত্র দেখা যায়। তবে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে লাশ কাটার ঘর কিছুটা উন্নত। সামান্য বৃষ্টি হলেই সামনে জমে হাঁটু পানি। এছাড়া দেশের সকল লাশ কাটার ঘর জরাজীর্ণ এবং গোয়ালঘরের চেয়েও খারাপ অবস্থা বলে ডোমরা জানিয়েছেন। শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় লাশ না রাখলে গরমে লাশ গলে যায়। গলিত লাশের ময়না তদন্ত করে সঠিক মৃত্যুর কারণ নির্ণয় করা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সম্ভব হয় না। শুধু ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ মর্গ ব্যতীত আর কোন মর্গে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা নেই। একজন চিকিত্সক বলেছেন, যেখানে লাশ কাটার ঘর নেই, আলো নেই, বাতি নেই সেখানে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা আশা করা যায় না।
ময়না তদন্তকারী ১০ জন চিকিত্সক ইত্তেফাকের এ প্রতিনিধিকে বলেন, ভিক্ষুকরাও একটা নিয়মনীতি মেনে চলে, কিন্তু ময়না তদন্ত ব্যবস্থাপনায় তাও নেই। এ পেশায় জড়িত চিকিত্সকদের মরা মানুষের ডাক্তার বলা হয়। তাদের কোন প্রাইভেট প্র্যাকটিস নেই। এসব ডাক্তারের কাছে রোগীরা যেতে চান না। সরকারি ছুটির দিনেও প্রায় দুই থেকে তিনবার মর্গে ময়না তদন্ত করতে আসতে হয়। নেই কোন যানবাহন এবং নিজের টাকা যাতায়াতে ব্যয় করতে হয়। ময়না তদন্ত আইনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। প্রতিটি মামলায় ময়না তদন্তকারী চিকিত্সককে আদালতে হাজিরা দিতে যেতে হয়। টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া পর্যন্ত আদালতে হাজিরা থাকে ঐসব চিকিত্সকের। নেই কোন আর্থিক সুবিধা এবং নিরাপত্তার ব্যবস্থা। আদালতে সাক্ষী দিতে গেলে কারো পক্ষে যায়, আবার কারো বিরুদ্ধে। এসব কারণে বর্তমানে ফরেনসিক বিষয়ে ডাক্তাররা পড়তে নিরুত্সাহিত হচ্ছেন।
মেডিকো লিগ্যাল সোসাইটি অব বাংলাদেশের মহাসচিব ডা. সোহেল মাহমুদ বলেন, সরকারি মেডিক্যাল কলেজ ফরেনসিক বিভাগগুলোতে ৩২ জন অধ্যাপক পদে মাত্র একজন অধ্যাপক। তিনি হচ্ছেন স্যার সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজ ফরেনসিক বিভাগের অধ্যাপক ডা. প্রণব কুমার চক্রবর্তী। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজসহ আর কোন মেডিক্যাল কলেজে অধ্যাপক নেই। সহকারী অধ্যাপকরা বিভাগীয় প্রধান কিংবা অধ্যাপকের পদে দায়িত্ব পালন করছেন। এ অব্যবস্থাপনা চলতে থাকলে ফরেনসিক বিষয়ে ভবিষ্যতে কোন বিশেষজ্ঞ পাওয়া যাবে না। অব্যবস্থাপনার মধ্যে জটিল ময়না তদন্ত নিয়ে সমস্যা সৃষ্টি হয়। লাশ কাটার নেই আধুনিক যন্ত্রপাতি। বিশ্বের যেকোন দেশে একটি লাশ ময়না তদন্ত করলে ঐ চিকিত্সকের জন্য নির্ধারিত টাকা বরাদ্দ রয়েছে। এছাড়া রয়েছে যানবাহন ও নিরাপত্তাসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা। মর্গগুলোতে বিলাসবহুল অত্যাধুনিক ব্যবস্থাপনা রয়েছে। লাশ রাখার ও আনা-নেয়ার শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা রয়েছে। ন্যায়বিচারের স্বার্থে এ ব্যবস্থাপনা সবচেয়ে গুরুত্ব দেয়া হয়। মর্গে প্যাথলজি, ডিএনএ ল্যাবসহ বিভিন্ন ধরনের আধুনিক পরীক্ষার ব্যবস্থা বিদেশে রয়েছে। এদেশে লাশ কাটার টেবিল পর্যন্ত নেই বলে উক্ত চিকিত্সক জানান।
ডোমরা বলেন, তাদের কারো পাঁচ পুরুষ পর্যন্ত লাশ কেটে গেছেন। ঐ ছোরা দিয়ে লাশ কেটে আসছেন এখনও। টেবিল নেই। মেঝেতে ফেলে শক্তি প্রয়োগ করে ভোঁতা ছোরা ও হাতুড়ি দিয়ে লাশ কেটে আসছেন তারা। ঢাকার বাইরে মেডিক্যাল কলেজগুলোর মর্গের অবস্থা আরও করুণ। জেলা পর্যায়ে লাশ কাটার ঘরে অনেক জায়গা নেই। ভাঙ্গা, জরাজীর্ণ ডাস্টবিনের পাশে কোনরকমে মাটিতে রেখে লাশ কাটা হচ্ছে বছরের পর বছর। দেখার কেউ নেই। সে চিত্র ইত্তেফাকের প্রতিনিধিরা জানিয়েছেন। ইতিমধ্যে মন্ত্রী পরিষদ বৈঠকে স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডা. আ ফ ম রুহুল হক ময়না তদন্তের অব্যবস্থাপনার চিত্র তুলে ধরে দ্রুত এর প্রতিকার চেয়েছেন। অন্যথায় ফরেনসিক বিষয়ে কোন ডাক্তার পাওয়া যাবে না বলে তিনি সতর্ক করেছেন। গতকাল শুক্রবার স্বাস্থ্যমন্ত্রী ইত্তেফাককে বলেন, ন্যায়বিচারের স্বার্থে দ্রুত ময়না তদন্ত ব্যবস্থাপনা উন্নয়নে জরুরি পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে।
চট্টগ্রাম মেডিক্যালে ময়না তদন্ত রিপোর্টে দীর্ঘসূত্রতা : মুহাম্মদ নিজাম উদ্দিন, চট্টগ্রাম অফিস: চট্টগ্রাম মেডিক্যালে ফরেনসিক বিভাগের অধীনে একটি আধুনিক মর্গ চালু হলেও দীর্ঘ সময়েও ময়না তদন্তের জন্য স্বয়ংসম্পূর্ণ ল্যাবরেটরী নির্মিত হয়নি। বাড়েনি পর্যাপ্ত জনবল ও চিকিত্সকদের বাড়তি সুযোগ-সুবিধা। নিজস্ব ল্যাবরেটরী না থাকায় মেডিক্যাল কলেজের প্যাথলজি, রেডিওলজি বিভাগ ও পুলিশের ল্যাবে পরীক্ষা করতে হচ্ছে। এতে লাশের ময়না তদন্তের রিপোর্ট নিয়ে বিলম্ব ও হয়রানির অভিযোগ পাওয়া গেছে। ফরেনসিক বিভাগ জানায়, মর্গে লাশ রাখার ৩টি ফ্রিজের মধ্যে একটি দীর্ঘদিন ধরে নষ্ট। বাকি দু'টি ফ্রিজে ২০টি লাশ রাখা যায়। মর্গের ফ্রিজে লাশ রাখতে হলে প্রতিটি লাশের জন্য দৈনিক ১ হাজার টাকা ভাড়া দিতে হয়। লাশের সুরতহাল করার জন্য একজন মাত্র লোক রয়েছে। অথচ প্রতিদিন কমপক্ষে ৫/৬টি লাশের সুরতহাল করতে হয়। যা একজন লোকের পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। যন্ত্রপাতি নেই। শুধু ভবন নির্মাণ হয়েছে।
ফরেনসিক বিভাগ জানায়, জনবলের ৭টি পদের মধ্যে ৬ জন চিকিত্সক কর্মরত রয়েছেন। এসব চিকিত্সককে মেডিক্যাল কলেজে শ্রেণি কার্যক্রমের পাশাপাশি ময়না তদন্ত রিপোর্টের কাজও করতে হচ্ছে। অতিরিক্ত কাজের জন্য কোন ওভারটাইম দেয়া হয় না। আবার বিভিন্ন মামলায় চিকিত্সকদের আদালতে সাক্ষী দিতে যেতে হয়। এজন্য কোন যাতায়াত ভাতা দেয়া হয় না। এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজের ফরেনসিক বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. সৈয়দ মোহাম্মদ কাসেম ইত্তেফাককে বলেন, 'ফরেনসিক বিভাগে চিকিত্সকের আরো অন্তত ১০টি পদ সৃষ্টি করা প্রয়োজন। চিকিত্সকদের সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো প্রয়োজন। মর্গকে স্বয়ংসম্পূর্ণ করতে একটি অত্যাধুনিক ল্যাবরেটরী স্থাপন অত্যন্ত জরুরি।'
