Saturday, May 11, 2013

জন্ডিসঃ কি খাবেন না


জন্ডিসঃ কি খাবেন নাডা. মামুন-আল মাহতাব
সহযোগী অধ্যাপক, লিভার বিভাগ
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়

জন্ডিস হয়েছে মনে করলেই মনে নানা অজানা আশঙ্কার উদ্ভব ঘটে। আর চারপাশের সবাই হয়ে উঠেন একেকজন বিশেষজ্ঞ। বিশেষ করে কি খেতে হবে আর কি খাওয়া যাবে না এই নিয়ে পরামর্শের যেন শেষ থাকে না। প্রতিদিন জন্ডিস রোগীদের চিকিত্সা করতে গিয়ে দেখতে পাচ্ছি রোগীরা তাদের খাওয়া-দাওয়ার ব্যাপারে খুবই বিভ্রান্তিতে থাকে। বিশেষ করে লিভার বিশেষজ্ঞের সাথে কথা বলতে যেয়ে তাদের বিভ্রান্তি অনেক ক্ষেত্রেই বেড়ে যায়। কারণ জন্ডিস রোগীর পথ্যের ব্যাপারে আমাদের যে প্রচলিত বিশ্বাস তা অনেক ক্ষেত্রেই আধুনিক চিকিত্সা বিজ্ঞানের সাথে খাপ খায় না।
জন্ডিস নিজে কিন্তু কোন রোগ নয়, বরং এটি রোগের লক্ষণ। জন্ডিস বলতে সাধারণত আমরা লিভারের একিউট প্রদাহ বা একিউট হেপাটাইটিস জনিত জন্ডিসকেই বুঝে থাকি। ভাইরাস থেকে শুরু করে নানা ধরণের ওষুধ, এলকোহল ইত্যাদি অনেক কারণেই লিভারে একিউট হেপাটাইটিস হতে পারে। আমাদের দেশে একিউট হেপাটাইটিসের প্রধান কারণ হেপাটাইটিস ই, এ এবং বি ভাইরাস। এর মধ্যে প্রথম দু'টি হলো পানি ও খাদ্যবাহিত আর তৃতীয়টি ছড়ায় মূলত:রক্তের মাধ্যমে। হেপাটাইটিস এ ভাইরাস প্রধানত শিশুদের জন্ডিসের কারণ, তবে যে কোন বয়সের মানুষই হেপাটাইটিস ই ও বি ভাইরাসে আক্রান্ত হতে পারে। আমাদের প্রথাগত বিশ্বাস হচ্ছে জন্ডিস হলে বেশী বেশী পানি খেতে হবে। খেতে হবে বেশী করে আখের রস, ডাবের পানি, গ্লুকোজের সরবত ইত্যাদি। আসলে ব্যাপারটি এরকম নয়। জন্ডিস রোগীকে সাধারণ মানুষের মতোই পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি খেতে হবে। সমস্যা হতে পারে স্বাভাবিকের চেয়ে কম পানি পান করলে। কারণ সে ক্ষেত্রে একিউট কিডনি ইনজুরি বা কিডনি ফেইলিয়্যুর হতে পারে। জন্ডিসের রোগীরা অনেক সময়ই বমি বা বমি-বমি ভাব এবং খাবারে অরুচির কারণে যথেষ্ট পরিমাণে পানি এবং অন্যান্য খাবার খেতে পারেন না। সেক্ষেত্রে রোগীকে শিরায় স্যালাইন দেয়া জরুরী হয়ে পড়ে। সাধারণের ধারণা বেশী বেশী পানি বা তরল খেলে প্রস্রাবের রং অনেকটাই হালকা বা সাদা হয়ে আসে বলে জন্ডিসের রোগীরা প্রায়শ:ই বেশী বেশী তরল খাবার খেয়ে থাকেন। তবে বাস্তবতা হলো, এতে জন্ডিস এতটুকুও কমে না। বেশী বেশী পানি খেলে ঘন ঘন প্রস্রাব হয় বলে তা কিছুটা হালকা হয়ে এলেও রক্তে বিলিরুবিনের পরিমাণ এতে বিন্দুমাত্রও কমে না। বরং বিশ্রাম যেখানে জন্ডিসের রোগীদের প্রধান সমস্যা সেখানে প্রস্রাব করার জন্য রোগীকে বারবার টয়লেটে যেতে হলে রোগীর বিশ্রামে ব্যাঘাত ঘটে, যা রোগীর জন্য মোটেও মঙ্গলজনক নয়। তেমনিভাবে বেশী বেশী ফলের রস খাওয়াও বুদ্ধিমানের কাজ নয়। কারণ এতেও একই কারণে রোগীর বিশ্রামের ব্যাঘাত ঘটে। পাশাপাশি বেশি বেশি ফলের রস খেলে পেটের মধ্যে ফার্মেন্টেশনের কারণে রোগীর পেট ফাপা, খাওয়ার অরুচি ইত্যাদি বেড়ে যায়। আখের রস আমাদের দেশে জন্ডিসের একটি বহুল প্রচলিত ওষুধ। অথচ সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে রাস্তার পাশের যে দূষিত পানিতে আখ ভিজিয়ে রাখা হয় সেই পানি মিশ্রিত আখের রস খাওয়া থেকে হেপাটাইটিস এ বা ই ভাইরাস মানুষের শরীরে ছাড়াতে পারে। আমাদের দেশে আরেকটি প্রচলিত বিশ্বাস হচ্ছে জন্ডিসের রোগীকে হলুদ দিয়ে রান্না করা তরকারি খেতে দেয়া যাবেন। কারণ এতে রোগীর জন্ডিস বাড়তে পারে। আসল কথা হলো, রক্তে বিলিরুবিন নামক একটি হলুদ পিগমেন্টের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ার কারনেই জন্ডিস দেখা দেয়। এর সাথে খাবারের হলুদের কোন ধরণের যোগাযোগ নেই। একইভাবে জন্ডিসের রোগীকে তেল-মসলা না দিয়ে শুধুমাত্র সিদ্ধ-সিদ্ধ খাবার খেতে দেয়ারও কোন যুক্তি থাকতে পারে না। এ সমস্ত রোগীদের এমনিতেই খাবারে অরুচি দেখা দেয়। তার উপর এ ধরণের খাবার-দাবার রোগীদের উপকারের চেয়ে অপকারই করে বেশী। তাই জন্ডিসের রোগীকে সব সময় এমন খাবার দেয়া উচিত যা তার জন্য রুচিকর এবং যা তিনি খেতে পারছেন। তবে মনে রাখতে হবে রোগীকে বাইরের খাবার সব সময় পরিহার করতে হবে। বিশেষ করে খুব সাবধান থাকতে হবে পানির ক্ষেত্রে। জন্ডিস থাক বা না থাক, না ফুটিয়ে পানি পান করা যাবে না।
তেমনিভাবে বাইরের খাবার যদি খেতেই হয় তবে তা অবশ্যই গরম হতে হবে। সতর্ক থাক থাকতে হবে ফুচকা, চটপটি, বোরহানি আর সালাদের ব্যাপারে। কারণ হেপাটাইটিস এ বা ই-এর মতো পানিবাহিত ভাইরাসগুলো এসবের মাধ্যমেই ছড়িয়ে থাকে। বিশেষ করে গর্ভবতী মহিলাদের খুব সাবধান থাকা উচিত। এসময় মায়েরা প্রায়শই বাইরের খাবার খেয়ে থাকেন যা থেকে তারা অনেক সময় হেপাটাইটিস ই ভাইরাস জনিত জন্ডিসে আক্রান্ত হন। আর গর্ভাবস্থায় শেষ তিন মাসে যদি হেপাটাইটিস-ই হয়, তবে তা থেকে মা ও গর্ভের শিশুর মৃত্যুর আশঙ্কা শতকরা পঞ্চাশ ভাগেরও বেশী। জন্ডিসের রোগীদের সাথে একই প্লেট-বাসন বা গ্লাসে খাবার বা পানি খাওয়া যাবে কিনা রোগীর স্বজনদের মনে এমন একটি প্রশ্ন থাকে। যে সমস্ত ভাইরাসের মাধ্যমে একিউট হেপাটাইটিস জনিত জন্ডিস হতে পারে, তাদের মধ্যে হেপাটাইটিস বি ও সি ছড়ায় রক্তের মাধ্যমে। আর হেপাটাইটিস এ ও ই ভাইরাস দুটি খাদ্য ও পানি বাহিত হলেও এই দুটি ভাইরাসের কারণে রোগীর যতদিনে জন্ডিস দেখা দেয়, তখন তার কাছ থেকে আর ঐ ভাইরাস দুটি ছড়ানোর আশঙ্কা থাকে না বললেই চলে। কাজেই জন্ডিস রোগীর সাথে প্লেট-বাসন শেয়ার করার মাধ্যমে কারো এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার কোন কারণ নেই। ঠিক তেমনিভাবে জন্ডিস রোগে আক্রান্ত মা নিশ্চিন্তে তার সন্তানকে দুধ পান করাতে পারেন তবে মার যদি হেপাটাইটিস বি ভাইরাস জনিত জন্ডিস হয়ে থাকে তবে শিশুর জন্মের সাথে সাথেই হেপাটাইটিস বি ভাইরাসের টিকা এবং ইমিউনোগ্লোবুলিন ইঞ্জেকশন দেয়া অত্যন্ত জরুরী। কারণ মায়ের দুধের মাধ্যমে না ছড়ালেও, মার ঘনিষ্ট সাহচর্যে শিশুর হেপাটাইটিস বি ভাইরাসে আক্রান্ত হবার আশঙ্কা থাকে এবং আমাদের দেশে অনেক হেপাটাইটিস বি ভাইরাসের রোগীই
এভাবেই এই রোগ আক্রান্ত হয়ে থাকেন। তাই জন্ডিসের রোগীদের খাবারের ব্যাপারে বিভিন্ন রকম বাছ-বিচার আর সতর্কতা এসব রোগীদের ভাল থাকতে যেমন অনেক খানি সাহায্য করে তেমনি অজ্ঞতা বা ভুল ধারণার কারণে অনেক সময়েই তারা বড় ধরণের সমস্যায় পরতে পারেন। এ ব্যাপারে সঠিক জ্ঞান খুবই জরুরী।

No comments: