Monday, January 14, 2013

নিশ্চল ওষুধ প্রশাসন অধিদফতর

আয়নাল হোসেন
আশির দশকের গোড়ায় ওষুধবাজারে দেশীয় উৎপাদক প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ শুরু হয়। গত ৩০ বছরে বদলে গেছে পুরো ওষুধবাজারের চিত্র। এখন চাহিদার ৯৭ শতাংশ ওষুধের জোগান দিচ্ছে দেশী কোম্পানিগুলো। কিন্তু জীবন রক্ষাকারী এসব ওষুধের মান প্রশ্নে সংশয় এখনো কাটেনি। একই ওষুধের কোম্পানিভেদে দামের পার্থক্য তো আছেই। নিয়ন্ত্রক সংস্থা ওষুধ প্রশাসন অধিদফতরের ভূমিকা এক্ষেত্রে প্রায় নিশ্চল। মান নিয়ন্ত্রণ ও বাজার তদারকিতে সংস্থাটির দুর্বল অবস্থানের কারণে দেশী-বিদেশী ওষুধ মিলে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার এ বিশাল বাজারে বিক্রি হচ্ছে নকল ও ভেজাল ওষুধ।
ওষুধ প্রশাসন অধিদফতর বলছে, পর্যাপ্ত জনবল ও বাজেটের অভাবে সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারছে না সংস্থাটি। দেশের ওষুধশিল্প যেভাবে সম্প্রসারণ হয়েছে সে অনুযায়ী পরিবর্তন আসেনি প্রশাসনে। প্রতি থানায় কমপক্ষে একজন কর্মকর্তার প্রয়োজন থাকলেও সব জেলায়ও নেই কোনো কর্মকর্তা। বছরে এ অধিদফতরের পেছনে সরকার ব্যয় করে মাত্র সাড়ে ৬ কোটি টাকা। ফলে অবকাঠামো ও লোকবলের কারণেই ওষুধের মান নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হচ্ছে না।
ওষুধ প্রশাসন অধিফতরের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জাহাঙ্গীর হোসেন মল্লিক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ওষুধ প্রশাসনকে ঢেলে সাজানো উচিত। লোকবল ও বাজেটস্বল্পতা রয়েছে। তবে সমস্যার মধ্যেও কাজ চালিয়ে যাচ্ছি। প্রশাসনের গতি ফিরিয়ে আনতে সব ধরনের ফি বাড়িয়ে দিয়েছি। বর্ধিত ফির কারণে সরকারি কোষাগারে অতিরিক্ত ৫ কোটি টাকা জমা দেয়া সম্ভব হবে। আশা করি, সরকার এ সংস্থার আধুনিকায়নে মনোযোগী হবে।’
বাজার ঘুরে দেখা গেছে, একই ওষুধ হলেও কোম্পানিভেদে দামের পার্থক্য প্রচুর। ওষুধের ফর্মুলা ও উপাদান একই হওয়া সত্ত্বেও দামের পার্থক্যের কারণে মান নিয়েও সংশয়ে থাকেন ক্রেতারা। স্কয়ারের তৈরি ১০০ এলাট্রল ট্যাবলেটের দাম ২৬০ টাকা। অথচ প্রিমিয়ার ল্যাবরেটরির ১০০ এলাট্রল ট্যাবলেটের দাম মাত্র ৩৫ টাকা। ইনসেপ্টার ৪০ মিলির ১০০ পেনটোনিক্স ট্যাবলেট ৩০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে আর ব্রিস্টল কোম্পানির পেনটোপ্রাজল নামের একই ওষুধের দাম ৫০ টাকা। বেক্সিমকো ফার্মার নিওসেপটিন-আর ৩৭৫ টাকায় বিক্রি হলেও এলিয়নের একই ওষুধ বিক্রি হচ্ছে মাত্র ৫৫ টাকায়। দাম নিয়ন্ত্রণে ওষুধ প্রশাসন যেমন নীরব, তেমনি আমদানি নিষিদ্ধ ওষুধের ক্ষেত্রেও তাদের ভূমিকা একই। দেশের বাজারে এ-জাতীয় হাজার খানেক ওষুধ চোখের সামনেই বিক্রি হচ্ছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে লিভার সমস্যায় ব্যবহূত অ্যালবোটিন ইনজেকশন, রক্তশূন্যতার জন্য নিওরাল। চোরাই পথে আসছে এ ওষুধগুলো। বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি হচ্ছে কিছু ওষুধ। কিন্তু সেগুলোর মান প্রশ্নে নির্বিকার ওষুধ প্রশাসন। মাঝে মধ্যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তায় কিছু কিছু প্রতিষ্ঠানে অভিযান চালানোর মধ্যেই সীমিত তাদের কার্যক্রম।
মান, দাম ও বাজার নজরদারিতে ব্যর্থতার দায়ভার ওষুধ প্রশাসন তাদের অবকাঠামোগত দুর্বলতার ওপরই চাপিয়ে দিচ্ছে। তাদের অভিযোগ, দক্ষ জনবল, উন্নত মানের গবেষণাগার, লজিস্টিক সুবিধাসহ পর্যাপ্ত বরাদ্দের অভাবেই তারা সঠিক মান নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না। ওষুধ প্রশাসন অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, দেশব্যাপী তাদের অনুমোদিত পদ আছে ৩৭০টি। এর বিপরীতে কর্মরত মাত্র ১৪৩ জন। একজন মহাপরিচালক, তিনজন পরিচালক, চারজন উপপরিচালক, ১১ জন সহকারী পরিচালক, একজন সহকারী লাইসেন্স অফিসার, ২১ জন ড্রাগস সুপার ও চারজন পরিদর্শক মিলে মোট ৪৮ জন কর্মকর্তা এবং ৯৫ জন কর্মচারী রয়েছেন। এর মধ্যে প্রধান কার্যালয়ে দায়িত্ব পালন করছেন মাত্র ২২ জন। দেশব্যাপী ২১ জন ড্রাগ সুপার ও চারজন পরিদর্শক নকল ভেজাল ওষুধ শনাক্ত ও স্যাম্পল সংগ্রহের কাজে নিয়োজিত। দেশব্যাপী বিভিন্ন জেলায় রয়েছে ৩৫টি কার্যালয়। মান নিয়ন্ত্রণে ঢাকা ও চট্টগ্রামে দুটি টেস্টিং ল্যাবরেটরি রয়েছে। মান পরীক্ষক মাত্র দুজন।
অবকাঠামো দুর্বলতার কথা স্বীকার করে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব মুহম্মদ হুমায়ন কবির এ প্রসঙ্গে বণিক বার্তাকে বলেন, একবারেই সবকিছু করা সম্ভব নয়। অধিদফতরের ক্ষমতা পর্যায়ক্রমে বাড়ানো হচ্ছে। সরকারি কর্মকমিশনের মাধ্যমে ও স্বতন্ত্রভাবে জনবল নিয়োগ করা হচ্ছে। তারপরও কোম্পানিগুলোর গুণগত মানসম্পন্ন পণ্য তৈরিতে কার্যকর ভূমিকা রাখছে ওষুধ প্রশাসন অধিদফতর।
দেশে ২৬৫টি ওষুধ কোম্পানির মধ্যে চালু রয়েছে ১৮১টি। এর মধ্যে মাত্র ২০টি প্রতিষ্ঠান পুরো বাজারের ৬০-৭০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করছে। স্কয়ার, বেক্সিমকো ফার্মা, ইনসেপটা, একমি, অপসোনিন, রেনাটা, এরিস্ট্রো ফার্মা, এসিআই, ওরিয়ন, ড্রাগ ইন্টারন্যাশনাল, এসকেএফ, অ্যাভেনটিস, ইবনে সিনা, রেডিয়ান্ট ফার্মার মতো নেতৃস্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের ওষুধের মান নিজেরাই নিয়ন্ত্রণ করছে। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে অনেক ওষুধ রফতানিও হচ্ছে। কিন্তু বাকি দেড় শতাধিক কোম্পানি কী ওষুধ উৎপাদন করছে, তাদের উৎপাদিত ওষুধ কতটা মানসম্পন্ন, তা সঠিকভাবে জানে না ওষুধ প্রশাসন। দেড় শতাধিক কোম্পানি নিজেদের পছন্দমতো ওষুধ উৎপাদন করে বাজারজাত করছে। কখনো কখনো প্রতিষ্ঠিত কোম্পানির ওষুধ নকল করেও বাজারে ছাড়ছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে আর্থিক সুবিধার বিনিময়ে ব্যবস্থাপত্রে চিকিত্সকদের দিয়ে এসব ওষুধের ব্যবহারের পরামর্শ দেয়া হচ্ছে।
ওষুধ ব্যবসায়ীরা জানান, সরকার দেশের শিল্প, কল-কারখানা রক্ষার্থে শিল্প পুলিশ গঠন করেছে। ওষুধ প্রশাসনের জন্যও তেমন আলাদা ফোর্স থাকা প্রয়োজন। তাহলেই নকল ও ভেজালকারীদের বিরুদ্ধে যেকোনো সময় অভিযান চালানো সম্ভব হবে। তাতে নকল ও ভেজালের পরিমাণও অনেকটা কমে আসবে। শাস্তির ভয়ে নকল বা ভেজাল থেকে উৎপাদনকারী থেকে শুরু করে পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায়ীরা সজাগ থাকবেন।
তারা বলেন, দেশে ২৬৫টি অ্যালোপ্যাথিক, ২০১টি আয়ুর্বেদিক, ২৬৮টি ইউনানি, ২৫টি হারবাল ও ৭৯টি হোমিওপ্যাথিক মিলে মোট ৮৩৮টি কোম্পানি রয়েছে। সেগুলোর উৎপাদন ও বিপণন নজরদারির জন্য উপজেলা থেকে শুরু করে জেলাপর্যায়ে পরিদর্শক থাকা প্রয়োজন। তাছাড়া সারাবছর নকল ও ভেজালবিরোধী ভ্রাম্যমাণ অভিযান চালালে অবস্থার উন্নতি হবে।
 http://bonikbarta.com/?view=details&pub_no=202&menu_id=1&news_id=25655&news_type_id=1

No comments: