উদ্ধারের পর রেশমাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
বাংলাদেশে একটি বহুতল কারখানা ভবন ধসে পড়ার ১৭ দিন পর এর ধ্বংসস্তূপের নিচে থেকে এক মহিলাকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে।
বাংলাদেশ দমকল বাহিনীর প্রধান ব্রিগেডিয়ার
জেনারেল আলী আহমেদ খান জানিয়েছেন, ধসে পড়া ভবনের দ্বিতীয় তলার ধ্বংসস্তূপের
নিচে রেশমা নামের এই মহিলা আটকে আছেন বলে উদ্ধারকর্মীরা জানতে পারেন।
সঙ্গে সঙ্গে সেখানে পানি, খাবার এবং অক্সিজেন পাঠানো হয়।উদ্ধারকর্মীরা সেখানে সব ধরণের ভারী
যন্ত্রপাতি ব্যবহার বন্ধ করে দেন। কেবল হাতে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি ব্যবহার
করে তাঁকে ধ্বংসস্তূপের নিচে থেকে টেনে বের করা হয়।ধসে পড়া রানা প্লাজার কয়েক হাজার টন ধ্বংসাবশেষের নিচে ১৭ দিন পর একজন জীবিত মানুষকে খুঁজে পাওয়ার এই ঘটনাকে উদ্ধারকর্মীরা 'বিস্ময়কর' বলে বর্ণনা করছেন।
"আমি দৌড়ে গিয়ে পাইপটা ধরি। দেখি ভেতরে একটা মেয়ে। মেয়েটা আমাকে বললো, স্যার আমাকে বাঁচান"
আবদুর রাজ্জাক, সেনাবাহিনীর উদ্ধার কর্মী
এরপর গত ১২ দিনে ধ্বংসস্তূপে আর কোন জীবিত মানুষের সন্ধান পাওয়া যায় নি।
অবিশ্বাস্য ঘটনা
রানা প্লাজার ধ্বংসাবশেষে ১৭ দিন পর কাউকে জীবিত পাওয়া যাবে, এটা উদ্ধারকর্মীদের কল্পনারও বাইরে ছিল।
নিখোঁজ স্বজনদের খোঁজে ছবি হাতে যারা সেখানে ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন, তাদের শেষ ভরসা ছিল যদি প্রিয়জনের লাশটা অন্তত পাওয়া যায়।
সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে রেশমা
বেঁচে থাকা রেশমার অবস্থান প্রথম জানতে পেরেছিলেন সেনাবাহিনীর উদ্ধারকর্মী আবদুর রাজ্জাক।
শ্বাসরুদ্ধকর এই উদ্ধার অভিযানের পর টেলিভিশন ক্যামেরার সামনে তিনি ঘটনার বর্ণনা দেন।
“আমরা মিডিয়ার লোকজনকে রানা প্লাজার ধ্বংসাবশেষের ওপর নিয়ে যাচ্ছিলাম। হঠাৎ দেখি একটা পাইপ নড়ছে। মেয়েটা ভেতর থেকে একটা ছোট পাইপ বের করে নাড়ছিল। আমি আমার স্যারকে বললাম, স্যার এখানে লোক আছে নিশ্চয়ই।”
"অনেক কষ্ট করে চিপা দিয়ে চিপা দিয়ে লাঠি দিয়ে ভেঙ্গে নিচে নামছি। আমি অনেক ডাকছি, কেউই শুনে নাই"
রেশমা
রেশমার জীবিত থাকার খবর মূহুর্তে রটে যায় সাভারের দুর্ঘটনাস্থলে, তার মিডিয়ার মাধ্যমে সারা দুনিয়ায়।
শ্বাসরুদ্ধকর ৪৫ মিনিট
শুক্রবার বিকেল সাড়ে তিনটার দিকে উদ্ধার কর্মীরা রেশমার সন্ধান পান। আর তাঁকে ধ্বংসাবশেষের নিচে থেকে টেনে বের করা হয় বিকেল চারটা ২৭ মিনিটে। এই ৪৫ মিনিট বাংলাদেশের মানুষ শ্বাসরুদ্ধকর প্রতীক্ষায় ছিলেন রেশমাকে জীবিত দেখার আশায়।
১২ দিন আগে একই ভাবে সন্ধান পাওয়া আরেক গার্মেন্টস কর্মী শাহীনাকে উদ্ধারের চেষ্টা শেষ পর্যন্ত বিফল হয়েছিল। উদ্ধার কাজে ব্যবহৃত ড্রিল মেশিন থেকে আগুন ধরে গেলে শাহীনা মারা যান। একই ঘটনায় অগ্নিদগ্ধ উদ্ধার কর্মী কায়কোবাদও পরে সিঙ্গাপুরের এক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। কাজেই অনেকেই শংকায় ছিলেন রেশমাকে নিয়ে।
ঘটনাস্থল থেকে বিবিসির আকবর হোসেন জানান, উদ্ধারকর্মীরা যখন রেশমাকে জীবিত অবস্থায় টেনে বের করেন, শত শত মানুষ খুশিতে চিৎকার দিয়ে উঠেন। ‘আল্লাহু আকবর’ ধ্বনিতে প্রকম্পিত হয়ে উঠে চারিদিক।
"রেশমাকে জীবিত বের করে আনার পর সেখানে এক আবেগময় দৃশ্য দেখা যায়। অনেকে খুশিতে চিৎকার করছিলেন, কাঁদছিলেন।"
বিবিসির সংবাদদাতা আকবর হোসেন
স্ট্রেচারে শায়িত রেশমাকে যখন অ্যাম্বুলেন্সের দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল, তখন তিনি টেলিভিশন ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে হাসেন।
উদ্ধার কর্মীরা জানান, রেশমা শারীরিকভাবে অক্ষত আছেন। তারপরও তাকে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁকে হাসপাতালে দেখতে যান।
যেভাবে বেঁচে ছিলেন
হাসপাতালের বেডে শুয়ে রেশমা ঢাকার এক টেলিভিশন চ্যানেলকে দেয়া সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, কিভাবে তিনি দীর্ঘ ১৭ দিন ধরে বেঁচে থাকার জন্য লড়াই করেছেন।
তিনি বলেন, "অনেক কষ্ট করে চিপা দিয়ে চিপা দিয়ে লাঠি দিয়ে ভেঙ্গে নিচে নামছি। আমি অনেক ডাকছি, কেউই শুনে নাই।"
সেনাবাহিনীর উদ্ধার কর্মী আবদুর রাজ্জাক জানান, উদ্ধার করার সময় রেশমার কাছে তিনি জানতে চেয়েছিলেন এতদিন তিনি কি খেয়ে ছিলেন। রেশমা তাকে জানিয়েছেন, সেখানে অনেক খাবার-দাবার পড়ে ছিল, অনেক শুকনো খাবার ছিল। দুর্ঘটনার পর ১৫ দিন ধরে তিনি সেই খাবার খেয়েছেন। তবে শেষ দুই দিন ধরে তিনি না খেয়ে ছিলেন। আর কোন খাবার ছিল না।
আবদুর রাজ্জাক জানান, গার্মেন্টস কর্মীরা দুপুরের লাঞ্চের জন্য যে শুকনো খাবার সাথে নিয়ে আসেন, সেরকম অনেক খাবার রেশমা পেয়েছিলেন।
নয়তলা ভবন ধসে যেভাবে এক হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন, এবং আরও শত শত মানুষ আহত হয়েছেন, তার মধ্যেও কিভাবে রেশমা প্রায় অক্ষত থাকলেন সেটাও এক বিস্ময়কর ঘটনা।
উদ্ধারকর্মী আবদুর রাজ্জাক বলেন, রেশমা যেখানটায় আটকে ছিলেন, সেটি ভবনের দ্বিতীয় তলায়। সেখানে অনেক ঘন ঘন পিলার থাকায় পুরোটা ধসে
পড়েনি। কিছু ফাঁকা জায়গা ছিল। এ কারণেই সেখানে রেশমা এতদিন টিকে থাকতে পেরেছেন।
No comments:
Post a Comment