বরিশালে ফরেনসিক বিভাগের ভবন এক বছর ধরে অব্যবহূত : লিটন বাশার, বরিশাল অফিস:কোন ডোম নেই শেরেবাংলা মেডিক্যাল কলেজে। জেলার ১৩টি থানা থেকে গড়ে প্রতি মাসে ২৫ থেকে ৩০টি লাশ আসে ময়না তদন্তের জন্য। এসব লাশের কাটা-ছেঁড়া করেন চুক্তি ভিত্তিক নিয়োগ দেয়া ৩ ঝাড়ুদার। লাশ কাটার জন্য অধিকাংশ ক্ষেত্রেই খরচ বহন করতে হয় লাশ নিয়ে আসা পরিবারের সদস্যদের। চিকিত্সক, সরঞ্জামাদি ও জনবল সংকটের কারণে যখন পুরনো লাশ কাটা ঘর ও ফরেকসিক বিভাগ পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়েছে তখন কোটি টাকা ব্যয়ে নবনির্মিত ভবনের কার্যক্রম অনিশ্চয়তায় পড়েছে।
১৯৮৪ সালে এ মেডিক্যাল কলেজে ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগ (মর্গ ও মৃতদেহ সংরক্ষণ কক্ষ) চালু করা হয়। শুরু থেকেই মর্গে লাশ কাটার জন্য ডোম পদটি তত্কালীন এডহক কমিটি বাতিল করে বলে দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তা জানান। বর্তমানে ঝাড়ুদার বাবুল, সিবু, বসন্ত ও বিজয় ডোম হিসেবে লাশ কাটার কাজ করছেন। ৩ জনের মধ্যে বিজয় সুইপার পদে সরকারি বেতন পান। বাকি দুজন মৃতব্যক্তির স্বজনদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে কাজ করেন। মাঝে মধ্যে বেওয়ারিশ লাশ এলে পুুলিশের পকেট থেকে সামান্য বকশিস দেয়া হয় এ দুজনকে। তা না হলে লাশ পড়ে থাকে সেই লাশকাটা ঘরের মধ্যেই। চিকিত্সক, যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জামাদির অভাবে নতুন ভবন চালু করা সম্ভব হচ্ছে না বলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়। ফরেনসিক বিভাগের অধ্যাপকের পদ শূন্য। সহযোগী অধ্যাপক পদ শূন্য, সহকারী অধ্যাপক ও প্রভাষকের ৩টি করে পদের বিপরীতে আছেন মাত্র একজন করে। বাকি সকল পদই শূন্য হয়ে আছে দীর্ঘদিন ধরে।
ফরেনসিক বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. আখতারুজ্জামান জানান, প্রয়োজনীয় চাহিদাপত্র প্রায় এক বছর পূর্বে পাঠানো হলেও বরাদ্দ পাওয়া যায়নি। এছাড়াও ডোম সংকটের কারণেই কাজে বিঘ্ন সৃষ্টি হচ্ছে।
রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজের শুধু নেই আর নেই :আনিসুজ্জামান, স্টাফ রিপোর্টার, রাজশাহী অফিস:রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজের (রামেক) ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগে শুধু নেই আর নেই। অভিজ্ঞ বিশেষজ্ঞ চিকিত্সক নেই। পর্যাপ্ত আধুনিক যন্ত্রপাতি নেই। চিকিত্সকদের অতিরিক্ত পারিশ্রমিক নেই। লাশ অক্ষত রাখার ডিপ ফ্রিজ নেই। এমনকি লাশকাটার ডোম পর্যন্ত নেই।
জানা গেছে, রামেক ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগ চলছে কার্যত একজন সহকারী অধ্যাপক দিয়ে। দুইজন অভিজ্ঞ ও বিশেষজ্ঞ সহকারী অধ্যাপক ডা. এমদাদুর রহমান ও ডা. মনসুর রহমান ২০১১ সালে অবসরে যাবার পর গুরুত্বপূর্ণ বিভাগটিতে লাশের ময়না তদন্তসহ শিক্ষা ও পরীক্ষার কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। রামেক ফরেনসিক বিভাগে ময়না তদন্তের জন্য লাশকাটার কাজ করেন রনি ও সনি ডোম। তারা কেউই কর্তৃপক্ষের নিয়োগকৃত নয়। বলা যায়, স্বেচ্ছায় চাকরি। তাদের বাবা অবিনাশ স্বেচ্ছায় কাজ করতে করতে মারা গেছেন।
সিলেট ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ মর্গের অবস্থা বেহাল :সিলেট অফিস:দীর্ঘদিন থেকে সিলেট ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের অবস্থা করুণ। গত দুবছর আগে নতুন একটি বহুতল ভবন তৈরি হলেও সেটিতে কোন কার্যক্রম চালু করা যাচ্ছে না। বর্তমানে এ বিভাগে প্রয়োজনীয় লোকবলের অভাব রয়েছে। যেখানে ২ জন ডোম থাকার কথা সেখানে একজনও নেই। কাজ চলে ৪র্থ শ্রেণির কর্মচারীদের সাহায্যে। অধ্যাপক, সহযোগী অধ্যাপক, লেকচারার সংকট লেগেই রয়েছে। নানা সমস্যা সংকট আর হতাশার মধ্য দিয়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে এই গুরুত্বপূর্ণ বিভাগটি।
সরেজমিন পরিদর্শনকালে দেখা যায় এ বিভাগের ময়না তদন্তের কক্ষটিতে ভৌতিক অবস্থা বিরাজ করছে। সেই কবে যে কংক্রিট দিয়ে একটি টেবিল তৈরি করা হয়েছিল লাশকাটার জন্য। লাশকাটার টেবিলটি এ যুগে যে কত অচল তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। বিভাগীয় শহরে সিলেট ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের ময়না তদন্ত কক্ষে একটি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত যন্ত্র নেই তা অনেকেই ভাবতে পারেন না। প্রায় সময় লাশ রাখতে হয় ওসমানী হাসপাতালে অথবা ডায়বেটিস বিভাগের মর্চুয়ারিতে।
সমস্যা জর্জরিত রংপুর মেডিক্যাল কলেজ ফরেনসিক বিভাগ :রংপুর থেকে ওয়াদুদ আলী:নানা সমস্যায় জর্জরিত রংপুর মেডিক্যাল কলেজ ফরেনসিক বিভাগ। পাশাপাশি চলছে লাশ নিয়ে বাণিজ্য। ফরেনসিক বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. মোস্তাক রহিম স্বপন ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ড্যাব) কেন্দ্রীয় কোষাধ্যক্ষের পদে থাকায় তিনি প্রায় সময় ঢাকায় অবস্থান করেন। সপ্তাহে একদিন তিনি রংপুরে এসে দায়িত্ব পালন করেন। ফরেনসিক বিভাগে ১ জন সহকারী অধ্যাপক ও ১ জন প্রভাষকের পদ শূন্য রয়েছে।
এদিকে রংপুর মেডিক্যাল কলেজের ৪র্থ শ্রেণির এক নেতার নেতৃত্বে ৪ সদস্যের এমএলএসএস কর্মচারীর সিন্ডিকেট চিকিত্সকদের সহযোগিতায় ফরেনসিক বিভাগের অধীন লাশকাটা ঘরে দীর্ঘদিন ধরে লাশ নিয়ে বাণিজ্য করে আসছে। লাশকাটার জন্য সেখানে নেই পর্যাপ্ত যন্ত্রপাতি। পর্যাপ্ত আলো ও প্রয়োজনীয় রাসায়নিক দ্রব্যের অভাব রয়েছে। নেই মৃতদেহ কাটার জন্য কোন ব্লেড। চেয়ার-টেবিলসহ অন্যান্য আসবাবপত্রও নেই। ড্রেনেজ ব্যবস্থা না থাকায় সেখানকার পরিবেশ অস্বাস্থ্যকর হয়ে উঠেছে। লাশের ময়না তদন্ত করার জন্য ডোমের প্রয়োজন থাকলেও কোন ডোম নেই।
এ ব্যাপারে ফরেনসিক বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. মোস্তাক রহিম স্বপনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, ঢাকায় থাকলেও রংপুরের দায়িত্ব পালনে তার কোন অসুবিধা হচ্ছে না। সপ্তাহে তিনি ১ দিন রংপুরে আসেন বলে জানান।
http://ittefaq.com.bd/index.php?ref=MjBfMDNfMTZfMTNfMV8xXzFfMjY1NDI=
No comments:
Post a Comment