এম এ বাবর:
প্রবল বর্ষণে প্লাবিত হয়েছে দেশের বিভিন্ন স্থানের সড়ক মহাসড়ক। টানা বৃষ্টিতে সৃষ্টি হয়েছে জলাবদ্ধতা। গত বুধবার মাঝ রাত থেকে প্রায় ১০ ঘণ্টা টানা বর্ষণে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে যোগাযোগ ব্যবস্থা। বৃষ্টির পানিতে তলিয়ে গেছে অনেক এলাকার ফসলি জমি। এমনকি সড়ক-মহাসড়কের কোথাও কোথাও হাঁটুপানি জমে যানবাহন চলাচলে বিঘœ ঘটায় সৃষ্টি হয় দীর্ঘ যানজট।
অবিরাম বর্ষণে সারাদেশের মতো রাজধানীরও কয়েকটি এলাকা হাঁটুপানির নিচে তলিয়ে যায়। এতে চরম ভোগান্তিতে পড়ে নগরবাসী। এছাড়া দিনভর বৃষ্টির কারণে গাজীপুর, মানিকগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ ও নারায়ণগঞ্জবাসীর জীবনযাত্রা ব্যাহত হয়।

আবহাওয়া অধিদফতর জানায়, গভীর সঞ্চালনশীল মেঘমালার কারণে সারাদেশে বৃষ্টিপাত হচ্ছে। গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল ৬টা থেকে বেলা ১২টা পর্যন্ত ঢাকায় ৭০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এই সময়ে দেশের সর্বোচ্চ বৃষ্টি হয় টাঙ্গাইলে ৮২ মিলিমিটার। অধিদফতরের জ্যেষ্ঠ আবহাওয়াবিদ বজলুর রহমান জানান, কালবৈশাখীর প্রভাবে আজ শুক্রবারও ঢাকা, চট্টগ্রাম ও বরিশাল বিভাগের কোথাও কোথাও ভারি থেকে অতিভারি বর্ষণ হতে পারে।
আর চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও মংলা সমুদ্র বন্দরকে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্কতা সংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে। উত্তর বঙ্গোপসাগরে অবস্থানরত সব মাছ ধরার নৌকা ও ট্রলারকে পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত উপকূলের কাছাকাছি থেকে সাবধানে চলাচল করতে বলা হয়েছে।
এদিকে রাজধানীতে গতকাল ভারি বর্ষণে নগরজীবনে বয়ে এনেছে দুর্ভোগ। বৃষ্টির পানি দ্রুত অপসারণ না হওয়ায় ড্রেন ও স্যুয়ারেজ লাইন থেকে বেরিয়ে আসা নোংরা পানি রাস্তায় জমা হলে পথচারীরা সীমাহীন ভোগান্তিতে পড়েন। সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত অবিরাম বৃষ্টিতে অলিগলিসহ ঢাকার প্রধান প্রধান সড়কের বেশিরভাগই চলে যায় হাঁটুপানির নিচে। সরকারি ছুটি থাকলেও কর্মমুখী মানুষ ঘর থেকে বের হতে পারেননি।
রাস্তায় যান চলাচলও ছিল খুবই কম। কিছু পাবলিক বাস চলাচল করলেও তাতে যাত্রীদের উঠতে রীতিমতো যুদ্ধ করতে হয়েছে। অন্যদিকে বৃষ্টির কারণে বাইরে বের হতে না পারায় ভোগান্তিতে পড়েছেন দিনমজুররা। আর বৃষ্টি এবং জলাবদ্ধতার কারণে দোকান বসাতে পারেননি হকার ও ফুটপাতের ব্যবসায়ীরা।
সরেজমিনে দেখা গেছে, বেলা পৌনে ১১টার দিকে কারওয়ান বাজার টিসিবি ভবনের সামনের সড়কে পানি জমে আছে। বেলা ১২টার সময় ব্যাংকপাড়া মতিঝিলের বনশিল্প ভবন ও বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের আশপাশের রাস্তায় জমে আছে হাঁটুপানি। জলাবদ্ধতার কারণে সকাল থেকেই ধানমণ্ডির জিগাতলা থেকে হাজারীবাগ রাস্তায় রিকশা, সিএনজি অটোরিকশা চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।
মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ডে, মিরপুরের সনি সিনেমা হল থেকে চিড়িয়াখানা রাস্তা ও মাজার রোড এবং গাবতলীর বিভিন্ন স্থানেও পানি জমে থাকতে দেখা যায়। একই অবস্থা দেখা যায় গুলশান, বারিধারা, মৌচাক, মালিবাগ, যাত্রাবাড়ী, সায়েদাবাদ, মহাখালী, মগবাজার, ফার্মগেট, ফকিরাপুল, কমলাপুর, কাকরাইল, মালিবাগ, শান্তিনগর, মৌচাক, সিদ্ধেশ্বরী, বেইলি রোড, মগবাজার, খিলগাঁও, মাদারটেক, বাসাবো, বাড্ডা, রামপুরা, বনশ্রী, মেরাদিয়া, গোড়ান, খিলগাঁও, কাঁঠালবাগান, যাত্রাবাড়ী, কলাবাগান, পল্লবী, মোহাম্মদপুর ও মিরপুরসহ বেশকিছু এলাকায়।
জলাবদ্ধতার কারণে এসব রাস্তায় প্রাইভেটকার, মাইক্রোবাস, সিএনজি অটোরিকশা ও ট্যাক্সিক্যাবের সাইলেন্সারে পানি ঢুকে যাওয়ায় বেশ কয়েকটি যানবাহন বিকল হয়ে যায়। অন্যদিকে জলাবদ্ধতার কারণে রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে সৃষ্টি হয় তীব্র যানজট।
গাজীপুর প্রতিনিধি জানান, গতকাল ভোর থেকে টানা বৃষ্টিতে গাজীপুরের বিভিন্ন স্থানে দেখা দিয়েছে জলাবদ্ধতা। বিভিন্ন সড়কে হাঁটুপানি জমে যায়। এতে দুর্ভোগে পড়েছে জেলাবাসী। ভোর সাড়ে ৫টা থেকে সকাল ১০টা পর্যন্ত বেশি বৃষ্টিপাতে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের গাজীপুরের বিভিন্ন এলাকা প্লাবিত হয়। এতে মাহসড়কে ভয়াবহ জানজট সৃষ্টি হয়ে দুর্ভোগে পড়ে যাত্রীরা। জেলার কালিগঞ্জ, কাপাসিয়া, কালিয়াকৈর, টঙ্গী, শ্রীপুর উপজেলার বিভিন্ন এলাকা বৃষ্টির পানিতে তলিয়ে গেছে। টঙ্গীর শিল্পাঞ্চলে স্কুল-কলেজ, রাস্তাঘাট, হাসপাতাল ও শিল্পকারখানাসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বৃষ্টির পানি ঢুকে যায়। প্রবল বর্ষণে প্লাবিত হয় গাজীপুরের নিুাঞ্চল বোর্ড বাজার, বড়বাড়ি, টঙ্গীর বিসিক এলাকা, টঙ্গী থানা ও এরশাদনগর এলাকা। এদিকে তুরাগ, শীতলক্ষ্যাসহ জেলার প্রায় সব নদ-নদীর পানিই বৃদ্ধি পেয়েছে।
মানিকগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, পর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থার অভাবে মানিকগঞ্জ পৌর এলাকায় সামান্য বৃষ্টিতেই সৃষ্টি হয় জলাবদ্ধতা। এতে চরম দুর্ভোগের শিকার হন পৌরবাসী। গতকাল সকালে কয়েক ঘণ্টার বৃষ্টিতেই বাসস্ট্যান্ড এলাকায় জমে যায় হাঁটুপানি। শহরের প্রবেশমুখে এমন জলাবদ্ধতায় যানবাহন চলাচল বিঘিœত হওয়ার পাশাপাশি দিনভর ভোগান্তিতে পড়েন বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষ। মানিকগঞ্জ বাসস্ট্যান্ড এলাকা থেকে সদর হাসপাতাল ফটক পর্যন্ত হাঁটুপানি জমে যায়। এছাড়া ড্রেনেজ ব্যবস্থা না থাকায় কর্নেল মালেক সড়কের পৌর এলাকার মানিকগঞ্জ বাসস্ট্যান্ড থেকে রমজান আলী ডিগ্রি কলেজ পর্যন্ত সড়কের দুই পাশে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে।
মুন্সীগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, মুন্সীগঞ্জে দিনভর বৃষ্টির কারণে জীবনযাত্রা ব্যাহত হয়েছে। শহরের রাস্তাঘাটে সৃষ্টি হয় জলাবদ্ধতার। গত কয়েকদিন ধরে টানা আবার কখনো থেমে থেমে এই বৃষ্টির কারণে ফসলেরও ক্ষতি হচ্ছে। লৌহজং, শ্রীনগর ও সিরাজদিখান উপজেলার শত শত একর জমির উঠতি বোরো ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। গতকাল কয়েক ঘণ্টায় মুন্সীগঞ্জে ৩৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে উল্লেখ করে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক মো. হাবিবুর রহমান জানান, বৃষ্টিতে এখানে ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।
রূপগঞ্জ (নারায়ণগঞ্জ) প্রতিনিধি জানান, দুই দিনের টানা বর্ষণে রূপগঞ্জে কৃত্রিম বন্যার সৃষ্টি হয়েছে। এতে উপজেলার গোলাকান্দাইল, নাগেরবাগ, ৫নং ক্যানেল, আড়িয়াব, মাসাবো, বরপা, গোলাকান্দাইল ইসলামবাগ, আউখাবো, ভাণ্ডাব, সোনাব, কর্ণগোপ, কালি, ডুলুরদিয়া, আমলাব, শিংলাব, আতলাশপুরসহ ২০ গ্রামের দুই লাখ লোক পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। প্রবল বর্ষণে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হওয়ায় শত শত বিঘা বোরো ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে সবজি চাষের। এ ক্ষতি চলতি মৌসুমে কাটিয়ে ওঠা সম্ভব নয় বলে জানান স্থানীয় কৃষকরা।
নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, মুষলধারের টানা বৃষ্টিতে নারায়ণগঞ্জে ডিএনডি বাঁধের ভেতরে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হওয়ায় এলাকার লোকজন গতকাল প্রায় দেড় ঘণ্টা সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছে। পরে পুলিশ ও স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর ঘটনাস্থলে এসে দ্রুত পানি নিষ্কাশনের আশ্বাস দিলে বিক্ষুব্ধ জনতা অবরোধ তুলে নেয়। বেলা সাড়ে ১১টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত নারায়ণগঞ্জ-আদমজী-ডেমরা সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করে সিদ্ধিরগঞ্জের গোদনাইল, চৌধুরীবাড়ি, এনায়েতনগর ও জেলেপাড়াসহ বিভিন্ন এলাকার পানিবন্দি হাজার হাজার নারী-পুরুষ। জেলেপাড়া এলাকায় সড়কে গাছের গুঁড়ি ফেলে রেখে অবরোধ করে এলাকাবাসী।
http://manobkantha.com/2013/05/24/122313.html

No comments:
Post a Comment