Friday, June 14, 2013

পেট্রোবাংলার ২২১ কোটি টাকার অনিয়ম

এম এ বাবর:
নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে সরকারের বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন পেট্রোবাংলার বিভিন্ন সংস্থার ২০০৯-১০ অর্থবছরে ২২০ কোটি ৭৪ লাখ ৩৮ হাজার ৪১৯ টাকা লোপাট হয়েছে। কোনো নিয়মনীতি ছাড়াই কোম্পানির মুনাফার একটি অংশ ‘শ্রমিক’ খাতে দেয়া হয়। অথচ এ প্রতিষ্ঠানে ওই খাতে কোনো শ্রমিক নেই। ‘উপরের নির্দেশে’ প্রাপ্য না হয়েও কর্মচারী-কর্মকর্তাদের দেয়া হয়েছে বিশেষ ভাতা ও আর্থিক সুবিধা। পেট্রোবাংলাকে প্রদেয় বিদেশি কোম্পানির অর্থও নিয়মনীতি ছাড়াই দেয়া হয়েছে শ্রমিক নেতা ও কর্মচারীদের। এ রকম ১৪টি অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে প্রতিষ্ঠানটির বিপুল পরিমাণ অর্থ লোপাটের অনুসন্ধানে নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

সূত্র জানায়, পেট্রোবাংলার মুনাফার পাঁচ ভাগ শ্রমিকের অংশগ্রহণ তহবিলে স্থানান্তরপূর্বক অনিয়মিতভাবে বণ্টন করায় সংস্থার আর্থিক ক্ষতি হয় ১৪৯ কোটি ৫৫ লাখ ৯৭ হাজার ৯২৫ টাকা। যে প্রতিষ্ঠানে শ্রমিকদের অর্থ দেয়া হয়েছে বলে বলা হয়, সেখানে খাতা-কলমে ‘শ্রমিক’ খাতে কোনো কর্মচারীই নেই, যারা আছেন তারা সবাই সরকারের পে-স্কেল অনুযায়ী বেতন-ভাতা পেয়ে থাকেন। করপূর্ব মুনাফা থেকে বিধিবহির্ভূতভাবে ‘ওয়ার্কার্স পার্টিসিপেশন ইন প্রফিট ফান্ড’ এ অর্থ     সরিয়ে নেয়ার মাধ্যমে দেয়া হয় আয়কর ফাঁকি। এভাবে লোপাট করা হয় ১৫ কোটি ৮৭ লাখ ২৫ হাজার টাকা। দুর্নীতির মাধ্যমে কর্মচারী-কর্মকর্তাদের প্রাপ্যতাবহির্ভূত ভাতা ও আর্থিক সুবিধা দেয়া হয় ৩৫ কোটি ৪৩ লাখ ২৪ হাজার টাকা। স্থানীয় বাজারে উৎপাদিত পণ্যের (অকটেন বুস্টার) উপযোগিতা যাচাই না করে আন্তর্জাতিক টেন্ডার আহ্বান ছাড়াই অপ্রয়োজনীয় অকটেন বুস্টার ক্রয়ের মাধ্যমে দুর্নীতি করে আত্মসাৎ করা হয় ৭ কোটি ৩৩ লাখ ৩১ হাজার টাকা।
এদিকে গ্যাস বিপণন নীতিমালা-২০০৪ অনুযায়ী যথাসময়ে গ্যাসসংযোগ বিচ্ছিন্ন না করায় গ্যাস বিল বকেয়া বাবদ ক্ষতি হয় ২ কোটি ৯৯ লাখ ৪৮ হাজার টাকা। প্রাক-যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও দরপত্র গ্রহণ এমনকি সংশোধনীর মাধ্যমে অনিয়মিতভাবে ‘মেসার্স টেক স্ট্রেট কর্পোরেশন’ থেকে কাপাসিয়া প্রকল্পের জন্য বৈদেশিক মালামাল কেনা হয়। একই সঙ্গে ‘আইডিকো-১৭০০’ রিগের জন্যও বিধিবহির্ভূতভাবে বৈদ্যুতিক মালামাল কেনা হয়। এতে করে লোপাট হয় ২ কোটি ৩০ লাখ ৪৬ হাজার টাকা।
অন্যদিকে সফলভাবে কাজ শেষ করতে হবে, এ উছিলায় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিধিবহির্ভূতভাবে প্রদান করা হয় এক কোটি ৭৩ লাখ ২৪ হাজার টাকা। পেট্রোবাংলার আওতাধীন একটি সংস্থায় অঙ্গীকারনামার ভিত্তিতে ৯০ জন কর্মচারীকে উচ্চতর স্কেল দিয়ে সে অনুযায়ী এদের বর্ধিত বেতন প্রদান করা হয়। কিন্তু নিয়মবহির্ভূত হওয়ায় পরে তা বাতিল করা হলে অতিরিক্ত দেয়া অর্থ আর আদায় করা হয়নি। এ অতিরিক্ত অর্থের পরিমাণ এক কোটি ৭০ লাখ ৩৯ হাজার টাকা।
এছাড়া ক্রয়াদেশে বর্ণিত নমুনা অনুযায়ী ‘ডায়াফ্রাম গ্যাস মিটার’ সরবরাহ করার কথা ছিল। কিন্তু কেনা হয় নিুমানের মিটার। এতে করে লোপাট করা হয় ৯৫ লাখ ৯৮ হাজার ৪৩২ টাকা। বিদেশি তেল কোম্পানি ‘শেভরন’ পেট্রোবাংলাকে প্রোডাকশন বোনাস প্রদান করে। সেই অর্থ নিয়মনীতি উপেক্ষা করেই দেয়া হয় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের। এতে কোম্পানির ক্ষতি হয় ৯৫ লাখ ৫০ হাজার ৩৪৮ টাকা। ‘উপরের চাপে’ ও আর্থিক সুবিধার বিনিময়ে গ্যাস বিপণন নীতিমালা-২০০৪ লঙ্ঘন করে ‘এনআর সিএনজি ফিলিং স্টেশন’ এ আবার গ্যাসসংযোগ দিয়ে আত্মসাৎ করা হয় ৭৯ লাখ ৮২ হাজার ৬১২ টাকা।
পেট্রোবাংলার দুর্নীতির অন্যান্য চিত্রের মধ্যে রয়েছে, বিধিবহির্ভূতভাবে প্রাপ্যতার অতিরিক্ত ছুটি নগদায়ন সুবিধা প্রদান করায় ক্ষতি ৬৮ লাখ ৮১ হাজার ৩৩৯ টাকা; অবসর গ্রহণকারী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রাপ্য অপেক্ষা অতিরিক্ত গ্র্যাচুইটি প্রদান করায় ক্ষতি ১৩ লাখ ৫৮ হাজার টাকা ও গ্রাহকদের আবেদন অনুযায়ী সংযোগ বিচ্ছিন্ন না করে গ্যাস সরবরাহ অবিচ্ছিন্ন রাখার ফলে গ্যাস বিল বকেয়া রয়েছে ২৬ লাখ ২৯ হাজার টাকা। পেট্রোবাংলাতে ভয়াবহ দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে উল্লেখ করে দুদক কমিশনার (বিশেষ অনুসন্ধান) মো. বাদিউজ্জামান বলেন, বাস্তবে এসব প্রতিষ্ঠানের দুর্নীতি ও অনিয়ম আরো বিশাল ও ভয়ঙ্কর। এ দুর্নীতি বছরের পর বছর ধরে চলে আসছে। এসব দুর্নীতির সঙ্গে কে বা করা জড়িত বিষয়টি অনুসন্ধান করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে কমিশন। এ লক্ষ্যে মহাপরিচালককে (অনুসন্ধান) দ্রুত একটি অনুসন্ধান কমিটি গঠন করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
http://manobkantha.com/2013/06/14/125477.html

http://www.emanobkantha.com/2013/06/14/

No comments: