Monday, November 11, 2013

দেদার বিক্রি হচ্ছে মানহীন পশুর মাংস!

ডিসিসি নীরব: দায়িত্বহীন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় :
এমএ বাবর
নিরাপদ মাংসপ্রাপ্তি নিশ্চিত আইনের প্রয়োগ না থাকায় রাজধানীসহ দেশের সব বাজারে দেদার বিক্রি হচ্ছে মানহীন মাংস। বিক্রেতারা মহিষ ও রোগা (অসুস্থ) গরু-ছাগল জবাই করে দেশি গরুর মাংস এবং ভেড়া জবাই করে খাসির মাংস বলে চালিয়ে দিচ্ছে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, মানহীন মাংস আহারে দেশে জটিল ও কঠিন রোগে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। এ অবস্থায় মাংসের মান নিয়ন্ত্রণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কঠোর পদক্ষেপ নেয়া জরুরি হয়ে পড়েছে।
রাজধানীর মাংসের দোকান ঘুরে দেখা গেছে, মাংস বিক্রেতারা কোনো আইনের তোয়াক্কা না করে স্বাধীনভাবে পশু জবাই করছেন। অনেকে রোগা গরু, মহিষ, ছাগল ও ভেড়া জবাই করছেন। নোংরা ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে এসব পশু জবাই করে মাংস প্রস্তুত করা হচ্ছে। আর এসব মাংস চলে যাচ্ছে রাজধানীর বিভিন্ন নামকরা ডিপার্টমেন্টাল স্টোরসহ বিভিন্ন বাজারের মাংসের দোকানে। কেন্দ্রীয় প্রাণীরোগ অনুসন্ধান গবেষণাগার সূত্রে জানা গেছে, রোগা গড়নের গরু দ্রুত মোটা তাজাকরণে নিষিদ্ধ স্টেরয়েড জাতীয় ওষুধ ডেক্সট্রমেথাসন বা ডেকাসন, বেটামেথাসন ও পেরিঅ্যাকটিন অতিরিক্ত মাত্রায় প্রয়োগ করা হয়। এতে গরুর কিডনি ও যকৃতের কার্যকারিতা নষ্ট হয়ে গরু-মহিষ-ছাগলের শরীর থেকে পানি বের হতে পারে না। 
এসব পানি শোষিত হয়ে সরাসরি মাংসে চলে যাওয়ায় গরুকে মোটা দেখায়। এছাড়া পশুর ব্যথা নিরাময়ে শরীরে প্রয়োগ করা হচ্ছে আরেকটি ক্ষতিকর ও নিষিদ্ধ ইনজেকশন ‘ডাইক্লোফেনাক’। ফলে এক সপ্তাহেই একটি পশুর ওজন বেড়ে যাচ্ছে ১০ থেকে ৩০ কেজি। অনেক ক্ষেত্রে অতিরিক্ত মাত্রায় ইউরিয়া কিংবা উচ্চমাত্রার ভিটামিনের মিশ্রণ খাওয়ানো হয়। এতে ওজন বাড়ার সঙ্গে আকর্ষণীয় হয় পশুর দৈহিক গড়ন। 
আর নির্দিষ্ট সময়ে মধ্যে এসব গরু জবাই করে মাংস বিক্রি করা হয়। নইলে এসব পশু স্ট্রোক করে মারা যায়। সাধারণত যেসব ওষুধে বেশি পরিমাণ অ্যান্ড্রোজেন, স্টোজেন, প্রোজেস্টোরেন ব্যবহার করা হয়, তা পশু হজম করতে পারে না। গরুর-মহিষ বা ছাগলের শরীরে থাকা এসব ওষুধ মানবদেহে প্রবেশ করে কিডনি ড্যামেজসহ ক্যান্সারও হতে পারে। এছাড়া স্টেরয়েড সেবন করানো পশুর মাংস খেলে মানুষের ফুসফুসে পানি জমে কিডনি দুর্বল করে। এতে হৃৎপিণ্ডেরও ক্ষতি হতে পারে। সিদ্ধ করে খেলে অবশ্য তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া নাও হতে পারে। কিন্তু পরবর্তীতে মানবদেহে এর প্রভাব সৃষ্টি হয়।  
কেন্দ্রীয় প্রাণীরোগ অনুসন্ধান গবেষণাগারের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. বিধান চন্দ্র দাস বলেন, সুস্থভাবে বেঁচে থাকতে হলে অবশ্যই মাংস আহারে সচেতন হতে হবে। অতিরিক্ত লাল মাংস মানবদেহের জন্য আত্মঘাতী। এছাড়া বেশিরভাগ গরু, মহিষ, ছাগল, দুম্বা, উটের মাংসে রাসায়নিক পদার্থ থাকার পাশাপাশি রয়েছে ক্ষতিকারক কোলেস্টেরেল। এই ক্ষতিকারক কোলেস্টেরেল বা লো ডেনসিটি লাইপোপ্রোটিন (এলডিএল) মানবদেহে সরাসরি রক্তে শোষিত হয় এবং লিভারে গিয়ে এলডিএল তৈরি করে। পরে এটি দেহের বিভিন্ন রক্তনালিতে ব্লক তৈরিতে সহায়তা করে। এর পরিণাম হতে পারে হার্ট অ্যাটাক।
 
হলিফ্যামিলি রেড ক্রিসেন্ট মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের অধ্যাপক কবির হোসেন বলেন, রোগা পশুর মাংস আহারে মানবদেহে অনেক জটিল রোগ হতে পারে। যেসব রোগ দেখা দিতে পারে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য-অ্যানথ্রাক্স, যক্ষ্মা, ব্রুসেলোসিস (যৌন রোগ) ও হাইডো ক্রোসিস (হার্ট, লিভার ও ফুসফুস আক্রান্ত হওয়া)। অনেক ক্ষেত্রে পশুর শরীরে টিউমার থাকলেও টিউমারের জীবাণু মানবদেহে ছড়িয়ে যেতে পারে। তাই মাংস কেনার আগে যতটুকু সম্ভব মান যাচাই করে নিতে হবে। এছাড়া যে কসাই জবাইয়ের আগে পশুটিকে চিকিৎসক দিয়ে (ভেটেরিনারি সার্জন) স্বাস্থ্য পরীক্ষা করিয়ে নেন সেই দোকান থেকে মাংস কেনার পরামর্শ দেন তিনি।

দেশে মানসম্পন্ন ও নিরাপদ মাংসপ্রাপ্তি নিশ্চিত করতে দীর্ঘ ৫২ বছর পর ২০০৯ সালে একটি বিধিমালা প্রণয়ন করে সরকার। কিন্তু ওই বিধিমালা বাস্তবায়ন হয়নি। সর্বশেষ ২০১১ সালের ২৪ আগস্ট জাতীয় সংসদে মাংসের মান নিয়ন্ত্রণে একটি বিল (বিধিমালা) পাস হয়। ওই বিধিমালা এখনো বাস্তবায়ন হয়নি। 
 
এ বিষয়ে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী আবদুল লতিফ বিশ্বাস জানান, দেশে মানসম্পন্ন ও নিরাপদ মাংসপ্রাপ্তি নিশ্চিত করতে মিট কন্ট্রোল অ্যাক্ট ১৯৫৭ যুগোপযোগী করে পশু জবাই ও মাংসের মান নিয়ন্ত্রণ বিল ২০১১ প্রণয়ন করা হয়েছে। এ আইনে যেখানে সেখানে পশু জবাই কারা চলবে না। লাইসেন্স ছাড়া মাংস বিক্রি করার সর্বোচ্চ শাস্তি দুই বছর বিনাশ্রম কারাদণ্ড অথবা ৫০ হাজার টাকার আর্থিক দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। দ্রুত এ আইন কঠোরভাবে বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া চলছে। 
 
মাংসের মান নিয়ন্ত্রণ আইন: ২০১১ সালের আইনের ৩ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, ‘বাণিজ্যিক উদ্দেশে বিক্রির জন্য কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান জবাইখানার বাইরে পশু জবাই করতে পারবে না’। এছাড়া সরকার যেসব পশু জবাই নিষিদ্ধ করেছে সেসব পশু কেউ জবাই করতে পারবে না। বিলের ২৩ নম্বর ধারায় অপরাধ ও বিচার সম্পর্কে বলা হয়েছে এই আইনের বিধিবিধান লঙ্ঘন করলে তার সর্বোচ্চ ১ বছরের বিনাশ্রম কারাদণ্ড অথবা ন্যূনতম ৫ হাজার এবং অনূর্ধ্ব ২৫ হাজার টাকা জরিমানা হবে। একই ব্যক্তি একই অপরাধ দ্বিতীয়বার করলে তার সর্বোচ্চ শাস্তি ২ বছরের বিনাশ্রম কারাদণ্ড ও সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকার আর্থিক দণ্ড ভোগ করতে হবে। ১৩ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে পশু জবাই, মাংস প্রক্রিয়াকরণ ও বিপণনের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের উপযুক্ত চিকিৎসক দ্বারা স্বাস্থ্য পরীক্ষা করতে হবে। স্বাস্থ্য পরীক্ষায় সংশ্লিষ্টরা ছোঁয়াচে ও সংক্রামক রোগমুক্ত হলেই মাংস বিপণনের অনুমতি পাবেন।
http://manobkantha.com/2013/11/09/146253.html 

No comments: