- বৃদ্ধির কোনো নিয়মনীতি নেই
- অভিযোগ দায়ের প্রক্রিয়ায় জটিলতা
- রেন্ট কন্ট্রোল আইন নিষ্ক্রিয়
এম এ বাবর:
বেতন বৃদ্ধির অজুহাতে দেশের জিনিসপত্রের দাম বাড়ে। লাগামহীন এ পরিস্থিতির মধ্যে বিষকাঁটা বাড়ি ভাড়া বৃদ্ধি। ভাড়াটিয়াদের বছর শেষ না হতেই শুনতে হচ্ছে, নতুন বছরের শুরুতেই ভাড়া হিসেবে অতিরিক্ত টাকা গুনতে হবে। ব্যাংকের কর্মকর্তা জাফর আলী বলেন, ‘বেতন বেড়েছে শুধু সরকারি কর্মচারীদের। এর মাশুল দিতে হয় জাতিকে।’ কিন্তু বাড়ি ভাড়া নিয়ন্ত্রকের দফতর থেকে বলা হয়েছে, বেতন বৃদ্ধির অজুহাতে ভাড়া বৃদ্ধি করা সম্পূর্ণ বেআইনি। নগরীর বাড়ি ভাড়া বাড়বে বাড়ি ভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন-১৯৯১ অনুযায়ী।
এদিকে ভাড়াটিয়ারা বলছেন, কোথাও জবাবদিহিতা না থাকায় কারণে-অকারণে ভাড়া বাড়িয়ে দেন বাড়ির মালিকরা। ভাড়াটিয়ারা প্রতিবাদ করলে সর্বশেষ বাড়ি পরিবর্তন করেই এর সমাধান হয়। আর বাড়ি মালিকরা বলছেন বাড়ি নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণ খরচ বেড়ে যাওয়ার কারণে তাদের ভাড়া না বাড়িয়ে উপায় নেই।
অন্যদিকে নগর বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাড়ি ভাড়া নিয়ন্ত্রণে বরাবরই সরকার উদাসীন। রেন্ট কন্ট্রোল আইন-১৯৯১ প্রণয়নের দীর্ঘ ২৩ বছরে সরকার এটি বাস্তবায়নের কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি। ফলে বাড়ি মালিক অথবা স্থানীয় বাড়ি মালিক সমিতির যোগসাজশে বিভিন্ন অজুহাতে যখন-তখন বাড়িভাড়া বৃদ্ধি করা হয়।
কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব), জাতীয় ভাড়াটিয়া পরিষদ ও সিপিবির জরিপ থেকে জানা গেছে, বিগত ২৩ বছরে রাজধানী ঢাকা, চট্টগ্রাম ও রাজশাহী ও খুলনা মহানগরী এলাকায় বাড়িভাড়া বেড়েছে ৩২৫ ভাগ। তুলনামূলক বেশি ভাড়া বেড়েছে অতিদরিদ্র মানুষের বসবাসস্থল বস্তি ঘরে।
বাড়িওয়ালার সঙ্গে ভাড়াটিয়ার সম্পর্কটাও ভাড়াভিত্তিক। কিন্তু সে ভাড়া কিভাবে নিয়ন্ত্রিত হবে এর জন্য দরকার একটি চুক্তিপত্র। চুক্তিপত্র অনুযায়ী পাকা রসিদের মাধ্যমে ভাড়া পরিশোধ করা হলে কোনো বিরোধ থাকার কথা নয়। কিন্তু বাস্তবে সিংহভাগ বাড়িওয়ালা চুক্তিপত্র ও ভাড়ার রসিদের মাধ্যমে ভাড়া নেয়ার নীতি মানেন না। মৌখিক নির্দেশেই চলে সব কিছু। এর ফলে সৃষ্টি হয় দ্বন্দ্ব। অনুসন্ধানে জানা যায়, বিরোধটা সবচেয়ে বেশি বাধে বাড়ি ভাড়া বৃদ্ধি নিয়ে। বাড়ি ভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন-১৯৯১ অনুযায়ী বাড়িওয়ালা ও ভাড়াটিয়ার মধ্যে চুক্তিপত্র করা হলো প্রথম শর্ত। ওই আইনের ১৩ ধারায় বলা হয়েছে, ভাড়াটিয়া ভাড়া পরিশোধ করলে ভাড়াপ্রাপ্তির একটি রসিদ বিধি দ্বারা একটি ফরমে স্বাক্ষর করে ভাড়াটিয়াকে প্রদান করতে হবে। বাড়িওয়ালা একটি অংশ সংরক্ষণ করবেন। বাড়ি ভাড়া বৃদ্ধির বিষয়েও ওই আইনে বিশেষ নির্দেশনা রয়েছে। আইনের ৭ ধারায় বলা হয়েছে, কোনো বাড়ির ভাড়া মানসম্মত ভাড়ার অধিক বৃদ্ধি করা হলে ওই অধিক ভাড়া গ্রহণ করা বেআইনি। এমনকি তা চুক্তিপত্রে উল্লেখ থাকলেও। এ মানসম্মত ভাড়া হলো সে এলাকায় প্রচলিত উপযুক্ত ভাড়া। কেউ বাড়ি ভাড়া দিচ্ছেন পাঁচ হাজার টাকায়, আবার কেউ দাবি করবেন ছয় হাজার টাকা। তাহলে সেটা মানসম্মত ভাড়া হবে না। এ বিষয়ে বিরোধ বাধলে আইনের ১৫ ধারা অনুযায়ী বাড়ি ভাড়া নির্ধারণ করবেন। এমনকি তা বাড়ি ভাড়া নিয়ন্ত্রক একাই করে দিতে পারেন। আইনের ১৫ ধারা অনুযায়ী দুই বছর পরপর মানসম্মত উপায়ে বাড়ি ভাড়া পুনর্র্নির্ধারণ করা যায়। এ ক্ষেত্রে বছর বছর ভাড়া বৃদ্ধি সম্পূর্ণ বেআইনি।
বাড়ি ভাড়া নিয়ন্ত্রকের দফতর সূত্রে জানা গেছে, কোনো কোনো বাড়িওয়ালা চুক্তিপত্রের শর্তে বলেন পুলিশ, আইনজীবী, রাজনীতিক বা সাংবাদিককে বাড়ি ভাড়া দেয়া হবে না। তা আইনের চরম লঙ্ঘন। কোনো বাড়িওয়ালা এক মাসের ভাড়ার অধিক অগ্রিম নিতে পারেন না। কিন্তু অনেক বাড়িওয়ালা নানা অজুহাতে ভাড়াটিয়ার কাছ থেকে অগ্রিম আদায় করেন মোটা অঙ্কের টাকা। পুরান ঢাকায় এর পরিমাণ এক থেকে পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত। এ বেআইনি উদ্দেশ্য হাসিলের কারণেও বাধে বিরোধ।
আবার কখনো কখনো বাড়িওয়ালা-ভাড়াটিয়া বিরোধ ফৌজদারি মামলা পর্যন্ত গড়ায়। নিয়ম-কানুন পালনের পরও অধিক ভাড়ার আশায় অনেক বাড়িওয়ালা ভাড়াটিয়া উচ্ছেদ করতে চান। অধিকাংশ ক্ষেত্রে ভাড়াটিয়ারা বিরোধ এড়িয়ে চলেন। কিন্তু কিছু ব্যতিক্রম ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ফৌজদারি মামলা এমনকি চুরি-ডাকাতি, ভাঙচুর, লুটতরাজ ও শ্লীলতাহানির মামলার উদ্ভব হয়। যার মাশুল দিতে হয় দুই পক্ষকেই।
বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইনটি বেশ পুরনো। অতীতে বাড়িওয়ালা-ভাড়াটিয়ার বিরোধ মেটানো হতো ১৮৮২ সালের সম্পত্তি হস্তান্তর আইনের মাধ্যমে। কিন্তু ওই আইনে বাড়িওয়ালা যে কোনো সময় যে কোনো অজুহাতে ভাড়াটিয়া উচ্ছেদ করতে পারতেন। ফলে দুই পক্ষের দ্বন্দ্ব চরম রূপ নিত। ১৯৪২ সালে প্রথম বিধিবদ্ধ বঙ্গীয় বাড়ি ভাড়া অধ্যাদেশ জারি হয়। ১৯৪৬ সালে ভারত প্রতিরক্ষা আইন বিলুপ্ত হলে একই বছর আলাদা করে ৫ নম্বর আইন জারি হয়। ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগে তা বাতিল হয়ে যায়। এরপর ১৯৫১ সালে জারি হয়ে ১৯৫২ সালে, ১৯৫৩ সালে জারি হয়ে ১৯৫৫ সালে ও ১৯৬১ সালে জারি হয়ে ১৯৬২ সালে বাতিল হয়ে যায় পূর্ব বাংলা বাড়ি ভাড়া নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশ। ১৯৬৩ সালে জারি হয় পূর্ব পাকিস্তান বাড়ি ভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন। কিন্তু সব আইনের পরিবর্তন, পরিমার্জন ও বিলুপ্ত করে ১৯৮৬ সালে জারি হয় বাংলাদেশ বাড়ি ভাড়া নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশ। ভাড়া সংক্রান্ত বিষয়ের সুষ্ঠু নিয়ন্ত্রণের জন্য ১৯৯১ সালে সর্বশেষ আইনটি জারি হয়। প্রায় ২২ বছরের পুরনো আইনটি বর্তমানে অকার্যকর বলে আইনজ্ঞরা মনে করেন।
বাড়ি ভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইনের ২৩ ধারায় বলা হয়েছে, কোনো ভাড়াটিয়া যদি অতিরিক্ত ভাড়া, অগ্রিম বা সালামি গ্রহণ করেন তাহলে তিনি প্রথমবার অতিরিক্ত আদায়ের দ্বিগুণ অর্থ দণ্ডণীয় হবেন। শুধু তাই নয়, ভাড়ার রসিদ না দিলে ভাড়ার টাকার দ্বিগুণ দণ্ড রয়েছে ২৭ নম্বর ধারায়। এমনকি ভাড়ার রসিদে তথ্য (নাম ঠিকানা) ভুল লিখলেও বাড়িওয়ালাকে পাঁচশ’ টাকা দণ্ড দিতে হবে।
রাজধানীর মেরুল বাড্ডা এলাকার বাড়ি মালিক দুলাল বাবু বলেন, ‘গৃহনির্মাণ ঋণের সুদের হার বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি নির্মাণ সামগ্রীর দাম বেড়েছে। এছাড়া দফায় দফায় বাড়ছে গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানির দামসহ নিত্য প্রয়োজনীয় খরচ। সর্বশেষ বাড়ল ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের হোল্ডিং ট্যাক্স। এ পরিস্থিতিতে বাড়িভাড়া না বাড়িয়ে উপায় নেই।’
নগর গবেষক অধ্যাপক নজরুল ইসলাম বলেন, ‘দফায় দফায় বাড়িভাড়া বৃদ্ধি বাড়ি মালিকদের এখন নেশায় পরিণত হয়েছে। আর বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইনের বাস্তবায়ন না থাকায় ভাড়াটিয়ারা পড়েছেন মহাবিপদে। ফলে নগরজীবনে অনেক ভাড়াটিয়ার আয় ব্যয়ের সমন্বয় হয় না।’ এ পরিস্থিতিতে বাড়ি ভাড়া নিয়ন্ত্রণ ও ভাড়াটিয়াদের জীবন মানের ব্যয়ের সমন্বয় করার জন্য সরকারের সুনির্দিষ্ট নীতি-নির্ধারণ অতি জরুরি হয়ে পড়েছে বলে তিনি মনে করেন।
সিপিবির পলিট ব্যুরোর সদস্য রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, খুলনা, রাজশাহী ও চট্টগ্রামে মহানগরীতে চলতি বছর ২০-৩০ শতাংশ হারে বাড়ি ভাড়া বাড়ানো হয়েছে। আগামী জানুয়ারি-২০১৩ থেকে রাজশাহী ও খুলনা মহানগরে অনেক বাড়ি মালিক ভাড়াটিয়াদের ৫০০ থেকে ১ হাজার টাকা করে বাড়ানোর নোটিশ দিয়েছেন। আর রাজধানীতে ১ থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন বেশির ভাগ বাড়ি মালিক। বাড়ি ভাড়া বাড়ানোর নোটিশ থেকে বাদ যায়নি রেললাইনের পাশের বস্তির ঘরেও।
রাজধানীর ‘দক্ষিণ বারিধারা মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মানির হোসেন বলেন, মালিক সমিতি এলাকার নিরাপত্তা ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে কাজ করে থাকে। ভাড়া নির্ধারণ সংশ্লিষ্ট বাড়ি মালিক নির্মাণ খরচের ওপর ভিত্তি করেই নির্ধারণ করেন। তবে মালিক সমিতির পক্ষ থেকে বাড়ি মালিকদের সব সময় সহনশীল হারে ভাড়া বৃদ্ধির সুপারিশ করা হয়।
জাতীয় ভাড়াটিয়া পরিষদের সভাপতি ডা. জালাল আহমেদ বলেন, ‘রাজধানীসহ দেশের সব মহানগরীতে বাড়ির মালিকরা অযৌক্তিকভাবে ভাড়া বাড়াচ্ছেন। বাড়ির মালিকরা নানা অজুহাতে যখন-তখন ভাড়া বাড়ানোর নোটিশ দেন। ভাড়াটিয়ারা প্রতিবাদ জানালে সন্ত্রাসী দিয়ে বের করে দেয়া হয়। ভাড়াটিয়াদের এই দুর্দশা দেখার কেউ নেই।’
ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা মনিরুজ্জামান বলেন, বাড়ি মালিকদের কাছ থেকে কর আদায়ের সুবিধার্থে অঞ্চল জরিপ করে অনেক আগে সিটি কর্পোরেশন রেট চার্ট তৈরি করেছে। এ চার্টের চেয়ে অনেক বেশি রেটে হয়তো বাড়ির মালিকরা ভাড়া নিচ্ছেন। তা দেখা বা নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব ডিসিসির নয়।
স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক বলেন, ‘বাড়ি ভাড়া বৃদ্ধির বিষয়টি নিয়ে আমিও ব্যক্তিগতভাবে বিব্রত। অবশ্যই এটির সমাধান হওয়া প্রয়োজন। বিষয়টি নিয়ন্ত্রণে এবং নিয়মের মধ্যে আনতে (রেন্ট কন্ট্রোল আইনসহ) সরকারের একটি কমিশন গঠন করার উদ্যোগ রয়েছে।’
No comments:
Post a Comment