জালিয়াত চক্রের খপ্পরে পড়ে হাজার কোটি টাকার সম্পত্তি হারাতে চলেছে রাজউক। বছরের পর বছর ধরে রাজউকের যে প্লটগুলো বেদখল হয়েছে, সেগুলো এখন জালিয়াতির মাধ্যমে গ্রাস করতে উঠেপড়ে লেগেছে কয়েকটি চক্র। এ চক্রগুলো একের পর এক মামলার জালে ফেলে রাজউককে কোণঠাসা করে হাতিয়ে নিতে যা”েছ মূল্যবান সম্পদ। এ প্রতারক চক্রের সঙ্গে রয়েছে রাজউকের কিছু প্যানেল আইনজীবী, কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং অর্থলোভী ধনাঢ্য ব্যক্তি। এই তিনপ¶ সম্মিলিতভাবে নানা প্রতারণা ও মামলার ফাঁদে ফেলে আÍসাৎ করছে সরকারের মহামূল্যবান সম্পত্তি।
কয়েক বছর ধরে গুলশান-২ এর ৫৯ ন¤^র রোডের এনডবিউ (ই)-২ পটটির জাল কাগজপত্র তৈরি করে হাতিয়ে নিতে তিনটি প্রতারক চক্র সক্রিয় হয়ে উঠেছে। রাজউকের সাবেক আইন কর্মকর্তা আশ্রাফ আলী মÊল ও জমির দালাল ওয়াজউদ্দিন গংয়ের প্রতারক চক্রটি জনৈক হাফিজা বেগমকে জীবিত দেখিয়ে এবং জমির মালিক সাজিয়ে জমি বিক্রির নামে বায়নাপত্র করেছে। তারা একটি বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠীর কাছ থেকে মোটা অংকের টাকা নিয়ে বায়নাপত্র দলিল করে দেয়। কিš‘ পরে তারা ক্রেতাকে জমি বুঝিয়ে না দিতে পারায় প্রতারণা মামলায় আশ্রাফ আলী মÊল এবং ওয়াজউদ্দিন জেলও খেটেছে।
এছাড়া জনৈক আসিফ আহম্মেদ নিজেকে মৃত হাফিজা বেগমের ছেলের ঘরে নাতি পরিচয় দিয়ে জমিটি দখল করে বিক্রির বায়নাপত্রও করেছে। আসিফ আহম্মেদ আমমোক্তারনামা দিয়ে পটটি বিক্রির নামে ৩ কোটি টাকাও নিয়েছে একটি রিয়েল এস্টেট প্রতিষ্ঠান থেকে। শুধু তাই নয়, আমমোক্তারনামা নিয়ে নিজেকে জমির মালিক দাবি করে রাজউকে আবেদন করলে রাজউক এ আমমোক্তারনামা বিশ্বাস না করায় হাইকোর্টে একটি রিট মামলা (ন¤^র-১১২২৮/১২) দায়ের করে। হাইকোর্ট প্রথমে ৬ মাসের জন্য এবং এপ্রিল মাসে আরও ৬ মাসের জন্য ¯ি’তাব¯’ার নির্দেশ দেন। আমমোক্তারনামাবলে ওই পটে বোরাক রিয়েল এস্টেটের নামে বিরাট বিলবোর্ড টানিয়ে সেখানে ১৪ তলা অ্যাপার্টমেন্ট ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা করেছে। এ বোরাক রিয়েল এস্টেট ও ওয়েস্টিন হোটেলের মালিক হ”েছন ব্যবসায়ী নূর আলী। বর্তমানে সেখানে তার কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং আসিফ আহম্মেদের আÍীয়-¯^জনরা বসবাস করছে।
অপরদিকে অন্য একটি প্রতারক চক্র জমিটির প্রকৃত মালিক একজন পাকি¯—ানি নাগরিক বলে দাবি করে তার ওয়ারিশ সেজে রাজউকের কাছে জমিটির মালিকানার দাবিতে আবেদনও করেছে। এ ত্রিপ¶ীয় প্রতারক চক্রের টানাহেঁচড়ার মধ্যে রাজউক মহাবিভ্রাšি—তে পড়ে এনডবিউ (ই)-২ পটের ফাইলটি রেকর্ড র“মে সংর¶ণে রেখেছে।
রাজউক জানিয়েছে, উলিখিত পটটির প্রকৃত মালিক সরকার অর্থাৎ রাজউক। কোনো জাল কাগজপত্র আমমোক্তারনামা বা মিথ্যা মামলা দিয়ে রাজউককে বিভ্রাš— করে কেউ-ই এ মূল্যবান সম্পত্তি হাতিয়ে নিতে পারবে না। কিš‘ প্রতারক ও জালিয়াত চক্রটি রাজউকের এ ধরনের পট হাতিয়ে নিতে একদিকে নিæ ও উ”চ আদালতে একাধিক মামলা করে, অপরদিকে মোটা টাকার বিনিময়ে পরস্পরে সমঝোতা করে আপসনামা দেয়। রাজউকের সাবেক আইন কর্মকর্তাসহ একশ্রেণীর দুর্নীতিবাজ কর্মকতা-কর্মচারী ওই প্রতারক চক্রকে সহযোগিতা করে। এভাবেই তারা একের পর এক মহামূল্যবান সরকারি সম্পত্তি গ্রাস করলেও তেমন কোনো ব্যব¯’াই নিতে পারছে না রাজউক। শুধু তাই নয়, এ বিষয়ে তাদের কোনো গরজও নেই।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, রাজউকের ভ‚মি, এস্টেট ও আইন শাখার কিছু কর্মচারী, প্যানেলভুক্ত কয়েকজন বর্তমান এবং সাবেক আইনজীবীর গোপন সহায়তায় এসব পট হাতছাড়া হয়ে যা”েছ। মূলত এরাই হ”েছন সব অপকর্মের হোতা। মোটা অংকের বিনিময়ে এরা পরস্পর যোগসাজশ করে পরিত্যক্ত, বিতর্কিত ও একাধিক মালিকানার বিরোধপূর্ণ পট, বাড়ি ও জমির খবর প্রথমে প্রভাবশালী জালিয়াত চক্রের কাছে সরবরাহ করে। সে অনুযায়ী সংঘবদ্ধ জালিয়াত চক্রটি ওই জমি, পট বা বাড়ির মালিকানার দাবির সপ¶ে ভুয়া দলিল, পর্চা, জরিপ রেকর্ড, আমমোক্তারনামা ও দানপত্রসহ যাবতীয় জাল কাগজ তৈরি করে। একপর্যায়ে তারা বিভিন্ন গ্র“পে বিভক্ত হয়ে সম্ভাব্য প্রাপ্ত জমি বা বাড়ির ভাগবাটোয়ারার শর্তে আদালতে দুই বা ততধিক বা আরও অধিকসংখ্যক মামলা দায়ের করে। এ পর্যায়ে আদালত রাজউকের কাছ থেকে দাবিকৃত জমি বা বাড়ির প্রকৃত তথ্য ও কাগজপত্র চেয়ে পাঠান।
এ সুযোগে রাজউকের ওই সব দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং আইনজীবী সংঘবদ্ধ জালিয়াত চক্রের প¶ে আইনি মতামতসহ আদালতে কাগজপত্র জমা দেয়। এ¶েত্রে প্রতারক চক্রকে মোকাবেলা করার জন্য রাজউকের দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা ও আইনজীবীরা আদালতে যে তৎপরতা দেখান তা লোক দেখানো। ফলে আদালতের রায় যায় প্রতারক চক্রের একজনের প¶ে।
এ পর্যায়ে এসে প্রতারক চক্রটি জমির অপর মালিক দাবিদারদের সঙ্গে সমঝোতা চুক্তি করে এবং জাল কাগজপত্র দিয়েই পটটি প্রভাবশালীদের কাছে বিক্রি করে দেয়। পাশাপাশি পুলিশ ও প্রভাবশালীদের সহযোগিতায় প্রতারকরা ওই পটও দখল করে নেয়। রাজউক বিতর্কিত পটের বিক্রির বিষয়টি গ্রাহ্য না করলে প্রতারকরা উ”চ আদালতের আশ্রয় নেয়। এ মামলা চলে দীর্ঘদিন। কোনো কারণে মামলার রায় রাজউকের প¶ে গেলে সঙ্গে সঙ্গে আরেকটি মামলা দাঁড় করিয়ে দেয় প্রতারকরা। এভাবে বিতর্কিত পটগুলো নিয়ে একের পর এক মামলা জর্জরিত হয়ে পড়েছে রাজউক। ফলে কোনো পটই উদ্ধার হ”েছ না।
জানা যায়, ২০১১ সালের ৫ অক্টোবর দেশের শীর্ষ¯’ানীয় একটি শিল্পগোষ্ঠীর কাছে গুলশানের ৫৯ ন¤^র সড়কের লেকপাড়ে অব¯ি’ত ২০ কাঠা আয়তনের এনডবিউ (ই)-২ ন¤^র পটটি বিক্রির উদ্দেশে বায়না দলিল রেজিস্ট্রি করে দেন হাফিজা বেগম। বায়না দলিলের শর্তানুযায়ী নগদ, চেক ও পে-অর্ডারের মাধ্যে হাফিজা বেগম, রাজউকের সাবেক আইন কর্মকর্তা আশ্রাফ আলী মÊল, মোঃ ওয়াজউদ্দিন ও মোঃ মনিরকে ৬ কোটি ১০ লাখ টাকা পরিশোধ করা হয়। এরপর মাসের পর মাস পেরিয়ে গেলেও তারা পটের দখল বুঝিয়ে দেয়নি। ৭ মার্চ প্রতারকরা জানিয়ে দেয় তারা পটের দখল বুঝিয়ে দিতে পারবে না। এতে বাধ্য হয়ে ওই শিল্পগোষ্ঠীর লোকজন প্রতারণার মামলা দায়ের করলে ভাটারা থানা পুলিশ প্রতারক আশ্রাফ আলী মÊল ও ওয়াজউদ্দিনকে গ্রেফতার করে। ওই সময় আÍগোপন করে হাফিজা বেগম ও মোঃ মনির।
রাজউক জানিয়েছে, বহু মামলা ও একাধিক মালিকানা দাবিদার ৩৮টি পট বিতর্কিত হিসেবে তালিকাভুক্ত। এসব পটের কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। এনডবিউ (ই)-২ পটের ফাইলও রয়েছে রাজউকের রেকর্ড র“মে। জালিয়াতদের কবল থেকে পটগুলো উদ্ধারে রাজউক সর্বশক্তি নিয়োগ করেছে বলে জানিয়েছেন এক কর্মকর্তা। রাজউক জানিয়েছে, গুলশান ও বনানীর ৩৮টি পটকে তারা বিতর্কিত হিসেবে চিহ্নিত করলেও এগুলোর মধ্যে কয়েকটি পটের মূল ফাইল রাজউক থেকে গায়েব করে ফেলা হয়েছে।
http://198.57.168.170/~ju/2013/06/03/news0094.htm
No comments:
Post a Comment