হেলাল উদ্দিন
এককভাবে সরকার সর্বোচ্চ রাজস্ব আদায় করছে সিগারেট উৎপাদকদের কাছ থেকে। তারপরই মোবাইল ফোন অপারেটরদের অবস্থান। গত অর্থবছরে সিগারেটে আগের বছরের চেয়ে রাজস্ব আয়ের প্রবৃদ্ধি ছিল ৩৭ শতাংশ। কিন্তু এবার পরিস্থিতি পুরো উল্টে গেছে। প্রবৃদ্ধি দূরে থাক বিশাল অংকের রাজস্ব ঘাটতির মুখোমুখি এখন জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। কমপক্ষে ৩ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব ঝুঁকির আশংকা করছেন নীতিনির্ধারকরা। নভেম্বর পর্যন্ত প্রায় ১৪৫ কোটি শলাকা সিগারেট কম উৎপাদন হয়েছে। এতে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে রাজস্ব আয় কমেছে ৪০ শতাংশেরও বেশি। বহুজাতিক কোম্পানি ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো (বিএটি) এবং দেশীয় ঢাকা টোব্যাকো ইন্ডাস্ট্রি থেকে রাজস্ব আদায় আশংকাজনক কমে গেছে। অথচ এ খাত থেকে ১২ হাজার ২১০ কোটি টাকা রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য রয়েছে, যা মোট ভ্যাট রাজস্বের ৩১ শতাংশ। কেন এ নাজুক অবস্থা?
যুগান্তরের অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী মূলত দুটি কারণে এবার প্রত্যাশিত রাজস্ব আদায় করা সম্ভব হবে না। রাজস্ব ফাঁকির অসৎ উদ্দেশ্যে চলতি অর্থবছরের উচ্চ শুল্কের বিপুল পরিমাণ সিগারেট চাহিদা বহির্ভূতভাবে গত অর্থবছরেই নিু শুল্কে খালাস নেয়া হয়েছে। এছাড়া হীন ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে দেশীয় সিগারেটের বাজার দখলে বিএটির অপকৌশলকে বড় কারণ বলে মনে করেন এনবিআরের নীতিনির্ধারকরা। উচ্চমান ও মূল্যের ব্রিস্টল সিগারেটকে সর্ব নিুস্তরের সিগারেট ঘোষণা দিয়ে শত শত কোটি টাকা রাজস্ব ফাঁকি দেয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। এতে দেশীয় সিগারেট উৎপাদন খাতে বড় ধরনের সংকট সৃষ্টি হয়েছে। এসব কারণে শুধু সিগারেটেই এ বছর রাজস্ব ঝুঁকি ৩ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে বলে আশংকা করা হচ্ছে। এনবিআরের হিসাবে নভেম্বর পর্যন্ত এ ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১৫শ’ ৬০ কোটি টাকা।
৭০ ও ৮০ দশকে ব্রিস্টল বাংলাদেশে প্রিমিয়াম ব্রান্ড হিসেবে ক্যাপস্টানের সমপর্যায়ে বিক্রি হতো। উপমহাদেশের প্রতিটি দেশেই ব্রিস্টল মধ্যম ব্রান্ডের সিগারেট হিসেবে বিক্রি হচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশেই শুধু ব্যতিক্রম করছে বিএটি। ভ্যাট কর্তৃপক্ষের পর্যবেক্ষণ হচ্ছে, কোন বহুজাতিক কোম্পানি তাদের আন্তর্জাতিক ব্রান্ডকে নিুমানের উপকরণ ব্যবহারের মাধ্যমে নিুস্তরের সিগারেট হিসেবে ঘোষণা প্রদান করা সম্পূর্ণ অনৈতিক। এ ক্ষেত্রে ব্রিস্টল সিগারেট নিুস্তরে অবনমিত রাখা অতিশয় অস্বাভাবিক।
এনবিআরের চেয়ারম্যান গোলাম হোসেন বিষয়টি স্বীকার করে জানান, রাজস্ব আয়ের স্বার্থে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। ভ্যাট এলটিইউ এ নিয়ে কাজ করছে।
এনবিআরের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সদস্য উদ্বেগ প্রকাশ করে জানান, ব্রিস্টল বিশ্ব মানসম্পন্ন সিগারেট। কিন্তু বিএটি কয়েক বছর ধরে কম শুল্ক ও মূল্যে তা বাজারজাত করছে। এতে সরকার বিপুল অংকের রাজস্ব হারাচ্ছে। দেশীয় উৎপাদকরাও এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তবে ব্রিস্টলকে আপাতত মধ্যম মানের স্তরে উন্নীত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে এনবিআর।
বিএটির রেগুলেটরি অ্যাফেয়ার্স হেড অব কর্পোরেট শাহেদ যোবায়ের ব্রিস্টলের মূল্য কারচুপি সরাসরি অস্বীকার করে বলেন, এ নিয়ে এনবিআরের সঙ্গে আলোচনা চলছে। আড়াই বছর ধরেই ব্রিস্টল বাজারজাত করা হচ্ছে। তিনি সরাসরি ব্রিস্টল সম্পর্কিত অভিযোগ এড়িয়ে গিয়ে বলেন, এ নিয়ে আমার কোন মতামত নেই।
বিএটির ব্যাখ্যা তলব : জানা গেছে, বিএটির আন্তর্জাতিক ব্রান্ড ব্রিস্টল পার্শ্ববর্তী ভারতে বিক্রি করা হয় ৫৬ রুপিতে। এর আন্তর্জাতিক মূল্য ইন্টারনেটে পাওয়া গেছে ১০ প্যাকেটের কার্টন ২০ দশমিক ১৩ মার্কিন ডলার (১৬৫ টাকা প্রতি প্যাকেট)। অথচ বাংলাদেশের বাজারে তা সরবরাহ করা হচ্ছে মাত্র ২৪ দশমিক ৬০ টাকায়! এ নিয়ে বাংলাদেশ সিগারেট উৎপাদক সমিতি কয়েক বছর ধরে প্রতিবাদ জানিয়ে আসছে। লিখিতভাবে এনবিআরকে জানানো হয়েছে একাধিকবার। কিন্তু এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান এ যৌক্তিক দাবি নিয়ে রহস্যজনক অনীহা দেখিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এখন পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ায় এনবিআরের নির্দেশে ব্রিস্টলের মূল্যস্তর সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে ভ্যাট এলটিইউ। এজন্য বিএটির ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। বিএটির ব্যবস্থাপনা পরিচালককে লেখা এলটিইউর নোটিশে বলা হয়েছে, ‘অক্টোবর ২০১২ পর্যন্ত সময়ে গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ব্রিস্টল ব্রান্ড খালাসের পরিমাণ ২৬০ শতাংশ বা ১১ কোটি ৩৪ লাখ শলাকা বৃদ্ধি পেয়েছে। এ দফতরের পর্যবেক্ষণের অনুযায়ী ব্রিস্টলের মূল্যস্তর নিুে থাকার কারণে সরকারের সামগ্রিক রাজস্ব আদায়ে ইতিমধ্যেই মারাÍক বিরূপ প্রভাব পড়েছে। এখনই ব্রিস্টল সিগারেটের প্রকৃত মূল্যস্তর নির্ধারণ না করা হলে রাজস্ব ঘাটতির বিরূপ প্রভাব প্রতিরোধ করা দুরূহ হবে। এ অবস্থায় ব্রিস্টল সিগারেটের মূল্যস্তর স্টার ফিল্টার এবং সিজার সিগারেটের ঘোষিত মূল্যস্তরে কেন উন্নীত করার সুপারিশ করা হবে না সে বিষয়ে আপনার ব্যাখ্যা প্রয়োজন।’
ভ্যাট এলটিইউর প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, মাত্র এক বছরের ব্যবধানে ব্রিস্টলের উৎপাদন ও খালাস অস্বাভাবিকহারে বেড়ে গেছে। এভাবে প্রতিবছরই তা বেড়ে চলেছে। এতে দেশীয় সিগারেটের সরবরাহ কমে গেছে আশংকাজনকহারে। কিন্তু উচ্চস্তরের সিগারেট নিুস্তরে খালাসে সরকার হারাচ্ছে বিপুল অংকের রাজস্ব। চলতি বছরের অক্টোবর পর্যন্ত ৪ মাসে ব্রিস্টল খালাস হয়েছে ১৫ কোটি ৭০ লাখ শলাকা। অথচ এর আগের বছরের একই সময়ে খালাস হয়েছে ৪ কোটি ৩৭ লাখ শলাকা। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে মাত্র ৪ মাসেই ব্রিস্টল খালাস হয়েছে ২৬০ শতাংশ বেশি।
রাজস্ব বিপর্যয়ের আশংকা : সিগারেট খাতে এ বছর ভয়াবহ রাজস্ব বিপর্যয়ের আশংকা করছে এনবিআর। বিএটির ব্রিস্টল কারচুপি এবং মাত্রাতিরিক্ত সিগারেট উৎপাদন ও বাজারজাত করে সিগারেট কোম্পানিগুলোর মাত্রাতিরিক্ত মুনাফা চলতি অর্থবছরের প্রত্যাশিত রাজস্ব আদায়কে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছে। সিগারেটে উচ্চ শুল্ক কার্যকরের আগেই গত বছরের মে-জুন মাসে নিু শুল্কে স্বাভাবিকের দ্বিগুণেরও বেশি বাজারজাত করা হয়। মূল্য সংযোজন কর বৃহৎ করদাতা ইউনিট (ভ্যাট এলটিইউ) বহুজাতিক বিএটিবি এবং আকিজ গ্র“পের ঢাকা টোব্যাকোর প্রতি অভিযোগের তীর ছুড়ে এনবিআরকে জানিয়েছে, পরিকল্পিত এই ঘটনায় সরকারের বড় ধরনের রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে। এতে চলতি বছরের নির্ধারিত রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হওয়ার সম্ভাবনা নেই। বিএটি ও ঢাকা টোব্যাকোর সঙ্গে এই অনিয়মে নাসির টোব্যাকো এবং আবুল খায়ের টোব্যাকোও জড়িত বলে প্রমাণ মিলেছে। চলতি অর্থবছরের প্রতিমাসেই এ ৪টি বড় কোম্পানি লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও অনেক কম রাজস্ব পরিশোধ করেছে। পাশাপাশি ব্রিস্টল সিগারেটকেও রাজস্ব ঘাটতির জন্য দায়ী করছে এলটিইউ।
যুগান্তরের অনুসন্ধানেও দেখা গেছে, অনৈতিকভাবে উচ্চমূল্যের ব্রিস্টল সিগারেট কম দামে বিক্রি করে দেশীয় উৎপাদকদের বাজার দখল করছে বিএটিবি। এজন্য দেশীয় সিগারেট উৎপাদন খাতে রাজস্ব আয় মারাÍক কমে গেছে। ভোক্তাদের সিংহভাগই কমদামে উচ্চমানের ব্রিস্টল সিগারেট কিনছে। যদিও এনবিআরের ধারণা ব্রিস্টল সিগারেটের অজুহাতে দেশীয় উৎপাদকরা বড় অংকের রাজস্ব ফাঁকি দিচ্ছে। এ নিয়ে ইতিমধ্যেই অনুসন্ধান শুরু হয়েছে।
ব্রিস্টল বাজারজাতে রাজস্ব ফাঁকি : সূত্রমতে, বিএটি ব্রিস্টল বাজারজাত করে প্রতিবছর সরকারকে বিপুল অংকের রাজস্ব ফাঁকি দিচ্ছে। সিগারেটের বর্তমানে ৪টি মূল্যস্তর কার্যকর রয়েছে। অতি উচ্চ (বেনসন অ্যান্ড হেজেজ, বেনসন সুইচ, মালবোরো), উচ্চ (গোল্ডলিফ, পলমল, ক্যাপস্টান, ক্যাসল), মধ্যম (স্টার, সিজার, নেভী), নিু (ব্রিস্টল, হলিউড, পাইলট, শেখ)। এই মূল্য স্তরের সর্ব নিুস্তরে থাকায় ব্রিস্টলে সম্পূরক শুল্ক ও ভ্যাট মিলিয়ে মোট করভার ৫৪ শতাংশ। মূল্য ২৪ দশমিক ৬০ টাকা। অথচ মধ্যম স্তরে এই সিগারেটের মূল্য হবে ৫০ দশমিক ৫০ টাকা। এতে মোট করভার ৭১ শতাংশ। নিুস্তরের ২০ শলাকার সিগারেটে সরকারকে মোট রাজস্ব দিতে হয় ১৩ দশমিক ২৮ টাকা। মধ্যম স্তরের এই সিগারেটে দিতে হচ্ছে ৩৫ দশমিক ৮৫ টাকা। এতে সুস্পষ্টভাবেই প্রমাণিত হয়, ব্রিস্টলকে নিুস্তরে বাজারজাত করে বিএটি বিপুল অংকের রাজস্ব ফাঁকি দিচ্ছে। কমপক্ষে মধ্যম স্তরের সিগারেট হিসেবে মেনে নিলেও গত কয়েক বছরে শত শত কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি দেয়া হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। সূত্র আরও জানায়, ব্রিস্টল আন্তর্জাতিক ব্রান্ড। ভারতে যেখানে ৫৬ রুপিতে ব্রিস্টল বিক্রি হচ্ছে সেখানে বাংলাদেশে কিভাবে একই মানের সিগারেট মাত্র ২৪ টাকায় বিক্রির সুযোগ দেয়া হচ্ছে? অভিনব কৌশলে এভাবে শত শত কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকির সুযোগ করে দেয়া হয়েছে বহুজাতিক বিএটিকে।
সাধারণ আদেশ নিয়ে বিতর্ক : ভ্যাট এলটিইউর দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, ব্রিস্টলকে নিুস্তরের সিগারেট হিসেবে অনুমোদনে বড় ধরনের অনিয়ম ছিল। কারা এর সঙ্গে জড়িত সে প্রশ্নের জবাব না দিয়ে তিনি জানান, ২০১০ সালে সিগারেটের মূল্যস্তর পরিবর্তন করা যাবে না বলে এনবিআর যে সাধারণ আদেশ জারি করে তা সঠিক ছিল না। ভ্যাট এলটিইউ কমিশনার গত বছরের ৪ অক্টোবর এনবিআরকে লেখা এক পত্রে সাধারণ আদেশটি বাতিলের অনুরোধ জানিয়ে বলেছেন, ব্রিস্টলকে নিু মূল্য ধাপের সিগারেট হিসেবে বাজারজাত করে বিএটি স্বল্পপ্রতিষ্ঠিত ও নতুন উৎপাদকদের প্রতিযোগিতামূলক বাজারে টিকতে দিচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে। একজন উৎপাদকের কোন নির্দিষ্ট ব্রান্ডের সিগারেটের মূল্য ও স্তর কোন ধাপে প্রযোজ্য হবে তা নির্ভর করে এর উৎপাদন খরচের ওপর। উৎপাদন খরচের তারতম্যের কারণে উৎপাদিত সিগারেটের মূল্য ধাপ পরিবর্তন হতে পারে। ভ্যাট আইনে ঘোষিত মূল্য পরিবর্তনের বিধান আছে। কিন্তু এনবিআরের সাধারণ আদেশ নং ৪৪/মূসক/২০১০ অনুযায়ী কোন নির্দিষ্ট ব্রান্ডের সিগারেটের মূল্য পূর্ববর্তী বছরের বিরাজমান মূল্যস্তরেই থাকতে হবে; তা নিু বা ঊর্ধ্বস্তরে কোনক্রমেই যেতে পারবে না বলে নির্দেশনা আছে। যা ভ্যাট আইনের বিধি ৩(৭)-এর সঙ্গে সাংঘর্ষিক। শুধু তাই নয়, এই আদেশ ভ্যাট বিভাগীয় কর্মকর্তা এবং কমিশনারের ক্ষমতার সঙ্গেও সাংঘর্ষিক। কিন্তু এনবিআরের দ্বিতীয় সচিব (ভ্যাট আইন ও বিধি) কমিশনারের এই বক্তব্যে একমত পোষণ না করে গত বছরের ২৮ নভেম্বর এক পত্রে জানান, সাধারণ আদেশটিতে পণ্যমূল্যের অবনমন বা বিদ্যমান স্তরের ঘোষণা প্রদান বা অনুমোদনের ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বনের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। কমিশনার স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে সাধারণ আদেশটি কোন বাধা নয়।
ব্রিস্টলে তামাক ব্যবহারে কারচুপি : ভ্যাট কর্তৃপক্ষ জানায়, ২০০৯-১০ অর্থবছরে স্থানীয় তামাক ব্যবহারে তৈরি স্টার ফিল্টার, সিজার ও ব্রিস্টলে প্রতি এককে তামাকের ব্যবহার ছিল অভিন্ন। পরের বছর পাইলট ও ব্রিস্টলে ব্যবহƒত তামাকের পরিমাণ অভিন্ন রেখে পাইলটে ব্যবহƒত তামাকের মূল্য বেশি এবং ব্রিস্টলে তামাকের মূল্য কম প্রদর্শন করা হয়। আবার ২০১১-১২ এবং চলতি অর্থবছরে ব্রিস্টলে ব্যবহƒত তামাকের পরিমাণ বেশি এবং উচ্চ মূল্যে তামাক ব্যবহার দেখানো হয়। এভাবে মধ্যম ও নিুস্তরের সিগারেটে বিশেষ করে ব্রিস্টলে ব্যবহƒত তামাকের মূল্য ও পরিমাণ ইচ্ছেমতো রদবদল করা হয়েছে। যার কারণ ভ্যাট কর্তৃপক্ষের কাছে বোধগম্য নয়। অথচ মধ্যম ব্রান্ডে ব্যবহƒত তামাকের ব্যবহার অপরিবর্তনীয় দেখানো হয়। এছাড়া ব্রিস্টলে তামাকের ব্যবহার নিয়েও কারচুপির আশ্রয় নিয়েছে বিএটি। চলতি অর্থবছরে মাত্র ৫ দিনের ব্যবধানে তামাকের মূল্যেও ব্যাপক তারতম্য দেখানো হয়। ভ্যাট এলটিইউর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘বাস্তব বাণিজ্যিক পরিস্থিতিতে মাত্র ৫ দিনে ব্রিস্টলে তামাকের মূল্যে এত বিপুল পরিবর্তন বাস্তবসম্মত নয়। এভাবে প্রতিনিয়তই ব্রিস্টলের ক্ষেত্রে তামাক ব্যবহারের মাত্রা ও মূল্য সমন্বয়ের প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। যা থেকে প্রমাণিত হয় ব্রিস্টল ব্রান্ডটি ঘোষিত স্তর থেকে উচ্চতর স্তরের সিগারেট। এছাড়া সিজার ও পাইলটের ক্ষেত্রে একই মূল্যমানের এবং পরিমাণের সিগারেট পেপার ব্রিস্টলে ব্যবহার করা হচ্ছে। অপরদিকে দেখা গেছে, মধ্যম স্তরের সিগারেটে যে উপকরণ ব্যবহার করা হয় নিুস্তরের ব্রিস্টলে তার মূল্য আরও বেশি। এতে প্রমাণিত হয় উঁচুমানের ব্রিস্টলকে নিুমান দেখানো হচ্ছে। বিএটিকে দেয়া ভ্যাট কর্তৃপক্ষের কারণ দর্শানো নোটিশে বিভিন্ন তথ্যপ্রমাণ বিশ্লেষণ করেও বলা হয়, স্পষ্টত প্রতীয়মান, ব্রিস্টল উঁচুস্তরের সিগারেট হওয়া সত্ত্বেও নিুস্তরে দেখানোর জন্য ওভারহেড এক্সপেনসেস খাতে খরচ কম দেখিয়ে কারচুপির আশ্রয় নিচ্ছে বিএটি।
বিএটির কৌশল অনৈতিক : সূত্রমতে, বিএটি যে কৌশলে ব্রিস্টল এদেশে বাজারজাত করছে তা সম্পূর্ণ অনৈতিক। উচ্চমূল্যের ব্রিস্টলকে কম মূল্যে কম রাজস্বে ২০০৯-১০ অর্থবছরে বাজারজাত করা হয়। এরপর ২০১০-১১ অর্থবছরে উচ্চ ব্রান্ড সিগারেট নিু ব্রান্ড ঘোষণায় বাজার দখল করার কৌশল হিসেবে মুনাফা হ্রাস করে ট্রেড মার্জিন পরে সময়ের তুলনায় বিক্রেতা আকৃষ্ট করার জন্য ৩৪০ শতাংশ করা হয়। ২০১১-১২ সময়ে এ কৌশলের সফলতায় পূর্ববর্তী সময়ের তুলনায় মুনাফা ১৩৪ দশমিক ৩২ শতাংশ বৃদ্ধি পায়। পক্ষান্তরে ট্রেড মার্জিন ৬১ শতাংশ কমানো হয়। অর্থাৎ নিুস্তরের মার্কেট দখল করার কৌশল হিসেবে ২০১০-১১ সালে ট্রেড মার্জিন অস্বাভাবিক বাড়ানো হয়। মার্কেট দখলের পর পরবর্তী বছরে মুনাফা শতগুণেরও বেশি বেড়ে গেছে। ব্রিস্টলের ক্ষেত্রে নিু সিগমেন্ট এর মার্কেট শেয়ার প্রতিবছরই উত্তরোত্তর অস্বাভাবিকহারে বেড়ে চলেছে। যার ফলে নিুস্তরের সিগারেটের পুরো বাজারই বিএটির দখল করার আশংকা দেখা দিয়েছে।
এককভাবে সরকার সর্বোচ্চ রাজস্ব আদায় করছে সিগারেট উৎপাদকদের কাছ থেকে। তারপরই মোবাইল ফোন অপারেটরদের অবস্থান। গত অর্থবছরে সিগারেটে আগের বছরের চেয়ে রাজস্ব আয়ের প্রবৃদ্ধি ছিল ৩৭ শতাংশ। কিন্তু এবার পরিস্থিতি পুরো উল্টে গেছে। প্রবৃদ্ধি দূরে থাক বিশাল অংকের রাজস্ব ঘাটতির মুখোমুখি এখন জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। কমপক্ষে ৩ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব ঝুঁকির আশংকা করছেন নীতিনির্ধারকরা। নভেম্বর পর্যন্ত প্রায় ১৪৫ কোটি শলাকা সিগারেট কম উৎপাদন হয়েছে। এতে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে রাজস্ব আয় কমেছে ৪০ শতাংশেরও বেশি। বহুজাতিক কোম্পানি ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো (বিএটি) এবং দেশীয় ঢাকা টোব্যাকো ইন্ডাস্ট্রি থেকে রাজস্ব আদায় আশংকাজনক কমে গেছে। অথচ এ খাত থেকে ১২ হাজার ২১০ কোটি টাকা রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য রয়েছে, যা মোট ভ্যাট রাজস্বের ৩১ শতাংশ। কেন এ নাজুক অবস্থা?
যুগান্তরের অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী মূলত দুটি কারণে এবার প্রত্যাশিত রাজস্ব আদায় করা সম্ভব হবে না। রাজস্ব ফাঁকির অসৎ উদ্দেশ্যে চলতি অর্থবছরের উচ্চ শুল্কের বিপুল পরিমাণ সিগারেট চাহিদা বহির্ভূতভাবে গত অর্থবছরেই নিু শুল্কে খালাস নেয়া হয়েছে। এছাড়া হীন ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে দেশীয় সিগারেটের বাজার দখলে বিএটির অপকৌশলকে বড় কারণ বলে মনে করেন এনবিআরের নীতিনির্ধারকরা। উচ্চমান ও মূল্যের ব্রিস্টল সিগারেটকে সর্ব নিুস্তরের সিগারেট ঘোষণা দিয়ে শত শত কোটি টাকা রাজস্ব ফাঁকি দেয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। এতে দেশীয় সিগারেট উৎপাদন খাতে বড় ধরনের সংকট সৃষ্টি হয়েছে। এসব কারণে শুধু সিগারেটেই এ বছর রাজস্ব ঝুঁকি ৩ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে বলে আশংকা করা হচ্ছে। এনবিআরের হিসাবে নভেম্বর পর্যন্ত এ ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১৫শ’ ৬০ কোটি টাকা।
৭০ ও ৮০ দশকে ব্রিস্টল বাংলাদেশে প্রিমিয়াম ব্রান্ড হিসেবে ক্যাপস্টানের সমপর্যায়ে বিক্রি হতো। উপমহাদেশের প্রতিটি দেশেই ব্রিস্টল মধ্যম ব্রান্ডের সিগারেট হিসেবে বিক্রি হচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশেই শুধু ব্যতিক্রম করছে বিএটি। ভ্যাট কর্তৃপক্ষের পর্যবেক্ষণ হচ্ছে, কোন বহুজাতিক কোম্পানি তাদের আন্তর্জাতিক ব্রান্ডকে নিুমানের উপকরণ ব্যবহারের মাধ্যমে নিুস্তরের সিগারেট হিসেবে ঘোষণা প্রদান করা সম্পূর্ণ অনৈতিক। এ ক্ষেত্রে ব্রিস্টল সিগারেট নিুস্তরে অবনমিত রাখা অতিশয় অস্বাভাবিক।
এনবিআরের চেয়ারম্যান গোলাম হোসেন বিষয়টি স্বীকার করে জানান, রাজস্ব আয়ের স্বার্থে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। ভ্যাট এলটিইউ এ নিয়ে কাজ করছে।
এনবিআরের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সদস্য উদ্বেগ প্রকাশ করে জানান, ব্রিস্টল বিশ্ব মানসম্পন্ন সিগারেট। কিন্তু বিএটি কয়েক বছর ধরে কম শুল্ক ও মূল্যে তা বাজারজাত করছে। এতে সরকার বিপুল অংকের রাজস্ব হারাচ্ছে। দেশীয় উৎপাদকরাও এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তবে ব্রিস্টলকে আপাতত মধ্যম মানের স্তরে উন্নীত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে এনবিআর।
বিএটির রেগুলেটরি অ্যাফেয়ার্স হেড অব কর্পোরেট শাহেদ যোবায়ের ব্রিস্টলের মূল্য কারচুপি সরাসরি অস্বীকার করে বলেন, এ নিয়ে এনবিআরের সঙ্গে আলোচনা চলছে। আড়াই বছর ধরেই ব্রিস্টল বাজারজাত করা হচ্ছে। তিনি সরাসরি ব্রিস্টল সম্পর্কিত অভিযোগ এড়িয়ে গিয়ে বলেন, এ নিয়ে আমার কোন মতামত নেই।
বিএটির ব্যাখ্যা তলব : জানা গেছে, বিএটির আন্তর্জাতিক ব্রান্ড ব্রিস্টল পার্শ্ববর্তী ভারতে বিক্রি করা হয় ৫৬ রুপিতে। এর আন্তর্জাতিক মূল্য ইন্টারনেটে পাওয়া গেছে ১০ প্যাকেটের কার্টন ২০ দশমিক ১৩ মার্কিন ডলার (১৬৫ টাকা প্রতি প্যাকেট)। অথচ বাংলাদেশের বাজারে তা সরবরাহ করা হচ্ছে মাত্র ২৪ দশমিক ৬০ টাকায়! এ নিয়ে বাংলাদেশ সিগারেট উৎপাদক সমিতি কয়েক বছর ধরে প্রতিবাদ জানিয়ে আসছে। লিখিতভাবে এনবিআরকে জানানো হয়েছে একাধিকবার। কিন্তু এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান এ যৌক্তিক দাবি নিয়ে রহস্যজনক অনীহা দেখিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এখন পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ায় এনবিআরের নির্দেশে ব্রিস্টলের মূল্যস্তর সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে ভ্যাট এলটিইউ। এজন্য বিএটির ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। বিএটির ব্যবস্থাপনা পরিচালককে লেখা এলটিইউর নোটিশে বলা হয়েছে, ‘অক্টোবর ২০১২ পর্যন্ত সময়ে গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ব্রিস্টল ব্রান্ড খালাসের পরিমাণ ২৬০ শতাংশ বা ১১ কোটি ৩৪ লাখ শলাকা বৃদ্ধি পেয়েছে। এ দফতরের পর্যবেক্ষণের অনুযায়ী ব্রিস্টলের মূল্যস্তর নিুে থাকার কারণে সরকারের সামগ্রিক রাজস্ব আদায়ে ইতিমধ্যেই মারাÍক বিরূপ প্রভাব পড়েছে। এখনই ব্রিস্টল সিগারেটের প্রকৃত মূল্যস্তর নির্ধারণ না করা হলে রাজস্ব ঘাটতির বিরূপ প্রভাব প্রতিরোধ করা দুরূহ হবে। এ অবস্থায় ব্রিস্টল সিগারেটের মূল্যস্তর স্টার ফিল্টার এবং সিজার সিগারেটের ঘোষিত মূল্যস্তরে কেন উন্নীত করার সুপারিশ করা হবে না সে বিষয়ে আপনার ব্যাখ্যা প্রয়োজন।’
ভ্যাট এলটিইউর প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, মাত্র এক বছরের ব্যবধানে ব্রিস্টলের উৎপাদন ও খালাস অস্বাভাবিকহারে বেড়ে গেছে। এভাবে প্রতিবছরই তা বেড়ে চলেছে। এতে দেশীয় সিগারেটের সরবরাহ কমে গেছে আশংকাজনকহারে। কিন্তু উচ্চস্তরের সিগারেট নিুস্তরে খালাসে সরকার হারাচ্ছে বিপুল অংকের রাজস্ব। চলতি বছরের অক্টোবর পর্যন্ত ৪ মাসে ব্রিস্টল খালাস হয়েছে ১৫ কোটি ৭০ লাখ শলাকা। অথচ এর আগের বছরের একই সময়ে খালাস হয়েছে ৪ কোটি ৩৭ লাখ শলাকা। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে মাত্র ৪ মাসেই ব্রিস্টল খালাস হয়েছে ২৬০ শতাংশ বেশি।
রাজস্ব বিপর্যয়ের আশংকা : সিগারেট খাতে এ বছর ভয়াবহ রাজস্ব বিপর্যয়ের আশংকা করছে এনবিআর। বিএটির ব্রিস্টল কারচুপি এবং মাত্রাতিরিক্ত সিগারেট উৎপাদন ও বাজারজাত করে সিগারেট কোম্পানিগুলোর মাত্রাতিরিক্ত মুনাফা চলতি অর্থবছরের প্রত্যাশিত রাজস্ব আদায়কে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছে। সিগারেটে উচ্চ শুল্ক কার্যকরের আগেই গত বছরের মে-জুন মাসে নিু শুল্কে স্বাভাবিকের দ্বিগুণেরও বেশি বাজারজাত করা হয়। মূল্য সংযোজন কর বৃহৎ করদাতা ইউনিট (ভ্যাট এলটিইউ) বহুজাতিক বিএটিবি এবং আকিজ গ্র“পের ঢাকা টোব্যাকোর প্রতি অভিযোগের তীর ছুড়ে এনবিআরকে জানিয়েছে, পরিকল্পিত এই ঘটনায় সরকারের বড় ধরনের রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে। এতে চলতি বছরের নির্ধারিত রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হওয়ার সম্ভাবনা নেই। বিএটি ও ঢাকা টোব্যাকোর সঙ্গে এই অনিয়মে নাসির টোব্যাকো এবং আবুল খায়ের টোব্যাকোও জড়িত বলে প্রমাণ মিলেছে। চলতি অর্থবছরের প্রতিমাসেই এ ৪টি বড় কোম্পানি লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও অনেক কম রাজস্ব পরিশোধ করেছে। পাশাপাশি ব্রিস্টল সিগারেটকেও রাজস্ব ঘাটতির জন্য দায়ী করছে এলটিইউ।
যুগান্তরের অনুসন্ধানেও দেখা গেছে, অনৈতিকভাবে উচ্চমূল্যের ব্রিস্টল সিগারেট কম দামে বিক্রি করে দেশীয় উৎপাদকদের বাজার দখল করছে বিএটিবি। এজন্য দেশীয় সিগারেট উৎপাদন খাতে রাজস্ব আয় মারাÍক কমে গেছে। ভোক্তাদের সিংহভাগই কমদামে উচ্চমানের ব্রিস্টল সিগারেট কিনছে। যদিও এনবিআরের ধারণা ব্রিস্টল সিগারেটের অজুহাতে দেশীয় উৎপাদকরা বড় অংকের রাজস্ব ফাঁকি দিচ্ছে। এ নিয়ে ইতিমধ্যেই অনুসন্ধান শুরু হয়েছে।
ব্রিস্টল বাজারজাতে রাজস্ব ফাঁকি : সূত্রমতে, বিএটি ব্রিস্টল বাজারজাত করে প্রতিবছর সরকারকে বিপুল অংকের রাজস্ব ফাঁকি দিচ্ছে। সিগারেটের বর্তমানে ৪টি মূল্যস্তর কার্যকর রয়েছে। অতি উচ্চ (বেনসন অ্যান্ড হেজেজ, বেনসন সুইচ, মালবোরো), উচ্চ (গোল্ডলিফ, পলমল, ক্যাপস্টান, ক্যাসল), মধ্যম (স্টার, সিজার, নেভী), নিু (ব্রিস্টল, হলিউড, পাইলট, শেখ)। এই মূল্য স্তরের সর্ব নিুস্তরে থাকায় ব্রিস্টলে সম্পূরক শুল্ক ও ভ্যাট মিলিয়ে মোট করভার ৫৪ শতাংশ। মূল্য ২৪ দশমিক ৬০ টাকা। অথচ মধ্যম স্তরে এই সিগারেটের মূল্য হবে ৫০ দশমিক ৫০ টাকা। এতে মোট করভার ৭১ শতাংশ। নিুস্তরের ২০ শলাকার সিগারেটে সরকারকে মোট রাজস্ব দিতে হয় ১৩ দশমিক ২৮ টাকা। মধ্যম স্তরের এই সিগারেটে দিতে হচ্ছে ৩৫ দশমিক ৮৫ টাকা। এতে সুস্পষ্টভাবেই প্রমাণিত হয়, ব্রিস্টলকে নিুস্তরে বাজারজাত করে বিএটি বিপুল অংকের রাজস্ব ফাঁকি দিচ্ছে। কমপক্ষে মধ্যম স্তরের সিগারেট হিসেবে মেনে নিলেও গত কয়েক বছরে শত শত কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি দেয়া হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। সূত্র আরও জানায়, ব্রিস্টল আন্তর্জাতিক ব্রান্ড। ভারতে যেখানে ৫৬ রুপিতে ব্রিস্টল বিক্রি হচ্ছে সেখানে বাংলাদেশে কিভাবে একই মানের সিগারেট মাত্র ২৪ টাকায় বিক্রির সুযোগ দেয়া হচ্ছে? অভিনব কৌশলে এভাবে শত শত কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকির সুযোগ করে দেয়া হয়েছে বহুজাতিক বিএটিকে।
সাধারণ আদেশ নিয়ে বিতর্ক : ভ্যাট এলটিইউর দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, ব্রিস্টলকে নিুস্তরের সিগারেট হিসেবে অনুমোদনে বড় ধরনের অনিয়ম ছিল। কারা এর সঙ্গে জড়িত সে প্রশ্নের জবাব না দিয়ে তিনি জানান, ২০১০ সালে সিগারেটের মূল্যস্তর পরিবর্তন করা যাবে না বলে এনবিআর যে সাধারণ আদেশ জারি করে তা সঠিক ছিল না। ভ্যাট এলটিইউ কমিশনার গত বছরের ৪ অক্টোবর এনবিআরকে লেখা এক পত্রে সাধারণ আদেশটি বাতিলের অনুরোধ জানিয়ে বলেছেন, ব্রিস্টলকে নিু মূল্য ধাপের সিগারেট হিসেবে বাজারজাত করে বিএটি স্বল্পপ্রতিষ্ঠিত ও নতুন উৎপাদকদের প্রতিযোগিতামূলক বাজারে টিকতে দিচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে। একজন উৎপাদকের কোন নির্দিষ্ট ব্রান্ডের সিগারেটের মূল্য ও স্তর কোন ধাপে প্রযোজ্য হবে তা নির্ভর করে এর উৎপাদন খরচের ওপর। উৎপাদন খরচের তারতম্যের কারণে উৎপাদিত সিগারেটের মূল্য ধাপ পরিবর্তন হতে পারে। ভ্যাট আইনে ঘোষিত মূল্য পরিবর্তনের বিধান আছে। কিন্তু এনবিআরের সাধারণ আদেশ নং ৪৪/মূসক/২০১০ অনুযায়ী কোন নির্দিষ্ট ব্রান্ডের সিগারেটের মূল্য পূর্ববর্তী বছরের বিরাজমান মূল্যস্তরেই থাকতে হবে; তা নিু বা ঊর্ধ্বস্তরে কোনক্রমেই যেতে পারবে না বলে নির্দেশনা আছে। যা ভ্যাট আইনের বিধি ৩(৭)-এর সঙ্গে সাংঘর্ষিক। শুধু তাই নয়, এই আদেশ ভ্যাট বিভাগীয় কর্মকর্তা এবং কমিশনারের ক্ষমতার সঙ্গেও সাংঘর্ষিক। কিন্তু এনবিআরের দ্বিতীয় সচিব (ভ্যাট আইন ও বিধি) কমিশনারের এই বক্তব্যে একমত পোষণ না করে গত বছরের ২৮ নভেম্বর এক পত্রে জানান, সাধারণ আদেশটিতে পণ্যমূল্যের অবনমন বা বিদ্যমান স্তরের ঘোষণা প্রদান বা অনুমোদনের ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বনের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। কমিশনার স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে সাধারণ আদেশটি কোন বাধা নয়।
ব্রিস্টলে তামাক ব্যবহারে কারচুপি : ভ্যাট কর্তৃপক্ষ জানায়, ২০০৯-১০ অর্থবছরে স্থানীয় তামাক ব্যবহারে তৈরি স্টার ফিল্টার, সিজার ও ব্রিস্টলে প্রতি এককে তামাকের ব্যবহার ছিল অভিন্ন। পরের বছর পাইলট ও ব্রিস্টলে ব্যবহƒত তামাকের পরিমাণ অভিন্ন রেখে পাইলটে ব্যবহƒত তামাকের মূল্য বেশি এবং ব্রিস্টলে তামাকের মূল্য কম প্রদর্শন করা হয়। আবার ২০১১-১২ এবং চলতি অর্থবছরে ব্রিস্টলে ব্যবহƒত তামাকের পরিমাণ বেশি এবং উচ্চ মূল্যে তামাক ব্যবহার দেখানো হয়। এভাবে মধ্যম ও নিুস্তরের সিগারেটে বিশেষ করে ব্রিস্টলে ব্যবহƒত তামাকের মূল্য ও পরিমাণ ইচ্ছেমতো রদবদল করা হয়েছে। যার কারণ ভ্যাট কর্তৃপক্ষের কাছে বোধগম্য নয়। অথচ মধ্যম ব্রান্ডে ব্যবহƒত তামাকের ব্যবহার অপরিবর্তনীয় দেখানো হয়। এছাড়া ব্রিস্টলে তামাকের ব্যবহার নিয়েও কারচুপির আশ্রয় নিয়েছে বিএটি। চলতি অর্থবছরে মাত্র ৫ দিনের ব্যবধানে তামাকের মূল্যেও ব্যাপক তারতম্য দেখানো হয়। ভ্যাট এলটিইউর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘বাস্তব বাণিজ্যিক পরিস্থিতিতে মাত্র ৫ দিনে ব্রিস্টলে তামাকের মূল্যে এত বিপুল পরিবর্তন বাস্তবসম্মত নয়। এভাবে প্রতিনিয়তই ব্রিস্টলের ক্ষেত্রে তামাক ব্যবহারের মাত্রা ও মূল্য সমন্বয়ের প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। যা থেকে প্রমাণিত হয় ব্রিস্টল ব্রান্ডটি ঘোষিত স্তর থেকে উচ্চতর স্তরের সিগারেট। এছাড়া সিজার ও পাইলটের ক্ষেত্রে একই মূল্যমানের এবং পরিমাণের সিগারেট পেপার ব্রিস্টলে ব্যবহার করা হচ্ছে। অপরদিকে দেখা গেছে, মধ্যম স্তরের সিগারেটে যে উপকরণ ব্যবহার করা হয় নিুস্তরের ব্রিস্টলে তার মূল্য আরও বেশি। এতে প্রমাণিত হয় উঁচুমানের ব্রিস্টলকে নিুমান দেখানো হচ্ছে। বিএটিকে দেয়া ভ্যাট কর্তৃপক্ষের কারণ দর্শানো নোটিশে বিভিন্ন তথ্যপ্রমাণ বিশ্লেষণ করেও বলা হয়, স্পষ্টত প্রতীয়মান, ব্রিস্টল উঁচুস্তরের সিগারেট হওয়া সত্ত্বেও নিুস্তরে দেখানোর জন্য ওভারহেড এক্সপেনসেস খাতে খরচ কম দেখিয়ে কারচুপির আশ্রয় নিচ্ছে বিএটি।
বিএটির কৌশল অনৈতিক : সূত্রমতে, বিএটি যে কৌশলে ব্রিস্টল এদেশে বাজারজাত করছে তা সম্পূর্ণ অনৈতিক। উচ্চমূল্যের ব্রিস্টলকে কম মূল্যে কম রাজস্বে ২০০৯-১০ অর্থবছরে বাজারজাত করা হয়। এরপর ২০১০-১১ অর্থবছরে উচ্চ ব্রান্ড সিগারেট নিু ব্রান্ড ঘোষণায় বাজার দখল করার কৌশল হিসেবে মুনাফা হ্রাস করে ট্রেড মার্জিন পরে সময়ের তুলনায় বিক্রেতা আকৃষ্ট করার জন্য ৩৪০ শতাংশ করা হয়। ২০১১-১২ সময়ে এ কৌশলের সফলতায় পূর্ববর্তী সময়ের তুলনায় মুনাফা ১৩৪ দশমিক ৩২ শতাংশ বৃদ্ধি পায়। পক্ষান্তরে ট্রেড মার্জিন ৬১ শতাংশ কমানো হয়। অর্থাৎ নিুস্তরের মার্কেট দখল করার কৌশল হিসেবে ২০১০-১১ সালে ট্রেড মার্জিন অস্বাভাবিক বাড়ানো হয়। মার্কেট দখলের পর পরবর্তী বছরে মুনাফা শতগুণেরও বেশি বেড়ে গেছে। ব্রিস্টলের ক্ষেত্রে নিু সিগমেন্ট এর মার্কেট শেয়ার প্রতিবছরই উত্তরোত্তর অস্বাভাবিকহারে বেড়ে চলেছে। যার ফলে নিুস্তরের সিগারেটের পুরো বাজারই বিএটির দখল করার আশংকা দেখা দিয়েছে।
http://jugantor.us/2013/01/05/news0151.htm
No comments:
Post a Comment