Sunday, December 29, 2013

উন্নয়ন ব্যয়ের নামে ডিসিসির ২৩৩৫ কোটি টাকা লোপাট!

এম এ বাবর 
মেয়র হানিফ ফ্লাইওভার (গুলিস্তান-যাত্রাবাড়ী) নির্মাণ প্রকল্পের উন্নয়ন ব্যয় দেখিয়ে ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের (ডিসিসি) দুই হাজার তিনশ’ ৩৫ কোটি টাকা লোপাট হয়েছে। অথচ এ ফ্লাইওভারটির নির্মাণ চুক্তি অনুযায়ী ডিসিসির কোনো ধরনের উন্নয়ন ব্যয় নেই। অভিযোগ রয়েছে, একটি প্রভাশালী রাজনৈতিক ও আমলা চক্র এ ফ্লাইওভার রক্ষণাবেক্ষণ ও উন্নয়ন ব্যয়ের নামে গত পাঁচ অর্থবছরে উল্লিখিত পরিমাণ অর্থ লোপাট করেছে। এদিকে এ বিপুল পরিমাণ অর্থ কোন কোন খাতে ব্যয় হয়েছে তার উল্লেখযোগ্য কোনো তথ্য-প্রমাণও নেই সংস্থার কাছে। 
 
মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর ২০১০ সালের ২২ জুন মেয়র হানিফ ফ্লাইওভারের নির্মাণ কাজ উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সম্পূর্ণ বেসরকারি বিনিয়োগে নির্মিত প্রায় ১১ কিলোমিটার দীর্ঘ এ ফ্লাইওভারের সংশোধিত ব্যয় ধরা হয় দুই হাজার ১০৮ কোটি ৫৫ লাখ টাকা। বিল্ড ওন অপারেট অ্যান্ড ট্রান্সফার (বিওওটি) পদ্ধতিতে এ প্রকল্পে পরামর্শক ব্যয় ছাড়া সিটি কর্পোরেশনের আর কোনো বিনিয়োগ নেই। কিন্তু ফ্লাইওভার নির্মাণে ঢাকা সিটি কর্পোরেশন ২০০৯-১০ অর্থবছরে ব্যয় দেখায় ১শ’ কোটি ও ২০১০-১১ অর্থবছরে ৩৩৫ কোটি টাকা। আর বিভক্ত হওয়ার পর ডিএসসিসি ২০১১-১২ অর্থবছরে এ প্রকল্পে ব্যয় দেখায় ৭শ’ কোটি ও ২০১২-১৩ অর্থবছরে ৬শ’ কোটি টাকা। আর ২০১৩-১৪ অর্থবছরের বাজেটে ব্যয় ধরা হয়েছে ৬শ’ কোটি টাকা।  

Photo: http://manobkantha.com/2013/12/20/151826.html
http://www.emanobkantha.com/2013/12/20/এ প্রসঙ্গে ডিএসসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আনছার আলী খান জানান, প্রকল্পে ডিএসসিসির উল্লেখযোগ্য কোনো ব্যয় নেই। শুধু পরামর্শক খাতে কিছু অর্থ ব্যয় করতে হয়েছে। ২০০৯-১০ অর্থবছর থেকে ২০১২-১৩ অর্থবছর পর্যন্ত এক হাজার ৭৩৫ কোটি টাকা কোন খাতে ব্যয় করা হয়েছে জানতে চাইলে তিনি বলেন- ‘এটা আসলে ব্যয় নয়, এমনিতেই দেখানো হয়েছে। এ অর্থ কোথায় গেছে বা কেন দেখানো হয়েছে, সে বিষয়টি আমার জানা নেই।’ এ ব্যাপারে বিস্তারিত জানতে তিনি ডিএসসিসির প্রধান হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দেন।
প্রধান হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা শেখ মোহাম্মদ ওমর ফারুক এ বিষয়ে বলেন, প্রকল্পের তিন স্তরের পরামর্শক খাতে এ পর্যন্ত সাড়ে ৬ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। তবে প্রতিবছর যে ব্যয় দেখানো হচ্ছে তার সঠিক কোনো হিসাব নেই। প্রকৃতপক্ষে সংস্থার এ ধরনের কোনো ব্যয় হয়নি।
প্রতিবছর কেন এ ব্যয় দেখানো হয়েছে বা হচ্ছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘২৪ বছর পর এ ফ্লাইওভারটি সিটি কর্পোরেশনের সম্পত্তি হবে। তাই এ খাতে প্রতিবছর ব্যয় দেখানো হচ্ছে। এ বিষয়ে আপনারা প্রকল্প পরিচালকের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন।’
প্রকল্প পরিচালক ও ডিএসসিসির তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আশিকুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, ফ্লাইওভার নির্মাণে সিটি কর্পোরেশন বা সরকারের এক টাকাও ব্যয় হয়নি। সম্পূর্ণ বেসরকারি বিনিয়োগে ফ্লাইওভারটি নির্মিত হচ্ছে। প্রকল্প পরিচালক হিসেবে এ সংক্রান্ত কোনো বিলও তিনি পরিশোধ করেননি। তাহলে এক হাজার ৭৩৫ কোটি টাকা কিভাবে ব্যয় হলো জানতে চাইলে প্রকল্প পরিচালক গ্রহণযোগ্য কোনো উত্তর দিতে পারেননি।
মেয়র হানিফ ফ্লাইওভার প্রকল্পের তথ্যানুযায়ী, ফ্লাইওভারের মূল সুপার স্ট্রাকচার ও র‌্যাম্প নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে এক হাজার ৪৮১ কোটি ৩৭ লাখ টাকা। অন্যান্য ব্যয়ের মধ্যে সড়ক নির্মাণে ২১৮ কোটি ৯৭ লাখ টাকা, টোল প্লাজা, টোল ব্যবস্থা ও লাইটিং খাতে ১০৫ কোটি ৩৭ লাখ, প্রকল্প ব্যবস্থাপনা ও গুণগত মান নিশ্চিত করতে ১৪৮ কোটি ৭৯ লাখ, পরিবেশগত প্রশমন (মিটিগেশন) খাতে ৫৫ কোটি ৮০ লাখ, ট্রাফিক ডাইভারশনে ২০ কোটি ও পরিষেবা সংযোগ লাইন স্থানান্তরে ২৪ কোটি টাকা। এ ব্যয়ের পুরোটাই বহন করছে ওরিয়ন গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান বেলহাসা-একম অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েট লিমিটেড।
এ প্রসঙ্গে ওরিয়ন গ্রুপের ব্যবস্থাপক (সরবরাহ) চৌধুরী খালেদ মাসুদ বলেন, প্রকল্প ব্যয় পুরোটাই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বহন করছে। প্রাথমিকভাবে পরিষেবা সংযোগ লাইন স্থানান্তরের ব্যয় সিটি কর্পোরেশনের দেয়ার কথা ছিল। কিন্তু তা না পাওয়ায় এ ব্যয়ও ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান নিজস্ব তহবিল থেকে বহন করছে। সিটি কর্পোরেশন বাজেটে কেন প্রতিবছর এ প্রকল্পে ব্যয় দেখাচ্ছে সে বিষয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাছে কোনো তথ্য নেই।
উল্লেখ্য, ফ্লাইওভারটি নির্মাণ কাজ উদ্বোধনের পর ২০১০ সালের জুলাইয়ে ভারতের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সিমপ্লেক্স ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেডের সঙ্গে চুক্তি করে বেলহাসা-একম। ফ্লাইওভারটি নির্মাণে সিমপ্লেক্সকে ৭৮৮ কোটি ৯০ হাজার ৩৮১ টাকা প্রদান করবে বেলহাসা-একম। যদিও তার আগেই ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান বেলহাসা-একম অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েট সরকারের কাছ থেকে ১ হাজার ৩৩২ কোটি টাকার ব্যয় অনুমোদন করিয়ে নেয়। অর্থাৎ শুরুতেই বাড়তি ব্যয় দেখানো আছে প্রায় ৫৪৫ কোটি টাকা। পরে নির্মাণসামগ্রী ও জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির যুক্তি দেখিয়ে এ ব্যয় ৭৭৬ কোটি টাকা বাড়িয়ে ২ হাজার ১০৮ কোটি টাকা করা হয়।

No comments: