Sunday, December 29, 2013

ভেজাল খাদ্যের অনাচারে অতিষ্ঠ মানুষ: প্রশ্নবিদ্ধ বিএসটিআই !!

এম এ বাবর 
অব্যাহত ভেজাল ও রাসায়নিক দ্রব্যমিশ্রিত খাদ্যের অনাচারে অতিষ্ঠ দেশের মানুষ। আর খাদ্যমান রক্ষায় ব্যর্থ হয়ে অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে দেশের একমাত্র মান নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউট (বিএসটিআই)। দেশে উৎপাদিত পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণে সংস্থার নিজস্ব পরীক্ষাগার থাকলেও এর কার্যক্রম নিয়ে রয়েছে নানা ধরনের অভিযোগ। এদিকে বিএসটিআই অনুমোদিত দেশে উৎপাদিত পণ্য দেশীয় বিভিন্ন ল্যাব ও বিদেশের ল্যাবে পরীক্ষায় ভেজাল ও মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর পদার্থের অস্তিত্ব পাওয়ায় প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছে সংস্থাটি। 
দেশে নিরাপদ খাদ্য আইন-২০১৩ (দ্য পিওর ফুড অর্ডিন্যান্স-১৯৫৯ সদ্য বাতিল) বিদ্যমান থাকলেও নেই তার বাস্তবায়ন। ওই আইনে জীবননাশক বা মানবস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর কোনো রাসায়নিক বা ভারি ধাতু বা বিষাক্ত দ্রব্যমিশ্রিত কোনো খাদ্যদ্রব্য উৎপাদন, আমদানি, প্রস্তুত, মজুদ, বিতরণ ও বিক্রি করলে অনূর্ধ্ব সাত বছরের কারাদণ্ড বা অনধিক ১০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবে। এছাড়া পুনরায় অপরাধ করলে সাত বছর থেকে অনূর্ধ্ব ১৪ বছরের কারাদণ্ড বা অনূর্ধ্ব ১০ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে। এমনকি অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানের পণ্য উৎপাদন ও বিপণনে নিষিদ্ধ করা করা যেতে পারে। কিন্তু খাদ্যমান নিয়ন্ত্রণে বিএসটিআই’র কঠোর কোনো কার্যক্রম নেই। মাঝেমধ্যে নামমাত্র ভেজালবিরোধী অভিযান করেই দায়সারা ভূমিকা পালন করছে সংস্থাটি। লাইসেন্স দেয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর পণ্যমানও তদারকি করা হয় না। ফলে দেশের বাজারে ভেজাল ও মানহীন পণ্য অতিমাত্রায় বেড়েছে। আর বিএসটিআই’র ল্যাবে পরীক্ষিত ও অনুমোদিত বেশ কিছু পণ্য অন্য পরীক্ষাগারে পরীক্ষা করে তাতে ভেজাল ও মানবদেহেরে জন্য ক্ষতিকারক পদার্থের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। 
Photo: http://manobkantha.com/2013/12/24/152428.html
 
ফার্মফ্রেশ দুধ ও দই: গত জুন মাসে আকিজ ফুড অ্যান্ড বেভারেজ উৎপাদিত ফার্মফ্রেশ পাস্তুরিত দুধ ও দই ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের (ডিসিসি) ল্যাবে পরীক্ষা করা হয়। এতে পাস্তুরিত তরল দুধে বিভিন্ন অপরিহার্য উপাদান যথাযথ মাত্রায় নেই। ডিসিসি বারবার রাসায়নিক টেস্ট করলেও এর শুদ্ধতার প্রমাণ মেলেনি। বরং তা জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি বলে ল্যাবরেটরি টেস্ট প্রমাণিত হয়। পরে ডিসিসির বিশুদ্ধ খাদ্য আদালতে আকিজ ফুড অ্যান্ড বেভারেজের বিরুদ্ধে ভেজাল ফার্মফ্রেশ দুধ ও দই উৎপাদন ও বিপণনের অভিযোগে দুটি মামলা করেন ডিসিসির খাদ্য পরিদর্শক ফখরুদ্দীন মোবারক।

ফ্রেশ সয়াবিন তেল: বোতলজাত সয়াবিন তেলে মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর উপাদান পাওয়ার অভিযোগে গত ৪ মার্চ তেল প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান ফ্রেস’র বিরুদ্ধে বিশুদ্ধ খাদ্য আদালতে মামলা দায়ের করে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন। দায়ের করা মামলায় ফ্রেশ তেল রিফাইনারি প্রতিষ্ঠান তানভির অয়েল মিলস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোস্তফা কামাল এবং ওই তেল বিক্রয়কারী আগোরা ডিপার্টমেন্টাল স্টোরের একজন ব্যবস্থাপক শেখ ওয়াহিদ হাসানকে আসামি করা হয়।


এনার্জি ড্রিংক: সম্প্রতি মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর বাজার থেকে সংগৃহীত ‘এনার্জি ড্রিংক’ হিসেবে পরিচিত সাত ধরনের পানীয় সংগ্রহ করে নিজস্ব পরীক্ষাগারে পরীক্ষা করে। অধিদফতরের পরীক্ষায় ভিগো-বি, ম্যান পাওয়ার (স্বচ্ছ তরল), ম্যান পাওয়ার (অস্বচ্ছ তরল), হর্স ফিলিংস, রয়েল টাইগার, ব্ল্যাক হর্স ও স্পিড নামের সাতটি পানীয়তে জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর উপাদান পায়। পানীয়গুলোর মধ্যে প্রথম চারটিতে ‘অপিয়াম উদ্ভূত অপিয়েট’ ও ‘সিলডেনাফিল সাইট্রেট’ নামের রাসায়নিক দ্রব্য পাওয়া গেছে। এ দুটি দ্রব্য ‘ঔষধ নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশ-১৯৮২’ অনুযায়ী নিষিদ্ধ। পরের তিনটি পণ্যে পাওয়া গেছে উচ্চমাত্রার ক্যাফেইন, যা বিএসটিআই অনুমোদিত পণ্যের চার-পাঁচগুণ বেশি ক্যাফেইন। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে এসব উপাদান ভোক্তাদের আসক্তি বৃদ্ধি, যৌনশক্তি হ্রাস ও হৃদেরাগের কারণ হতে পারে।


প্রাণ হলুদ, আচার ও সস: সম্প্রতি প্রাণের কাঁচা আম ও জুসে ফরমালিনের অস্তিত্ব ধরা পড়ে। কানাডায় রফতানি করা পণ্য ভাইরাসের কারণে ফেরত আসার ঘটনা ঘটেছে। এ সংক্রান্ত কয়েকটি প্রতিবেদন গুরুত্বসহকারে বিবেচনায় নিয়েছে আন্তর্জাতিক সংস্থা দি ইন্টারন্যাশনাল ফুড সেফটি অথরিটিস নেটওয়ার্ক (আইএনএফওএসএএন)। এছাড়া গত ২৮ মে কাঁচা আমে মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর ফরমালিন মেশাতে গিয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালতে দণ্ডিত হন প্রাণের দুই কর্মকর্তা। এছাড়া প্রাণ টমেটো সসে ভেজাল ধরা পড়ায় গত বছর দুটি মামলা হয়েছে উৎপাদনকারী সংস্থা প্রাণ এগ্রো কোম্পানির বিরুদ্ধে। বিশুদ্ধ খাদ্য আদালতে মামলাটি করেছেন ডিএসসিসির ফুড অ্যান্ড স্যানিটেশন ইন্সপেক্টর কামরুল হাসান। সর্বশেষ গত ১৭ অক্টোবর যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রাণের গুঁড়ো হলুদে মাত্রাতিরিক্ত সিসার উপস্থিতি ধরা পড়ে। এরপর বাংলাদেশের বাজার থেকে সংগ্রহ করা প্রাণের গুঁড়া হলুদ পরীক্ষা করে বিএসটিআই ৪০ পিপিএম (পার্টস পার মিলিয়ন) থেকে ৫৮ পিপিএম মাত্রায় সিসা পায়, যা মানবদেহের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। এরপর গত মাসে প্রাণের প্যাকেটজাত গুঁড়া হলুদের লাইসেন্স বাতিল করে বিএসটিআই। 

 
বিএসটিআইয়ের উপ-পরিচালক (প্রশাসন) তাহের জামিল বলেন, দেশের লোকাল মার্কেটে মানসম্পন্ন পণ্য বাজারজাত করার জন্য নির্দিষ্ট সময়ের জন্য লাইসেন্স দেয় বিএসটিআই। সে ক্ষেত্রে সংস্থার প্রচলিত নিয়মে ফ্যাক্টরি পরিদর্শন করে সেখানকার অবস্থা দেখে পণ্যের মান-সংক্রান্ত যেসব বিষয় বলা আছে তা দেখে ওই পণ্য সিলড করা হয়। এরপর ওই পণ্য বিএসটিআই’র নিজস্ব ল্যাবে কেমিক্যাল টেস্ট বা আরো যেসব টেস্ট করার দরকার তা করেই গুণগত মান সঠিক থাকলেই লাইসেন্স দেয়া হয়। এরপর লাইসেন্স অনুযায়ীই ওই পণ্য বিএসটিআইর অনুমোদিত নিয়মে উৎপাদন ও বাজারজাত করতে হবে। আর পণ্য মান ঠিক আছে কিনা তা যাচাই জন্য সংস্থার পরিদর্শন টিম মাঠ পর্যায়ে কাজ করছে। তবে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনায় বিএসটিআই’র নিজস্ব ম্যাজিস্ট্রেট নেই। ফলে মাঠপর্যায়ে আদালত পরিচালনায় জেলা প্রশাসনের সহযোগিতা নিতে হয়। তাই মান নিয়ন্ত্রণ এবং বিএসটিআই’র সক্ষমতা বাড়াতে পর্যাপ্ত জনবল নিয়োগ ও নিজস্ব ম্যাজিস্ট্রেট ছাড়া এ কাজ সম্ভব নয়।
http://manobkantha.com/2013/12/24/152428.html

No comments: