Saturday, January 5, 2013

১৯ মন্ত্রণালয়ে ৫ হাজার কোটি টাকা লুটপাট

মিজান চৌধুরী:
নানা ধরনের অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে সরকারের ৪ হাজার ৮১১ কোটি টাকা লুটপাট করা হয়েছে। প্রচলিত আর্থিক বিধি লংঘনের মাধ্যমে ১৯ মন্ত্রণালয়ে এ আর্থিক অনিয়মের ঘটনা ঘটেছে। সবচেয়ে বেশি আর্থিক অনিয়ম ও দুর্নীতি হয়েছে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের অধীনে। প্রায় ৯৫০ কোটি টাকার আর্থিক অনিয়ম ধরা পড়েছে এ মন্ত্রণালয়ে। সরকারের এই আর্থিক অনিয়ম ও লুটপাটের ভয়াবহ চিত্র উদঘাটন হয়েছে সর্বশেষ তৈরি করা কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেল (সিএজি) অফিসের ৬১টি অডিট রিপোর্টে।
সিএজি অফিস সম্প্রতি অডিট রিপোর্টগুলো প্রধানমন্ত্রীর কাছে জমা দিয়েছে। শিগগিরই এ রিপোর্ট রাষ্ট্রপতির কাছে হস্তান্তর করা হবে। অবশ্য রাষ্ট্রপতির কাছে হস্তান্তরের আগ পর্যন্ত রিপোর্টগুলো কঠোর গোপনীয়তা অবলম্বন করা হয়েছে।
অডিট রিপোর্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০১০-১১ ও ২০০৯-১০ অর্থবছরের কার্যক্রমের ওপর এসব আর্থিক অনিয়ম ও অর্থ লুটপাটের অধিকাংশ ঘটনা ধরা পড়েছে। অবশ্য অডিট বিভাগ আর্থিক অনিয়মের ব্যাপারে ৬১৪টি আপত্তি জানিয়েছে। জানা গেছে, অডিট রিপোর্টগুলো রাষ্ট্রপতির কাছে হস্তান্তরের পর জনসাধারণের জন্য উš§ুক্ত করা হবে।
বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, সংস্থা, রাষ্টায়ত্ত শিল্প প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রেলওয়ে মন্ত্রণালয়ের একটি প্রকল্পে ২৮ কোটি ৭৫ লাখ টাকা, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণাধীন ১২টি বাণিজ্যিক ব্যাংকে ৩২ কোটি ১৫ লাখ টাকা, বাংলাদেশ রেলওয়ের ১৫৬ কোটি ৬৯ লাখ টাকা, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ে ৫৯৪ কোটি ৭৬ লাখ টাকা, বেসরকারি বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ে ১১৬ কোটি ৪৭ লাখ টাকা, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ে ৬৩ কোটি ৮ লাখ টাকা, সড়ক ও জনপদ অধিদফতরে ২৩৭ কোটি ৯৯ লাখ টাকা, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় অধিদফতরে ৫০২ কোটি ৭৪ লাখ টাকা, পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ে ১৪ কোটি ১৭ লাখ টাকা, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে ২২ কোটি ২৯ লাখ টাকা, অর্থ মন্ত্রণালয়ে অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের কর ইউনিটে ৩৬৯ কোটি ৭৭ লাখ টাকা, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে ৬ কোটি ৯১ লাখ টাকা, রাষ্টায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে ৫৪৯ কোটি ২৩ লাখ টাকা, বেসিক, রাজশাহী ও কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকে ১০২ কোটি ৬২ লাখ টাকা, শিল্প মন্ত্রণালয়ে ১১৭ কোটি ১৩ লাখ টাকা, খাদ্য মন্ত্রণালয়ে ২৭ কোটি ২৬ লাখ টাকা, কৃষি মন্ত্রণালয় ১৫২ কোটি ৩৩ লাখ টাকা, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ে ১০ কোটি ৭৮ লাখ টাকা, ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ে ২১ কোটি ৩৪ লাখ টাকা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ৫ কোটি ১৬ লাখ টাকা ও যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ে ৭৭৩ কোটি ৭৮ লাখ টাকার আর্থিক অনিয়ম ঘটেছে।
জানা গেছে, বাস্তব প্রয়োজন না হওয়া সত্ত্বেও মাটি ভরাট কাজ, গার্ডারসহ ব্রিজ নির্মাণের প্রাক্কলন থাকলেও পৃথকভাবে গার্ডার ক্রয়, স্বল্পমূল্যের দরপত্র বাতিল করে পুনরায় দরপত্র আহ্বান ও বিনা দরপত্রে কার্যাদেশ দেয়ার মাধ্যমে প্রায় ২৯ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের অধীনে রেলওয়ের তারাকান্দি যমুনা ব্রিজ রেলওয়ে লিংক প্রকল্প থেকে।
এছাড়া নির্ধারিত হার উপেক্ষা করে অতিরিক্ত হারে নগদ সহায়তা প্রদান ও বিধিবহির্ভূত নগদ সহায়তা প্রদানের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণাধীন ১২টি বাণিজ্যিক শাখা থেকে ৩২ কোটি ১৫ লাখ টাকা লুটপাট করা হয়েছে। পাশাপাশি অতিরিক্ত দরে পিগ আয়রন ক্রয়, ১১৪ শতাংশ বেশি দরে ক্রিয়োসট অয়েল ক্রয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশ রেলওয়ের ১৫৬ কোটি ৬৯ লাখ টাকার আর্থিক অনিয়ম ধরা পড়েছে।
এছাড়া প্রাক্কলিত মূল্য থেকে অস্বাভাবিক বেশি দরে কার্যাদেশ, টেন্ডার কমিটি ছাড়া বাইরের লোক দিয়ে দরপত্র খোলা, পিপিআর লংঘনের মাধ্যমে রেল বিভাগে পৃথকভাবে আরও প্রায় ৩২ কোটি টাকার আর্থিক অনিয়মের ঘটনা হয়েছে।
সড়ক ও জনপদ অধিদফতরে এখতিয়ারবহির্ভূত রাস্তার বাজেট বরাদ্দ ছাড়াই নিয়ন্ত্রণহীনভাবে মেরামত কাজে সরকারের অপচয়, কার্য সম্পাদনে ব্যর্থ ঠিকাদারকে কার্যাদেশ বাতিল করা হলেও আরোপিত জরিমানা আদায় না করা, ডিজাইন উপেক্ষা করে সড়কের পাশে বাড়ানোর নামে ঠিকাদারকে অতিরিক্ত অর্থ পরিশোধ, মেরামত ছাড়াই ঠিকাদারকে অর্থ পরিশোধ, কোডাল বিধি লংঘন করে অনিয়মিত ব্যয়, ঠিকাদারকে অতিরিক্ত অর্থ পরিশোধ সর্বোচ্চ দরদাতার সঙ্গে চুক্তি না করা ও কাজ না দেয়ার মাধ্যমে ২৩৭ কোটি টাকার আর্থিক অনিয়ম ও অর্থ লুটপাটের ঘটনা শনাক্ত হয়।
স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ে আর্থিক অনিয়মের ব্যাপারে দেখা গেছে, পত্রিকায় দরপত্র বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ দেখিয়ে জালিয়াতির মাধ্যমে চুক্তি সম্পাদন, ঠিকাদারের বিল পরিশোধের ক্ষেত্রে পুরনো বিল না কাটা, প্রকৃত কাজের চেয়ে অতিরিক্ত বিল প্রস্তুত, রোড ডিজাইন স্ট্যান্ডার্ডের নির্দেশ উপেক্ষা করে ওয়াটার বল্ডমেকাডাম বিটুমিনাস কার্পেটিং বিটুমিনাস সিলকোট কাজের পুরত্ব বেশি দেখিয়ে বিল পরিশোধের মাধ্যমে ৩৪ কোটি ২৬ লাখ টাকা লুটপাট করা হয়।
পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ে সর্বনিু দরদাতার দরপত্র গ্রহণ না করে চতুর্থ সর্বনিু দরদাতার দর গ্রহণ ও কাজ দেয়া, নির্মাণ সামগ্রীর গুণগত মান যাচাই না করে অর্থ পরিশোধ, বাজেটের বরাদ্দের অতিরিক্ত কার্যাদেশ প্রদানের মাধ্যমে ১৪ কোটি ১৭ লাখ টাকার আর্থিক অনিয়ম করা হয়েছে।
এছাড়া পত্রিকায় জাল করে টেন্ডার বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ দেখিয়ে চুক্তি সম্পাদন, বাস্তবে কাজ না করেই বিল পরিশোধ, জ্বালানি তেলের প্রকৃত ব্যবহার উপেক্ষা করে অতিরিক্ত ব্যবহার প্রদর্শনের মাধ্যমে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের ১৭৮ কোটি টাকা লুটপাট করা হয়েছে।
ইউজার ফি, কমিশন ফি, হাসপাতালের অভ্যন্তরে অবস্থিত ফার্মেসি এবং ক্যান্টিন ভাড়া ও অন্যান্য চার্জ বাবদ আদায়কৃত অর্থ কোষাগারে জমা না দেয়া, সর্বনিু দরদাতার কাছ থেকে ওষুধ ক্রয় না করা, এসেনসিয়াল ড্রাগস কোম্পানি থেকে ওষুধ ক্রয় না করে অধিক মূল্য দিয়ে সরবরাহকারীর কাছ থেকে ক্রয় করা, চাকরির প্রার্থীর কাছ থেকে প্রাপ্ত পোস্টাল অর্ডার, পে অর্ডার ও ব্যাংক ড্রাফটের অর্থ কোষাগারে জমা না দেয়ার মাধ্যমে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ১৩ কোটি ৮০ লাখ টাকা লুট করা হয়।
বিধিবহির্ভূত রেয়াদ প্রদান করা, প্রকৃত উৎপাদন অপেক্ষা কম উৎপাদন প্রদর্শন করা, অনুমোদিত মূল্য থেকে কম মূল্যে পণ্য খালাস, বিক্রি করা, অনিয়মের মাধ্যমে মূল্য সংযোজন কর প্রদান করা, বার্ষিক হিসাব বিবরণীতে প্রদর্শিত বিক্রয় অপেক্ষা ভ্যাট অফিসে কম বিক্রয় প্রদর্শন করার মাধ্যমে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ মূল্য সংযোজন কর ইউনিট ৩৭ কোটি ১১ লাখ টাকার আর্থিক অনিয়ম করেছে।
ইউরিয়া সারের মজুদ ঘাটতি, কার্যাদেশের পরিমাণের চেয়ে অতিরিক্ত সার উচ্চ দর পরিবহন করানো, রক ফসফেট মজুদ কম পাওয়া, টেন্ডার ছাড়া বাজারদর অপেক্ষা কম দরে জায়গা ভাড়া দেয়ায় মাধ্যমে ১২টি রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প প্রতিষ্ঠানে ৪০ কোটি ২৫ লাখ টাকার আর্থিক অনিয়ম হয়। এছাড়া ব্যবহার অনুপযোগী রক ফসফেট জাহাজ থেকে খালাস করা, অনিয়মিতভাবে সেলস এজেন্ট নিয়োগ করে কমিশন প্রদান, প্রতিষ্ঠানের উৎপাদিত ফসফরিক এসিড টিএসপি সার উৎপাদনে ব্যবহার না করা সত্ত্বেও উৎপাদনের বিপরীতে কাঁচামাল দেখানোর মাধ্যমে শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীনে রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প প্রতিষ্ঠানের ৭৬ কোটি ৮৭ লাখ টাকার লুটপাট ও অনিয়ম হয়েছে।
স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অধীনে বৈদেশিক সাহায্যপুষ্ট একটি প্রকল্পের টাকা হিসাব থেকে স্থানান্তর, ডিপিপির সংস্থানবহির্ভূত গাড়ি ক্রয়, রাস্তার দৈর্ঘ্য থেকে ব্রিজ, কালভার্টের দৈর্ঘ্যবাদ না দিয়ে অতিরিক্ত অর্থ পরিশোধ, কাজ বাস্তবায়ন ছাড়াই প্রকল্পের অর্থ উত্তোলন, কাল্পনিক ক্যাশমেমো প্রদর্শন, জিওবি তহবিলে অর্জিত অর্থের সুদ সরকারি হিসাবে জমা না দেয়া, ঠিকাদারের প্রকৃত পাওনা থেকে অতিরিক্ত অর্থ পরিশোধের মাধ্যমে লুটপাট করা হয়।
http://jugantor.us/2013/01/05/news0146.htm

No comments: