Thursday, May 16, 2013

যেসব ঝড় সামলাতে পারেনি বাংলাদেশ


আদিত্য আরাফাত, সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট
বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
যেসব ঝড় সামলাতে পারেনি বাংলাদেশ
ঢাকা: ঘূর্ণিঝড় উপকূলে আঘাত হানলে যদিও দুর্যোগের সৃষ্টি হয়, কিন্তু এটি আবহাওয়ার একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া, যা পৃথিবীতে তাপের ভারসাম্য রক্ষা করে। পৃথিবীতে প্রতি বছর গড়ে প্রায় ৮০টি ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টি হয়।
এর অধিকাংশই সমুদ্রে মিলিয়ে যায়, কিন্তু যে অল্প সংখ্যক উপকূলে আঘাত হানে, তা অনেক সময় ভয়াবহ ক্ষতি সাধন করে।

ঘূর্ণিঝড় কী:
‘ঘূর্ণিঝড়’ বা ‘ঘূর্ণিবাত্যা’ হলো- ক্রান্তীয় অঞ্চলের সমুদ্রে সৃষ্ট বৃষ্টি, বজ্র ও প্রচণ্ড ঘূর্ণি বাতাস সম্বলিত আবহাওয়ার একটি নিম্নচাপ প্রক্রিয়া (low pressure system), যা নিরক্ষীয় অঞ্চলে উৎপন্ন তাপকে মেরু অঞ্চলের দিকে প্রবাহিত করে।
এই ধরনের ঝড়ে বাতাস প্রবল বেগে ঘুরতে ঘুরতে ছুটে চলে বলে এর নামকরণ হয়েছে ‘ঘূর্ণিঝড়’।
ঘূর্ণিঝড়ের ঘূর্ণন উত্তর গোলার্ধে ঘড়ির কাঁটার বিপরীত দিকে এবং দক্ষিণ গোলার্ধে ঘড়ির কাঁটার দিকে প্রবাহিত হয়।

আবহাওয়াবিদ বজলুর রশীদ বাংলানিউজকে বলেন, “ঘূর্ণিঝড়ের সৃষ্টি মূলত নিম্নচাপ থেকে। নিম্নচাপ বিশিষ্ট ঝড়কেই ‘ঘূর্ণিঝড়’ বলা হয়।”

তিনি জানান, ঘূর্ণিবাত্যার কেন্দ্রে নিম্নচাপ সৃষ্টি হলে চাপের সমতা রক্ষার জন্য চতুর্দিকে উচ্চচাপের শীতল বায়ু ওই কেন্দ্রের দিকে প্রবল গতিতে ধাবিত হয় এবং কেন্দ্রে গিয়ে তা ঊর্ধ্বগামী হয়।

আবহাওয়া অফিস সূত্রে জানা যায়, পৃথিবীতে প্রতি বছর গড়ে প্রায় ৮০টি ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টি হয়। এর অধিকাংশই সমুদ্রে মিলিয়ে যায়। কিন্তু যে অল্প সংখ্যক উপকূলে আঘাত হানে, তা অনেক সময় ভয়াবহ ক্ষতিসাধন করে।

বাংলাদেশে ৯১ সালের প্রলঙ্করী ঘূর্ণিঝড় ‘সিডর’, ‘আইলা’ বহু প্রাণহানি ঘটিয়ে উপকূলের অসংখ্য মানুষকে নিঃস্ব করে দিয়েছে।

গত কয়েক দশক ধরে বঙ্গোপসাগরে অসময়ে এবং ঘন ঘন সৃষ্টি হচ্ছে নানা সামুদ্রিক দুর্যোগ। সাইক্লোন সিজন বা ঘূর্ণিঝড় মৌসুমগুলো ব্যতিক্রমী আচরণ শুরু করেছে। আর সম্প্রতি তা চরম আকার ধারণ করেছে। ঘূর্ণিঝড় মৌসুমে মাত্রাতিরিক্ত লঘুচাপ ও নিম্নচাপ সৃষ্টি হচ্ছে।

শুধু তাই নয়, ঘূর্ণিঝড়ের শক্তি, গতি, সংখ্যা এবং স্থায়িত্বের রেকর্ডও দিন দিন পেরিয়ে যাচ্ছে। এর প্রমাণ পাওয়া যায় ১৯৭০, ১৯৯১, ২০০৭ ও ২০০৯ সালের ঘূর্ণিঝড়ের তাণ্ডব দেখে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য থেকে জানা যায়, উপকূলীয় অঞ্চলে ১৫৮৪ সাল থেকে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত ৩৮৫ বছরে অস্বাভাবিক ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের সংখ্যা ছিল ২৭টি।

এরপর মে-১৯৭০ সাল থেকে মে-২০০৯ সাল পর্যন্ত মাত্র ৩৯ বছরে একই ধরনের দুর্যোগের সংখ্যা ছিল ২৬টি।

একটি বেসরকারি সংস্থা তাদের ‘নিরাপদ বার্তা’ নামে প্রকাশনায় জানিয়েছে, ১৮৭৬ সাল থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত গত ১২৫ বছরে বাংলাদেশের উপকূলে ৮৩টি বড় ও মাঝারি ধরনের ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানে।

এই ৮৩টি ঝড়ের মধ্যে একটিও জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি, মার্চ ও জুলাই মাসে আঘাত হানেনি।

পরিবেশ বিষয়ক গবেষক আজিজুর রহমান সম্প্রতি তার এক নিবন্ধে জানান, গত কয়েক বছর ধরে দেশে ঘূর্ণিঝড়ের প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে। কমে আসছে ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টির ব্যবধান। আগে ১০, ১৫ কিংবা ২০ বছর পর পর ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানলেও এখন এ ব্যবধানের সময়টা ৪-৫ বছরে নেমে এসেছে।

তিনি জানান, কয়েক বছর আগেও নিম্নচাপ সৃষ্টি হলে ১ বা ২ নম্বর সতর্ক সংকেতের বেশি দেখানো হতো না। এখন লঘুচাপ ও নিম্নচাপ সৃষ্টির প্রকোপ এবং শক্তি বৃদ্ধি পাওয়ায় সমুদ্র বন্দরগুলোকেও মে থেকে অক্টোবর পর্যন্ত প্রায় প্রতিমাসেই একাধিকবার সরাসরি ৩ নম্বর বিপদ সংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হচ্ছে।

প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়গুলোর মধ্যে ১৯৭১ সালের ১২ নভেম্বর আঘাত হানা ‘গোর্কি’ নামে ঘূর্ণিঝড়টির স্থায়িত্ব ছিল ৫ ঘণ্টা, ১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিল ‘হারিকেন’ নামে ঘূর্ণিঝড়টির স্থায়িত্ব ছিল ১১ ঘণ্টা এবং ২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বর আঘাত হানা সুপার সাইক্লোনটির স্থায়িত্ব ছিল ২৪ ঘণ্টা।

২০০৭ ও ০৯ সালের ‘সিডর’ এবং ‘আইলা’র ভয়াবহতা মানুষ ভুলতে পারেনি আজও। এবার দেখে নেওয়া যাক উল্লেখযোগ্য কয়েকটি ঘূর্ণিঝড়ের চিত্র।

’৬০ সালের ঘূর্ণিঝড়ে নিহত ১৩ হাজার:

 ১৯৬০ সালের অক্টোবরে দুবার ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানে। প্রথমবার ৮ ও ৯ অক্টোবর। এ ঘূর্ণিঝড়ে মেঘনা নদীর খাঁড়ি অঞ্চল ও নোয়াখালী, বাকেরগঞ্জ, ফরিদপুর, পটুয়াখালী অঞ্চলের তিন হাজার মানুষ মারা যান। ঝড়ের বেগ ছিল ২০১ কিলোমিটার ঘণ্টায়। ৬২ হাজার ৭২৫টি বাড়িঘরের ক্ষতি হয়।

এছাড়া ৩০-৩১ অক্টোবর ২১০ কিলোমিটার বেগে সংঘটিত ঝড়ে চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, বাকেরগঞ্জ, ফরিদপুর ও পটুয়াখালী জেলায় ১০ হাজার মানুষ মারা যান।

গবাদিপশু মারা যায় ২৭ হাজার ৭৯৩, পাঁচ লাখ ৬৮ হাজার বাড়িঘর ধ্বংস হয়, যার ৭০ শতাংশই হাতিয়ায়। সাগরগামী দুটি বড় জাহাজ উপকূলে উঠে পড়ে ও পাঁচ-ছয়টি লাইটারেজ জাহাজ কর্ণফুলীতে ডুবে যায়।

ভোলা সাইক্লোন ১৯৭০:

এ বছরের ৭ থেকে ১৩ নভেম্বর ভোলা সাইক্লোনে প্রায় ৫ লাখের বেশি মানুষ মারা গিয়েছিল।

চট্টগ্রাম, ভোলা, চরফ্যাসন, মনপুরা, সন্দ্বীপ, বরগুনা, খেপুপাড়া, পটুয়াখালী, বোরহানুদ্দিন, চর তজুমদ্দিন, দক্ষিণ মাঈজদী, হারিয়াঘাটা এলাকার ওপর দিয়ে এ সময় ২২২ কিলোমিটার বেগে ঝড় হয়েছিল।

২০ হাজার জেলে নৌকা নিখোঁজ হয়েছিল। ১০ লক্ষাধিক গবাদিপশু মারা গিয়েছিল অথবা হারিয়ে গিয়েছিল জলোচ্ছ্বাসে।

বাড়িঘর ধ্বংস হয়েছিল চার লাখের বেশি। এ ঝড়পরবর্তী দুর্যোগ মোকাবেলা, ক্ষতিগ্রস্তদের সরকারি সহায়তার অপ্রতুলতা ইত্যাদি নিয়ে তখন পূর্ব পাকিস্তানে ব্যাপক অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়েছিল।

২৪-২৫ মে ১৯৮৫:

চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, কক্সবাজারের সন্দ্বীপ, হাতিয়া, উড়িরচরে ঝড়টি হয়। চট্টগ্রামে ১৫৪ কিলোমিটার বেগে, সন্দ্বীপে ১৪০ কিলোমিটার, কক্সবাজারে ১০০ কিলোমিটার বেগে ঝড় হয়। ৩ থেকে ৬ মিটার উচ্চতায় জলোচ্ছ্বাসে সম্পদের ক্ষতির সঙ্গে মানুষ মারা যায় ১১ হাজার ৬৯ জন, এক লাখ ৩৬ হাজার গবাদিপশুও মারা যায়।

২৪-৩০ নভেম্বর ১৯৮৮:

যশোর, কুষ্টিয়া, ফরিদপুর, বরিশাল ও খুলনার উপকূলীয় দ্বীপাঞ্চলে ১৬২ কিলোমিটার বেগে সংঘটিত ঝড়ে পাঁচ হাজার ৭০৮ জন মারা গিয়েছিল। এ ঝড়ে সুন্দরবনে ১৫ হাজার হরিণ ও ৯টি রয়েল বেঙ্গল টাইগার মারা গিয়েছিল। গবাদিপশু মারা যায় ৬৫ হাজার। এ ঝড়ে সম্পদের ক্ষতি হয় ৯৪১ কোটি টাকার।

১৯৯১ সালের চট্টগ্রাম ঝড়:

১৯৯১ সালের ২৯ ও ৩০ এপ্রিল চট্টগ্রাম ঝড়ে প্রায় দেড় লাখ মানুষ মারা যায় এবং গবাদিপশু মারা যায় প্রায় ৭০ হাজার। সব মিলিয়ে এ ঝড়ে ৬০ হাজার কোটি টাকার সম্পদ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।

১৯৯১ সালের ২৯ ও ৩০ এপ্রিল ঝড়ের গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় ২২৫ কিলোমিটার। তবে এনওএএ-১১ নামক স্যাটেলাইটের রেকর্ড থেকে বলা হয়েছিল, ঝড়টির গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় ২৪০ কিলোমিটার।

এটি ভারত মহাসাগর থেকে উত্থিত হয় এবং ২০ দিন পর বঙ্গোপসাগরে এসে পৌঁছায় ও চট্টগ্রাম উপকূলে আঘাত হানে।

ঝড়টি ৬০০ বর্গকিলোমিটার জায়গা জুড়ে ঘূর্ণন করে। উপকূলীয় এলাকায় পাঁচ থেকে আট মিটার উচ্চতায় জলোচ্ছ্বাস হয়ে তলিয়ে গিয়েছিল ফসলের মাঠ, ভাসিয়ে নিয়ে গিয়েছিল ঘর, গাছপালা ও পশুপাখি।

সিডর:

২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বর প্রলয়ঙ্করী এ ঘূর্ণিঝড় লণ্ডভণ্ড করে দেয় বাংলাদেশের সুন্দরবন, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাট।

২৬০ কিলোমিটার বেগে প্রবাহিত হওয়া এই ঝড়টি মধ্য বঙ্গোপসাগরে হঠাৎ উত্থিত হয়েই শক্তিশালী হয়ে পড়ে।

প্রায় সাড়ে তিন হাজার মানুষ এ ঝড়ে মারা যান। সেভ দ্য চিলড্রেন ও বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির পরিসংখ্যান মতে, মৃতের সংখ্যা পাঁচ থেকে ১০ হাজারের মধ্যে ছিল।

আইলা:

২০০৯ সালের ২৭ মে বাংলাদেশ ও ভারতে আঘাত হানে আইলা। এ ঝড়ে ৩৩০ জন মারা গেলেও সাড়ে আট হাজারের বেশি মানুষ নিখোঁজ হয়। বাড়িঘর থেকে স্থানচ্যুত হয় ১০ লাখের বেশি মানুষ। আইলা পরবর্তী দুর্যোগে সাত হাজারের বেশি মানুষ ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়।

নিরাপদ পানির ঘাটতি দেখা দেয়। সম্পদের ক্ষতি হয়েছিল ৫৫ কোটি ২৬ লাখ ডলারের।

http://www.banglanews24.com/detailsnews.php?nssl=65828ba9e6159fa4c38ec4a9d42ae29c&nttl=16052013196828

No comments: