Tuesday, January 15, 2013

সংবিধান পর্যালোচনা-৩

আসন শূন্য ঘোষণা না করেই সংসদ নির্বাচন
আগের মেয়াদ শেষ না হওয়া পর্যন্ত নবনির্বাচিতরা শপথ নিতে পারবেন না
সালেহউদ্দিন:
সংসদ সদস্যদের আসন শূন্য ঘোষণা না করেই বর্তমান সংবিধানের বিধান অনুযায়ী তিনশ আসনে নির্বাচন করতে হবে। আর এ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে হবে সংসদের মেয়াদ শেষের ৯০ দিন আগে। নতুন সংসদের নির্বাচিত সদস্যরা আগের সংসদের মেয়াদ শেষ না হওয়া পর্যন্ত দায়িত্বও নিতে পারবেন না। এ নিয়ে আইনি জটিলতাও রয়েছে।

অন্যদিকে নির্বাচন কমিশন প্রণীত বিধিমালা অনুযায়ী কোনো মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, এমপি বা তাদের সমমর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিরা জাতীয় সংসদের কোনো আসনের উপ-নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর আর ওই নির্বাচনী এলাকায় যেতে পারেন না। সে অনুযায়ী তাদের আসন শূন্য ঘোষণা না হলে নির্বাচনী এলাকায় প্রার্থী হিসেবে যেতেও তাদের বিধিনিষেধ রয়েছে। আবার ওই আচরণবিধি যদি বাতিল বা সংশোধনও করা হয় সেক্ষেত্রে সংবিধানের সমতার নীতি লংঘিত হবে বলে সংবিধান বিশেষজ্ঞদের আশংকা।

জাতীয় সংসদে ২০১১ সালের ৩০ জুন পঞ্চদশ সংশোধনী আইন-২০১১ পাস হয়। ওই সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে ১২৩(৩) অনুচ্ছেদে (ক) উপ-অনুচ্ছেদ সংযুক্ত করা হয়। এতে বলা হয়, 'সংসদ সদস্যদের সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হইবে—মেয়াদ অবসানের কারণে সংসদ ভাঙ্গিয়া যাইবার ক্ষেত্রে ভাঙ্গিয়া যাইবার পূর্ববর্তী ৯০ দিনের মধ্যে'। ওই বিধানের কারণে সংসদ বহাল রেখেই নির্বাচন কমিশনকে আরেকটি সংসদ নির্বাচন আয়োজন করতে হবে। ওই সময়ের মধ্যে সংসদের অধিবেশন অনুষ্ঠিত হবে না। সংবিধানের ৭২(১) অনুচ্ছেদে সংসদের অধিবেশন বসার ক্ষেত্রে ৬০ দিনের বেশি বিরতি থাকবে না বলে বলা হয়েছে। নির্বাচনকালীন ৯০ দিনের ক্ষেত্রে এ বিধান প্রযোজ্য হবে না। তবে ওই সময়ে সংসদ সদস্যরা তাদের দায়িত্বে থাকবেন। এমনকি আগের সংসদের মেয়াদ শেষ না হওয়া পর্যন্ত নতুন সংসদের নির্বাচিতদের শপথ গ্রহণের জন্য অপেক্ষা করতে হবে। এ প্রসঙ্গে সংবিধানের ১২৩(৩) অনুচ্ছেদের শর্তাংশে বলা হয়েছে, 'তবে শর্ত থাকে যে (ক) উপ-দফা অনুযায়ী অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে নির্বাচিত ব্যক্তিগণ, উক্ত উপ-দফায় উল্লেখিত মেয়াদ সমাপ্ত না হওয়া পর্যন্ত, সংসদ সদস্যরূপে কার্যভার গ্রহণ করিবেন না।'

এদিকে সংসদ নির্বাচনে রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীর আচরণ বিধিমালা ২০০৮-এর ১৪ ধারায় উল্লেখ রয়েছে, '(১) সংসদের কোন শূন্য আসনে উপ-নির্বাচন অনুষ্ঠিত হইবার ক্ষেত্রে সরকারের কোন মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপ-মন্ত্রী কিংবা উক্ত মন্ত্রীদের পদমর্যাদাসম্পন্ন সরকারি সুবিধাভোগী কোন ব্যক্তি সংশ্লিষ্ট নির্বাচনী এলাকায় নির্বাচন-পূর্ব সময়ের মধ্যে কোন সফর বা নির্বাচনী প্রচারণায় যাইতে পারিবেন না; তবে শর্ত থাকে যে, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি উক্ত নির্বাচনী এলাকার ভোটার হইলে তিনি কেবল ভোট প্রদানের জন্য উক্ত এলাকায় যাইতে পারিবেন।'

আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সংসদের কোনো আসনে উপ-নির্বাচনের সময় মন্ত্রী-এমপিরা যে কারণে নির্বাচনী এলাকায় যেতে পারেন না, একই কারণে জাতীয় নির্বাচনকালেও যেতে পারেন না। তাছাড়া বিধানটি করা হয়েছিল সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর আগে। অর্থাত্ পঞ্চদশ সংশোধনীর আগে সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতো সংসদের মেয়াদ শেষে অথবা সংসদ বিলুপ্ত হওয়ার পর। ফলে সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী কারোরই কোনো পদমর্যাদা ছিল না। বর্তমানে সংসদ বহাল থাকলে এবং মন্ত্রী ও এমপিরা নির্বাচনে অংশ নিতে ইচ্ছুক হলে আইনগত জটিলতা এবং সংবিধানের সমতার নীতি লংঘিত হওয়ার আশংকা দেখা দিয়েছে। প্রসঙ্গত, সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদে উল্লেখ রয়েছে, 'সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী।' সংবিধানের ১২৩ অনুচ্ছেদের কারণে কেউ ক্ষমতায় থেকে এবং কাউকে ক্ষমতার বাইরে থেকে নির্বাচনে অংশ নিতে হবে।

প্রসঙ্গত, সংসদীয় গণতন্ত্রের সূতিকাগার বৃটেন এবং সংসদীয় গণতন্ত্রের বৃহত্তম দেশ ভারতে সংসদ বাতিল ঘোষণার পর পরবর্তী সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিলের রায়ে বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে নির্বাচনের ৪২ দিন আগে সংসদ ভেঙ্গে দেয়ার অভিমত দেন। কিন্তু বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যদের আস্থাভাজন কাউকে না পাওয়া গেলেই কেবল রাষ্ট্রপতি সংসদ ভেঙ্গে দিতে পারেন। সংসদ ভাঙ্গার আর কোনো ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির নেই।
http://ittefaq.com.bd/index.php?ref=MjBfMDFfMTVfMTNfMV8xXzFfMTE0NTU=

No comments: