দুদককে মামলার পরামর্শ বিশ্বব্যাংক প্যানেলের
পদ্মা সেতু নির্মাণে বিশ্বব্যাংকের অর্থছাড় নিশ্চিত করতে হলে দুর্নীতির পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্তদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করতে হবে। বিশ্বব্যাংক প্যানেল এরকমই পরামর্শ দিয়েছে দুদককে। দুদকের দায়িত্বশীল একটি সূত্রে এ খবর জানা গেছে।
সূত্রমতে, বিশ্বব্যাংক প্যানেল নথিপত্র সংগ্রহ করে নিশ্চিত হয়েছে যে এ প্রকল্পে সরকারের ভেতরের ও বাইরের কিছুসংখ্যক প্রভাবশালী ব্যক্তি দুর্নীতির ষড়যন্ত্র বা পরিকল্পনা করেছিলেন। অর্থ লেনদেন হয়েছে কি-না তা স্পষ্ট নয়। বাংলাদেশের আইনে দুর্নীতির পরিকল্পনা করাও শাস্তিযোগ্য অপরাধ। ফলে তাদের বিরুদ্ধে মামলা করতে হবে। বিশ্বব্যাংক প্যানেল এ পরামর্শ দিয়েছে।
জানা গেছে, ওই প্রকল্পে কানাডার কোম্পানি এসএনসি-লাভালিনকে পরামর্শক হিসেবে কাজ পাইয়ে দেওয়ার শর্তে অনৈতিক অর্থ লেনদেনের কথাবার্তা হয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছিলেন কিছু প্রভাবশালী লোক। এ বিষয়ে তথ্য-প্রমাণাদি বেরিয়ে এসেছে কানাডার রয়্যাল পুলিশের তদন্তে। বিশ্বব্যাংক প্যানেল তদন্ত কাজের গাইডলাইন দিয়েছে দুদককে। কানাডা থেকে তদন্তের নথিপত্র সংগ্রহ করে দিতে সহায়তারও আশ্বাস দিয়েছেন তারা।
সূত্র জানায়, কানাডিয়ান রয়্যাল পুলিশের তদন্ত রিপোর্ট, ঘুষ লেনদেন কাজে যুক্ত এসএনসি-লাভালিন কর্মকর্তা রমেশ সাহার জবানবন্দি, রমেশের তৈরি ঘুষের তালিকা ও বাংলাদেশের প্রচলিত আইন যাচাই করে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী মামলা দায়ের করবে দুদক।
এদিকে গতকাল মঙ্গলবার বিশ্বব্যাংক প্যানেল সদস্যরা ঢাকা ত্যাগ করেছেন। এক সপ্তাহের মধ্যে বিশ্বব্যাংক সদর দফতরে তাদের মতামত দেওয়ার কথা। এরপর বিশ্বব্যাংক পদ্মা সেতু প্রকল্পে ঋণ ছাড়ের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারে বলে জানা গেছে। এদিকে পদ্মা সেতু বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনার জন্য আরেকটি প্রতিনিধি দল ঢাকা আসার কথা। তারা কবে আসবেন তা নিশ্চিত নয়। সূত্রমতে, প্যানেলের মত ইতিবাচক হলে খুব তাড়াতাড়ি তারা ঢাকা আসবেন। দুদক চেয়ারম্যান গোলাম রহমান গতকাল সমকালকে বলেছেন, মামলা করার মতো তথ্য-প্রমাণ
পাওয়া গেলে অভিযুক্ত যেই হোক না কেন, তার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হবে। তিনি আরও বলেন, দুদকের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয় তা হলো, মামলার পর আদালতে বিচারিক কাজে নিজেদের পক্ষে রায়ের জন্য সব ধরনের দালিলিক প্রমাণ থাকা। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বিশ্বব্যাংক প্যানেলের সদস্যরা আমাদের কাজে সন্তুষ্ট কি-না তা আপনারা ভালো বলতে পারবেন। তিনি বলেন, এখন আমরা প্যানেলের প্রতিবেদনের অপেক্ষায় আছি। তাদের প্রতিবেদনে যদি অভিযোগ প্রমাণ হয় তাহলে তা যাচাই করে অভিযুক্তদের আইনের হাতে সোপর্দ করা হবে। গোলাম রহমান বলেন, বিশ্বব্যাংক অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কোনো তথ্যপ্রমাণ আমাদের কাছে হাজির করেনি। তবে আমাদের অনুসন্ধান করা তথ্য তাদের দেওয়া হয়েছে। এখন বিশ্বব্যাংক প্যানেল কী প্রতিবেদন দেয়, সেটিই দেখার বিষয়। তদন্ত কার্যক্রম ও প্রকল্প বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় সমান্তরাল গতিতে এগিয়ে যাওয়া উচিত বলে তিনি মনে করেন।
দুদকের একটি সূত্র জানায়, পদ্মা সেতু প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগে অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তিও আসামি হতে পারেন। এ ধরনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মামলা করার ক্ষেত্রে প্রথমেই প্রয়োজন পর্যাপ্ত তথ্য-প্রমাণ। এ মামলা দায়েরের আগে কানাডার রয়্যাল পুলিশের তদন্ত রিপোর্ট সংগ্রহ করতে হবে। একই সঙ্গে কানাডিয়ান কোম্পানি এসএনসি-লাভালিনের কর্মকর্তা রমেশ সাহা ও ইসমাইল হোসেনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা দরকার।
দুদক আগে স্বীকার না করলেও এখন স্বীকার করছে যে, দুর্নীতির ষড়যন্ত্র করাও আইনের চোখে অপরাধ। দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন-১৯৪৭-এর ৫(২) ধারা অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা যায়।
জানা গেছে, পদ্মা সেতু প্রকল্পে এসএনসি-লাভালিনকে পরামর্শকের কাজ পাইয়ে দেওয়ার বিনিময়ে বাংলাদেশের কতিপয় ব্যক্তিকে অর্থ দিতে হবে বলে রমেশ সাহা তার ডায়েরিতে যাদের নাম ও টাকার পরিমাণ উল্লেখ করে একটি তালিকা তৈরি করেছিলেন, সে তালিকাই এখন দুদকের তদন্তের মুখ্য বিষয়। কাজ পাইয়ে দেওয়ার বিনিময়ে বাংলাদেশের ওইসব ব্যক্তি তাদের কাছে অর্থ দাবি করেছিলেন কি-না, নাকি কাজ পাওয়ার বিনিময়ে লাভালিন খুশি হয়ে টাকা দিতে চেয়েছিল_ রমেশের কাছে এসব প্রশ্নের উত্তর জানতে কানাডায় যাবে দুদকের বিশেষ তদন্ত কমিটি। মামলা দায়েরের জন্য ঘুষ লেনদেন পরিকল্পনা সম্পর্কে রমেশের বক্তব্য খুবই জরুরি বলে মনে করছে দুদক।
রমেশ যাদের নাম লিখেছিলেন তাদের মধ্যে পদ্মা সেতুর কাজের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন যে ৪ জন তারা হলেন_ ছুটিতে যাওয়া প্রধানমন্ত্রীর অর্থবিষয়ক উপদেষ্টা ও পদ্মা সেতু প্রকল্পের ইন্টেগ্রিটি অ্যাডভাইজার ড. মসিউর রহমান, সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন, ছুটিতে যাওয়া সেতু বিভাগের সচিব মোশাররফ হোসেন ভঁূইয়া, প্রকল্প পরিচালক রফিকুল ইসলাম, সরকারের বাইরের দু'জন হলেন সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আবুল হাসান চৌধুরী ও জাতীয় সংসদের হুইপ নূর-ই-আলম লিটনের ভাই নিক্সন চৌধুরী।
বিশ্বব্যাংক প্যানেলের গাইডলাইন অনুযায়ী দুদকের কমিটি পুরো তদন্ত কাজ পুনরায় করবে বলে জানা গেছে। এ লক্ষ্যে ড. মসিউর রহমানসহ ৩০ জনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। এর মধ্যে ড. মসিউর ছাড়া ২৯ জনকে আগে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। আবারও তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হতে পারে।
সৌজন্যে: http://www.samakal.com.bd/details.php?news=13&action=main&option=single&news_id=300516&pub_no=1202
No comments:
Post a Comment