সফল হচ্ছে না ভেজালবিরোধী অভিযান :
ভেজাল ও নিুমানের প্রসাধনী পণ্য বিক্রি এখন আর ফুটপাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এসব পণ্য এখন পাইকারি বাজার হয়ে চলে যাচ্ছে দেশের বড় বড় মার্কেটের দোকানে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব নকল-ভেজাল পণ্য ব্যবহারে চর্মরোগসহ ক্যান্সার হওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে।
নকল শ্যাম্পু তৈরিতে গার্মেন্টস শিল্পে ব্যবহার হওয়া তরল সাবানের সঙ্গে রং ও ঘ্রাণ ব্যবহার করা হয়। ল্যাক্সিবেট স্পিরিটে হুবহু রং ও ঘ্রাণ মিলিয়ে পুরনো বডি স্প্রে ও পারফিউমের (সেন্ট) কনটেইনারের মুখে সিরিঞ্জ দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করানো হয়। স্প্রে হওয়ার জন্য ব্যবহার করা হয় গ্যাসলাইটের গ্যাস। এভাবে সব ধরনের নামি ব্র্যান্ডের পণ্য নকল করে চকবাজার পাইকারি দোকান হয়ে রাজধানীর বিভিন্ন মার্কেটে চলে যায়। এরা খুব নিখুঁতভাবে পণ্যের হুবহু হলোগ্রাম, স্টিকার ও বিএসটিআইয়ের সিলসহ মোড়ক তৈরি করেন। যার ফলে ক্রেতার পক্ষে আসল-নকল যাচাই কঠিন হয়ে পড়ে। প্রসাধনী কিনতে গিয়ে প্রতারিত হওয়ার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। বেশির ভাগ ক্রেতাই প্রতারিত হচ্ছেন ফুটপাতের দোকান থেকে প্রসাধনী সামগ্রী সংগ্রহ করে। আবার কিছু বিক্রেতা ক্রেতা বুঝে অনেক পণ্যের মধ্যে এক-দুইটি ভেজাল পণ্য কৌশলে বিক্রি করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এভাবে বিক্রেতা লাভবান হচ্ছেন ভেজাল পণ্য আসল পণ্যের দামে বিক্রি করে। এদিকে ক্রেতা পছন্দের আসল পণ্যটি সংগ্রহ করতে গিয়ে প্রতারিত হয়ে আস্থা হারাচ্ছেন তার নির্দিষ্ট ব্র্যান্ডের পণ্যের ওপরে।
র্যাবের ভেজালবিরোধী অভিযান পরিচালনা টিম সূত্রে জানা গেছে, রাজধানীর দোকান ও ফুটপাত দেশি-বিদেশি নামি ব্র্যান্ডের শ্যাম্পু, সাবান, লোশন, তেল, সেভিং ক্রিম, পারফিউম, নেল পলিশসহ বিভিন্ন ভেজাল পণ্যে ছেয়ে গেছে। তাদের বিভিন্ন অভিযানের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে যে, ৩-৪ ধাপে এসব ভেজাল পণ্য উৎপাদন ও বাজারজাত করা হয়। একশ্রেণীর ফেরিওয়ালা রাজধানীর অভিজাত এলাকায় ঘুরে ঘুরে ব্যবহৃত পণ্যের টিউব বা কনটেইনার সংগ্রহ করেন। এদের কাছ থেকে চলে যায় রাজধানীর বেগম বাজার, লালবাগ ও চকবাজারে ভাঙাড়ির পাইকার দোকানে। ভাঙাড়ির পাইকার বিক্রেতা ব্র্যান্ড অনুযায়ী কনটেইনার ও টিউব পৃথক করে বস্তাবন্দি করে রাখেন। ভেজাল পণ্য উৎপাদনকারীরা এসব দোকান থেকে টিউব ও কনটেইনার সংগ্রহ করেন। আবার অনেক সময় তারা হকারের কাছ থেকেও তা সংগ্রহ করে থাকেন। এরা ওই কনটেইনার বা টিউবের বাইরে দিকটি খুব ভালোভাবে পরিষ্কার করে পণ্যের রং ও ঘ্রাণ হুবহু মিলিয়ে মোড়কজাত করে নিজেদের প্রতিনিধির মাধ্যমে বাজারজাত করেন।
র্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ফরহাদ হোসেন জানান, তাদের পরিচালনায় ভেজালবিরোধী অভিযানে যেসব প্রসাধনী পণ্যে বেশি ভেজাল পাওয়া গেছে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- প্যান্টিন ও সানসিল্কসহ বিভিন্ন দেশি বিদেশি ব্র্যান্ডের শ্যাম্পু, সাবান, ফেয়ার অ্যান্ড লাভলী, মহারানী øো, গার্নিয়ার, ডাভ, জনসন ব্র্যান্ডের পণ্য, বডি লোশন, সেভিং ক্রিম ও নেল পালিশ।
তিনি বলেন, বারবার অভিযান চালিয়েও ভেজাল পণ্য উৎপাদন প্রতিরোধ নিয়ন্ত্রণে আনা যাচ্ছে না। চকবাজারের একটি মার্কেটের কয়েকটি দোকানে বারবার অভিযান চালিয়ে জেল-জরিমানা করেও সুফল পাওয়া যাচ্ছে না। এরা জরিমানা দিয়ে পুনরায় আবার ভেজাল পণ্যের ব্যবসা শুরু করেন। আবার কিছু ব্যবসায়ী অভিযান থেকে রক্ষা পেতে তাদের ব্যবসার কৌশল পরিবর্তন করছেন। ভেজাল পণ্যের ব্যাপারে জনসাধারণকে সতর্ক হওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।
রসায়নবিদ নজরুল ইসলাম বলেন সাবান, শ্যাম্পু, পেস্ট ও øোতে ব্যবহার হওয়া সোডিয়াম লরাইল ইথার সালফেট, সোডিয়াম পালমিটেট, ডাইমেথিকোন, ফ্রেগরেন্স টিটেনিয়াম ডাই অক্সাইড, অ্যালকোহল, ওয়ার হাইড্রোক্স প্রোপাইল, ট্রাইমনিয়াম ক্লোরাইড, ইথাইল, হেক্সাইল মেথোক্সি সিনামেট, জিংক, ক্যাটিওনিক, টাইটেনিয়াম-ডাই-অক্সাইড, টেকোপার্ল এসিটেট, পটাশিয়াম স্টিয়ারেট, সেট্রিমাইড, পটাশিয়াম স্টিয়েরেট, সেট্রিমাইড ক্যালসিয়াম কার্বোনেট ইত্যাদি রসায়ন সামগ্রী। এগুলো সঠিক মানে ও শোধন না করে ব্যবহার করলে স্ক্রীনে মারাত্মক রোগ দেখা দিতে পারে।
চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. এমইউ কবির চৌধুরী জানান, মেয়াদ উত্তীর্ণ, ভেজাল ও নিুমানের প্রসাধনী পণ্য ব্যবহারে চুলকানি, একজিমাসহ বিভিন্ন রকমের চর্মরোগ দেখা দেয়। এমনকি এসব সামগ্রী দীর্ঘদিন ব্যাবহার করলে ক্যান্সারের মতো ভয়াবহ রোগও হতে পারে।
No comments:
Post a Comment