যেমন ইচ্ছা তেমন করে চলছে ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশন। সংস্থা দুটির প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড অনেকটা ভেঙে পড়েছে। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি না থাকায় ক্ষণিক দায়িত্ব পালনের জন্য প্রেষণে নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা উন্নয়নমূলক কোনো কার্যক্রমের দিকে গুরুত্ব দিচ্ছেন না।
এদের মধ্যে বেশিরভাগ কর্মকর্তাই রয়েছেন বিদেশ ভ্রমণ আর নিজেদের আখের গোছানোয় ব্যস্ত। এদিকে চেইন অব কমান্ড না থাকায় সংস্থার বেশিরভাগ কর্মকর্তা-কর্মচারী ঠিকমতো কর্মস্থলে থাকছেন না। অন্যদিকে সংস্থার দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের স্বেচ্ছাচারিতা ও অবহেলায় সেবা প্রত্যাশীদের ভোগান্তির শেষ নেই। আর জাল-জালিয়াতি ও অনিয়মের বেড়াজালে পড়ে ডিসিসির ঘাড়ে অনুদান এবং ঋণের বোঝা বাড়ছে।
নাগরিক সেবার মান বাড়ানোর অজুহাতে ঢাকা সিটি কর্পোরেশন (ডিসিসি) বিভক্ত করেছে সরকার। কিন্তু বিভক্ত ডিসিসির সেবার মান আগের তুলনায় কমে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। আর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের স্বেচ্ছাচারিতা ও অবহেলায় সেবা প্রত্যাশীরা প্রতিনিয়ত হয়রানির শিকার হচ্ছেন।
এমনকি অনিয়ম ও হয়রানির শিকার হলেও সেবা প্রত্যাশীরা সংস্থা দুটির প্রশাসক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার সঙ্গে দেখা করার সুযোগ পর্যন্ত পাচ্ছেন না। প্রশাসক নিয়োগের বিধান রেখে ২০১১ সালের ২৯ নভেম্বর ডিসিসিকে দু’ভাগ করতে ‘স্থানীয় সরকার, সিটি কর্পোরেশন সংশোধন বিল-২০১১’ সংসদে পাস হয়। ১ ডিসেম্বর ’১১ থেকে বিভক্ত ডিসিসির ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন (ডিএনসিসি) ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন (ডিএসসিসি) হিসেবে কাজ শুরু হয়। কিন্তু শুরু থেকেই আমলানির্ভর ডিএসসিসি ও ডিএনসিসি পরিচালনায় নানা জটিলতা সৃষ্টি হয়। দুর্নীতির সিন্ডিকেট গড়ে তোলা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বদলি নিয়ে দেখা দেয় তদবির ও বাহুবল প্রদর্শন। আর বিস্তর অনিয়ম ও রাজনৈতিক প্রভাবে কিছুসংখ্যক কর্মকর্তা-কর্মচারী বেপরোয়া হয়ে ওঠেন। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি ঘরনার শ্রমিক সংগঠনের অপতৎপরতায় অনেকটা অসহায় হয়ে পড়েন সংস্থার প্রধান-প্রধান পদে প্রেষণে নিয়োগ পাওয়া কর্মকর্তারা। অনেকটা অসহায় হয়ে সংস্থা দুটির প্রধান কর্মকর্তারা নাগরিক সেবার মানসিকতা হারিয়ে ফেলেন।সরেজমিন গত ২৩ অক্টোবর বুধবার ডিএসসিসির নগর ভবনে অধিকাংশ কর্মকর্তা-কর্মচারীকে পাওয়া যায়নি। এমনকি সংস্থার প্রশাসক নজমুল ইসলামকে সকাল ১০টা থেকে বেলা ১টা পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। প্রশাসক মহোদয় কোথায় আছেন জানতে চাইলে তার ব্যক্তিগত সহকারী আশ্রাফুল আলম বলেন, ‘স্যার কোথায় আছেন জানি না। অফিসিয়াল কোনো কাজে নেই। তাই কখন আসবেন তাও বলতে পারছি না।’ সকাল পৌনে ১১টায় নগর ভবনের অষ্টম তলায় বিজ্ঞাপন ও বিউটিফিকেশন বিভাগের উপ-কর কর্মকর্তা কুদ্দুস আহমেদকে পাওয়া যায়নি। রুম খালি পড়ে আছে। ১১টায় স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. মীর মোস্তাফিজুর রহমানকে পাওয়া যায়নি। সামনে বসে থাকা একজন এমএলএসএস বলেন, ‘স্যার সকালে একবার এসে চলে গেছেন। আজকে আর নাও আসতে পারেন।’ সপ্তম তলায় প্রশাসনিক বিভাগের ৬১২ নম্বর রুমে সোয়া ১১টা থেকে সাড়ে ১১টা পর্যন্ত অপেক্ষা করে ওই রুমে কাউকে পাওয়া যায়নি। খালি পড়ে রয়েছে ৪টি টেবিল-চেয়ার। অনেক প্রয়োজনীয় কাগজপত্র এলোমেলোভাবে পড়ে আছে টেবিলে। পঞ্চম তলায় ৪৩২ নম্বর রুমে বসেন সমাজকল্যাণ ও সাংস্কৃতিক কর্মকর্তা খন্দকার মিল্লাতুল ইসলাম। পৌনে ১২টা পর্যন্ত তিনি অফিসে আসেননি। পাশের রুমে এক কর্মচারীকে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি জানান, সকাল থেকে ওনাকে অফিসে আসতে দেখিনি। তবে পরিবহন বিভাগে ওনার দায়িত্ব রয়েছে। ওখানে পেতে পারেন। কিন্তু তাৎক্ষণিক পরিবহন বিভাগে গিয়েও তাকে পাওয়া যায়নি। একই সময়ে ৪০৫ নম্বর রুমে কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী পাওয়া যায়নি। দরজা খোলা অবস্থায় টেবিলে পড়ে রয়েছে অনেক ফাইলপত্র। চতুর্থ তলায় সম্পত্তি বিভাগের ৩৩২ নম্বর রুমে কাজ ফেলে চারজন আড্ডা দিচ্ছেন। আর সিগারেটের ধোঁয়ায় রুম ঘোলা হয়ে গেছে। রুমে উঁকি দিয়ে এখানে কি হয় জানতে চাইলে একজন বলেন, সম্পত্তি বিভাগের প্রয়োজনীয় অনেক কাজ এখানে হয়। ৩২১ নম্বর রুমে বসেন প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা খালিদ আহমেদ। দুপুর সোয়া ১২টায় তাকেও রুমে পাওয়া যায়নি। কোথায় আছেন জানতে চাইলে তার একজন পিয়ন বলেন, স্যার সকালে এসে নিচের দিকে গেছেন। কোথায় আছেন আর কখন আসবেন বলতে পারি না। আর কয়েকদিন যাবৎ খোঁজ করেও দেখা পাওয়া যায়নি তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আশিকুর রহমান ও শিহাব উল্লাহকে।
এদিকে গত ৩০ জুন ডিএসসিসির সচিব পদে যোগদান করেন উপ-সচিব রেজাউল করিম। সংস্থার একাধিক কর্মকর্তা জানান, তিনি এখানে নিয়োগের পর থেকেই কখন কিভাবে বিদেশ ভ্রমণে যাবেন সেই নিয়ে ব্যস্ত আছেন। ৬ সেপ্টেম্বরে গবেষণা কর্মকর্তা (ভূগোল) মার্জিয়া বেগমসহ তিনি সাতদিন দক্ষিণ কোরিয়া ঘুরে এসেছেন। এরপর এক মাস না যেতেই গত ২০ অক্টোবর তিনি আবার জাপান ভ্রমণে গেছেন। এর আগে আগস্টের প্রথম সপ্তাহে ১০ দিনের জন্য বিদেশ ছিলেন সংস্থার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আনছার আলী খান।
এদিকে ২৪ অক্টোবর বৃহস্পতিবার ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের (ডিএনসিসি) গুলশান ‘নগর ভবন’ বনানী কমিউনিটি সেন্টার গিয়ে বেশিরভাগ কর্মকর্তা-কর্মচারীকে অফিসে দেখা যায়নি। সকাল সোয়া ১১টায় তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আহমেদ আলী ও মেজবাউল করিমকে অফিসে পাওয়া যায়নি। এরা দু’জন কোথায় আছেন তাও নিশ্চিত করতে পারেননি কেউ। আর প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন বিপন কুমার সাহা একটি প্রশিক্ষণের জন্য বিদেশ রয়েছেন। ডিএনসিসির গুরুত্বপূর্ণ বেশিরভাগ কর্মকর্তার দফতর বনানী কমিউনিটি সেন্টারে। বেলা ১২টা থেকে একটা পর্যন্ত পাওয়া যায়নি প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ সৈয়দ কুদরত উল্লাহ, স্থপতি এসএম শফিকুর রহমান, সহ-প্রোগ্রামার (আইসিটি) শাহনাজ পারভীন, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট শেখ কামাল হোসেন, প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা ফসিউল্লাহ ও প্রধান ভাণ্ডার কর্মকর্তা মোহাম্মদ আলীকে। আর নির্বাহী প্রকৌশলী ড. আবদুর রাজ্জাক কয়েক মাস ধরে বিদেশে রয়েছেন। এ সময় একাধিক কর্মচারী জানান, বেশিরভাগ কর্মকর্তাই নিয়মিত অফিস করেন না। অনেক সময় সকালে এসে বাইরে চলে যান, আর ওইদিন অফিসে আসেন না।
এ ব্যাপারে স্থানীয় সরকার সচিব আবু আলম মো. শহিদ খান বলেন, বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে। অফিস রুল মেনেই সকলকে কাজ করতে হবে। কেউ কর্তব্যে অবহেলা করলে বিধি অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
http://manobkantha.com/2013/11/02/145241.html#sthash.d6Ar38sD.dpuf
No comments:
Post a Comment