Wednesday, October 24, 2012

কৃত্রিম মোটাতাজা গরুতে জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি

 কৃত্রিম মোটাতাজা গরুতে জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি
লেখক: আবুলখায়ের  |  বুধবার, ২৪ অক্টোবর ২০১২, ৯ কার্তিক ১৪১৯
Details
ক্রেতা আকর্ষণে অসাধু ব্যবসায়ীদের জঘন্য তত্পরতা
কোরবানি আসলে এক শ্রেণী বেপারী কিংবা ব্যবসায়ী মুনাফার লোভে জনস্বাস্থ্যের মারাত্মক ক্ষতিকর গরু মোটা-তাজাকরণের ওষুধ খাইয়ে দেদারসে বাজারজাত ও বেচাকেনা করছেন। ক্রেতারা ঐ সকল মোটা-তাজা গরু কেনার জন্য আকৃষ্ট বেশি।
বিশেষজ্ঞ চিকিত্সক ও পশু চিকিত্সকগণ বলেছেন, মোটা-তাজাকরণের ওষুধ খাওয়ালে গরু দেখতে মোটা হয় ঠিকই। শরীরে চামড়ার নিচে পানি জমে ফুলে যায় কিংবা চর্বি বেড়ে যায়। ঐ ওষুধে গরুর মুখমণ্ডল ফুলে যায়। আসলে মাংস একটুও বাড়ে না। এটা এক ধরনের প্রতারণা। কোন কোন বেপারী গরুকে ইউরিয়া সার খাওয়ায়। ইউরিয়া সার কেমিক্যাল জাতীয়। যেন কোন কেমিক্যাল ক্যান্সার সৃষ্টিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। মোটা-তাজাকরণ সম্পর্কে জনসচেতনতা গড়ে তোলা জরুরি বলে বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকরা জানান।
কোরবানি ঈদ আসার এক-দুই মাস পূর্ব থেকে এই ব্যবসায়ী চক্র গরু মোটা-তাজাকরণের জন্য সক্রিয় হয়ে উঠে। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত থেকে সীমান্ত পথে আসছে গরু মোটা-তাজাকরণের ওষুধ। এ ওষুধের কদর বাড়ে কোরবানি ঈদের ১ থেকে ২ মাস আগে। গত ২ দিন রাজধানী সিটি করপোরেশন এলাকার ২০টি গরুর হাটে খোঁজ-খবর ও সরেজমিনে গিয়ে বিক্রেতা সেজে কৌশলে ১৫ জন ব্যবসায়ীর সঙ্গে আলাপে তারা মোটা-তাজাকরণ সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য জানান। তারা পশুচিকিত্সক নয় ও অশিক্ষিত। তবে গরু   মোটা-তাজাকরণের বিষয়ে অভিজ্ঞ। যত দ্রুত মোটা করা যায়, জানা আছে বলে ব্যবসায়ীরা এ প্রতিনিধিকে জানান। কুষ্টিয়া থেকে আগত গরু বেপারী দুলাল, লালু, মোস্তাক, হিরন; দিনাজপুরের সফিকুল, মেহেদী, জাহাঙ্গীর আলম, খোরশেদ ও মেহেরপুরের সুমন, নাসির, কুদ্দুস ইত্তেফাকের প্রতিনিধিকে জানান, গরু মোটা-তাজাকরণের ওষুধে মানুষের স্বাস্থ্যের ক্ষতি সম্পর্কে তাদের জানা নেই। এ সকল ওষুধ খাওয়ালে গরু দ্রুত মোটা হয়ে যায়। খাওয়াতে খাওয়াতে তারা ওষুধের ডোজ সম্পর্কে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন বলে বেপারীরা জানান। তারা গাবতলী, হাজারীবাগ, উত্তরা, আজমপুর ও পুরাতন ঢাকার হাটে গরু সরবরাহ করে থাকেন। হাটে বেশ কিছু গরু মুখমণ্ডল ফোলা ও মোটা দেখা যায়। এ সকল গরু ওষুধ খাওয়ানোর ফলে সাময়িক মোটা করা হয়েছে বলে কয়েক বেপারী জানান।
লিভার বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. মবিন খান বলেন, স্ট্রেরয়েড জাতীয় ওষুধ খাইয়ে গরু মোটা-তাজা করা হয়। পাশাপাশি ইউরিয়া সার ও রাব খাওয়ানো হয়। এ সকল ওষুধ ও কেমিক্যাল খাওয়ানো গরুর মাংস খেলে লিভার নষ্টসহ জটিল রোগ, ডায়াবেটিস, উচ্চরক্তচাপ, আথ্রাইটিস হয়ে হাড় ভেঙ্গে যাওয়া, চোখে ছানি পড়া ও বুদ্ধিজনিত ঘাটতি হওয়ার আশংকা বেশি। চর্ম ও যৌন রোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. এমএন হুদা একই মতামত পোষণ করে বলেন, চেহারা সুন্দর ও নাদুস-নুদুস করার জন্য এক শ্রেণীর তরুণী গরু মোটা-তাজাকরণের ডেকাসন, ওরাডেক্সন, বিকাসন ইত্যাদি ওষুধ ব্যবহার করে থাকে। ঐ সকল তরুণীর অনুরূপ রোগব্যাধি ও জটিলতা হওয়ার আশংকা বেশি বলে তিনি অভিমত ব্যক্ত করেন।
কিডনি ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ও কিডনি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. হারুন অর রশীদ বলেন, ঐ পশুগুলোর কিডনিসহ স্বাস্থ্যঝুঁকি বেশি। মানুষের জীবন রক্ষার্থে মোটা-তাজাকরণ ওষুধ পরিহার করে স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় খড়, খৈল, ভুসি, ঘাস খাইয়ে স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় লালন-পালন করার আহ্বান জানান।
গরু মোটা-তাজাকরণে ওষুধ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। অথচ এ সকল ওষুধ অবাধে পুরাতন ঢাকার কাজী আলাউদ্দিন রোডে পশু হাসপাতালের কাছে, রাজধানীর অলি গলিতে কিংবা ঢাকার বাইরে হাটবাজারে ওষুধের দোকানে অথবা পান-বিড়ি-সিগারেটের দোকানে পাওয়া যায়। পশু সম্পদ অধিদফতর কিংবা সরকারের সংশ্লিষ্ট প্রশাসন নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করে আসছে।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের পশু বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মুজাফফর হোসেন বলেন, পশু মোটা-তাজাকরণের ওষুধ খাওয়ালে ফোমের মতো ফুলে যায়। প্রায়ই সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগে এ নিষিদ্ধ ওষুধ পশুকে খাওয়ানোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করা হয়ে থাকে।

No comments: