Friday, February 2, 2018

বরিশালের ইলিশে পুষ্টি বেশি

ইলিশের জন্য বিশেষভাবে পরিচিত চাঁদপুর, বরিশাল ও ভোলা। পটুয়াখালী, কক্সবাজার ও শরীয়তপুরেও উল্লেখযোগ্য ইলিশ ধরা পড়ে। অঞ্চলভেদে এসব ইলিশের পুষ্টিতে রয়েছে ভিন্নতা। 

বাংলাদেশের কোন অঞ্চলের ইলিশের পুষ্টি কেমন, তা পরিমাপে ছয়টি অঞ্চলের প্রত্যেকটি  থেকে ২০টি করে মাছের নমুনা সংগ্রহ করেন একদল গবেষক। এরপর বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে পরীক্ষাগারে মাছের পুষ্টি উপাদান পরীক্ষা করেন তারা। পরীক্ষায় প্রাপ্ত ফলাফলের ভিত্তিতে তৈরি একটি গবেষণা প্রতিবেদন  সম্প্রতি জার্নাল অব নিউট্রিশন অ্যান্ড ফুড সায়েন্সেসে প্রকাশ হয়েছে। তাতে দেখা গেছে, দেশের অন্যান্য অঞ্চলের চেয়ে বরিশালের ইলিশই বেশি পুষ্টি ধারণ করছে। পুষ্টি উপাদান বেশি থাকায় এ ইলিশের স্বাদও ভালো।

প্রোটিন, ফ্যাট, ক্যালরি ও ভিটামিনের আধিক্যের ওপরই মূলত নির্ভর করে ইলিশের সামগ্রিক পুষ্টি। ক্যালসিয়াম, আয়রন, ফসফরাস ও জিংকের মতো খনিজ উপাদানও এক্ষেত্রে বিবেচনায় নেয়া হয়। গবেষকরা বিভিন্ন অঞ্চলের মাছের নমুনা পরীক্ষা করে বরিশালের ইলিশেই সবচেয়ে বেশি পরিমাণে প্রোটিন, ফ্যাট, ভিটামিন সি, ক্যালরি, ক্যালসিয়াম, আয়রন ও ফসফরাস পেয়েছেন। এ অঞ্চলের ইলিশে প্রোটিন পাওয়া গেছে ১৮ দশমিক ৯৫ থেকে ২০ দশমিক ৫৬ শতাংশ পর্যন্ত। এর পরই প্রোটিনের উপস্থিতি বেশি রয়েছে ভোলা ও চাঁদপুরের ইলিশে।

ইলিশ মাছে সাধারণত ওমেগা থ্রি ও ওমেগা সিক্স পাওয়া যায়। এছাড়া এইচডিএল (হাইডেনসিটি লিপোপ্রোটিন) বা ভালো কোলেস্টেরলও পাওয়া যায় মাছটিতে, যা ফ্যাট দিয়ে পরিমাপ করা হয়। বরিশালের ইলিশে ফ্যাট পাওয়া গেছে ৮ দশমিক ২১ শতাংশ। বরিশালের পর সবচেয়ে বেশি ফ্যাট মিলেছে পটুয়াখালীর ইলিশে ৭ দশমিক ৪৭ ও কক্সবাজারে ৭ দশমিক ৩১ শতাংশ। অর্থাৎ এদিক থেকেও অন্যান্য অঞ্চলের চেয়ে এগিয়ে বরিশালের ইলিশ।

ভিটামিনের উপস্থিতিও বরিশালের ইলিশে তুলনামূলক বেশি পেয়েছেন গবেষকরা। অঞ্চলটির ইলিশের প্রতি ১০০ গ্রামে ভিটামিন সি পাওয়া গেছে সর্বোচ্চ ১৪ দশমিক ২৮ মাইক্রোগ্রাম। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ভিটামিন সি আছে ভোলার ইলিশে ১২ দশমিক ৬৮ ও শরীয়তপুরে ১২ দশমিক ৪৮ মাইক্রোগ্রাম।

গবেষণাটিতে নেতৃত্ব দেন বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদের (বিসিএসআইআর) ফিশ টেকনোলজি রিসার্চ সেকশনের শাখাপ্রধান ও ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মোহাজিরা বেগম। জানতে চাইলে বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, বরিশালের ইলিশেই সবচেয়ে বেশি পুষ্টি উপস্থিতির প্রমাণ পাওয়া গেছে। এ অঞ্চলের মাছে বিশেষ কিছু গুণও আছে। বরিশালের ইলিশে পিএইচ বেশি থাকায় মাইক্রোবায়ল দ্রুত আক্রমণ করতে পারে না। আবার আর্দ্রতা বা জলীয় অংশ নির্দিষ্ট মাত্রার মধ্যে থাকে। ফলে দীর্ঘ সময় সতেজ থাকে এখানকার ইলিশ। বরিশালের ইলিশে ভালো কোলেস্টেরলও পাওয়া গেছে সবচেয়ে বেশি। অর্থাৎ বলা যায়, সবদিক থেকে বরিশালের ইলিশই সেরা।

বিভিন্ন খনিজ উপাদানের আধিক্যেও এগিয়ে আছে বরিশালের ইলিশ। গবেষকরা এখানকার ইলিশের প্রতি ১০০ গ্রামে ক্যালসিয়াম পেয়েছেন ৩৭২ দশমিক ৬৭ মিলিগ্রাম। ভোলার ইলিশে খনিজটির উপস্থিতি প্রতি ১০০ গ্রামে ৩২২ দশমিক ৯১ ও শরীয়তপুরে ২৯৬ দশমিক ৫৯ মিলিগ্রাম। চাঁদপুরের ইলিশে ক্যালসিয়ামের উপস্থিতি আরো কম— প্রতি ১০০ গ্রামে ১৪৪ দশমিক ২১ মিলিগ্রাম।

আরেক খনিজ আয়রনের উপস্থিতিও বরিশালের ইলিশেই বেশি। জেলাটি থেকে আহরিত ইলিশের প্রতি ১০০ গ্রামে আয়রন রয়েছে ১৩ দশমিক শূন্য ৭ মিলিগ্রাম। এরপর সবচেয়ে বেশি আয়রন পাওয়া গেছে ভোলার ইলিশে প্রতি ১০০ গ্রামে ১১ দশমিক ৯২ মিলিগ্রাম।

মত্স্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী নারায়ণ চন্দ্র চন্দের সঙ্গে এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে গবেষণাটি এখনো দেখেননি বলে তিনি জানান। এমনটা হলে বরিশালে ইলিশ উৎপাদন বাড়ানোর ওপর জোর দেয়া হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

মত্স্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী বণিক বার্তাকে বলেন, বরিশালের পাশাপাশি সব অঞ্চলেই ইলিশের উৎপাদন বাড়াতে সব ধরনের চেষ্টা করে যাচ্ছে সরকার। এজন্য নদ-নদীর জাটকাপ্রধান অঞ্চলে প্রজনন মৌসুমে মা-ইলিশ আহরণ নিষিদ্ধের সময়সীমা বাড়ানো হয়েছে। সরকার ইলিশের পাঁচটি অভয়াশ্রম প্রতিষ্ঠার পর প্রতি বছর প্রজননের মৌসুমে মা-ইলিশ ধরা নিষিদ্ধ করেছে। নতুন অভয়াশ্রম ঘোষণার কাজও শেষের দিকে। আইনগত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার পাশাপাশি জেলেদের মধ্যে সচেতনতা ও সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো হচ্ছে। সেই সঙ্গে জেলেদের ক্ষতিপূরণ বিষয়ে আরো সময়োপযোগী পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে। সামনের দিনে বরিশাল অঞ্চলে ইলিশ মাছ উৎপাদন ও সংরক্ষণে জোরালো পদক্ষেপ নেয়া হবে।

সরকারের এসব উদ্যোগের ফলে দেশে ইলিশ আহরণ ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। মত্স্য অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০০১-০২ অর্থবছর দেশে ইলিশ আহরণ ছিল মাত্র ২ লাখ ২০ হাজার টন। ২০০৮-০৯ অর্থবছর তা ৩ লাখ টনে উন্নীত হয়। চার লাখ টনে উন্নীত হতে ২০১৫-১৬ অর্থবছর লেগে যায়। অর্থবছরটিতে দেশে ইলিশ আহরণের পরিমাণ ছিল ৩ লাখ ৯৪ হাজার টন। গত অর্থবছর ইলিশ আহরণ হয় প্রায় পাঁচ লাখ টন। আর চলতি অর্থবছর ৫ লাখ ৪০ হাজার টন ইলিশ আহরণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

ইলিশ আহরণের এ লক্ষ্য অর্জনে প্রজনন পয়েন্ট ও অভয়ারণ্য এলাকা প্রয়োজনে আরো বাড়াতে হবে বলে মনে করেন ইলিশ গবেষক প্রফেসর ড. মো. শহীদুল্লাহ মিয়া। তিনি বলেন, নতুন ও পুরনো অভয়াশ্রম এবং প্রজনন পয়েন্টগুলোর সুরক্ষায় যথাযথ পদক্ষেপ নিতে হবে। সাম্প্রতিক সময়ে মাছের ব্রিডিং জোন পরিবর্তন হতে দেখা যাচ্ছে। ইলিশ এখন ডিম ছাড়ছে হাতিয়া ও সন্দ্বীপ অঞ্চলে। ব্রিডিংয়ের জন্য এসব এলাকা নিরাপদ করতে হবে।




No comments: