মুক্ত প্রকৃতিতে একান্তে কিছু সময় কাটানোর অনন্য স্থান হাতিরঝিল যেন ঢাকার কণ্ঠে হীরার হার। উদ্বোধনের পর থেকে সকালে শরীরচর্চা, বিকেলে সাইক্লিং আর সন্ধ্যা হলে বন্ধু-বান্ধব ও পরিবার-পরিজন নিয়ে আড্ডা; সারাবেলাই মুখর থাকে হাতিরঝিল এলাকা। কিন্তু উদ্বোধনের নতুনত্ব না কাটতেই হাতিরঝিলের নির্মল অবকাশে ছেদ পড়তে শুরু করেছে। নগরবাসীর বহু কাক্সিক্ষত এই জায়গাটি ক্রমান্বয়ে শ্রীহীন ও অরক্ষিত হয়ে পড়েছে। পরিণত হচ্ছে অসামাজিক কর্মকাণ্ডের আস্তানায়। সন্ধ্যা হলেই বসে মাদকের আসর, শুরু হয় অসামাজিক কার্যকলাপ। আর রাতভর চলে ভাসমান মানুষের আনাগোনা।
কিছুদিন ধরে হাতিরঝিলে নিরাপত্তা সদস্যদের তেমন চোখে পড়ছে না। নেই সেনা প্রহরা। তাই অনেকটা অবাধেই চলছে রিকশা, লেন মানছে না গাড়ি ও মোটরবাইক। এতে প্রকল্প এলাকায় সৃষ্টি হচ্ছে যানজট। ঘটছে দুর্ঘটনা। আর ডাস্টবিন থাকা সত্ত্বেও যত্রতত্র আবর্জনা ফেলা হচ্ছে। সন্ধ্যা হলেই হাতিরঝিল হয়ে যায় নিরাপত্তাহীন। ফলে সৌন্দর্যপিপাসুদের আগমনও কমে যাচ্ছে দিন দিন।

সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, হাতিরঝিল লেকের দু’পাশে পাকা রাস্তা, তার পাশে ফুটপাত। লেকের ঢাল কমপক্ষে ১০-১৫ ফুট নিচু। ল্যাম্প পোস্টের আলো লেকের ঢাল পর্যন্ত পৌঁছায় না। তাই এমন জায়গাতেই আখড়া গেড়েছে মাদকসেবীরা। গাঁজার উৎকট গন্ধে নাক চেপে ধরতে বাধ্য হন পথচারীরা। ঝিলের সংযোগ সেতুর আশপাশেই তাদের তৎপরতা বেশি। আর দিনের আলো নিভতেই শুরু হয় তরুণ-তরুণীদের আপত্তিকর অবস্থান। মগবাজার অভিমুখী ওভারপাসের দু’ধারে দু-তিন হাত পর পর ঝাউগাছ লাগানো হয়েছে। এরই আড়ালে অসামাজিক কার্যকলাপ চলছে অবাধে। এছাড়া ঝিলের পশ্চিম প্রান্তে দর্শনার্থীদের দাবা খেলার জন্য বিশেষ চত্বর তৈরি করা হয়েছে। কিন্তু রাতে আলোর স্বল্পতার সুযোগে সেখানে আপত্তিকর অবস্থায় জুটিবদ্ধ হয়ে বসে পড়ছে কতিপয় নারী-পুরুষ। তাই, সপরিবারে বেড়াতে এসে বিব্রত হচ্ছেন অনেকেই।
এদিকে কারওয়ান বাজারের দিক থেকে হাতিরঝিলে প্রবেশ পথের ডান দিকে আলোর ব্যবস্থা নেই। এ রকম আরো কয়েকটি স্থানে পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা নেই। স্বল্প আলোতে তৎপর অপরাধীরা। হাতিরঝিল প্রকল্পের মগবাজার ও তেজগাঁও এলাকার আশপাশে রয়েছে কিছু বস্তির এলাকা। আর এসব এলাকাকে ঘিরে চলে ছিনতাইয়ের মতো অপরাধ।
অন্যদিকে লেকের পানির দুর্গন্ধে পাশ দিয়ে হাঁটা-চলা করাও দায়। আর প্রকল্প এলাকায় প্রতিদিন বিভিন্ন ধরনের পানীয়র বোতল, বাদাম-বিস্কুটের প্যাকেট ও আইসক্রিমের খোসাসহ ময়লা-আবর্জনা ফেলা হচ্ছে। তাই বিব্রতকর দৃশ্য আর চুরি ছিনতাইয়ের ভয়ে সাধারণ মানুষ হাতিরঝিলের পথে পা বাড়ানো বন্ধ করে দিয়েছেন।
এ ব্যাপারে হাতিরঝিল-বেগুনবাড়ি সমন্বিত উন্নয়ন প্রকল্প পরিচালক (রাজউক) এএসএম রায়হানুল ফেরদাউস বলেন, খুব শিগগির এ প্রকল্পের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পাচ্ছেন সেনাবাহিনী। এজন্য মন্ত্রণালয় পর্যায়ে কার্যক্রম চলছে। আর সেনাবাহিনী দায়িত্ব পেলে এর সৌন্দর্য ও রক্ষণাবেক্ষণ দীর্ঘদিন অটুট থাকবে বলে আশা করা যায়।
গত ২ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা হাতিরঝিল-বেগুনবাড়ি সমন্বিত উন্নয়ন প্রকল্প উদ্বোধন করেন। এক হাজার ৯৭১ কোটি ৩০ লাখ টাকা ব্যয়ে ৩০২ একর জমির ওপর বিস্তৃত এই প্রকল্পে ৮ দশমিক ৮ কিলোমিটার সার্ভিস রোড, ৮ কিলোমিটার এক্সেস রোড, ২৬০ মিটার ভায়োড্যাকট, ১০ কিলোমিটার ওয়াকওয়ে, ৪টি ব্রিজ ও ৪টি ওভারপাস। বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের (১/১১) সময়ে ২০০৭ সালের ৮ অক্টোবর একনেকে ১ হাজার ৪৭৩ কোটি ৫৮ লাখ টাকার এই প্রকল্পটি পাস করা হয়েছিল। পরবর্তীতে ভূমি অধিগ্রহণ ব্যয়সহ সংশোধিত প্রকল্প ব্যয় দাঁড়ায় ১ হাজার ৯৭১ কোটি ৩০ লাখ টাকা। প্রকল্পে আরো আছে ঢাকা ওয়াসার তত্ত্বাবধানে ডাইভারশন স্যুয়ারেজ এবং স্পেশাল ডাইভারসন স্ট্র্যাকচার নির্মাণ। আরো যুক্ত হচ্ছে রামপুরা ব্রিজের দু’পাশ দুটি ইউলুপ। এই দুটি ইউলুপের ফলে হাতিরঝিল থেকে আসা সড়কটি রামপুরা প্রগতি সরণিতে এসে মিলবে।
http://manobkantha.com/2013/10/12/142715.html
No comments:
Post a Comment