Sunday, February 3, 2013

ভূমি অফিসে অনিয়ম দুর্নীতির আখড়া


এম এ বাবর: ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তরে অনিয়মের বেড়াজালে সেবা প্রত্যাশীরা দিশাহারা এক শ্রেণির অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী ও দালাল চক্রের দৌরাত্মে এখানে অনিয়ম এখন নিয়মে পরিণত হয়েছে

ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তরের (ভূমি অফিস) প্রধান কাজ, ভূমি সংক্রান্@ বিরোধ নিষ্পত্তিতে জমির খতিয়ান, পর্চা ও দলিলাদি তৈরি করা কিন্তু এসব কাজ করাতে গিয়ে দালাল চক্রের দৌরাত্ম্যে সেবা প্রত্যাশীরা ধাপে-ধাপে হয়রানি ও প্রতারিত হচ্ছেন আবার অনেকেই দালালের সহযোগিতায় ঘুস দিয়ে দ্রুত কাজ করিয়ে নিচ্ছেন

অভিযোগ রয়েছে, দালালের মাধ্যমে না এলে এখানে কোন কাজ সহজে করানো যায় না নাম প্রস@াব, জরিপ প্রতিবেদন (সার্ভে রিপোর্ট), নাম জারি, খাজনা দাখিল থেকে শুরু করে সবকিছুতেই চলে মোটা দাগের অর্থ লেনদেন কাজের মল্য অনুযায়ী সেবা প্রত্যাশীর কাছ থেকে সরকারি ফির চেয়ে কয়েক গুন টাকা বেশি আদায় করা হয় আর অতিরিক্ত টাকা দালাল এবং একাজে জড়িত কর্মচারীর মধ্যে অর্ধেক-অর্ধেক ভাগ হয় এদিকে দীর্ঘদিন এখানে কাজ করে ভূমি অফিসের বেশকিছু নকল নবিশ কোটিপতি হয়ে গেছেন

ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তরের নীচ তলায় ১০১ নম্বর রুমে ঢুকলে বোর্ডে লেখা রয়েছে, ‘বিনা মল্যে পরচা ও নকশা প্রাপ্তির ফরম সরবরাহ করা হয় কিন্তু বাস@বে এখানে ফরম পাওয়া যায় না অধিদপ্তরের বারান্দায় দালালের কাছ থেকে প্রতি ফরম ২০ টাকা করে কিনতে হয়

সরেজমিন খোঁজখবর নিয়ে জানা যায়, ভূমি জরিপ অধিদপ্তরসহ ঢাকা মহানগরীতে সহকারী ভূমি কমিশনের ৫টি সার্কেল অফিস, রেকর্ড রুম, তহসিল অফিস ও ভূমি অধিগ্রহণ শাখায় ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতি চলছে
এসব অফিসের প্রায় সব ধরনের কাজকর্ম দালালের নিয়ন্¿ণে চলে গেছে দালালরা প্রতি কার্য দিবসে সকাল থেকেই অফিসের ভেতরে-বাইরে ঘোরাফেরা করেন তেজগাঁও ভূমি অফিসের দালাল স্বপন মিয়া জানান, কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করেই তিনি দ্রুত কাজ করিয়ে দেন আর কাজ পাওয়ার জন্য তারও দালাল রয়েছে এরা মাঠ পর্যায় থেকে মক্কেল সংগ্রহ করেন

ভূমি অফিসের প্রতিটি সার্কেলের প্রধান একজন সহকারী কমিশনার (এসিল্যান্ড) এছাড়া সার্কেল অফিসে কানুনগো, নাজির, সার্ভেয়ার, প্রোসেস সার্ভেয়ার, মিউটেশন ক্লার্ক ও পিয়নসহ ১২-১৩ জন সরকারি নিয়োগ প্রাপ্ত স্টাফ রয়েছেন কিন্তু প্রতিটি সার্কেল অফিসের স্টাফ (ওমেদার) পরিচয়ে কাজ করছে আরো ১৫-২০ জন সরকারি কোন বেতন ভাতা না পেলেও প্রতিমাসে বড় অংকের টাকা আয় করেন তারা

ভূমি অফিসে সেবা প্রত্যাশীদের অনেকেই মল দলিল, ভায়া দলিলের সার্টিফায়েড কপি, নাম জারি (মিউটেশন), নাম জারি সংক্রান্@ সংশোধন, জমা-খারিজ, মিস কেস দায়ের, ভূমি কর পরিশোধ, আরএস, মৃত ব্যক্তির সম্পত্তি ওয়ারিশদের মধ্যে ভাগবাটোয়ারা করে দেয়া, এসআর, মহানগর পর্চা কপি ও এ সংক্রান্@ ভুল সংশোধন, রেকর্ড সংশোধন করতে এসে দালালের খপ্পরে পরেন

আতাউর রহমান নামে একজন ভুক্ত ভোগী জানান, একটি মিউটেশন ৪৫ কার্য দিবসের মধ্যে শেষ হওয়ার নিয়ম রয়েছে কিন্তু দালাল না ধরলে বিভিন্ন অজুহাত মাসের পর মাস ঘুরতে হয় সাধারণ মানুষের একটি মিউটেশনের জন্যে ২০ থেকে ৩০ বারও যেতে হয় যার কারণে এ হয়রানি এড়াতেই আমরা দালালের সহযোগিতা নেই


কোতোয়ালি ভূমি অফিসে দালালের সহযোগিতায় পর্চা তুলেছেন মোক্তার হোসেন তিনি বলেন, ‘এক শতাংশ জমির জন্য খাজনা বাবদ সরকারকে যে টাকা দিতে হয়, তার তিন গুন দিতে হয় ভূমি অফিসের কর্মকর্তাদের বলবেন আপনারা দেন কেন ? ঘুস দিবনা কোথায় যাব ? একদিনে যে কাজ করা সম্ভব, ঘুস না দিলে সেটি ১৫ দিনেও হবে না!’
তিনি জানান, টাকা না ছাড়লে এখানে কোন কাজ হয় না টাকা খরচ করলে মৃত ব্যক্তির নামেও পর্চা বেড় করা সম্বভ

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এখানের একজন দালাল বলেন, ‘পর্চার জন্য জমিন অনুযায়ী তিন থেকে দশ হাজার টাকা পর্যন্@ অফিসারগো ঘুস দেন লাগে আর কাজ করাইয়া তা দিয়া আমরা কমিশন পাই 
তিনি জানান, সর্ব প্রথম ঘুস দিয়ে রেজিস্ট্রি খাতায় এন্ট্রি করাতে হয় এরপরে রেকর্ড রুমের নকলনবিশ, বালাম খোঁজার পিয়ন, যাচাইকারী, রেকর্ড কিপার ও ডেস্ক-পাসে এসব ধাপে টাকা না দিলে আবেদনপত্র দীর্ঘদিন পরে থাকবে অথবা ড্যামেজ (খারাপ) করে লেখা হবে

তিনি আরো বলেন, সিএস পর্চার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ঘুস দিতে হয় কারণ সিএস পর্চার অধিকাংশ বালাম বইয়ের পাতা কাটা ও ঘষাঘষির কারণে দাগ-নম্বর ওঠে যায় যার কারণে  ট্রেজারি লকারে থাকা বালাম বই থেকে ওই পর্চা সংগ্রহ করতে হয় তাই এই পর্চা তুলতে ১০-৫০ হাজার টাকা পর্যন্@ ঘুস দিতে হয়

ভূমি অধিগ্রহণ শাখায় ভিন্ন কৌশলে বড় ধরনের দুর্নীতি হওয়ার অভিযোগ রয়েছে এ শাখায় দালালের দৌরাত্ম্য  নেই তবে শাখার এক শ্রেণির কর্মকর্তা-কর্মচারী, এডিসি, কানুনগো ও জমির মালিক মিলে ভুয়া তথ্য দিয়ে অধিগ্রহণ করা জমির বিল ছাড় করান তারা তদন্@ রিপোর্টে জলাশয় বা ডোবাকে উঁচু জমি, গাছপালাহীন জমিকে বাগান এবং চাষের জমিকে আবাসিক দেখিয়ে প্রতিবেদন তৈরি করে দেন এভাবে অধিগ্রহণ করা জমির মল দামের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি টাকা উত্তোলন করা হয়

ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদন্@রের মহাপরিচালক  মো. আব্দুল মান্নান বলেন, ১২৮ বছর যাবত (১৮৮৪ সাল থেকে) ব্রিটিশ আমলের নিয়মেই এ বিভাগটি পরিচালিত হচ্ছে এই বিভাগকে সম্পর্ণ ডিজিটাল পদ্ধতিতে নিয়ে আসার প্রক্রিয়া চলছে পুরো প্রক্রিয়া ডিজিটাল হয়ে গেলে ভূমির সাথে সম্পৃক্ত মানুষদের আর হয়রানি হতে হবে না তারা দ্রুত গতিতে ঘরে বসেই খতিয়ানসহ সকল তথ্য সংগ্রহ করতে পারবেন

মন্¿ী ভূমিমন্¿ী রেজাউল করিম হীরা বলেন, ভূমি ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম, দুর্নীতি ও হয়রানি দর করতে সরকার আন্@রিক ভাবে কাজ করছে ২০১৩ মধ্যে সারা দেশের ভূমি রেকর্ড ব্যবস্থাপনা ডিজিটাল নেটওয়ার্কের মধ্যে চলে আসবে এতে ঘরে বসেই মানুষ দেখতে পাবে তার জমির পরিমাণ, রেকর্ডের অবস্থা কিংবা প্রতিবেশীর জমির খতিয়ান সবকিছুই

ভূমি জরিপ অধিদপ্তরে দুর্নীতি ও হয়রানির বিষয়টি স্বীকার করে মন্¿ী বলেন, ‘অবস্থা সেখানে এমন যে লোম বাছতে গিয়ে কম্বল উজাড় হবার দশা
তদারকির অভাবে হয়রানি ও দুর্নীতি বাড়ছে উলেখ করে তিনি বলেন, অধিদপ্তরে জনবল সংকট রয়েছে তদারকি পর্যায়ে প্রশাসন ক্যাডারের ৭৪ জনের স্থলে লোক রয়েছে মাত্র ২৪ জন জনবল বৃদ্ধি করে এ অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছে সরকার
তিনি জানান, ডিজিটাল জরিপ কার্যক্রম শুরু হলে এক্ষেত্রে দুর্নীতি ও হয়রানি অনেক কমে যাবে

No comments: