Sunday, November 17, 2013

মাথার চুল পড়ে যাওয়া

ডা: ওয়ানাইজা
মাথার চুল পড়ে যাওয়া এক অস্বস্তিকর অভিজ্ঞতা। দিন দিন মাথার চুল পাতলা হয়ে যাচ্ছে অর্থাৎ ঝরে যাচ্ছে বা টাক পড়ে যাচ্ছে এমন ব্যক্তির সংখ্যা অনেক। চুল ঝরে যাওয়া বা টাক পড়া দু’ভাবে হয়ে থাকে : এক. পুরো মাথার চুল পড়ে যাওয়া। এ ক্ষেত্রে মাথার তালু বা চামড়া অতি সহজেই দেখা যায়।

দুই. মাথার কিছু কিছু অংশে গোল গোল আকারে চুল পড়ে যাওয়া সার্বিকভাবে পুরো মাথার চুল যেসব কারণে ঝরতে পারে চুলে টান লাগা : প্রচলিত একটি ধারণা আছে, রাতে শোয়ার আগে টান টান করে বেণী বেঁধে ঘুমালে চুল তাড়াতাড়ি লম্বা হয়। এটি সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। চুল কতটা লম্বা হবে তা নির্ভর করে জেনেটিক, হরমোন ও পুষ্টির ওপর। বরং উল্টো ক্ষতিই হয়ে থাকে। যে চুলগুলো আরো কিছু দিন মাথায় থেকে তার পর ঝরে যাওয়ার কথা, তা আগেই ঝরে যায় অতিরিক্ত টান লাগার কারণে। প্রসব-পরবর্তী : সন্তান প্রসবের দুই থেকে পাঁচ মাস পর হঠাৎ চুল পড়ে যেতে থাকে। 

মাথা প্রায় খালিই হয়ে যায়। দুই থেকে ছয় মাস ধরে এ প্রক্রিয়া চলতে থাকে। তবে আশার বিষয় এ চুল আবার সম্পূর্ণ গজিয়ে থাকে। চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের তত্ত্বাবধানে থাকুন। নবজাত অবস্থায় : নবজাতকের মাথার চুল জন্মের পর থেকে চার মাসের ভেতরে অনেকটা ঝরে যায়। 

এতে মা-বাবা ভয় পেয়ে যান, আমার সন্তানের মাথার চুল কি কম হবে? না, এতে ঘাবড়ানোর কিছু নেই। ছয় মাস বয়সের সময় আবার চুল গজায়। কখনো কখনো পুষ্টিহীনতার কারণে চুল গজাতে একটু দেরি হতে পারে। জ্বরের পর : কঠিন কোনো জ্বর যেমন নিউমোনিয়া, টাইফয়েড হওয়ার দুই থেকে চার মাস পর হঠাৎ চুল ঝরতে শুরু করে এবং প্রায় পাতলা হয়ে যায়। কিন্তু কিছু দিন পরও এ চুল আবার গজিয়ে থাকে। মানসিক কারণে : মানসিক রোগ বা দুশ্চিন্তা যদি বেশি থাকে তবে চুল পড়ে যায়। 

ওষুধে : কিছু কিছু ওষুধে যেমন ক্যান্সারের ওষুধ, যে চুলগুলো মাত্র গজাচ্ছে, সেগুলোও ঝরিয়ে দেয়। অনাহার : ওজন বা মেদ কমানোর জন্য অনেকে হঠাৎ খাওয়া-দাওয়া একেবারেই ছেড়ে দেয়। এই হঠাৎ খাওয়া কমানো চুল পড়ার কারণ হতে পারে যেমনটি হয় অপুষ্টিজনিত কারণে। অ্যানড্রোজেন হরমোন : পুরুষ হরমোনের প্রভাবে ২০ থেকে ৩০ বছর বয়সে পুরুষের কপালের দুই দিকে এবং মাথার মধ্য অংশে টাক পড়ে। যাকে বংশগত টাকও বলা যায়। এ-জাতীয় বংশগত টাক ঠেকাতে এবং টাক পড়া স্থানে কিছু চুল গজাতে সক্ষম এমন ওষুধ এখন বাজারে পাওয়া যায়। যার বৈজ্ঞানিক নাম ফিনাস্টেরয়েড। চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের তত্ত্বাবধানে এ-জাতীয় ওষুধ শুধু ছেলেদের জন্য। 
 
মেয়েরা খেতে পারবে না। মাথার চুলসংখ্যা প্রায় এক লাখ, এর মধ্যে ৭০ থেকে ১০০টি চুল প্রতিদিন ঝরে যায়। অর্থাৎ প্রতিদিন ১০০টি চুল পড়া স্বাভাবিক। কিন্তু যখন এই ১০০টির বেশি চুল পড়ে, তখনই মাথার তালু খালি হয়ে যেতে থাকে। মাথার চুল পাতলা হওয়ার অন্যতম কারণ হচ্ছে খুশকি। মাথা চুলকালে গুঁড়ো গুঁড়ো খোসা দেখা যাওয়াকে খুশকি বলে। তবে কখনো কখনো খোসা দেখা যায় না, মাথায় চুল তেলতেলে ভাব থাকে। এই খুশকি যদি নিয়ন্ত্রণে রাখা যায় তবে মাথায় যে চুল আছে তাকে হয়তো আরো ১০ থেকে ২০ বছর টিকিয়ে রাখা যাবে, অন্যথায় পাঁচ মাস থেকে এক বছরের মাথায় টাক পড়ে যাবে। তবে একটি বিষয় জেনে রাখা ভালো, খুশকি বা তেলতেলে ভাব বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই হরমোনের (অ্যানড্রোজেন) প্রভাবে হয়ে থাকে। সুতরাং এ অবস্থায় খুশকিকে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব, আর খুশকি হবে না এটি সম্ভব নয়। যেহেতু অ্যানড্রোজেন হরমোন কমানো উচিত নয়। অ্যান্টিড্যানড্রাফ শ্যাম্পু ব্যবহারে খোসা খোসা ভাব খুশকি খুব দ্রুত নির্মূল হয়ে যায়। কিন্তু তেলতেলে ভাব তো প্রতিদিনই হয়। অন্য দিকে অ্যান্টিড্যানড্রাফ শ্যাম্পু প্রতিদিন ব্যবহার করা যায় না, তাতে চুলের ক্ষতি হয়। তাহলে যা দাঁড়াল তা হচ্ছে খোসা খোসা ভাব খুশকি দূর করা সম্ভব হচ্ছে, চুল পড়া রোধ করা সম্ভব হচ্ছে না। এ অবস্থায় প্রয়োজনে প্রতিদিন এমন কিছু দিয়ে মাথা ধুতে হবে, যাতে চুলের ক্ষতি না হয়। এ সিস্টেমে খুশকি হয়তো ভালো হবে না, তবে খুশকি ও তেলতেলে ভাব নিয়ন্ত্রণে আসবে এবং চুলও কম ঝরবে। মাথার গোল টাক : এ অবস্থায় রোগী কোনো একদিন ঘুম থেকে উঠে দেখে যে মাথায় কিছু কিছু অংশে গোলাকার টাক পড়েছে। আক্রান্ত স্থানের ত্বক মসৃণ, কোনো চুলকানি বা লাল ভাব নেই, কোনো খোসাও নেই। এ অবস্থা বেড়ে গিয়ে সম্পূর্ণ মাথায় এমনকি শরীরের লোমও ঝরে যেতে পারে। প্রাথমিক অবস্থায় আক্রান্ত স্থানে স্টেরয়েড ইনজেকশন দিয়ে আকারে বেড়ে যাওয়াকে রোধ করা যায় এবং নতুন চুল গজাতে থাকে। প্রতি মাসে একবার ইনজেকশন দিতে হয়।
 লেখিকা : সহযোগী অধ্যাপিকা, ফার্মাকোলজি অ্যান্ড থেরাপিউটিক্স, ঢাকা ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজ। চেম্বার : স্ট্যান্ডার্ড মেডিক্যাল সার্ভিস লিমিটেড, ২০৯/২, এলিফ্যান্ট রোড, ঢাকা। ফোন : ০১৬৮২২০১৪২৭

No comments: